বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীদের কল্যাণ-অবসরের টাকা কবে পাবে সরকার মহাশয়?

।। এ এইচ এম সায়েদুজ্জামান।। 

গ্রামের এক লোকের একটা মোরগ ছিল। মোরগটা এমন অসুস্থ হইল যে, হাটের কবিরাজ থেইকা শুরু কইরা পাড়া-মহল্লার ফুঁ দেওয়া হুজুর—সবাই ব্যর্থ। শেষমেশ লোকটা দুই হাত তুইলা আকাশের দিকে তাকাইয়া বলল, “হে আল্লাহ! আমার মোরগটা যদি বাঁচে, আমি মসজিদে একটা মোটা খাসি দান করমু!”

আল্লাহর কী রহমত! কয়েকদিন পর মোরগটা আবার উঠানে বুক ফুলায়া ডাকাডাকি শুরু করল। লোকজন ভাবল, এবার বুঝি খাসি যাইতেছে মসজিদে। কিন্তু সপ্তাহ যায়, মাস যায়—খাসির আর খবর নাই।

একদিন প্রতিবেশী জিজ্ঞেস করল, “কিরে ভাই, খাসি কই?” লোকটা গম্ভীর মুখে বলল, “আরে ভাই, আমার মোরগের দাম কয় টাকা? আর একটা খাসির দাম কয়! ওইটা তো পরিস্থিতির চাপে একটু আবেগি বক্তব্য আছিল। আল্লাহ ফাঁকিও বুঝে না ফুঁকিও বোঝেনা! গল্পটি নিছক হাসির মনে হলেও এর ভেতরে আছে প্রতিশ্রুতিভঙ্গের নির্মম বাস্তবতা।

আজকাল আমাদের শিক্ষক সমাজের অবস্থা দেইখা সেই গল্পটাই বেশি মনে পড়ে। ক্ষমতায় যাওয়ার আগে বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীদের জন্য কত প্রতিশ্রুতি! জাতীয়করণ হবে, বৈষম্য দূর হবে, কল্যাণ-অবসরের জট খুলবে, উৎসব ভাতা বাড়বে—শুনতে শুনতে শিক্ষকরা ভাবছিলেন বুঝি এবার তাদের দুর্দিন শেষ। কিন্তু ক্ষমতার চেয়ারটা একটু আরামদায়ক হইতেই মনে হয় সেই প্রতিশ্রুতিগুলাও “আবেগি বক্তব্য” হইয়া গেছে! এখন শিক্ষকরা ফাইল হাতে অফিসে অফিসে ঘুরেন, আর প্রতিশ্রুতিগুলো বাতাসে ঘুরে বেড়ায়।

বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীরা বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় অংশ বহন করছেন। দেশের অধিকাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানই বেসরকারি। গ্রামগঞ্জে, প্রত্যন্ত অঞ্চলে, মফস্বলে—যেখানে সরকারি প্রতিষ্ঠানের উপস্থিতি কম, সেখানে শিক্ষার আলো জ্বালিয়ে রেখেছেন এই শিক্ষকরা। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, সবচেয়ে অবহেলিত শ্রেণির নামও আজ বেসরকারি শিক্ষক সমাজ।

একজন শিক্ষক সারাজীবন ছাত্র গড়েন, জাতি গড়েন। নিজের সন্তানের মুখে ভালো খাবার তুলে দিতে না পারলেও ছাত্রদের মানুষ করার স্বপ্ন দেখান। কিন্তু সেই শিক্ষক অবসরে গিয়ে যখন নিজের প্রাপ্য টাকার জন্য বছরের পর বছর ঘোরেন, তখন এটি শুধু প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়—এটি জাতির নৈতিক ব্যর্থতা।

অনেক শিক্ষক অবসরের পর কল্যাণ ও অবসর সুবিধার টাকা পেতে দুই-তিন বছর পর্যন্ত অপেক্ষা করছেন। কেউ কেউ জীবিত অবস্থায় সেই টাকা পান না। মৃত্যুর পর পরিবার সেই টাকার জন্য ঘুরে বেড়ায়। কত শিক্ষক চিকিৎসার অভাবে মারা গেছেন, কত পরিবার ঋণের বোঝা টানছে—তার হিসাব কোনো দপ্তরের ফাইলে নেই।

শেখ হাসিনা সরকারের সময়েও বেসরকারি শিক্ষকরা বৈষম্যের শিকার হয়েছেন—এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই। দীর্ঘ আন্দোলন, রাস্তায় অবস্থান, অনশন—এসব দৃশ্য নতুন কিছু নয়। তবুও সেই সময় কিছু বিষয়ে অন্তত উদ্যোগ দেখা গিয়েছিল। কল্যাণ-অবসরের টাকা পুরোপুরি নিয়মিত না হলেও মাঝে মাঝে বড় অঙ্কের বরাদ্দ দেওয়া হতো। শিক্ষকরা অন্তত এই আশা করতেন যে, কিছুটা দেরি হলেও টাকা একসময় মিলবে।

কিন্তু বর্তমান সরকারের ৯০ দিন পেরিয়ে গেলেও শিক্ষক সমাজ আশার কোনো স্পষ্ট আলো দেখছে না। বরং অনেকের মধ্যে হতাশা বাড়ছে। কারণ ক্ষমতায় আসার আগে যেসব প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, তার বাস্তবায়নে দৃশ্যমান সদিচ্ছার অভাব চোখে পড়ছে। জাতীয়করণের মতো বড় প্রতিশ্রুতির কথা এখন আর খুব একটা শোনা যায় না। কল্যাণ-অবসরের জট নিরসনে কার্যকর উদ্যোগও দৃশ্যমান নয়।

সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো—উৎসব ভাতা ১০ শতাংশ বৃদ্ধির ঘোষণা দিয়েও তা বাস্তবায়ন না করা। একজন শিক্ষক যখন টেলিভিশনে ঘোষণা শুনেন, সামাজিক মাধ্যমে অভিনন্দন বার্তা দেখেন, তখন তিনি মনে মনে হিসাব কষেন—ঈদে সন্তানকে হয়তো নতুন জামা কিনে দিতে পারবেন। হয়তো স্ত্রীর জন্য একটা শাড়ি কেনা যাবে। কিন্তু পরে যখন দেখেন ঘোষণাটি কাগজেই আটকে আছে, তখন তাঁর কষ্টটা শুধু আর্থিক নয়—মানসিকও।

কারণ শিক্ষকরা শুধু টাকা চান না; তারা সম্মানও চান। তারা চান, সরকার তাদের সঙ্গে সত্য কথা বলুক। এমন প্রতিশ্রুতি না দিক, যা বাস্তবায়নের কোনো ইচ্ছাই নেই।

আজ একজন বেসরকারি শিক্ষক কী অবস্থায় আছেন? মাসের পর মাস বেতন দিয়ে সংসার চালানো কঠিন। বাজারের আগুনে নিত্যপণ্যের দাম বাড়ছে, চিকিৎসা ব্যয় বাড়ছে, বাড়িভাড়া বাড়ছে। কিন্তু শিক্ষকদের আয় সেই তুলনায় বাড়ছে না। অনেক শিক্ষক প্রাইভেট পড়িয়ে, কোচিং করিয়ে কিংবা টিউশনির ওপর নির্ভর করে সংসার টিকিয়ে রাখছেন। অবসরে গেলে সেই পথও বন্ধ হয়ে যায়। তখন কল্যাণ-অবসরের টাকাটাই হয়ে ওঠে শেষ ভরসা। আর সেই টাকাই যদি বছরের পর বছর আটকে থাকে, তাহলে একজন শিক্ষক কোথায় যাবেন?

এই দেশের রাজনীতিবিদরা প্রায়ই বলেন—শিক্ষকরাই জাতি গড়ার কারিগর। কিন্তু বাস্তবে সেই কারিগরদের জীবনই সবচেয়ে অনিরাপদ। একজন সরকারি কর্মচারী অবসরের পর তুলনামূলক দ্রুত সুবিধা পান। কিন্তু বেসরকারি শিক্ষকরা যেন দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক। একই রাষ্ট্রের নাগরিক হয়েও তারা সমান মর্যাদা পান না।

এখানে সবচেয়ে বড় সংকট হলো বিশ্বাসের সংকট। শিক্ষক সমাজ এখন প্রশ্ন করতে শুরু করেছে—রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি কি শুধু ভোটের সময়ের জন্য? ক্ষমতায় যাওয়ার আগে শিক্ষকদের পাশে দাঁড়ানোর কথা বলা হয়, আর ক্ষমতায় যাওয়ার পর তাদের বেমালুম ভুলে যাওয়া হয় কেন?

এই আক্ষেপ শুধু অর্থের নয়; এটি আত্মমর্যাদার আক্ষেপ। একজন শিক্ষক যখন বলেন, “আমাদের কথা কেউ ভাবে না”—তখন সেটি একটি সমাজের জন্য লজ্জার কথা।

সরকার চাইলে এই সংকট নিরসন অসম্ভব নয়। প্রয়োজন আন্তরিকতা ও অগ্রাধিকার। কল্যাণ-অবসরের জন্য আলাদা স্থায়ী তহবিল গঠন করা যেতে পারে। আবেদন নিষ্পত্তির নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ করা যেতে পারে। ডিজিটাল পদ্ধতিতে স্বচ্ছতা আনা যেতে পারে। সবচেয়ে বড় কথা—যা ঘোষণা দেওয়া হবে, তা বাস্তবায়নের সৎ উদ্যোগ থাকতে হবে।

কারণ শিক্ষক সমাজকে দীর্ঘদিন অবহেলা করলে তার প্রভাব শুধু শিক্ষকদের ওপর পড়ে না; পুরো শিক্ষা ব্যবস্থার ওপর পড়ে। হতাশ শিক্ষক কখনো প্রাণবন্ত শিক্ষা দিতে পারেন না। 

আজ সময় এসেছে সরকার বাস্তবতা উপলব্ধি করুক। শিক্ষকদের প্রাপ্যকে দয়া বা অনুদান হিসেবে না দেখে অধিকার হিসেবে বিবেচনা করুক। কারণ এই শিক্ষকরা কোনো ভিক্ষা চান না; তারা তাদের ঘামঝরা উপার্জনের ন্যায্য পাওনা চান।

সরকার মহাশয়, আর কতদিন অপেক্ষা করবেন শিক্ষকরা? আর কত অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক মৃত্যুর আগে প্রাপ্য টাকার আশায় দরজায় দরজায় ঘুরবেন? প্রতিশ্রুতি দিয়ে ভুলে যাওয়ার রাজনীতি থেকে বেরিয়ে আসার সময় কি এখনও হয়নি?

 নইলে মানুষ হয়তো একদিন সত্যিই বলবে—ক্ষমতার আগে দেওয়া অনেক প্রতিশ্রুতিই ছিল সেই অসুস্থ মোরগকে বাঁচানোর সময় করা “খাসি দেওয়ার মানত”-এর মতো; প্রয়োজন ফুরালেই যার আর কোনো মূল্য থাকে না।

লেখক: শিক্ষক ও গবেষক। 


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.