।। এ এইচ এম সায়েদুজ্জামান।।
শিক্ষক—সমাজ গঠনের কারিগর, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের আলোকবর্তিকা, নৈতিকতার শিক্ষক। অথচ সেই শিক্ষকরাই জীবনের অন্তিম পর্যায়ে এসে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। কারণ, চাকরিকালীন কেটে রাখা তাঁদের রক্ত-ঘামে অর্জিত অর্থ—অবসর ও কল্যাণ সুবিধা—পাওয়ার জন্য তাঁদের বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে হচ্ছে।
বর্তমানে প্রায় ৯০ হাজার শিক্ষক-কর্মচারী এই প্রাপ্য অর্থ থেকে বঞ্চিত। সুপ্রিম কোর্ট এবং হাইকোর্টের স্পষ্ট নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও সরকার সেই নির্দেশ কার্যকর করতে পারছে না। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ভাষ্য, এখনই প্রয়োজন প্রায় ৯ হাজার কোটি টাকা তরল অর্থ। কিন্তু সরকার বরাদ্দ দিয়েছে মাত্র ২ হাজার ২০০ কোটি টাকা, সেটিও মূলত বন্ড আকারে। এতে সমস্যার সমাধান দূরে থাক, দীর্ঘসূত্রিতা আরও বাড়ছে।
বাংলাদেশে বেসরকারি স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের এমপিওভুক্ত প্রায় পাঁচ লাখ শিক্ষক-কর্মচারী কর্মরত আছেন। তাঁদের জন্য ১৯৯০ সালে কল্যাণ ট্রাস্ট চালু হয় এবং ২০০৫ সালে অবসর সুবিধা চালু করা হয়। নিয়ম অনুযায়ী, চাকরিকালে শিক্ষক-কর্মচারীদের মূল বেতনের ৬% কেটে রাখা হয় অবসর সুবিধার জন্য এবং ৪% রাখা হয় কল্যাণ ট্রাস্টের জন্য। অর্থাৎ মোট ১০% কেটে রাখা হয় তাঁদের নিজস্ব আয়ের অংশ থেকে।
এছাড়া, সাম্প্রতিক সময়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, প্রত্যেক শিক্ষার্থীর কাছ থেকে বছরে ১০০ টাকা (৭০ টাকা অবসরের জন্য, ৩০ টাকা কল্যাণের জন্য) নেওয়া হয়। এ ছাড়া সরকারি তহবিল ও চাঁদা জমার সুদ থেকে অর্থ যোগ হয়। ফলে, অবসর ও কল্যাণ সুবিধার মূল ভিত্তি তৈরি হয় শিক্ষকদের ঘামঝরা আয় থেকেই। কিন্তু বিদ্রূপজনক বিষয় হলো, নিজেদের টাকাই ফেরত পেতে তাঁদের বছরের পর বছর ঘুরতে হচ্ছে।
২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে মহামান্য হাইকোর্ট স্পষ্ট নির্দেশ দেন—অবসরের ছয় মাসের মধ্যে সব শিক্ষককে অবসর ভাতা দিতে হবে। রায়ে উল্লেখ ছিল, একজন শিক্ষক সামান্য বেতন পান, জীবনের শেষভাগে তাঁরা আর্থিক সংকটে পড়েন। তাই তাঁদের অবসরভাতা পেতে বছরের পর বছর ঘুরতে হতে পারে না।
কিন্তু সরকার সেই নির্দেশ মানতে অপারগতার কথা জানিয়েছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় বলছে, প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ নেই। ফলে নির্দেশ বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। আদালতের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হওয়ার পরও সরকারের অবস্থান পরিবর্তন হয়নি। বরং বিষয়টি আইনিভাবে মোকাবিলা করার প্রস্তুতি নিচ্ছে মন্ত্রণালয়। অর্থাৎ, শিক্ষকদের ন্যায্য প্রাপ্য নিয়ে সরকার নিজেই আদালতের সঙ্গে বিরোধে নামছে।
অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের জীবনে এই সংকট যে কী ভয়াবহ প্রভাব ফেলছে, তা অনুধাবন করা কঠিন নয়।
অবসর ও কল্যাণ সুবিধার অর্থ না পেয়ে – তাঁরা চিকিৎসা করাতে পারছেন না। সন্তানের লেখাপড়া, মেয়ের বিয়ে কিংবা পরিবারের দৈনন্দিন ব্যয় নির্বাহ—সব ক্ষেত্রেই তাঁরা দিশেহারা হয়ে পড়ছেন।অনেকেই ধারদেনা করে জীবন চালাচ্ছেন। কেউ কেউ মৃত্যুর আগ পর্যন্ত টাকার আশায় ঘুরে ঘুরে ক্লান্ত হয়েছেন। তাঁদের উত্তরাধিকারীরাই এখন সেই পাওনার আশায় দৌড়ঝাঁপ করছেন।
মুন্সীগঞ্জের এক প্রবীণ অধ্যাপক কাজী আলাউদ্দিনের উদাহরণই যথেষ্ট। সড়ক দুর্ঘটনায় আহত এই শিক্ষক আশা করেছিলেন, অবসরের টাকা দিয়ে চিকিৎসা করাবেন। কিন্তু চার বছর ঘুরেও কিছুই পাননি। এখন লাঠিতে ভর দিয়ে খুঁড়িয়ে চলা ছাড়া তাঁর উপায় নেই।
এই চিত্র কোনো একক ব্যক্তির নয় দেশের বিভিন্ন প্রান্তের হাজারো শিক্ষক একই দুরবস্থার শিকার।
একজন শিক্ষক জীবনের শেষপ্রান্তে এসে যদি অপমানিত ও অর্থকষ্টে জর্জরিত হন, তবে তা শুধু ব্যক্তি নয়, গোটা শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য এক ভয়াবহ বার্তা। শিক্ষাবিদরা আশঙ্কা করছেন, এই ধরনের পরিস্থিতি নতুন প্রজন্মকে শিক্ষা পেশার প্রতি বিমুখ করে তুলবে।
শিক্ষকের পেশাদারিত্ব ও সমাজে মর্যাদা ক্ষুণ্ণ হলে শিক্ষাক্ষেত্রের ভবিষ্যৎও অন্ধকার হবে। একজন শিক্ষকের সম্মান যখন ক্ষুণ্ণ হয়, তখন সমাজের নৈতিক ভিত্তিও দুর্বল হয়ে পড়ে।
প্রশ্ন হলো—কেন এই সংকট তৈরি হলো? সরকারের যুক্তি, বাজেট সংকট। কিন্তু এ যুক্তি কতটা গ্রহণযোগ্য?
প্রতি বছর হাজার হাজার কোটি টাকা অবকাঠামো, সড়ক বা মেগা প্রকল্পে ব্যয় হয়। কিন্তু সেই একই সরকার ৯ হাজার কোটি টাকা খুঁজে পাচ্ছে না শিক্ষক-কর্মচারীদের ন্যায্য প্রাপ্য মেটাতে। শিক্ষা খাত যদি প্রকৃত অর্থে অগ্রাধিকার পেত, তবে এ সংকট তৈরি হতো না।
এখানে সুস্পষ্টভাবে বোঝা যায়, রাষ্ট্রের নীতি-নির্ধারকরা শিক্ষা খাতকে গৌণ মনে করছেন। অথচ শিক্ষাই একটি জাতির ভিত্তি।
ভুক্তভোগীরা বলছেন অবসর সুবিধা বোর্ড পরিচালনার জন্য একটি কমিটি থাকা অপরিহার্য। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে সেই কমিটি গঠিত হয়নি। কারণ, শিক্ষক সংগঠনগুলো নিজেদের প্রভাব বিস্তার ও স্বার্থ হাসিলে ব্যস্ত। একেকটি সংগঠন চায় তাদের ঘনিষ্ঠজন কমিটিতে জায়গা পাক। ফলাফল দাঁড়িয়েছে— কমিটি হচ্ছে না, আর শিক্ষক-কর্মচারীরা তাদের প্রাপ্য সুবিধা পাচ্ছেন না। আন্দোলনের নামে যেসব দাবি তোলা হচ্ছে, তার বড় অংশই আসলে নিজেদের অবস্থান মজবুত করা এবং রাজনৈতিক সুবিধা আদায়ের কৌশল। অথচ যাদের জন্য আন্দোলন— সেই অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকরা রয়েছেন অনিশ্চয়তায়।
এমন পরিস্থিতি অত্যন্ত দুঃখজনক। শিক্ষকরা জাতির আলোকবর্তিকা, অথচ তাদের বার্ধক্যে সম্মান ও আর্থিক নিরাপত্তা দেওয়া হচ্ছে না। সরকারকেও অবশ্যই দায়িত্ব এড়ানো যায় না। যদি কমিটি গঠনেই দীর্ঘসূত্রতা হয়, তবে বিকল্প ব্যবস্থা নিয়ে হলেও অবসরপ্রাপ্তদের অর্থ দ্রুত ছাড়ের উদ্যোগ নিতে হবে।
আজ প্রয়োজন শিক্ষক সংগঠনগুলোর আত্মসমালোচনা ও সমঝোতা। নিজেদের মধ্যে দ্বন্দ্ব ভুলে শিক্ষকদের প্রকৃত স্বার্থে এগিয়ে আসতে হবে। নইলে শিক্ষক সমাজের দুর্দশা শুধু বাড়বে, আর সমাজ হারাবে সেই আলোকবর্তিকাদের প্রতি সম্মান ও আস্থা। শিক্ষকরা যেন আর “আহাজারি” না করে প্রাপ্য সম্মান নিয়ে বাঁচতে পারেন— এ দায়িত্ব সরকার ও শিক্ষক সংগঠন উভয়েরই।
এছাড়াও এই সংকট উত্তরণের জন্য- বর্তমান ঘাটতি মেটাতে সরকারকে অবিলম্বে এককালীন বিশেষ থোক বরাদ্দ দিতে হবে। শুধু বন্ড নয়, তরল অর্থ প্রয়োজন। কল্যাণ ট্রাস্ট ও অবসর বোর্ডের আর্থিক কার্যক্রমে দীর্ঘদিন ধরে অনিয়মের অভিযোগ আছে। এসব দূর করতে হবে। অসুস্থ, প্রবীণ, মুক্তিযোদ্ধা ও জরুরি প্রয়োজনে থাকা শিক্ষকদের আবেদন আগে নিষ্পত্তি করতে হবে। শিক্ষা বাজেটের একটি নির্দিষ্ট অংশ শুধুমাত্র অবসর ও কল্যাণ সুবিধার জন্য বরাদ্দ রাখতে হবে। ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের মতো প্রতিষ্ঠানে অর্থ আটকে থাকলে শিক্ষকরা কেন ভোগান্তিতে পড়বেন? এই অর্থ পুনরুদ্ধারে কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন।
অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকরা কোনো ভিক্ষুক নন। তাঁরা তাঁদের শ্রম, মেধা ও জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়টি দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য উৎসর্গ করেছেন। চাকরিকালীন বেতন থেকেও নিয়মিত টাকা কেটে রাখা হয়েছে। এখন তাঁদের পাওনা ফেরত দেওয়া রাষ্ট্রের নৈতিক দায়িত্ব।
শিক্ষককে অবহেলা করে কোনো জাতি উন্নতি করতে পারে না। আজ যদি একজন শিক্ষক লাঠিতে ভর দিয়ে পেনশনের জন্য ঘুরে বেড়ান, তাহলে আগামী প্রজন্ম কী শিক্ষা পাবে?
আজ প্রায় ৯০ হাজার শিক্ষক-কর্মচারী অবসর ও কল্যাণ সুবিধার আশায় অপেক্ষমাণ। আদালতের নির্দেশনা স্পষ্ট, তাঁদের ছয় মাসের মধ্যে প্রাপ্য ভাতা দিতে হবে। কিন্তু সরকার বরাদ্দ সংকটের অজুহাতে তা মানছে না।
এটি কেবল আর্থিক সংকট নয়; এটি নৈতিক সংকট, রাষ্ট্রের অগ্রাধিকার সংকট। শিক্ষকদের প্রতি এই অবিচার শুধু তাঁদের নয়, গোটা জাতিকেই লজ্জায় ফেলে।
প্রশ্ন জাগে—অবসর ও কল্যাণ সুবিধা: ৯০ হাজার শিক্ষক-কর্মচারীর আহাজারির অবসান কবে?
সমাধান একটাই—সরকারকে জরুরি ভিত্তিতে শিক্ষা খাতকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে এককালীন বিশেষ বরাদ্দ দিতে হবে। নয়তো শিক্ষকদের জীবনাবসান যেমন দুঃখজনক হবে, তেমনি শিক্ষা ব্যবস্থার ভিত্তিও ধসে পড়বে।
লেখক : সম্পাদক, শিক্ষাবার্তা।
শিক্ষাবার্তা/এ/২১/০৯/২৫
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
