এইমাত্র পাওয়া

শিক্ষিত বেকার ও শিক্ষাব্যবস্থার দায়

  • সাইফুল্লাহ হিমেল।।

    বাজার থেকে নামী কোম্পানির দামি পোশাক কিনতে পকেটের টাকা ছাড়া অন্য কিছুর প্রয়োজন হয় না। সেই পোশাকে দেহ প্রবেশ করিয়ে সাহেবি ভাব আনতেও কোনো যোগ্যতার দরকার নেই। কিন্তু দামি পোশাক গায়ে দিলেই একজন জ্ঞানে যোগ্যতায় বা আচার-আচরণে দামি হয়ে যায় না।

    এজন্য দরকার প্রকৃত শিক্ষা। আমরা শিক্ষা বলতে বুঝি, একজন মানুষের যে বিষয়গুলো জানা থাকলে সমাজে চলতে গিয়ে তার দ্বারা কারো অধিকার নষ্ট হয় না এবং কেউ তার অধিকারে টান দিলে তা বুঝতে পারেন এবং সঠিক নিয়মে নিজের অধিকার রক্ষা করতে পারেন।

    এখানে অধিকার বলতে ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক, ধর্মীয়, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিকসহ সব অধিকার বোঝায়। শিক্ষিত ব্যক্তি তাকেই বলা যায়, যিনি পার্থিব জীবন এবং মৃত্যুপরবর্তী তথা পরকালের বিষয়ে সচেতন। দুই জীবনের মর্মার্থ সম্পর্কে সচেতন।

    একসময় পৃথিবীতে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা বলতে কিছু ছিল না। কিন্তু এখন সব দেশেই প্রতিষ্ঠানিক শিক্ষা বিদ্যমান। মানুষকে দুই জীবনের বিষয়ে সচেতন করে তোলার প্রয়োজনীয়তার উপলব্ধি থেকেই রাষ্ট্রীয়ভাবে শিক্ষা দেয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। কিন্তু দেশে প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থা আমাদের পুরোপুরি সচেতন করতে পারছে না।

    কারণ আর কিছু নয়, বিদ্যমান শিক্ষাব্যবস্থা অপূর্ণাঙ্গ। যারা এ শিক্ষাব্যবস্থার প্রণয়ন করেছেন, তারা বুঝে না বুঝে বিজাতীয় শিক্ষাব্যবস্থায় প্রভাবিত হয়ে এমন একটি বিকলাঙ্গ শিক্ষাব্যবস্থা প্রণয়ন করেছেন।

    ইতঃপূর্বে যেসব জাতির দ্বারা শাসিত হয়েছি আমরা; তাদের মধ্যে অনেকেই চায়নি আমরা সত্যিকারের একটি সচেতন জাতি হিসেবে গড়ে উঠি। তাই তারা আমাদের বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী করে রাখতে বিভিন্ন সময় নানা ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছে। তারা এ দেশের এক শ্রেণীর তথাকথিত শিক্ষিত লোক দিয়ে একটি বিকলাঙ্গ শিক্ষাব্যবস্থা চালু করতে সক্ষম হয়েছে। সেই শিক্ষাব্যবস্থার কারণে আজো আমাদের সমাজের অসঙ্গতির মূল কারণ।

    দেশের শিক্ষাব্যবস্থা নানা ধারায় বিভক্ত। একটি ধারা সাধারণ শিক্ষা। কেউ সাধারণ শিক্ষা নিলে তার জন্য কারিগরি শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ নেই। আবার কারিগরি শিক্ষা নিলে সাধারণ শিক্ষা নিতে পারেন না তিনি। এতে কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষিত ব্যক্তি সাধারণ শিক্ষার উপকারিতা থেকে বঞ্চিত হন।

    যা তাকে সারা জীবন বয়ে বেড়াতে হয়। ফলে অপূর্ণ শিক্ষায় সমাজও একজন অপূর্ণাঙ্গ মানুষের ভার নিতে নিতে ক্লান্ত। একইভাবে একজন সাধারণ শিক্ষায় শিক্ষিত ব্যক্তি কারিগরি দক্ষতার অভাবে অনেক সময় বেকার জীবন কাটান। এ দিকে সাধারণ ও কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষিত একজন লোক ধর্মীয় বা নৈতিক শিক্ষার দিক থেকে দুর্বল। বর্তমান পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয়পর্যায়ে যখনই নৈতিক অবক্ষয়ের দৃষ্টান্ত দেখা যায়, তখনই সামনে আসে নৈতিক শিক্ষার বিষয়টি।

    মাদরাসা শিক্ষাব্যবস্থা (আলিয়া ও কওমি) আমাদের আরো একটি শিক্ষা পদ্ধতি। বলতে গেলে প্রচলিত বিশ্বব্যবস্থার কারণে মাদরাসা শিক্ষায় শিক্ষিত ব্যক্তিরা অপূর্ণতায় এক ধাপ এগিয়ে। তারা প্রচলিত সমাজের সাথে কর্মগত দক্ষতায় মানিয়ে নিতে পারছেন না। তবে কিছু ব্যক্তি, যারা মাদরাসা শিক্ষার পাশাপাশি কারিগরি বা সাধারণ শিক্ষা নিজ উদ্যোগে আয়ত্ত করছেন। তারা কিন্তু সমাজে জায়গা করে নিচ্ছেন। সাধারণ ও কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষিতদের সাথে প্রতিযোগিতায় তারা প্রথম সারিতে অবস্থান করছেন।

    যদি এমন হতো, ব্যক্তি উদ্যোগে নয় বরং মাদরাসা শিক্ষাই তাকে সাধারণ, কারিগরি ও নৈতিক শিক্ষা দিতে পারছে; তাহলে কী আরো সহজ হতো না? মাদরাসায় নৈতিক শিক্ষাকে প্রাধান্য দেয়া হয়। তবে ইদানীং মাদরাসা সিলেবাসেও নৈতিকতা শিক্ষাদানের সক্ষমতা নিয়ে অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন। তাই অর্থনীতি, রাজনীতি, সমাজনীতি, সাংস্কৃতি, ধর্ম-কর্ম, কারিগরি দক্ষতা সব এক ছাদের নিচে থাকা জরুরি।

    কমপক্ষে অতটুক থাকা দরকার; যতটুক হলে কারো জীবন চালাতে কষ্ট হয় না। সাধারণ শিক্ষায় উচ্চশিক্ষা লাভের পরেও কারিগরি দক্ষতার অভাবে বিকলাঙ্গ, ধর্মীয়জ্ঞানে বিকলাঙ্গ, সাংস্কৃতিক জ্ঞানে বিকলাঙ্গ হচ্ছেন দেশের শিক্ষার্থীরা। তাই শিক্ষিত হয়েও প্রতিনিয়ত ভিনদেশী সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের শিকার হচ্ছি আমরা। পার্থক্য করতে পারছি না কোনটা নিজেদের সংস্কৃতি, কোনটা নয়। এ জন্য বিকলাঙ্গ শিক্ষাব্যবস্থার অবসান দরকার।

    পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে : ‘তারপর যখন সালাত শেষ হয়ে যায় তখন ভূপৃষ্ঠে ছড়িয়ে পড়ো এবং আল্লাহর অনুগ্রহ সন্ধান করো এবং বেশি করে আল্লাহকে স্মরণ করতে থাকো। আশা করা যায়, তোমরা সফলকাম হবে’ (সূরা জুমআ : ১০)। এখানে লক্ষণীয় বিষয় হলো, সালাত শেষে অনুগ্রহ অনুসন্ধানে ছড়িয়ে পড়ার আদেশ সাধারণভাবে সবাইকে দেয়া হয়েছে। সুতরাং, যোগ্যতা না থাকেল মুসলিমরা কিভাবে সালাত শেষে অনুগ্রহ তালাশ করবেন। অনুগ্রহ তালাশ মানে হলো কাজে মনোনিবেশ করা।

    সুতরাং, একই ব্যক্তিকে জীবন চলার পথে ন্যূনতম সক্ষমতা অর্জন করা অত্যাবশ্যক। এরপর ভিন্ন ভিন্ন বিষয়ে বিশেষজ্ঞ হতে হবে।

    এখন প্রশ্ন আসতে পারে, মানুষ কি সব কিছু পারে। এ প্রশ্নের জবাবে আমরা হ্যাঁ বলতে চাই। মানুষ নামের প্রাণীটি যিনি ডিজাইন করেছেন, যিনি তাদের দেহের কার্যক্ষমতা নির্ধারণ করেছেন; তিনিই ভালো জানেন মানুষ কী কী পারবে। আল্লাহ সর্ববিষয়ে সক্ষমতা দিয়ে সৃষ্টি করেছেন মানুষকে।

    আর মানুষের সর্ব সক্ষমতার তথ্য কুরআনের যেসব স্থানে উল্লেখ করেছেন; তার মধ্যে সূরা জুমার উপরিক্ত আয়াত একটি। এখানে তিনি মানুষকে পবিত্র কুরআন অক্ষরে অক্ষরে অনুসরণ এবং পার্থিব বিষয়ে দক্ষতা অর্জনকে পাশাপাশি উপস্থাপন করেছেন। মানুষকে সেই সক্ষমতা দিয়ে সৃষ্টি না করলে অবশ্যই আল্লাহ এভাবে বলতেন না।

    উল্লিখিত আয়াতের শেষাংশে বলা হচ্ছে ‘বেশি করে আল্লাহকে স্মরণ করতে থাকো। আশা করা যায়, তোমরা সফলকাম হবে’। অর্থাৎ কাজ করতে গিয়ে কোনো অশুভ উপায় অবলম্বন করা যাবে না। সৃষ্টিকর্তা যেভাবে কাজ করতে বলেছেন, মানুষ সেভাবে কাজ করবে।

    অনুগ্রহ অনুসন্ধানের সময় প্রতিটি কাজেই আল্লাহকে স্মরণে রাখতে হবে। সেজন্য কর্মদক্ষ ও নীতিবান একজন মানুষ হিসেবে গড়ে উঠতে একই ছাদের নিচে চাই সব শিক্ষা। কমপক্ষে উচ্চমাধ্যমিক পর্যায় পর্যন্ত একমুখী শিক্ষা বাধ্যতামূলক করতে হবে। তবেই দেশের প্রত্যেক শিক্ষিত নাগরিক সবার জন্য কল্যাণকর হবেন বলে আশা করা যায়।

    লেখক: সাংবাদিক


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.