এইমাত্র পাওয়া

শিক্ষক লাঞ্ছনা ও আমাদের সামাজিক অবক্ষয়

।। কাওসার আলম সোহেল।।

বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার অন্যতম মৌলিক স্তম্ভ হচ্ছেন শিক্ষক। রাষ্ট্র, সমাজ এবং সভ্যতার ধারক-বাহক হিসেবে তাঁদের ভূমিকা অনস্বীকার্য। একটি জাতির মানসিকতা, মূল্যবোধ এবং নৈতিক ভিত্তি গড়ে ওঠে মূলত শিক্ষকের হাত ধরেই। অথচ দুঃখজনক হলেও সত্য- এই গুরুত্বপূর্ণ পেশাটিই আজ সবচেয়ে বেশি অবমূল্যায়নের শিকার।

একদিকে তাঁদের “জাতি গড়ার কারিগর” বলা হয়, অন্যদিকে প্রতিনিয়ত তাঁদের সম্মান, নিরাপত্তা ও মর্যাদা ক্ষুণ্ন করা হয়। এই দ্বৈত অবস্থান কেবল পরিহাস নয়, বরং গভীর সামাজিক সংকটের প্রতিফলন। বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতে শিক্ষকতা একটি সম্মানজনক ও আকর্ষণীয় পেশা হিসেবে বিবেচিত।

সেখানে শিক্ষক কেবল জ্ঞানদাতা নন; তাঁরা পথপ্রদর্শক, চিন্তাবিদ এবং মূল্যবোধের নির্মাতা। সমাজ তাঁদের প্রতি শ্রদ্ধাশীল, রাষ্ট্র তাঁদের প্রাপ্য মর্যাদা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করে। অথচ বাংলাদেশের চিত্র অনেকাংশেই ভিন্ন। এখানে একজন শিক্ষক দীর্ঘ শিক্ষাজীবন পেরিয়ে, কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে নিজেকে গড়ে তোলার পরও কর্মজীবনে এসে বারবার অপমান ও অবজ্ঞার শিকার হন।

অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পরিচালনা পর্ষদের সদস্য বা সভাপতি, যাদের শিক্ষাগত যোগ্যতা সীমিত- তাঁরাই শিক্ষকদের উপর কর্তৃত্ব প্রদর্শন করেন। রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে গড়ে ওঠা এই ক্ষমতার কাঠামো শিক্ষার পরিবেশকে ক্রমশ বিষাক্ত করে তুলছে। আপনাদের অনেকেরই মনে রয়েছে, কুমিল্লার দেবিদ্বার উপজেলার মোহনপুর উচ্চ বিদ্যালয়ে এক শিক্ষার্থী প্রধান শিক্ষকের চেয়ারে বসে সেই ছবি সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দেয়। এটি নিছক দুষ্টুমি নয়; বরং শিক্ষকের প্রতি ক্রমবর্ধমান অবজ্ঞা ও শৃঙ্খলাহীনতার প্রতীক।

আমরা প্রায়ই খবরের কাগজ কিংবা অনলাইন মাধ্যমে দেখতে পাই, শিক্ষার্থীদের হাতেই শিক্ষক লাঞ্ছিত হচ্ছেন। যেখানে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্ক গড়ে ওঠার কথা ছিল পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সম্মান ও মূল্যবোধের ভিত্তিতে, সেখানে আজ সেই সম্পর্ক ক্রমেই ক্ষয়ে যাচ্ছে অবাধ্যতা, অসচেতনতা ও নৈতিক অবক্ষয়ের চাপে।

শুধু শিক্ষার্থীদের হাতেই যে শিক্ষকরা লাঞ্ছিত হচ্ছেন, বিষয়টি এমন নয়; বাস্তবতা আরও উদ্বেগজনক। দেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলায় বারবার দেখা যাচ্ছে, রাজনৈতিক প্রভাবশালী ব্যক্তি, স্থানীয় নেতা কিংবা ক্ষমতাধর গোষ্ঠীর হাতেও শিক্ষকরা অপমান, হেনস্তা এমনকি শারীরিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। একটি সভ্য সমাজে যেখানে শিক্ষক হওয়া উচিত সর্বোচ্চ সম্মানিত পেশাগুলোর একটি, সেখানে তাঁদের এই অবমাননাকর পরিস্থিতি গভীরভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করে আমাদের সামগ্রিক সামাজিক ও নৈতিক অবস্থানকে।

এমন চিত্র বিশ্বব্যাপী বিরল- বরং মনে হয়, এই অবক্ষয় আমাদের সমাজেই সবচেয়ে প্রকটভাবে দৃশ্যমান। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ঘুরে প্রায় দুই হাজারের বেশি স্কুল-কলেজে কাজ করার অভিজ্ঞতা থেকে যে বাস্তবতা সামনে এসেছে, তা অত্যন্ত বেদনাদায়ক। প্রতিষ্ঠানভেদে ভিন্নতা থাকলেও একটি বিষয় প্রায় সর্বত্রই অভিন্ন- শিক্ষকদের অনিরাপত্তা ও অবমূল্যায়ন। অনেক শিক্ষকই জানান, তাঁরা শ্রেণিকক্ষে পাঠদান করতে গিয়ে মানসিক চাপ, ভয় ও অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকেন।

কখন কার আচরণে অপমানিত হতে হবে, বা কোন ঘটনার জেরে হেনস্তার শিকার হতে হবে- এই অজানা শঙ্কা তাঁদের প্রতিনিয়ত তাড়িয়ে বেড়ায়। একসময় শিক্ষকদের ‘গুরু’ হিসেবে মানা হতো। তাঁদের কথা ছিল চূড়ান্ত, তাঁদের শাসন ছিল শিক্ষার অবিচ্ছেদ্য অংশ। যদিও সেই সময়ে কিছু ক্ষেত্রে অতিরিক্ত কঠোরতা ছিল, তবুও শিক্ষার্থীরা শৃঙ্খলাবোধ, দায়িত্ববোধ এবং সম্মানবোধ অর্জন করত। বর্তমানে শারীরিক শাস্তি নিষিদ্ধ করা হয়েছে- যা মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত।

তবে এর বিকল্প হিসেবে কার্যকর শৃঙ্খলা ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়নি। ফলে শিক্ষকরা অনেক ক্ষেত্রে শাসনের ন্যূনতম ক্ষমতাটুকুও হারিয়ে ফেলেছেন। এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে আসে, শাসন কি কেবল শাস্তির মাধ্যমেই সম্ভব? নিশ্চয়ই নয়। কিন্তু শাসনের সম্পূর্ণ অনুপস্থিতি বা অকার্যকারিতা যে ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি করতে পারে, তা আমরা এখন প্রত্যক্ষ করছি। বর্তমানে “কিশোর গ্যাং” একটি উদ্বেগজনক সামাজিক সমস্যায় পরিণত হয়েছে। এসব কিশোর-তরুণদের একটি অংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সাথেও সম্পৃক্ত।

তারা বিদ্যালয়ের ভেতরেও বেপরোয়া আচরণ করছে, শিক্ষকদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করছে এবং নিয়ম-শৃঙ্খলার প্রতি অবজ্ঞা প্রদর্শন করছে। এই পরিস্থিতির পেছনে পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্র- সবকটিরই ভূমিকা রয়েছে। পরিবারে যদি সন্তানকে সম্মানবোধ, শৃঙ্খলা ও নৈতিকতার শিক্ষা না দেওয়া হয়, তবে বিদ্যালয় একা তা পূরণ করতে পারে না।

আবার সমাজে যদি শিক্ষকদের প্রতি অবজ্ঞা স্বাভাবিক হয়ে ওঠে, তবে শিক্ষার্থীরা সেই আচরণই অনুসরণ করবে এটাই স্বাভাবিক। শিক্ষকদের মর্যাদা পুনরুদ্ধার করতে হলে প্রথমেই তাঁদের জন্য একটি নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। কোনো শিক্ষক যদি অপমান বা হেনস্তার শিকার হন, তবে দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে বিচার নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিচালনা কাঠামোয় যোগ্যতা, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা জরুরি।

রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত প্রশাসনিক ব্যবস্থা ছাড়া শিক্ষার মানোন্নয়ন সম্ভব নয়। দ্বিতীয়ত, শিক্ষার্থীদের জন্য কার্যকর ও আধুনিক শৃঙ্খলা নীতি প্রণয়ন করতে হবে। শাস্তিনির্ভর নয়, বরং মূল্যবোধ ও দায়িত্ববোধভিত্তিক শিক্ষা ব্যবস্থার উপর জোর দিতে হবে। শিক্ষককে এমন ক্ষমতা দিতে হবে, যাতে তিনি সম্মানের সঙ্গে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে পারেন, কিন্তু তা যেন কোনোভাবেই নির্যাতনে পরিণত না হয়। তৃতীয়ত, পরিবারকে তাদের দায়িত্ব আরও সচেতনভাবে পালন করতে হবে।

সন্তানকে শুধু পরীক্ষায় ভালো ফল করার জন্য নয়, বরং একজন মানবিক, নৈতিক ও দায়িত্বশীল মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার শিক্ষা দিতে হবে। পিতা-মাতার আচরণই সন্তানের প্রথম ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। সবশেষে, সমাজের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন সবচেয়ে জরুরি। শিক্ষককে কেবল একজন পেশাজীবী হিসেবে নয়, বরং একজন জাতি নির্মাতা হিসেবে দেখতে হবে এবং সেই দৃষ্টিভঙ্গি বাস্তবেও প্রতিফলিত হতে হবে। তাঁদের প্রতি সম্মান, নিরাপত্তা এবং ন্যায্য মূল্যায়ন নিশ্চিত করতে হবে। আজ যদি আমরা শিক্ষকদের অপমানিত হতে দেখি এবং নীরব থাকি, তাহলে আগামীকাল সেই অপমান আমাদের সমাজের প্রতিটি স্তরে ছড়িয়ে পড়বে। কারণ শিক্ষকই সেই ব্যক্তি, যিনি একটি জাতির নৈতিক ভিত্তি নির্মাণ করেন। সেই ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়লে পুরো সমাজ কাঠামোই একসময় ভেঙে পড়বে। সুতরাং এখনই সময় শিক্ষকদের মর্যাদা পুনরুদ্ধার করার, শিক্ষাব্যবস্থাকে শৃঙ্খলার পথে ফিরিয়ে আনার এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে একটি মানবিক, দায়িত্বশীল ও সুস্থ সমাজ উপহার দেওয়ার। অন্যথায় “জাতি গড়ার কারিগর” কথাটি কেবলই একটি শূন্য স্লোগানে পরিণত হবে।

লেখকঃ সংগঠক ও কলামিস্ট

শিক্ষাবার্তা /এ/১১ /০৫/২০২৬

দেশ বিদেশের শিক্ষা, পড়ালেখা, ক্যারিয়ার সম্পর্কিত সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম, ছবি, ভিডিও প্রতিবেদন সবার আগে দেখতে চোখ রাখুন শিক্ষাবার্তায়।


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.