।। এ এইচ এম সায়েদুজ্জামান।।
ঢাকার রাস্তায় এখন আর যানজট শুধু যানবাহনের ভিড়ে হয় না, বিশৃঙ্খলারও একটা আলাদা গতি তৈরি হয়েছে। সেই গতির নাম—ব্যাটারিচালিত রিকশা। একসময় যেটি ছিলো অলিগলির সীমাবদ্ধ বাহন, সেটিই এখন রাজধানীর প্রধান সড়কে দাপটের সঙ্গে চলাচল করছে। ফুটপাত, মোড়, ফ্লাইওভারের মুখ, এমনকি ব্যস্ত মহাসড়কেও এদের অবাধ বিচরণ। যেন কোনো আইন নেই, নিয়ন্ত্রণ নেই, দায়বদ্ধতাও নেই।
চার মাসে প্রায় তিন হাজার দুর্ঘটনার খবর শুধু পরিসংখ্যান নয়; এটি রাজধানীর নাগরিক জীবনের এক ভয়াবহ সংকেত। প্রতিদিনই কোথাও না কোথাও শিশু চাপা পড়ছে, বৃদ্ধ আহত হচ্ছেন, স্কুলগামী শিক্ষার্থী রাস্তায় ছিটকে পড়ছে, কিংবা মোটরসাইকেল ও বাসের সঙ্গে সংঘর্ষে প্রাণ যাচ্ছে কারও না কারও। অথচ আশ্চর্যজনকভাবে এই ভয়াবহ পরিস্থিতিও যেন প্রশাসনের চোখে বড় কোনো সংকট হয়ে উঠছে না।
ঢাকার মানুষ আজ প্রশ্ন করছে—সরকার কি সত্যিই সমস্যাটির সমাধান চায়? নাকি ব্যাটারি রিকশাকে ঘিরে গড়ে ওঠা শক্তিশালী সিন্ডিকেটের কাছে নীতিনির্ধারকেরা জিম্মি হয়ে পড়েছেন?
ব্যাটারি রিকশার মূল সমস্যা শুধু যানজট নয়; এটি একটি অনিয়ন্ত্রিত পরিবহনব্যবস্থার প্রতীক। রাজধানীতে বর্তমানে কত ব্যাটারি রিকশা চলছে, তার নির্ভুল হিসাব সরকারের কাছেও নেই। কোনো রুট পারমিট নেই, অধিকাংশ চালকের বৈধ প্রশিক্ষণ নেই, ট্রাফিক আইন সম্পর্কে ধারণা নেই। তবুও প্রতিদিন হাজার হাজার রিকশা নতুন করে নামছে রাস্তায়।
একটি ব্যাটারি রিকশার সঙ্গে জড়িয়ে আছে ব্যাটারি ব্যবসায়ী, গ্যারেজ মালিক, চাঁদাবাজ, স্থানীয় প্রভাবশালী, রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়া এবং কিছু অসাধু প্রশাসনিক সুবিধাভোগীর স্বার্থ। যে কারণে মাঝে মাঝে অভিযান হলেও কয়েকদিন পর আবার সব আগের মতো হয়ে যায়। জনগণ দেখে, ছবি তোলে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভ প্রকাশ করে; তারপর আবার একই বিশৃঙ্খলা চলতে থাকে।
এই শহরে আইন যেন শুধু দুর্বল মানুষের জন্য। সাধারণ রিকশাওয়ালাকে ধরে জরিমানা করা সহজ, কিন্তু হাজার হাজার অবৈধ ব্যাটারি রিকশার সিন্ডিকেট ভাঙা কঠিন। কারণ সেখানে প্রভাবশালীদের অর্থনৈতিক স্বার্থ জড়িয়ে আছে।
নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর জনগণের প্রত্যাশা ছিলো—কমপক্ষে রাজধানীর মৌলিক সমস্যাগুলোর দ্রুত সমাধানে দৃশ্যমান পদক্ষেপ দেখা যাবে। কিন্তু ৯০ দিন পার হলেও ব্যাটারি রিকশা নিয়ন্ত্রণে কার্যকর কোনো পরিকল্পনা দৃশ্যমান নয়। মাঝে কিছু বক্তব্য এসেছে, কিছু বৈঠক হয়েছে, দু-একদিন অভিযানও চলেছে; কিন্তু বাস্তবতা হলো—ঢাকার রাস্তায় ব্যাটারি রিকশার সংখ্যা কমেনি, বরং বেড়েছে।
প্রশ্ন হচ্ছে, একটি রাষ্ট্রের কি সত্যিই এত সময় লাগে একটি দৃশ্যমান সমস্যা চিহ্নিত করতে? মানুষের জানমাল রক্ষায় কি ৯০ দিনও যথেষ্ট নয়? নাকি সমস্যাটি এতটাই রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থে জড়িত যে কেউ হাত দিতে সাহস পাচ্ছে না?
সরকার চাইলে অনেক কিছুই সম্ভব। সড়কে হেলমেট ছাড়া মোটরসাইকেলের বিরুদ্ধে অভিযান চালানো যায়, অবৈধ হকার উচ্ছেদ করা যায়, রাজনৈতিক কর্মসূচিতে পুরো শহর নিয়ন্ত্রণ করা যায়; তাহলে ব্যাটারি রিকশা নিয়ন্ত্রণ কেন সম্ভব নয়?
ঢাকার নাগরিকরা উন্নয়ন চায়, কিন্তু উন্নয়নের নামে বিশৃঙ্খলা চায় না। বিদ্যুৎচালিত পরিবহন পরিবেশবান্ধব হতে পারে, কিন্তু সেটি অবশ্যই পরিকল্পিত হতে হবে। উন্নত দেশগুলোতেও ইলেকট্রিক ছোট যানবাহন আছে, কিন্তু সেখানে আলাদা লেন আছে, নিবন্ধন আছে, গতিনিয়ন্ত্রণ আছে, চালকের প্রশিক্ষণ আছে। আর আমাদের এখানে? যে কেউ আজ ব্যাটারি লাগিয়ে রাস্তায় নেমে পড়তে পারে।
সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় হলো—এই রিকশাগুলোর অধিকাংশই নিম্নমানের ব্যাটারি ব্যবহার করে। চার্জিং ব্যবস্থাও অনিরাপদ। ফলে অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকিও বাড়ছে। একদিকে বিদ্যুতের ওপর চাপ বাড়ছে, অন্যদিকে সড়কে বিশৃঙ্খলা বাড়ছে। কিন্তু কোনো সমন্বিত নীতিমালা চোখে পড়ছে না।
সরকারের একাংশ যুক্তি দেয়, ব্যাটারি রিকশা বন্ধ করলে লাখো মানুষের কর্মসংস্থান ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কথাটি আংশিক সত্য। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে—রাষ্ট্র কি জীবিকার নামে বিশৃঙ্খলাকে বৈধতা দিতে পারে? তাহলে তো ফুটপাত দখল, অবৈধ স্থাপনা কিংবা লাইসেন্সবিহীন যানবাহনও “জীবিকার” যুক্তিতে চালু রাখতে হয়।
সরকার চাইলে কয়েকটি ধাপে দ্রুত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পারে:
প্রথমত, রাজধানীর প্রধান সড়কে ব্যাটারি রিকশা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করতে হবে। এগুলোকে সীমাবদ্ধ রাখতে হবে অলিগলি ও নির্দিষ্ট এলাকায়।
দ্বিতীয়ত, প্রতিটি ব্যাটারি রিকশাকে নিবন্ধনের আওতায় আনতে হবে। নম্বরপ্লেট, মালিকের তথ্য ও চালকের পরিচয় বাধ্যতামূলক করতে হবে।
তৃতীয়ত, চালকদের ন্যূনতম প্রশিক্ষণ ও ট্রাফিক আইন সম্পর্কে ধারণা নিশ্চিত করতে হবে।
চতুর্থত, অবৈধ গ্যারেজ ও চাঁদাবাজ সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান অভিযান চালাতে হবে। শুধু রিকশা জব্দ করলেই হবে না; পেছনের অর্থনৈতিক চক্রও ভাঙতে হবে।
পঞ্চমত, বিকল্প কর্মসংস্থানের পরিকল্পনাও রাখতে হবে। কারণ হঠাৎ কঠোর সিদ্ধান্ত নিলে দরিদ্র মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাই ধাপে ধাপে সংস্কারই হতে পারে কার্যকর পথ।
কিন্তু এসবের জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা। আর সেই সদিচ্ছার অভাবই এখন সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান।
আজ ঢাকার মানুষ ক্লান্ত। অফিসগামী মানুষ ক্লান্ত, স্কুলপড়ুয়া শিশু ক্লান্ত, অ্যাম্বুলেন্সে থাকা রোগী ক্লান্ত। যানজটের নগরীতে ব্যাটারি রিকশা যেন বিশৃঙ্খলার নতুন প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। যে শহরে একটি অ্যাম্বুলেন্স ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে থাকে, সেখানে রাষ্ট্রের উন্নয়নের গল্প সাধারণ মানুষের কাছে অনেক সময় কৌতুক মনে হয়।
জনগণ এখন আর শুধু প্রতিশ্রুতি শুনতে চায় না; তারা ফলাফল দেখতে চায়।
তারা কি সত্যিই জনস্বার্থে সিদ্ধান্ত নিতে পারবে, নাকি আগের মতোই প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের চাপের কাছে নতি স্বীকার করবে? কারণ জনগণ খুব ভালো করেই বুঝতে শিখেছে—যে সমস্যার সমাধান হয় না, তার পেছনে শুধু অক্ষমতা নয়; অনেক সময় ইচ্ছাকৃত নীরবতাও কাজ করে।
ঢাকার রাস্তায় প্রতিদিন যে বিশৃঙ্খলা বাড়ছে, সেটি শুধু ট্রাফিক সংকট নয়; এটি রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণহীনতারও প্রতিচ্ছবি। একটি রাজধানী শহর কতটা পরিকল্পনাহীন হলে অবৈধ ও অনিয়ন্ত্রিত যানবাহন পুরো নগরজীবনকে জিম্মি করতে পারে, তার জীবন্ত উদাহরণ আজকের ঢাকা।
এখন সময় এসেছে স্পষ্ট সিদ্ধান্তের। জনগণের নিরাপত্তা বড়, নাকি সিন্ডিকেটের মুনাফা বড়—সরকারকে সেটি নির্ধারণ করতে হবে।
কারণ মানুষ আর জানতে চায় না, “সমস্যা আছে কি না”; মানুষ জানতে চায়—“সমাধান কবে?”
লেখক: শিক্ষক ও গবেষক।
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল

