।। এ এইচ এম সায়েদুজ্জামান।।
জাতি গঠনের কারিগর বলা হয় শিক্ষকদের। সভা-সেমিনার, জাতীয় দিবস কিংবা রাজনৈতিক ভাষণে শিক্ষক সমাজের গুরুত্ব নিয়ে উচ্চকণ্ঠ বক্তব্যের কমতি নেই। কিন্তু বাস্তবতা হলো—যখন একজন শিক্ষক-কর্মচারি তার সন্তানের ঈদের পোশাক কিনতে পারেন না, বাজারের বাকি শোধ করতে পারেন না, কিংবা মাসের শেষে ঘরের ভাড়া নিয়ে দুশ্চিন্তায় থাকেন, তখন রাষ্ট্রের সব বুলি নিষ্ঠুর উপহাসে পরিণত হয়।
চলতি বছরও ঈদের আগে বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীদের মে মাসের বেতন পরিশোধ না হওয়ায় লাখো পরিবার চরম অনিশ্চয়তা ও মানসিক যন্ত্রণার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। সরকারি চাকরিজীবী, ব্যাংকার, শ্রমিক—প্রায় সবাই বেতন-ভাতা পেয়েছেন। অথচ দেশের বিশাল শিক্ষা ব্যবস্থার একটি বড় অংশ বহনকারী বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীরা এখনও বেতনের অপেক্ষায়। প্রশ্ন উঠতেই পারে—এ কেমন রাষ্ট্রীয় বৈষম্য? এ কেমন ফাজলামি?
বাংলাদেশের মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের অধিকাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বেসরকারি হলেও শিক্ষাব্যবস্থার মূল ভার তারাই বহন করে। গ্রামের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে শহরের অলিগলি—প্রতিটি এলাকায় শিক্ষার আলো পৌঁছে দিচ্ছেন এসব শিক্ষক। অথচ বছরের পর বছর ধরে তারা বেতন বৈষম্য, আর্থিক অনিশ্চয়তা এবং প্রশাসনিক অবহেলার শিকার।
এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারি নামমাত্র বেতন পেলেও তা নির্ধারিত সময়ে হাতে পৌঁছায় না। আর নন-এমপিও শিক্ষকদের অবস্থা আরও ভয়াবহ। রাষ্ট্রের কাছে তারা যেন অদৃশ্য এক জনগোষ্ঠী।
ঈদ মুসলমানদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব। এই উৎসবকে কেন্দ্র করে প্রতিটি পরিবারে থাকে বাড়তি ব্যয়, সন্তানদের নতুন পোশাক, আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ, যাতায়াত খরচ, বাজার-সদাইসহ নানা আয়োজন।
একজন সাধারণ মানুষও চান ঈদের সময় পরিবারকে অন্তত কিছুটা আনন্দ দিতে। কিন্তু একজন শিক্ষক যখন মাসের বেতনই পান না, তখন তার জন্য ঈদ আনন্দ নয়, বরং অপমান আর হতাশার নাম হয়ে দাঁড়ায়। অনেক শিক্ষক বাধ্য হয়ে ধার-দেনা করেন, এনজিও থেকে ঋণ নেন, দোকানে বাকির খাতা বাড়ান। অথচ সেই শিক্ষকই প্রতিদিন শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের নৈতিকতা, আত্মমর্যাদা ও মানবিকতার পাঠ দেন।
সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো, এই সংকট যেন এখন স্বাভাবিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে। ঈদের আগে বেতন না পাওয়া বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীদের জন্য নতুন কিছু নয়। প্রায় প্রতিবছরই কোনো না কোনো অজুহাতে বেতন বিলম্বিত হয়। কখনও ফাইল আটকে থাকে, কখনও সার্ভার জটিলতা, কখনও প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার ধীরগতি। কিন্তু প্রশ্ন হলো—রাষ্ট্র কি জানে না যে ঈদ কবে? সরকার কি জানে না যে লাখো শিক্ষক পরিবার এই বেতনের উপর নির্ভরশীল? যদি জেনেও সময়মতো ব্যবস্থা না নেওয়া হয়, তাহলে এটিকে অবহেলা ছাড়া আর কী বলা যায়?
সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা সাধারণত উৎসবের আগেই পরিশোধ করা হয়। অনেক সময় অগ্রিম বোনাসও দেওয়া হয়। কিন্তু বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীদের ক্ষেত্রে দেখা যায় সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র। অথচ তারা রাষ্ট্রের শিক্ষানীতির বাস্তবায়নকারী। একই জাতীয় শিক্ষাক্রম পড়ান, একই বোর্ড পরীক্ষার দায়িত্ব পালন করেন, একইভাবে শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ গড়েন। তাহলে কেন এই বৈষম্য? কেন একজন সরকারি স্কুলের শিক্ষক সময়মতো বেতন পাবেন, আর এমপিওভুক্ত বেসরকারি শিক্ষক অনিশ্চয়তায় থাকবেন?
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—বেসরকারি শিক্ষকরা নামের দিক থেকে বেসরকারি হলেও বাস্তবে তারা রাষ্ট্রীয় শিক্ষাব্যবস্থার অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাদের বেতনের একটি বড় অংশ সরকার বহন করে। তারা সরকারের নীতিমালা মেনেই নিয়োগ পান, পাঠদান করেন এবং প্রশাসনিক কাঠামোর আওতায় থাকেন। তাহলে তাদের প্রতি এই অবজ্ঞা কেন? রাষ্ট্র কি শুধুই দায়িত্ব চাপিয়ে দেবে, কিন্তু মর্যাদা ও ন্যায্য অধিকার দেবে না?
এই পরিস্থিতি শুধু শিক্ষকদের ব্যক্তিগত দুর্ভোগ নয়; এটি গোটা শিক্ষাব্যবস্থার জন্য অশনিসংকেত। একজন শিক্ষক যখন অর্থকষ্টে জর্জরিত থাকেন, তখন তার মানসিক চাপ স্বাভাবিকভাবেই শ্রেণিকক্ষে প্রভাব ফেলে। হতাশা, ক্ষোভ ও নিরাপত্তাহীনতা একজন শিক্ষকের সৃজনশীলতা ও মনোযোগ কমিয়ে দেয়। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হয় শিক্ষার্থীরাও। একটি রাষ্ট্র যদি সত্যিই মানসম্মত শিক্ষা চায়, তাহলে শিক্ষকদের আর্থিক ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই হবে।
আরেকটি নির্মম বাস্তবতা হলো—শিক্ষকদের নিয়ে আমাদের সমাজে এক ধরনের ভণ্ডামি প্রচলিত রয়েছে। শিক্ষক দিবসে ফুল দেওয়া হয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আবেগঘন পোস্ট লেখা হয়, কিন্তু বাস্তব জীবনে তাদের ন্যায্য দাবিকে গুরুত্ব দেওয়া হয় না। একজন শিক্ষক অসুস্থ হলে চিকিৎসার টাকা জোগাড় করতে পারেন না, অবসরে গেলে বছরের পর বছর ঘুরতে হয় পাওনা টাকার জন্য। আবার ঈদের আগে বেতন না পেয়ে পরিবার নিয়ে চরম সংকটে পড়লেও তা নিয়ে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ দেখা যায় না। যেন শিক্ষক সমাজ কেবল বক্তৃতার অলংকার, বাস্তবের মানুষ নয়।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে—এই সমস্যার সমাধান কী? প্রথমত, বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন প্রদানের জন্য একটি নির্দিষ্ট ও স্বয়ংক্রিয় সময়সীমা নিশ্চিত করতে হবে। যেহেতু ঈদের তারিখ আগেই জানা থাকে, তাই উৎসবের অন্তত এক সপ্তাহ আগে বেতন-বোনাস পরিশোধ বাধ্যতামূলক করা উচিত।
দ্বিতীয়ত, এমপিও ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘসূত্রতা ও প্রশাসনিক জটিলতা কমাতে ডিজিটাল ও জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থা চালু করতে হবে।
তৃতীয়ত, শিক্ষক সমাজকে শুধুমাত্র “জাতি গড়ার কারিগর” বলে আবেগ দেখানো নয়, বাস্তব মর্যাদা ও আর্থিক নিরাপত্তা দিতে হবে।
শিক্ষকদের প্রতি অবহেলা আসলে জাতির ভবিষ্যতের প্রতি অবহেলা। কারণ একজন হতাশ শিক্ষক কখনও একটি আত্মবিশ্বাসী জাতি গড়ে তুলতে পারেন না। রাষ্ট্র যদি সত্যিই উন্নত বাংলাদেশ গড়তে চায়, তাহলে শিক্ষকদের সম্মান ও নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। উন্নয়ন শুধু মেগাপ্রকল্প, উড়ালসেতু কিংবা জিডিপির প্রবৃদ্ধি দিয়ে মাপা যায় না; উন্নয়ন তখনই অর্থবহ হয়, যখন একজন শিক্ষক ঈদের আগে পরিবারের মুখে হাসি ফোটাতে পারেন।
আজ দেশের লাখো বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীর মনে একটাই প্রশ্ন—তাদের অপরাধ কী? কেন প্রতিবার ঈদের আগে তাদেরই বেতনের জন্য অপেক্ষা করতে হবে? কেন তাদের পরিবারকে অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাতে হবে? রাষ্ট্রের কাছে এই প্রশ্নের জবাব আছে কি?
একটি সভ্য রাষ্ট্র কখনও তার শিক্ষক সমাজকে অপমানিত হতে দেয় না। কারণ শিক্ষকরা কেবল কর্মচারী নন; তারা জাতির বিবেক নির্মাতা। অথচ আমাদের দেশে বারবার দেখা যায়, সবচেয়ে অবহেলিত শ্রেণির একটি হয়ে উঠেছেন শিক্ষকরা। এই অবস্থা চলতে থাকলে ভবিষ্যতে মেধাবীরা শিক্ষকতা পেশায় আসতে নিরুৎসাহিত হবে। তখন ক্ষতিগ্রস্ত হবে পুরো জাতি।
ঈদের আগে বেতন না পাওয়া শুধু একটি প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়; এটি রাষ্ট্রের মানবিক ব্যর্থতা, নৈতিক ব্যর্থতা। যারা প্রতিদিন নতুন প্রজন্মকে স্বপ্ন দেখতে শেখান, তাদের নিজেদের স্বপ্ন যদি বারবার ভেঙে যায়, তাহলে সেই সমাজ কখনও সত্যিকার অর্থে আলোকিত হতে পারে না। তাই এখনই সময় বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীদের প্রতি এই বৈষম্যমূলক আচরণের অবসান ঘটানোর। নয়তো “শিক্ষক সম্মান” কেবল কাগজের বুলি হয়েই থেকে যাবে, আর বাস্তবে শিক্ষক সমাজ বঞ্চনার অন্ধকারেই হারিয়ে যাবে।
লেখক: শিক্ষক ও গবেষক।
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল

