।। এ এইচ এম সায়েদুজ্জামান।।
ভোরবেলা। শ্যামলীর একটি সরু গলিতে দাঁড়িয়ে কাঁপছিলেন রিকশাচালক হাফিজুল। পাশে তার স্ত্রী, চোখে অনিশ্চয়তার ছাপ। হাতে একটি ছোট ব্যাগ—ভেতরে কিছু রিপোর্ট, আর কিছু ওষুধের খালি প্যাকেট। তার কিডনি প্রায় অকেজো। গ্রামের জমিটুকু বিক্রি করেও চিকিৎসা চালানো সম্ভব হয়নি। ঢাকায় এসেছে শেষ আশায়—কেউ একজন নাকি আছেন, যিনি টাকা না থাকলেও রোগীদের ফিরিয়ে দেন না।
হাসপাতালের দরজায় পৌঁছে যখন তিনি জানতে পারলেন—তার চিকিৎসা হবে, অপারেশনও হতে পারে, তাও বিনা পারিশ্রমিকে—তখন তার চোখের পানি থামেনি। তিনি ভেবেছিলেন, পৃথিবীতে এখনও মানুষ আছে, যারা শুধু মানুষের জন্য কাজ করে।
কিন্তু সেই হাসপাতালের ভেতরেই, যেখানে মানবতার আলো জ্বলছে, সেখানে যদি ঢুকে পড়ে ভয়, হুমকি আর চাঁদাবাজির অন্ধকার—তাহলে প্রশ্ন জাগে, আমরা আসলে কোন সমাজে বাস করছি?
এই গল্প কোনো কল্পনা নয়—এটি আমাদের সময়ের নির্মম বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি।
অধ্যাপক ডা. কামরুল ইসলাম—একটি নাম, যা আজ শুধু একজন চিকিৎসকের পরিচয় বহন করে না; এটি মানবতার এক অনন্য প্রতীক। দীর্ঘ প্রায় দুই দশক ধরে তিনি কিডনি রোগীদের জন্য কাজ করে যাচ্ছেন। যেসব রোগী অর্থের অভাবে চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হন, তাদের জন্য তার হাসপাতাল যেন শেষ আশ্রয়স্থল। তিনি শুধু চিকিৎসা দেন না, রোগীদের খাবারের খরচ পর্যন্ত কমিয়ে আনেন, নিজেই বাজার করে তদারকি করেন—এ যেন চিকিৎসা নয়, এক ধরনের মানবিক আন্দোলন।
রাষ্ট্র তার এই অবদানকে স্বীকৃতি দিয়েছে, স্বাধীনতা পদকে ভূষিত করেছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো—রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সম্মান পাওয়া একজন মানুষও যদি নিরাপদ না হন, তাহলে সাধারণ মানুষের অবস্থান কোথায়?
সম্প্রতি অভিযোগ উঠেছে, একটি চক্র দীর্ঘদিন ধরে এই হাসপাতালকে কেন্দ্র করে চাঁদা দাবি করে আসছে। আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, তারা নিজেদের রাজনৈতিক পরিচয়ে পরিচিত করে প্রভাব খাটানোর চেষ্টা করেছে। হুমকি, ভয়ভীতি, এমনকি হাসপাতালের কর্মীদের বাড়িতে গিয়ে চাপ প্রয়োগ—সবকিছু মিলিয়ে একটি ভয়ংকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি হলো—এই সাহস তারা কোথা থেকে পায়?
কেউ হঠাৎ করে চাঁদাবাজ হয়ে ওঠে না। এর পেছনে থাকে একটি সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা। যখন আইন প্রয়োগে শিথিলতা থাকে, যখন অপরাধীরা দেখে যে প্রভাব খাটিয়ে পার পাওয়া যায়, তখনই তারা আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে।
অভিযোগ রয়েছে, আগেও এ বিষয়ে সাধারণ ডায়েরি করা হয়েছিল। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জানানো হয়েছিল। কিন্তু কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। বরং ঘটনাটি এমন পর্যায়ে গড়িয়েছে যে হাসপাতালের কর্মচারীরাও আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন।
আমরা প্রায়ই শুনি—“দলের নাম ভাঙিয়ে অপরাধ।” কিন্তু প্রশ্ন হলো, একটি দলের নাম ব্যবহার করে কেউ যদি বারবার অপরাধ করে, তাহলে সেই দলের দায় কি একেবারেই নেই? শুধু ‘সে আমাদের কেউ নয়’ বললেই কি দায়িত্ব শেষ হয়ে যায়?
রাজনৈতিক সংগঠনগুলোর উচিত এ ধরনের ঘটনায় শুধু প্রতিক্রিয়া দেখানো নয়, বরং প্রতিরোধ গড়ে তোলা। তাদের নাম ব্যবহার করে কেউ যেন অপরাধ করতে না পারে, সেই নিশ্চয়তা তৈরি করা। কারণ, জনগণের কাছে একটি দলের পরিচয় শুধু তার নেতাদের বক্তব্যে নয়, বরং মাঠপর্যায়ের কর্মকাণ্ডে প্রতিফলিত হয়।
এই ঘটনার আরেকটি দিক আমাদের গভীরভাবে ভাবিয়ে তোলে—মানবিক কাজের নিরাপত্তা।
আমরা সবাই চাই সমাজে ভালো মানুষ বাড়ুক, মানবিক উদ্যোগ গড়ে উঠুক। কিন্তু যখন একজন মানুষ নিঃস্বার্থভাবে কাজ করতে গিয়ে হুমকির মুখে পড়েন, তখন অন্যরা কি আর সেই পথে হাঁটার সাহস পাবে?
ডা. কামরুল ইসলামের মতো মানুষদের রক্ষা করা শুধু একটি ব্যক্তিগত নিরাপত্তার বিষয় নয়—এটি একটি মূল্যবোধ রক্ষার প্রশ্ন। তিনি যে কাজটি করছেন, সেটি কোনো সাধারণ কাজ নয়। এটি রাষ্ট্রের দায়িত্বকে আংশিকভাবে বহন করা। যেখানে রাষ্ট্র সবার চিকিৎসা নিশ্চিত করতে পারে না, সেখানে তিনি নিজের উদ্যোগে সেই শূন্যতা পূরণ করছেন।
আরও একটি বিষয় আমাদের না বললেই নয়—চাঁদাবাজির এই সংস্কৃতি আমাদের সমাজে কতটা গভীরভাবে প্রোথিত। একটি হাসপাতাল, যেখানে মানুষ জীবনের জন্য লড়াই করছে, সেটিকেও যদি ‘আয়ের উৎস’ হিসেবে দেখা হয়, তাহলে সেটি শুধু অপরাধ নয়, এটি একটি ভয়ংকর মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ।
এই মানসিকতা পরিবর্তন করা সহজ নয়। কিন্তু এর বিরুদ্ধে দাঁড়ানো জরুরি।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আরও কার্যকর হতে হবে। অভিযোগ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে। অপরাধী যে-ই হোক, তার পরিচয় যাই হোক—আইনের আওতায় আনতে হবে। দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে কেউ এমন কাজ করার সাহস না পায়।
একই সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোকেও তাদের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা জোরদার করতে হবে। কেউ যদি দলের নাম ব্যবহার করে অপরাধ করে, তাহলে তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে—শুধু বক্তব্যে নয়, বাস্তবেও।
আর আমাদের সমাজকেও বদলাতে হবে। আমরা যদি অন্যায়ের বিরুদ্ধে নীরব থাকি, তাহলে সেই অন্যায় একসময় আমাদের দোরগোড়ায় এসে দাঁড়াবে। আজ একজন চিকিৎসক আক্রান্ত হয়েছেন, কাল হয়তো আপনি, আমি বা আমাদের প্রিয়জন।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি আবারও ফিরে আসে—লজ্জা কার?
চাঁদাবাজদের, যারা মানবিক সেবাকেও ব্যবসার সুযোগ হিসেবে দেখে?
প্রশাসনের, যারা সময়মতো কার্যকর ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ?
রাজনৈতিক সংস্কৃতির, যেখানে নাম ব্যবহার করেই অপরাধ করা যায়?
নাকি আমাদের সবার, যারা অনেক সময় জানার পরও নীরব থাকি?
এই প্রশ্নের উত্তর সহজ নয়। কিন্তু উত্তর খোঁজা জরুরি।
কারণ, যদি আমরা এখনই এই প্রবণতার বিরুদ্ধে দাঁড়াতে না পারি, তাহলে ভবিষ্যতে হয়তো আর কোনো ডা. কামরুল ইসলাম তৈরি হবে না। কেউ আর ঝুঁকি নিয়ে মানবতার জন্য কাজ করতে এগিয়ে আসবে না।
আর তখন, হাফিজুলদের মতো মানুষরা কোথায় যাবে?
মানবতার আলো নিভে যাওয়ার আগেই আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে—আমরা কোন সমাজ চাই? একটি মানবিক সমাজ, নাকি একটি ভয়ের সমাজ?
সেই উত্তরই নির্ধারণ করবে—লজ্জা কার।
লেখা: শিক্ষক ও গবেষক
শিক্ষাবার্তা /এ/ ১২/০৪/২০২৬
দেশ বিদেশের শিক্ষা, পড়ালেখা, ক্যারিয়ার সম্পর্কিত সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম, ছবি, ভিডিও প্রতিবেদন সবার আগে দেখতে চোখ রাখুন শিক্ষাবার্তায়
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
