মোঃ আইউব আলী।।
সম্প্রতি বে-সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদ নিয়ে বিভিন্ন প্রচার মাধ্যমে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। উক্ত প্রতিবেদনে চলমান পরিচালনা পর্ষদের দ্বারা সৃষ্ট জটিলতার কথা স্পষ্টভাবে উদ্ধৃত হয়েছে। বোর্ড কর্তৃপক্ষ পরিচালনা পর্ষদের শিক্ষাগত যোগ্যতা বিদ্যমান শিক্ষকের শিক্ষাগত যোগ্যতার সমান করে এবং আরোও কিছু পরিবর্তন ও সংযোজন সাপেক্ষে নীতিমালা তৈরির কাজ শুরু করেছেন।
মাননীয় শিক্ষা উপমন্ত্রী ব্যারিস্টার মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল পরিচালনা পর্ষদে শিক্ষিত ব্যক্তিদের সংযোজন এবং কমিটির কাঠামোগত পরিবর্তনের কথা জানান। দেরীতে হলেও সদাশয় কর্তৃপক্ষ যে প্রকৃত বিষয়টি উপলব্ধি করেছেন এজন্য শিক্ষক সমাজের পক্ষ থেকে তাদের প্রতি রইলো আন্তরিক অভিনন্দন। ম্যানেজিং কমিটি, গভর্ণিং বডি মোট কথা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিচালনার জন্য যে পরিচালনা কমিটি গঠিত হয় তা আসলে সেকেলে আমলের, গতানুগতিক ধারার একটি বিষয়। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে সব ক্ষেত্রেই পরিবর্তন, পরিবর্ধন, পরিমার্জন হলেও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিচালনা সংক্রান্ত বিষয়টি এখনো সেকেলে আমলেরই রয়ে গেছে।
৭০ কিংবা ৮০’র দশকে কিংবা তারও পূর্বে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠতো স্থানীয় বিদ্যানুরাগী ব্যক্তির সার্বিক সহযোগিতায়। সন্তানের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে তারা জমি-জমা, টাকা-পয়সা প্রদান করে প্রতিষ্ঠান স্থাপন করতেন এবং নিজেদের অর্থায়নে এসব প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করতেন বিধায় তারাই থাকতেন পরিচালনা কমিটিতে। তারা সার্বিক দিক দেখাশোনা করতেন আর শিক্ষকগণ লেখা-পড়ার বিষয়টি দেখতেন। কালক্রমে প্রতিষ্ঠান স্থাপনের এ ধারাটির পরিবর্তন হয়।
৯০’র দশক থেকে দেখা গেছে এলাকার কিছু মানুষ প্রতিষ্ঠান স্থাপন করেছেন কিন্তু নিজের অর্থায়নে নয়, তারা মূলতঃ কৈ এর তেলে কৈ ভেজেছেন। প্রতিষ্ঠান স্থাপনের জন্য উদ্যোগ গ্রহণ করে এলাকার বেকারদের কাছ থেকে মোটা অংকের টাকা ডোনেশন হিসেবে গ্রহণ করে প্রতিষ্ঠান স্থাপন করেছেন ঠিকই কিন্তু নিজেরা আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ বনে গেছেন। তারাই আবার পরিচালনা পর্ষদেও রয়েছেন। এ ধারাটি এখনো অব্যাহত রয়েছে।
বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো শিক্ষাক্ষেত্রে ৭৫ থেকে ৮০ অবদান রাখলেও অতীতে এসব প্রতিষ্ঠান নিয়ে সরকারের তেমন মাথা ব্যাথা ছিলোনা হয়তো সামর্থ্য কিংবা সদিচ্ছার অভাব ছিল। কিন্তু কালক্রমে এ অবস্থার পরিবর্তন ঘটেছে। ১৯৮৫ সাল থেকে বেসরকারি শিক্ষকগণ তৎকালীন প্রচলিত স্কেলের ৫০ শতাংশ বেতন পেতেন, পর্যায়ক্রমে তা ১০০ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। বাড়ীভাড়া, চিকিৎসা ভাতা, উৎসব বোনাস অংশিক হারে পাচ্ছেন। এছাড়াও বৈশাখী ভাতা এবং ইনক্রিমেন্ট ইতোমধ্যে পাচ্ছেন। একাডেমিক ভবন, মেরামত ব্যয় সরকারই বহন করছে। এর অর্থ এই দ্বাড়ায় যে, বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সরকারই পরিচালনা করছেন। স্থানীয় ব্যক্তিবর্গ এখন আর প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় অর্থনৈতিকভাবে কোন অবদানই রাখছেন না। কিন্তু নীতিগত কারণে পরিচালনা পর্ষদে স্থানীয় জনগণই থাকছেন।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পরিচালনা পর্ষদের প্রয়োজনীয়তা কতটুকু, থাকলে কি সুবিধা না থাকলে কি সমস্যা তা বাস্তবতার আলোকে খতিয়ে দেখা দরকার। একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জন্য শিক্ষানুরাগী ব্যক্তি অবশ্যই কল্যাণকর কিন্তু বর্তমানে যারা উক্ত জায়গাটিতে আসছেন তাদের কতজন শিক্ষানুরাগী? কতজন নিঃস্বার্থভাবে প্রতিষ্ঠানের দেখভাল করেন? জরীপ করলে এ অংক নিশ্চয়ই একক অংকের বাইরে যাবেনা। তাহলে যারা পরিচালকের ব্যানার নিয়ে আছেন তারা আসলে কি করছেন? পেপার-পত্রিকা, বিভিন্ন মিডিয়ার মাধ্যমে আমরা সবাই কম-বেশি অবগত আছি যে, কমিটিতে যারা আসছেন তাদের অনেকেই ব্যক্তিস্বার্থ চরিতার্থ করার উদ্দেশ্যেই আসছেন।
বিভিন্ন পদে নিয়োগ দিয়ে অর্থ হাতিয়ে নেয়ার ঘটনা বিরল নয় যদিও এনটিআরসিএ’র কল্যাণে বর্তমানে সে সুযোগ সীমিত হয়ে গেছে। তারপরও যে পদগুলো রয়েছে সেগুলোর ডিমান্ড আকাশচুম্বী হওয়ায় পুষিয়ে যাচ্ছে। এছাড়াও যে সব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীর নিকট থেকে আয় হয় সে সব প্রতিষ্ঠানে পরিচালনা পর্ষদে আসার জন্য অনেকেই সার্বিক প্রচেষ্টা চালিয়ে যান। পক্ষান্তরে গ্রামে-গঞ্জে যে সব প্রতিষ্ঠান রয়েছে সে সব প্রতিষ্ঠানে পরিচালনা পর্ষদ গঠনের সময় যোগ্য ব্যক্তি তো দুরের কথা অযোগ্য ব্যক্তিরও সন্ধান পাওয়া যায় না। জোর করে ধরে আনতে হয়। প্রতিষ্ঠানের খোঁজ-খবর তো দুরের কথা সাধারণ মিটিংগুলোতেই আসেন না, বাড়ী বাড়ী গিয়ে রেজুলেশন খাতায় স্বাক্ষর নিতে হয়। একইভাবে যে সব ভাল মানুষ কমিটিতে আসেন তারা প্রতিষ্ঠান নিয়ে তেমন মাথা ঘামান না বা প্রাতিষ্ঠানিক উন্নয়নে মতামত প্রদানের যোগ্যতাও অনেকের থাকেনা।
প্রসঙ্গতঃ উল্লেখ্য যে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে যারা আসছেন তাদের মধ্যে কতজন শিক্ষিত, শিক্ষা সম্পর্কে দিক-নির্দেশনা দিতে সক্ষম আর কত জনই বা নিঃস্বার্থভাবে সমাজ সেবা করতে চান? গত ১৭ জুলাই বিভাগীয় পর্যায়ে ইউনিসেফ কর্তৃক আয়োজিত শিক্ষার্থী ঝরে পড়া রোধ কল্পে একটি ওয়ার্কশপে একজন অধ্যাপক তার ভাষণে বলেছিলেন- “আমাদের সর্বোচ্চ মেধাবীরা হতে চায় ডাক্তার কিংবা ইঞ্জিনিয়ার, হতে চায় ভার্সিটির শিক্ষক কিংবা চলে যায় দেশের বাইরে, দ্বিতীয় স্তরের মেধাবীরা যায় প্রশাসনে কিংবা সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ অন্যান্য সরকারি প্রতিষ্ঠানে।
তার পরের মেধাবীরা জায়গা করে নেয় বিভিন্ন বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক-বীমা, এনজিও কিংবা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। এরপর যাদের শিক্ষাগত যোগ্যতা কম তারা জায়গা করে নেয় ডিফেন্সে কিংবা বিভিন্ন কোম্পানীতে। তাহলে বাকী থাকলো তারাই যারা মাধ্যমিক কিংবা উচ্চ মাধ্যমিক পাশ সার্টিফিকেট অর্জন করতে পারেনি। আর এই শ্রেণির লোকজনই স্থানীয়ভাবে রাজনীতিতে জায়গা করে নিয়েছে। রাজনীতিতে জায়গা করে নেয়া মানেই আমাদেরকে পরিচালনা করছে।” স্যারের এ উক্তিটির গ্রহণযোগ্যতা শতভাগ। বাস্তবে তাই ঘটছে। বে-সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে যারা আজ পরিচালনা পর্ষদে আসছেন সামান্য ব্যতিক্রম ছাড়া তারাই রাজনীতিবিদ এবং তথাকথিত সমাজ সেবক। বে-সরকারি কলেজ এবং মাদরাসায় স্থানীয় এমপি মহোদয় কর্তৃক নির্বাচিতদের সভাপতির আসন নির্ধারিত ছিল কিন্তু কিছুদিন পূর্বে সে ধারা রহিত হলেও এমপি মহোদয়ের সাথে পরামর্শক্রমে সভাপতি নির্বাচনের বিধান বহাল রয়েছে। তাহলে কি হলো? দলীয় ব্যক্তিরাই বহাল থাকলো।
কর্তাব্যক্তিরা পরিচালনা পর্ষদের শিক্ষাগত যোগ্যতা নির্ধারণ করে দিতে চাচ্ছেন, ইতোপূর্বেও একবার শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে বাজার বেশ গরম হয়ে উঠেছিল কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা বাস্তবায়ন হয়নি। প্রসঙ্গক্রমে কথা উঠেছে যে, স্বল্প শিক্ষিত ব্যক্তিরা যদি সাংসদ হয়ে দেশ পরিচালনা করতে পারেন তাহলে সামান্য একটা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করতে পারবেন না কেন? এটা একটি অকাট্য যুক্তি। আসলে যুক্তি দিয়ে সব কিছু হয় না। একজন রাধুনী দীর্ঘ সময় ধরে অনেক কষ্ট করে রান্না করে কিন্তু যে পরিবেশন করে তার তেমন সময় কিংবা শ্রমের প্রয়োজন হয় না। দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ৭৫ থেকে ৮০ ভাগই তৈরি হয় বে-সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে। তাদেরকে ধাপে ধাপে তিলে তিলে গড়ে তুলতে হয়। কাজটা অতি কঠিন। এর জন্য প্রয়োজন কঠিন সাধনা, অধ্যবসায় আর আত্মত্যাগ যা বে-সরকারি শিক্ষকগণ সৃষ্টিলগ্ন থেকেই দিয়ে আসছেন। সাংসদদের সাথে এর তূলনা করা চলেনা। সংসদে উচ্চ শিক্ষিতের সংখ্যা নেহাত কম নয়। বিভিন্ন স্তরের গুরুত্বপূর্ণ পদে তারা দেখাশোনা করছেন, স্বল্প শিক্ষিতের সংখ্যা অতি অল্পই বলা চলে যারা কখনই গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে নিয়োজিত হন না।
পক্ষান্তরে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে ৮০ শতাংশই স্বল্প শিক্ষিত কিংবা অশিক্ষিত। সভাপতির আসনে তারাই অধিষ্ঠিত হচ্ছেন। প্রসঙ্গতঃ যে ব্যক্তিটি নিজেই শিক্ষা থেকে ছিটকে পড়েছেন তিনি কিভাবে একটা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার হন? প্রসঙ্গক্রমে বলতে হয়, আজ যদি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে অধিষ্ঠিত উচ্চ শিক্ষিত ব্যক্তিদ্বয়কে বাদ দিয়ে সাংসদদের মধ্য থেকে স্বল্প শিক্ষিত দু’জন ব্যক্তিকে উক্ত পদে আসীন করা যায় তাহলে শিক্ষা ব্যবস্থার কি দূর্দশা হবে তা সহজেই অনুমেয়। সংসদে স্বল্প শিক্ষিত ব্যক্তি অছেন কিন্তু তাদেরতো প্রত্যক্ষভাবে গুরুত্বপূর্ণ কাজে অংশগ্রহণের সুযোগ নেই পক্ষান্তরে পরিচালনা পর্ষদের সদস্য বিশেষ করে সভাপতি স্বল্প শিক্ষিত হোক আর অশিক্ষিত হোক সরাসরি শিক্ষাক্ষেত্রে প্রভাব বিস্তার করেন।
অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, এসব ব্যক্তি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সভাপতির পদ পেয়ে অনেকেই ধরাকে সরা জ্ঞান করছেন। সভাপতি কর্তৃক শিক্ষক লাঞ্চিত হওয়ার ঘটনাও বিরল নয়। অর্থ আত্মসাতের বিষয়টি এখন ওপেন সিক্রেট। দুই দিক থেকে এ সমস্যা সৃষ্টি হচ্ছে। কিছু সংখ্যক অসাধূ প্রতিষ্ঠান প্রধান অসাধু সভাপতির ছত্রছায়ায় অর্থ আত্মসাৎ করছেন আবার সভাপতি যদি অসাধূ হন তাহলে সৎ প্রতিষ্ঠান প্রধান নানাভাবে লাঞ্চিত হচ্ছেন। বেসরকারি শিক্ষকগণের বেতন যেহেতু কমিটির স্বাক্ষর ছাড়া হয় না সেহেতু সেটাকেই হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে অসাধুরা হীন স্বার্থ চরিতার্থ করেন।
প্রসঙ্গক্রমে একটি বাস্তব ঘটনা এখানে উল্লেখ করছি। পার্শ্ববর্তী জেলার একজন প্রধান শিক্ষক কমিটির পছন্দের প্রার্থীকে অফিস সহকারি পদে নিয়োগ দিতে রাজী না হওয়ায় কমিটি প্রথমে তাকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করে। বরখাস্ত প্রত্যাহার না করায় প্রধান শিক্ষক আইনের আশ্রয় গ্রহণ করলে কমিটি শিক্ষাবোর্ডে অভিযোগ দাখিল করে। শিক্ষাবোর্ড প্রধান শিক্ষকের পক্ষে রায় প্রদান করলে কমিটি উচ্চ আদালতে আপীল করে। পাঁচ বছর অতিক্রান্ত হলেও এখনো সুরাহা হয়নি। এদিকে প্রধান শিক্ষরে চাকুরীর বয়স প্রায় শেষের দিকে। কমিটির কল্যাণে তাকে মানবেতর জীবন যাপন করেই হয়তো শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করতে হবে। এধরণের মানবতাবিরোধী কর্মকান্ডের বহু নজির রয়েছে।
তবে হ্যাঁ এখনো কিছু কিছু প্রতিষ্ঠানে সভাপতি কিংবা কমিটির ইতিবাচক ভূমিকা দেখা যায়, জানা যায় কিন্তু সেটা নিত্যান্তই অপ্রতূল। আজ সারা দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে জরীপ চালালে দেখা যাবে সিংহভাগ প্রতিষ্ঠানেই রয়েছে দলীয়করণ আর এর জন্য দায়ী কমিটি। সভাপতি নির্বাচনের সময়ই এ দলীয়করণ শুরু হয় শেষ হয় কমিটির মেয়াদ শেষে, আবার শুরু হয়। ফলে কমিটি এবং শিক্ষকের মাঝে দলাদলি থাকায় একপক্ষ আরেক পক্ষকে কিভাবে জব্দ করবে এ নিয়েই চলে আলোচনা, সমালোচনা আর পর্যালোচনা। অভাগা প্রতিষ্ঠান প্রধান বাধ্য হয়ে ভাল-মন্দ বিবেচনা না করে যেহালে পানি পড়ে সেভাবে ছাতা ধরার চেষ্টা করেন। ব্যতিক্রম হলে পড়ে যান মানসিক যন্ত্রণায়। আবার অনেক প্রতিষ্ঠান প্রধান নিজেই ব্যক্তিগত সুবিধার জন্য নোংরা খেলায় মেতে উঠেন। ফলে প্রতিষ্ঠানে যে সময়টুকু শিক্ষকগণ অবস্থান করেন সে সময়টুকু শিক্ষার্থীদেরন কল্যাণে ব্যয় করার সুযোগ থাকেনা এমন কি প্রতিষ্ঠানের বাইরেও এসব বিষয় নিয়ে চায়ের কাপে ঝড় ওঠে।
সার্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করলে দেখা যায় পরিচালনা পর্ষদের মাধ্যমে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের যতটুকু লাভ হচ্ছে ক্ষতি হচ্ছে বহুগুণে। সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলি যদি কমিটির তদারকি বাদেই ভালভাবে চলতে পারে তাহলে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলিতে পরিচালনা পর্ষদ চলমান রাখার কোন প্রয়োজনীয়তা আছে বলে আমি মনে করিনা। আমি তাদেরকে হেয় প্রতিপন্ন করছি না, তবে যে দায়িত্ব পুরোপুরি শিক্ষকদের বহন করতে হয় সেখানে কেন তারা ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়াতে যাবেন? তাছাড়া একটি বিষয় অবশ্যই মনে রাখতে হবে যে, দেশে শিক্ষিতের হার বৃদ্ধি পেলেও গ্রামে-গঞ্জে শিক্ষিত মানুষের সংখ্যা নিত্যান্তই কম। গ্রামের শিক্ষিত মানুষ সঙ্গত কারণেই শহরমুখী। ফলে পরিচালনা পর্ষদের শিক্ষাগত যোগ্যতার বিষয়টি গ্রাম্য প্রতিষ্ঠানগুলোতে মারাত্মক সমস্যার সৃষ্টি করবে। উপরন্তু শিক্ষিত হলেই যে সৎ এবং দক্ষ হবেন এমনটি আশা করা যায় না। আমি কর্তৃপক্ষকে বিনীতভাবে অনুরোধ জানাচ্ছি জনকলাণে, দেশের কল্যাণে, দেশের উন্নয়নকে ত্বরান্বিতকরণে সর্বোপরি বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নকে বাস্তবায়নে কমিটি সংক্রান্ত বিষয়টি গভীরভাবে খতিয়ে দেখবেন।
মাননীয় প্রধান মন্ত্রীর উচ্চ শিক্ষা, সততা, দূরদর্শিতা, দেশের প্রতি ভালোবাসা এদেশটিকে বর্তমানে অনেক উপরে নিয়ে গেছে। সার্বিক সহযোগিতা যারা করছেন তারা সবাই উচ্চ শিক্ষিত এবং সৎ। ইতোপূর্বে বেসরকারি শিক্ষকদের বেতনের জন্য ডিজি অফিসে টাকা দিতে হতো কিন্তু এখন আর টাকা দিতে হয়না, টাকা দিতে হয়না বিভিন্ন চাকুরীতে। এ থেকে বোঝা যায়, দেশে সৎ মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমান শিক্ষামন্ত্রী মহোদয়ও একজন সৎ এবং দক্ষ মানুষ। তিনি মনে প্রাণে শিক্ষার উন্নতি চান যা আমরা ইতোমধ্যে বুঝতে পেরেছি। আর তার মনোবাসনা পূর্ণ করতে চাই বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মানসিক যন্ত্রণামূক্ত শিক্ষক সমাজ। আর এজন্য কমিটি প্রথা বাতিল করে ভিন্ন আঙ্গিকে চিন্তা করতে হবে।
আমি মনে করি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে আর্থিক স্বচ্ছতা এবং শিক্ষার মানোন্নয়নের জন্য প্রতিষ্ঠান প্রধানসহ কয়েকজন শিক্ষককে নিয়ে নির্দিষ্ট মেয়াদে কমিটি গঠন করা যেতে পারে। কমিটি দায়বদ্ধ থাকবে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে যদিও এটা তার জন্যে একটু কষ্টকর হবে। কিংবা উপজেলা এবং জেলাগুলোতে শিক্ষা কমিটি গঠন করে মনিটরিং-এর দায়িত্ব তাদেরকেও দেয়া যেতে পারে।
উপরন্তু জেলা শিক্ষা অফিসার এবং মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার ও একাডেমিক সুপারভাইজারগণতো রয়েছেন। এমনকি একবারেই কেউ যদি মনিটরিং-এর দায়িত্বে নাও থাকেন তথাপি খুব একটা সমস্যা হবেনা। হয়তো কোন কোন প্রতিষ্ঠানে অর্থ কেলেংকারী ঘটতে পারে কিন্তু সেটা কখনই ব্যাপক আকার ধারণ করতে পারবেনা। আমি মনে করি প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে এখনো যথেষ্ট সৎ ও নীতিবান শিক্ষক রয়েছেন। তাদের মাঝে দু-একজন অসৎ শিক্ষক হালে পানি পাবেন না। তাছাড়া গ্রাম-গঞ্জের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে আয় নেই, চক-ডাস্টার এখনো শিক্ষকদের টাকায় কিনতে হয়। যে সব প্রতিষ্ঠানে অর্থের প্রাচুর্য আছে সে সব প্রতিষ্ঠানে উপরোক্ত কর্তৃপক্ষগণ মনিটরিং করলে অর্থনৈতিক ঘাপলা সৃষ্টি হওয়ার সুযোগ থাকবে না। বাৎসরিক ভিত্তিতে একবার আয়-ব্যয় খতিয়ে দেখার ব্যবস্থা থাকলেই যথেষ্ট। বাকী থাকছে শিক্ষা বিষয়ক নির্দেশনা প্রদানের বিষয়টি। এর জন্য তো কমিটির কোন প্রয়োজন নেই, শিক্ষক এবং উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষই যথেষ্ট।
পরিশেষে, আমার এ লেখাটি সম্মানিত পরিচালনা পর্ষদকে আঘাত করার জন্য নয় বরং দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়নকল্পে একটি প্রস্তাবনা। একটি দেশের উন্নয়নের অন্যতম প্রধান শর্ত হচ্ছে শিক্ষা আর সে শিক্ষাক্ষেত্র যদি ইতিবাচক না হয় তাহলে কখনই আমরা কাংখিত লক্ষে পৌঁছতে পারবোনা। আশা করি মাননীয় প্রধান মন্ত্রী, মাননীয় শিক্ষা মন্ত্রীসহ শিক্ষা ক্ষেত্রে নিয়োজিত কর্তৃপক্ষ বিষয়টি নিয়ে ভাববেন।
লেখক-
অধ্যক্ষ
চিলাহাটি গার্লস্ স্কুল এন্ড কলেজ
নীলফামারী।
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
