।। এ এইচ এম সায়েদুজ্জামান।।
বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অগ্রগতি, অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং ডিজিটাল রূপান্তরের গল্প শুনছে প্রতিদিন। উন্নয়নের মহাসড়কে এগিয়ে যাওয়ার নানা পরিসংখ্যান তুলে ধরা হচ্ছে রাষ্ট্রীয় বক্তব্যে। কিন্তু এই উন্নয়নের আড়ালে যদি শিশুরা নিরাপদ না থাকে, যদি প্রতিদিন কোনো না কোনো শিশু ধর্ষণ, নির্যাতন কিংবা হত্যার শিকার হয়, তবে সেই উন্নয়ন কতটা মানবিক—সেই প্রশ্ন আজ প্রবলভাবে সামনে এসেছে। সাম্প্রতিক সময়ে দেশে একের পর এক শিশু ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনা শুধু উদ্বেগজনক নয়, বরং এটি সমাজের ভয়াবহ নৈতিক অবক্ষয়ের প্রতিচ্ছবি।
আজ বাংলাদেশের মানুষের মনে সবচেয়ে বড় আতঙ্কের জায়গা হলো—“এরপর কে?” কোনো শিশুর ধর্ষিত কিংবা নিহত হওয়ার সংবাদ এখন আর বিচ্ছিন্ন ঘটনা মনে হয় না; বরং যেন এক ভয়ংকর ধারাবাহিকতা। কয়েকদিন পরপরই সংবাদমাধ্যমে উঠে আসে নতুন কোনো রামিশা, আমিশা কিংবা নাম না জানা শিশুর করুণ পরিণতির খবর। এই বাস্তবতা শুধু অপরাধ বৃদ্ধির ইঙ্গিত দেয় না, এটি রাষ্ট্র, সমাজ, পরিবার এবং বিচারব্যবস্থার গভীর ব্যর্থতারও প্রতিচ্ছবি।
একটি সভ্য রাষ্ট্রে শিশুরা সবচেয়ে বেশি সুরক্ষিত থাকবে—এটাই স্বাভাবিক প্রত্যাশা। পৃথিবীর বহু দেশ স্বাধীনতার পর শিশু অধিকারকে রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকারে পরিণত করেছে। শিশুদের নিরাপত্তা, মানসিক বিকাশ, শিক্ষা ও সুরক্ষাকে ঘিরে শক্তিশালী আইন ও সামাজিক কাঠামো তৈরি হয়েছে। অথচ বাংলাদেশে এখনো শিশুরা ঘর, স্কুল, রাস্তাঘাট, এমনকি আত্মীয়স্বজনের কাছেও নিরাপদ নয়। সবচেয়ে ভয়ঙ্কর বাস্তবতা হলো, অনেক ক্ষেত্রে ধর্ষক ও হত্যাকারীরা পরিচিত মানুষ—প্রতিবেশী, আত্মীয়, শিক্ষক কিংবা প্রভাবশালী ব্যক্তি। ফলে শিশুর নিরাপত্তাহীনতা সমাজের প্রতিটি স্তরে ছড়িয়ে পড়েছে।
শিশু ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনা বৃদ্ধির পেছনে সবচেয়ে বড় কারণগুলোর একটি হলো বিচারহীনতার সংস্কৃতি। অপরাধীরা জানে, কিছুদিন আলোচনা-সমালোচনার পর ঘটনাটি চাপা পড়ে যাবে। রাজনৈতিক প্রভাব, সামাজিক ক্ষমতা কিংবা দীর্ঘসূত্রিতার কারণে অনেক মামলার বিচার বছরের পর বছর ঝুলে থাকে। আবার অনেক ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীর পরিবার ভয়, লজ্জা কিংবা সামাজিক চাপে মামলা পর্যন্ত করতে পারে না। ফলে অপরাধীরা আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে। বিচার দ্রুত ও দৃশ্যমান না হলে অপরাধ দমনের বার্তা কখনোই সমাজে পৌঁছায় না।
আমাদের সমাজে আরেকটি বড় সংকট হলো নৈতিক শিক্ষার অবক্ষয়। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সামাজিক পরিবেশ—সব জায়গাতেই মানবিক মূল্যবোধের ঘাটতি প্রকট হয়ে উঠছে। শিশুদের প্রতি সহমর্মিতা, নারীর প্রতি সম্মান এবং মানবিক আচরণের শিক্ষা আজ অনেক ক্ষেত্রেই অনুপস্থিত। প্রযুক্তির অপব্যবহার, অশ্লীল কনটেন্টের সহজলভ্যতা এবং অসুস্থ বিনোদন সংস্কৃতি অনেক বিকৃত মানসিকতাকে উসকে দিচ্ছে। কিন্তু রাষ্ট্র ও সমাজ এই জায়গাগুলোতে কার্যকর কোনো দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ নিতে পারেনি।
শুধু আইন করলেই সমস্যার সমাধান হবে না, আইনের কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। বাংলাদেশে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন রয়েছে, শিশু আইন রয়েছে, কিন্তু বাস্তবে এসব আইনের প্রয়োগ কতটা কার্যকর—সেই প্রশ্ন থেকেই যায়। তদন্তে গাফিলতি, প্রমাণ সংগ্রহে দুর্বলতা, সাক্ষীর নিরাপত্তাহীনতা এবং বিচার প্রক্রিয়ার ধীরগতি অপরাধীদের সুযোগ করে দেয়। অনেক সময় দেখা যায়, আলোচিত ঘটনায় কিছুদিন তৎপরতা থাকলেও পরে সবকিছু আগের মতো হয়ে যায়। ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যেও বিচারব্যবস্থার ওপর আস্থা কমে যাচ্ছে।
আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, শিশু নির্যাতনের ঘটনায় সামাজিক প্রতিক্রিয়া অনেক সময় অসুস্থ ও অমানবিক হয়ে ওঠে। ভুক্তভোগী পরিবারকেই নানা প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়। কোথায় গিয়েছিল, কেন গিয়েছিল, কী পোশাক ছিল—এসব প্রশ্নের মাধ্যমে অপরাধীর বদলে ভুক্তভোগীকেই দায়ী করার প্রবণতা সমাজে এখনো বিদ্যমান। এই মানসিকতা পরিবর্তন না হলে শিশু সুরক্ষা কখনোই নিশ্চিত হবে না।
শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে পরিবারকেও আরও সচেতন হতে হবে। সন্তান কোথায় যাচ্ছে, কার সঙ্গে মিশছে, কী ধরনের মানসিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে—এসব বিষয়ে অভিভাবকদের মনোযোগী হতে হবে। একই সঙ্গে শিশুদের “গুড টাচ-ব্যাড টাচ” সম্পর্কে শিক্ষা দেওয়া জরুরি। ভয় না পেয়ে যাতে তারা কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার কথা পরিবারকে জানাতে পারে, সেই আস্থার পরিবেশও তৈরি করতে হবে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর দায়িত্বও কম নয়। স্কুল শুধু পাঠ্যবই পড়ানোর জায়গা নয়; এটি একটি শিশুর সামাজিক ও নৈতিক বিকাশের অন্যতম ক্ষেত্র। কিন্তু অনেক প্রতিষ্ঠানে এখনো শিশু সুরক্ষা নীতিমালা কার্যকর নয়। শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ, কাউন্সেলিং ব্যবস্থা এবং নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে বড় ঘাটতি রয়েছে। প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিশু সুরক্ষা কমিটি গঠন এবং অভিযোগ গ্রহণের স্বচ্ছ ব্যবস্থা থাকা জরুরি।
রাষ্ট্রের ভূমিকাই এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। শিশু নির্যাতনের বিরুদ্ধে “জিরো টলারেন্স” নীতি শুধু বক্তব্যে নয়, বাস্তবেও প্রয়োগ করতে হবে। দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল কার্যকর করা, তদন্তের মান উন্নত করা, ডিজিটাল অপরাধ পর্যবেক্ষণ জোরদার করা এবং অপরাধীদের রাজনৈতিক বা সামাজিক পরিচয় বিবেচনা না করে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে শিশুদের জন্য নিরাপদ নগর ও সামাজিক পরিবেশ গড়ে তুলতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন।
ধর্মীয় ও সামাজিক নেতৃত্বকেও ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে হবে। ইসলামসহ সব ধর্মই শিশুদের প্রতি সহমর্মিতা, সুরক্ষা ও মর্যাদার কথা বলে। মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) শিশুদের প্রতি দয়া ও কোমল আচরণকে ঈমানের অংশ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। অথচ বাস্তবে আমরা এমন এক সমাজে বাস করছি, যেখানে শিশুদের ওপর পাশবিক নির্যাতনের ঘটনা ঘটছে প্রতিনিয়ত। ধর্মীয় মূল্যবোধ যদি সত্যিকার অর্থে সমাজে চর্চিত হতো, তবে এমন নৃশংসতা এত সহজে বিস্তার লাভ করত না।
শিশু ধর্ষণ ও হত্যা শুধু আইনশৃঙ্খলার সমস্যা নয়; এটি একটি জাতীয় সংকট। এই সংকট মোকাবিলায় রাজনৈতিক সদিচ্ছা, সামাজিক সচেতনতা, দ্রুত বিচার এবং মানবিক শিক্ষা—সবকিছুর সমন্বিত প্রয়াস প্রয়োজন। শুধু প্রতিবাদ মিছিল, মানববন্ধন কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভ প্রকাশ করলেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। প্রয়োজন ধারাবাহিক সামাজিক আন্দোলন এবং রাষ্ট্রীয় জবাবদিহি।
আজ যদি আমরা শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হই, তবে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম ভয়, অনিরাপত্তা এবং অবিশ্বাসের সমাজে বেড়ে উঠবে। যে দেশে শিশুরা নিরাপদ নয়, সেই দেশের উন্নয়ন, গণতন্ত্র কিংবা সভ্যতার দাবি প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। একটি রাষ্ট্রের মানবিকতার সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হয় তার শিশুদের নিরাপত্তা দিয়ে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে বাংলাদেশ সেই পরীক্ষায় বারবার ব্যর্থ হচ্ছে।
রামিশা, আমিশা কিংবা নাম না জানা অসংখ্য শিশুর আর্তনাদ আজ আমাদের বিবেককে প্রশ্ন করছে—আর কত? আর কত নিষ্পাপ প্রাণ হারালে রাষ্ট্র জেগে উঠবে? আর কত পরিবার ধ্বংস হলে সমাজ নীরবতা ভাঙবে? শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কোনো দয়া নয়, এটি রাষ্ট্রের সাংবিধানিক ও নৈতিক দায়িত্ব। এখনই যদি কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হয়, তবে ইতিহাস আমাদের ক্ষমা করবে না।
লেখক: শিক্ষক ও গবেষক।
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল

