চুরির অভিযোগে কুকুর লেলিয়ে নির্যাতন: সমাজে নয়া অস্থিরতার ইঙ্গিত?

।। এ এইচ এম সায়েদুজ্জামান।। 

গতকাল ১৯ সেপ্টেম্বর শুক্রবার  কুমিল্লার বুড়িচংয়ে চুরির অভিযোগে এক যুবকের ওপর জার্মান শেফার্ড কুকুর লেলিয়ে নির্মম নির্যাতনের ঘটনা সাম্প্রতিক সময়ে আলোচিত একটি অমানবিক দৃষ্টান্ত। ভিডিওতে দেখা যায়, কয়েকজন ব্যক্তি এক যুবকের দিকে প্রথমে একটি কুকুর লেলিয়ে দেয়, পরে আরও একটি কুকুর ছেড়ে দেয় তার ওপর।

একই সঙ্গে লাঠিপেটা চলতে থাকে। অসহায় যুবক প্রাণ বাঁচানোর আকুতি জানালেও কেউ তার আহ্বানে সাড়া দেয়নি। বরং তার চিৎকার, আর্তনাদ, রক্তাক্ত দেহকে যেন বিনোদনের উপকরণে পরিণত করা হয়েছিল। এই দৃশ্য শুধু মর্মান্তিক নয়, বরং আমাদের রাষ্ট্র ও সমাজ ব্যবস্থার প্রতি একটি বড় প্রশ্নচিহ্ন। আমরা কি সত্যিই ন্যায়বিচারে বিশ্বাস করি, নাকি প্রতিশোধের নামে বর্বরতায় অভ্যস্ত হয়ে যাচ্ছি?

একটি সভ্য সমাজের মূল ভিত্তি হলো—আইনের শাসন। কোনো অপরাধ সংঘটিত হলে রাষ্ট্রই তার বিচার করবে। তদন্ত, প্রমাণ সংগ্রহ এবং আদালতের রায়ে শাস্তি কার্যকর করার মাধ্যমে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা হয়। কিন্তু বুড়িচংয়ের ঘটনায় কয়েকজন ব্যক্তি “অতি উৎসাহে” আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে এক অসহায় মানুষকে এমনভাবে নির্যাতন করেছে, যা দণ্ডবিধি অনুযায়ী স্পষ্টতই অপরাধ।

বাংলাদেশ দণ্ডবিধি ১৮৬০-এর ৩২৩ ও ৩২৫ ধারায় আঘাত ও গুরুতর আঘাত করার জন্য কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। আর ৩০৭ ধারা অনুযায়ী হত্যাচেষ্টার জন্যও শাস্তি দেওয়া যায়। কিন্তু এখানে শুধু লাঠি নয়, বরং প্রশিক্ষিত কুকুরকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। যা আমাদের দেশে প্রচলিত আইন ও মানবাধিকারের সীমারেখা সরাসরি ভঙ্গ করেছে।
প্রশ্ন জাগে—আমাদের সমাজে কেন বারবার আইন হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা দেখা দিচ্ছে?

সমালোচকরা বলছেন- বিচার ব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রিতা ও অনেক সময় অপরাধীরা শাস্তি না পাওয়ার কারণে সাধারণ মানুষ ন্যায়বিচার নিয়ে আস্থাহীন হয়ে পড়ছে।

অপরাধ সংঘটিত হলে মানুষের ক্ষোভ স্বাভাবিক। কিন্তু সেই ক্ষোভকে যদি আইনি পথে পরিচালিত না করা হয়, তবে তা প্রতিহিংসায় রূপ নেয়। স্থানীয়ভাবে গণধোলাই, গুজব কিংবা অবৈধ শাস্তি দেওয়ার ঘটনা প্রমাণ করে যে, সমাজে নেতৃত্ব ও সচেতনতার ঘাটতি রয়েছে। এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে রাষ্ট্রের প্রতি আস্থা কমে যাবে এবং সমাজে অরাজকতা তৈরি হবে।

মানবাধিকারের অন্যতম মূলনীতি হলো—“প্রত্যেক মানুষ অপরাধী প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত নির্দোষ।” কিন্তু বুড়িচংয়ের ঘটনায় আমরা দেখেছি অভিযোগের ভিত্তিতেই নির্মম শাস্তি। এটি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ঘোষণাপত্র (UDHR)-এরও সরাসরি লঙ্ঘন। ধর্মীয় ও নৈতিক দিক থেকেও এই কাজ সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য। ইসলাম ধর্মে বলা হয়েছে,  “তোমরা কাউকে অন্যায়ভাবে হত্যা করো না। আল্লাহ এ ব্যাপারে কঠোর শাস্তি দেবেন।” (সুরা ইসরা, আয়াত ৩৩)

অন্যদিকে হিন্দু ধর্মেও বলা হয়েছে, অন্যের প্রতি অকারণে হিংসা প্রদর্শন পাপ। অর্থাৎ সব ধর্মই দয়া, সহমর্মিতা ও ন্যায়ের শিক্ষা দেয়। কুকুর লেলিয়ে বা লাঠিপেটা করে শাস্তি দেওয়া কোনো ধর্মেই সমর্থনযোগ্য নয়।

যে স্টিল মিলে এ ঘটনা ঘটেছে, সেখানে নিরাপত্তার জন্য তিনটি বিদেশি কুকুর রাখা হয়েছিল। কিন্তু এগুলোকে প্রতিরক্ষার জন্য ব্যবহার না করে আক্রমণের অস্ত্র বানানো হয়েছে। ভবিষ্যতে যদি এ ধরনের প্রবণতা বাড়ে, তবে নিরাপত্তার নামে মানুষকে টার্গেট করার ঘটনা বৃদ্ধি পাবে। তাই নিরাপত্তা ব্যবস্থার ব্যবহার অবশ্যই মানবাধিকারের সীমার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে হবে।

ভুক্তভোগী জয় চন্দ্র সরকারের শারীরিক ও মানসিক ট্রমা কাটিয়ে উঠতে দীর্ঘ সময় লাগবে। তিনি যে মামলা করেছেন, তার দ্রুত তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করতে হবে। একইসঙ্গে নির্যাতনকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে কেউ একই কাজ করার সাহস না পায়। রাষ্ট্রের দায়িত্ব শুধু আসামিদের গ্রেপ্তার করা নয়, বরং এ ধরনের অমানবিক ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে প্রাতিষ্ঠানিক পদক্ষেপ নেওয়া। এর মধ্যে থাকতে পারে— আইনের শাসন জোরদার করা, অপরাধপ্রবণ এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করা, জনসচেতনতা বাড়ানো এবং আইন হাতে তুলে নেওয়ার বিপদ সম্পর্কে প্রচার করা।

ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়ায় বিষয়টি দ্রুত গুরুত্ব পায়। এখানে গণমাধ্যমের ভূমিকা প্রশংসনীয়। তবে কেবল ঘটনাকে ভাইরাল করে ক্ষোভ প্রকাশ করাই যথেষ্ট নয়, বরং এর সামাজিক ও নৈতিক প্রভাব নিয়ে সচেতনতা তৈরি করতে হবে।

বুড়িচংয়ের ঘটনা আমাদের মনে করিয়ে দিয়েছে—ন্যায়বিচারের নামেই বর্বরতা কখনো গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। চুরির মতো অভিযোগ থাকলেও তার বিচার আদালতে হওয়া উচিত, কুকুরের দাঁত বা লাঠির আঘাতে নয়। একটি সমাজ তখনই সভ্যতার পরিচয় দেয়, যখন অভিযুক্ত ব্যক্তিরও অধিকার রক্ষা করা হয়। আমাদের মনে রাখতে হবে, আইন যদি দুর্বল হয়, তাহলে মানুষ আইন হাতে তুলে নেবে—যার ফল হবে ভয়াবহ। তাই এখনই সময় আইনের শাসনকে শক্তিশালী করা এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির মাধ্যমে মানবিক ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠন করা।

লেখক: সম্পাদক,  শিক্ষাবার্তা।

শিক্ষাবার্তা/এ/২০/০৯/২৫


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.