শিক্ষকদের অবমূল্যায়নের গল্প

।। এ এইচ এম সায়েদুজ্জামান ।।

শিক্ষক—এই শব্দটির সঙ্গে জড়িয়ে আছে শ্রদ্ধা, ভালোবাসা, আদর্শ ও দায়িত্বের এক অটুট বন্ধন। সমাজে এই শ্রেণির মানুষেরা জাতির ভবিষ্যৎ গড়ে তোলেন, অন্ধকার দূর করে আলো দেখান, অজ্ঞতা দূর করে জ্ঞান জাগান। কিন্তু পরিহাসের বিষয় হলো, যে শিক্ষক জাতির ভিত্তি রচনা করেন, সেই শিক্ষকই আজ সবচেয়ে বঞ্চিত, অবহেলিত ও আর্থিকভাবে নিপীড়িত শ্রেণিতে পরিণত হয়েছেন। একই পাঠ্যক্রম, একই ক্লাসঘণ্টা, একই দায়িত্ব—তবুও আর্থিক বৈষম্যের পাহাড় ঘিরে রেখেছে দেশের বেসরকারি শিক্ষকদের জীবন। সরকারি শিক্ষকদের সঙ্গে তাদের ব্যবধান দিন দিন আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে, যা শিক্ষা ব্যবস্থার ভিত্তিকে ক্রমেই দুর্বল করে দিচ্ছে।

বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবদান অনস্বীকার্য। দেশে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক স্তরের প্রায় ৯৭ শতাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বেসরকারি খাতে পরিচালিত হয়। অর্থাৎ, দেশের শিক্ষাক্ষেত্রে বেসরকারি শিক্ষকেরাই মূল চালিকাশক্তি। প্রায় ৫ লক্ষাধিক শিক্ষক সারাদেশে নিরলস পরিশ্রম করছেন প্রজন্ম গড়ার কাজে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, এই বিশাল অবদান থাকা সত্ত্বেও তারা পাচ্ছেন না ন্যায্য সম্মান বা আর্থিক সুরক্ষা।

বেতন কাঠামো, পদোন্নতি, চিকিৎসা সুবিধা, বাসাভাড়া, উৎসব ভাতা, অবসর সুবিধা—সবকিছুতেই সরকারি ও বেসরকারি শিক্ষকদের মধ্যে বিশাল বৈষম্য বিরাজ করছে। একদিকে সরকারি শিক্ষকরা পাচ্ছেন নিয়মিত ইনক্রিমেন্ট, শিক্ষা ভাতা, পূর্ণাঙ্গ অবসর সুবিধা ও অন্যান্য ভাতা, অন্যদিকে বেসরকারি শিক্ষকেরা এখনো ১৯৮০-র দশকের সীমিত সুবিধার বৃত্তে আবদ্ধ।

প্রাথমিক শিক্ষাই হলো শিশুর মানসিক ও জ্ঞানগত বিকাশের ভিত্তি। এখান থেকেই একজন শিক্ষার্থী তার ভবিষ্যৎ ব্যক্তিত্ব ও শিক্ষাজীবনের দিকনির্দেশনা পায়। অথচ যারা সেই ভিত্তি নির্মাণ করেন—প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা—তাদের অবস্থান এখনো তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারী হিসেবে নির্ধারিত। দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষকদের বেতন সবচেয়ে কম।

ভারত, নেপাল কিংবা শ্রীলঙ্কায় প্রাথমিক শিক্ষকরা সরকারি মর্যাদা ও সুবিধা ভোগ করেন, সেখানে বাংলাদেশের শিক্ষকরা বেতন-বৈষম্যের চরম নিদর্শন হয়ে দাঁড়িয়েছেন। এই শ্রেণির শিক্ষকরা জীবনযাপনের ন্যূনতম চাহিদা মেটাতেও হিমশিম খান। দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতি, চিকিৎসা ব্যয়, সন্তানদের শিক্ষার খরচ—সব মিলিয়ে তাদের জীবনযুদ্ধ প্রতিনিয়ত কঠিন হয়ে উঠছে।

এই বৈষম্যের ইতিহাস দীর্ঘ ও বেদনাদায়ক। ১৯৮২ সালের আগে বেসরকারি শিক্ষকদের সরকারি অংশ হিসেবে বেতন-ভাতা দেওয়া হতো মাত্র ৫০ শতাংশ। পরে এরশাদ সরকার তা ৮০ শতাংশে উন্নীত করলেও বাসাভাড়া ছিল মাত্র ১০০ টাকা আর চিকিৎসা ভাতা ১৫০ টাকা। সময় গড়িয়েছে, সরকার পাল্টেছে, কিন্তু শিক্ষকদের বাস্তবতা তেমন পাল্টায়নি।

১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার এসে বেতন-ভাতার সরকারি অংশ ৯০ শতাংশে উন্নীত করেছিল, কিন্তু বাসাভাড়া ও চিকিৎসা ভাতার কোনো পরিবর্তন আনেনি। ২০০১ সালে বিএনপি সরকার ৯৫ শতাংশে উন্নীত করে অবসর সুবিধা ও উৎসব ভাতার ব্যবস্থা করলেও তা পূর্ণতা পায়নি। পরবর্তীতে ১/১১ সরকার এসে ১০০ শতাংশ এমপিও কার্যকর করে।

তবে এখানেই মূল বৈষম্য রয়ে গেছে—বাসাভাড়া ও চিকিৎসা ভাতা। আজও একজন বেসরকারি শিক্ষক মাত্র ৫০০ টাকা বাড়িভাড়া এবং ১০০০ টাকা চিকিৎসা ভাতা পান, যা বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় হাস্যকর। অন্যদিকে সরকারি কর্মচারীরা তাদের মূল বেতনের ৩৫–৪৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়িভাড়া পান।

সরকারি শিক্ষকদের বেতন কাঠামোতে রয়েছে উৎসব ভাতা, চিকিৎসা ও শিক্ষা ভাতা, বাৎসরিক ইনক্রিমেন্ট, পূর্ণ পেনশন সুবিধা, সরকারি আবাসন ও বিভিন্ন প্রকল্পভিত্তিক বোনাস। অন্যদিকে বেসরকারি শিক্ষকরা পান অর্ধেক উৎসব ভাতা এবং তাদের জন্য কোনো শিক্ষা ভাতা নেই। তাদের অবসরভাতা ও কল্যাণ ট্রাস্টের অর্থ পেতেও বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে হয়। অনেক শিক্ষক মৃত্যুর আগেই সেই পাওনা না পেয়ে চলে যান।

এই আর্থিক বৈষম্য শুধু ব্যক্তিগত জীবনে কষ্ট তৈরি করে না, এটি শিক্ষা ব্যবস্থার মানকেও ক্ষতিগ্রস্ত করে। একজন শিক্ষক যখন সংসারের দায়ে কোচিং বা প্রাইভেট টিউশনে সময় ব্যয় করতে বাধ্য হন, তখন তার একাডেমিক মনোযোগ ক্ষীণ হয়, যা সরাসরি শিক্ষার্থীদের শিক্ষার মানে প্রভাব ফেলে।

একজন শিক্ষকের মনোযোগ, আত্মমর্যাদা ও প্রেরণা তার জীবনযাত্রার মানের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। যিনি মাসের শেষে নিজের পরিবারের প্রয়োজন মেটাতে ব্যর্থ, তার পক্ষে সঠিক মানসিক ভারসাম্যে থেকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে গড়ে তোলা কতটা সম্ভব? শিক্ষকদের মধ্যে হতাশা, অবমূল্যায়নের বোধ এবং আর্থিক নিরাপত্তাহীনতা বেড়ে চলেছে।

জাতি গঠনের এই কারিগররা যখন নিজের সন্তানদের ভালো স্কুলে ভর্তি করাতে পারেন না, চিকিৎসার জন্য ধার করতে হয়, তখন তারা যে কতটা মনোবেদনায় ভোগেন তা কল্পনা করা কঠিন। সমাজে তাদের যে সম্মান ও মর্যাদা পাওয়ার কথা, বাস্তবে তারা অনেক সময় সেটির উল্টো পরিস্থিতির মুখোমুখি হন।

শিক্ষকদের বঞ্চনার আরেকটি বড় কারণ হলো প্রশাসনিক জটিলতা ও সিদ্ধান্তহীনতা। বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর তদারকির দায়িত্ব মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের হলেও সেখানে প্রণোদনা বা নীতি নির্ধারণের ক্ষেত্রে সবসময়ই রয়েছে বিলম্ব ও উদাসীনতা।

যেমন—বেসরকারি শিক্ষকদের জন্য “শিক্ষক কল্যাণ ট্রাস্ট” বা “অবসর সুবিধা বোর্ড” থাকলেও সেগুলোর কার্যকারিতা প্রায় নেই বললেই চলে। আবেদন, যাচাই, অনুমোদন—সব মিলিয়ে একজন অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষককে তার প্রাপ্য অর্থ তুলতে লাগে দুই থেকে তিন বছর পর্যন্ত। এ অবস্থায় অনেক শিক্ষক মারা যাওয়ার পর তাদের পরিবার সেই অর্থ পায়।

১৯৯৫ সাল থেকে ৫ অক্টোবর বিশ্বব্যাপী পালিত হচ্ছে বিশ্ব শিক্ষক দিবস। এ বছর দিবসটির প্রতিপাদ্য—‘শিক্ষকতা পেশা: মিলিত প্রচেষ্টার দীপ্তি’। ইউনেসকো এবং এডুকেশন ইন্টারন্যাশনাল এই দিবসটির মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী শিক্ষকদের অবদানের স্বীকৃতি প্রদান করে।

কিন্তু বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই দিবসটি অনেক শিক্ষকের কাছে নিছক প্রতীকী হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ, সারাবছর যাদের কথা কেউ শোনে না, একদিন ফুল ও মিষ্টি দিয়ে তাদের সম্মান জানানো মানেই কি প্রকৃত সম্মান? শিক্ষক দিবসের আসল তাৎপর্য তখনই বাস্তবায়িত হবে, যখন প্রতিটি শিক্ষক আর্থিকভাবে নিরাপদ ও মর্যাদাবান হবেন।

একজন ভালো শিক্ষক হাজারো শিক্ষার্থীকে বদলে দিতে পারেন। শিক্ষকের মর্যাদা মানে জাতির মর্যাদা। ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, যে দেশগুলো শিক্ষকদের সর্বোচ্চ মর্যাদা দিয়েছে, সেই দেশগুলোই আজ উন্নয়নের শিখরে।

উদাহরণস্বরূপ, ফিনল্যান্ডে শিক্ষকরা সবচেয়ে বেশি সম্মানিত পেশাজীবী। সেখানে শিক্ষক হতে হলে যেমন যোগ্যতা লাগে, তেমনি সরকারও তাদের সর্বোচ্চ সুবিধা নিশ্চিত করে। ফলাফল—বিশ্বের সেরা শিক্ষা ব্যবস্থা।

বাংলাদেশেও যদি শিক্ষকদের জীবনমান নিশ্চিত করা যায়, তাহলে তার প্রতিফলন পড়বে শিক্ষার মান, মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে।

শিক্ষকদের সমস্যা কোনো একদিনে তৈরি হয়নি, তাই এর সমাধানও একদিনে সম্ভব নয়। তবে দৃঢ় রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলে অসম্ভবও সম্ভব। সরকার চাইলে ধাপে ধাপে এই বৈষম্য দূর করা যায়।

প্রথমত, বেসরকারি শিক্ষকদের বাসাভাড়া ও চিকিৎসা ভাতা পুনর্নির্ধারণ করতে হবে বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে।
দ্বিতীয়ত, অবসর সুবিধা ও কল্যাণ ট্রাস্টে অর্থ ছাড়ের প্রক্রিয়া সহজীকরণ করতে হবে যাতে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকরা জীবদ্দশায় তাদের প্রাপ্য অর্থ পান।
তৃতীয়ত, শিক্ষকদের পেশাগত পদমর্যাদা ও শ্রেণিবিন্যাসে বৈষম্য দূর করতে হবে। প্রাথমিক শিক্ষকরা যেন অন্তত দ্বিতীয় শ্রেণির মর্যাদা পান, সেটি এখন সময়ের দাবি।
চতুর্থত, শিক্ষা ভাতা ও পারিবারিক সুবিধা সরকারি শিক্ষকদের মতোই দিতে হবে বেসরকারি শিক্ষকদের।

জাতির অগ্রযাত্রা শুরু হয় শ্রেণিকক্ষ থেকে, আর সেই শ্রেণিকক্ষের প্রাণ হলো শিক্ষক। কিন্তু এই প্রাণ যখন অনাহারে, অবহেলায়, বৈষম্যে নিস্তেজ হয়ে পড়ে, তখন পুরো জাতিই দুর্বল হয়ে যায়।

আজ সময় এসেছে কথার ফুলঝুড়ি নয়, বাস্তব পদক্ষেপ নেওয়ার। শিক্ষককে যদি যথাযথ মর্যাদা, সম্মান ও আর্থিক নিরাপত্তা না দেওয়া হয়, তাহলে আমরা যতই উন্নয়নের স্বপ্ন দেখি না কেন, তা বাস্তব রূপ পাবে না।

শিক্ষককে মর্যাদা দিন—তিনি শুধু একজন মানুষ নন, তিনি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের গড়নশিল্পী। শিক্ষক হাসলে জাতি হাসবে, শিক্ষক কাঁদলে জাতিও কাঁদবে। তাই শিক্ষককে বাঁচান, তবেই বাঁচবে শিক্ষা, বাঁচবে বাংলাদেশ।

লেখা : শিক্ষক ও গবেষক। 

শিক্ষাবার্তা /এ/০৫/১০/২০২৫

দেশ বিদেশের শিক্ষা, পড়ালেখা, ক্যারিয়ার সম্পর্কিত সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম, ছবি, ভিডিও প্রতিবেদন সবার আগে দেখতে চোখ রাখুন শিক্ষাবার্তায়


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.