রাশেদা কে চৌধুরী।।
আজ (২৪ জানুয়ারি ২০২৬) আন্তর্জাতিক শিক্ষা দিবস। দিনটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, শিক্ষা শুধু পাঠ্যবই বা পরীক্ষার ফল নয়- শিক্ষা মানে পূর্ণ বিকাশের সুযোগ। কিন্তু প্রশ্ন হলো, যে পরিবেশে আমাদের তরুণরা শিখছে, সেই পরিবেশ কি সত্যিই শিক্ষার উপযোগী? যেখানে স্কুলের গেটের পাশেই সিগারেট বিক্রি হয়, যেখানে ধূমপানের দৃশ্য তরুণদের কাছে স্বাভাবিক হয়ে ওঠে, সেখানে শিক্ষা কি নিরাপদ থাকতে পারে? বাংলাদেশের সাম্প্রতিক বাস্তবতা এই প্রশ্নকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) একটি গবেষণায় দেখা গেছে, দেশের চারটি বিভাগে ১২১টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আশপাশে ১০০ মিটারের মধ্যে রয়েছে মোট ৬৬৬টি তামাকজাত দ্রব্য বিক্রির দোকান- অর্থাৎ গড়ে প্রতি প্রতিষ্ঠানের চারপাশে পাঁচটিরও বেশি দোকান। তরুণদের শেখার পরিবেশ যে বাস্তবে তামাকমুক্ত নয়, এই ঘন উপস্থিতি তারই জাজ্বল্যমান প্রমাণ।
পিপিআরসির মাঠপর্যায়ের পর্যবেক্ষণ আরও জানায়, প্রায় ৯৯ শতাংশ দোকানেই একক শলাকা সিগারেট বিক্রি হচ্ছে এবং ৮৪ শতাংশের বেশি দোকানে পাওয়া যাচ্ছে ফ্লেভারযুক্ত সিগারেট, যা তরুণদের কাছে সহজলভ্য ও আকর্ষণীয়। একই সঙ্গে প্রায় ৮৮ শতাংশ দোকানে তরুণদের চোখের সমান উচ্চতায় সিগারেট প্রদর্শিত হচ্ছে, অনেক ক্ষেত্রে মিষ্টি বা খেলনার পাশেই। এসব প্রদর্শন ও বিক্রয় কৌশল তামাককে তরুণদের কাছে স্বাভাবিক করে তোলে, যা শেখার সুস্থ পরিবেশের সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক।
বাংলাদেশের বাস্তবতায় এই প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। গ্লোবাল ইয়ুথ টোব্যাকো সার্ভে (২০১৩) দেখায়, ১৩-১৫ বছর বয়সী শিক্ষার্থীদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ কৈশোরেই তামাকপণ্যের সংস্পর্শে আসে। অনেক ক্ষেত্রে প্রথম সিগারেট পাওয়া যায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আশপাশের দোকান থেকে। একই জরিপে দেখা গেছে, এই বয়সী ধূমপায়ীদের বড় অংশ একক শলাকা সিগারেট কিনেছে। দাম কম, সহজলভ্যতা বেশি এবং প্যাকেটের স্বাস্থ্য সতর্কবার্তা এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ থাকায় একক শলাকা সিগারেট স্কুলপড়ুয়া কিশোরদের জন্য বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ। এসব তথ্য ইঙ্গিত দেয়, স্কুলের আশপাশের পরিবেশ কেবল শেখার জায়গা নয়, বাস্তবে দেখা যায়, এখান থেকেই অনেক শিক্ষার্থীর ধূমপানের মতো ক্ষতিকর অভ্যাসে জড়ানোর পথ শুরু হয়।
গবেষণা বলছে, কৈশোরে নিকোটিনের সংস্পর্শে এলে আসক্তি দ্রুত ও গভীরভাবে গড়ে ওঠে এবং পরবর্তী জীবনে তা ত্যাগ করা কঠিন হয়ে পড়ে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, যারা অল্প বয়সে ধূমপান শুরু করে, তাদের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি আসক্ত হয়ে পড়ার ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। ফলে কৈশোরে শুরু হওয়া সিগারেট ব্যবহার অনেক ক্ষেত্রেই আজীবন অভ্যাসে পরিণত হয়, যা তামাকশিল্পের জন্য স্থায়ী ভোক্তা তৈরি করে। এই বাস্তবতা জনস্বাস্থ্যের জন্য যেমন উদ্বেগজনক, তেমনি শিক্ষার জন্যও একটি দীর্ঘমেয়াদি হুমকি।
বাংলাদেশে পরিচালিত একটি কমিউনিটি জরিপে দেখা গেছে, কিশোর ছেলেদের মধ্যে ধূমপানের হার প্রায় ২৫ শতাংশ। একই গবেষণায় আরও দেখা যায়, যাদের বন্ধু ধূমপায়ী, তাদের ধূমপানে জড়ানোর ঝুঁকি ছয় গুণের বেশি এবং পরিবারে ধূমপায়ী থাকলে ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়। সহজভাবে বললে, ধূমপান অনেক সময় একা একা শুরু হয় না; আশপাশের মানুষ ও পরিবেশের প্রভাব এতে বড় ভূমিকা রাখে। স্কুলের পরিবেশ, সহপাঠীদের আচরণ এবং আশপাশের সামাজিক স্বাভাবিকীকরণ অনেক সময় শিক্ষার্থীদের ধূমপানের দিকে ঠেলে দেয়।
শিক্ষার্থীদের ক্ষতি এখানেই শেষ নয়। যারা নিজেরা ধূমপান করে না, তারাও মারাত্মক ঝুঁকিতে থাকে পরোক্ষ ধূমপানের প্রভাবে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা স্পষ্টভাবে বলেছে, পরোক্ষ ধূমপানের ধোঁয়ার কোনো নিরাপদ মাত্রা নেই। বাংলাদেশে গ্লোবাল অ্যাডাল্ট টোব্যাকো সার্ভে (২০১৭) থেকে জানা যায়, বিপুলসংখ্যক কিশোর-কিশোরী ঘর ও পাবলিক প্লেসে নিয়মিত পরোক্ষ ধূমপানের শিকার। এই ধোঁয়া তাদের শ্বাসতন্ত্রকে ক্ষতিগ্রস্ত করে, হাঁপানি ও সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ায় এবং দীর্ঘ মেয়াদে মস্তিষ্কের বিকাশ ও মনোযোগের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। অসুস্থতা বাড়লে স্কুলে উপস্থিতি কমে যায়, পড়াশোনার ধারাবাহিকতা ভেঙে পড়ে এবং শেখার গতি ধীর হয়ে যায়, যা শিক্ষার মানে সরাসরি প্রভাব ফেলে। তদুপরি বাড়িতে বা আশপাশে যদি কোনো সন্তানসম্ভবা বা প্রসূতি নারী থাকেন, তাহলে পরোক্ষ ধূমপান তাদের ভয়ানক ক্ষতি করতে পারে।
এই স্বাস্থ্যঝুঁকির প্রভাব শেষ পর্যন্ত জাতীয় উন্নয়নেও এসে পড়ে। গবেষণা অনুযায়ী, তামাকজনিত রোগ ও অকালমৃত্যুর কারণে বাংলাদেশে প্রতিবছর প্রায় ৩০৫ বিলিয়ন টাকার সমপরিমাণ অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়, যা জিডিপির প্রায় ১.৪ শতাংশ। এই ক্ষতির বড় অংশ আসে উৎপাদনশীলতা হ্রাস ও চিকিৎসা ব্যয় থেকে- যার বোঝা শেষ পর্যন্ত পরিবার ও রাষ্ট্রকেই বহন করতে হয়। যে অর্থ শিক্ষা, পুষ্টি ও মানবসম্পদ উন্নয়নে ব্যয় হওয়ার কথা, তা ব্যয় হয় একটি ক্ষতিকর পণ্যের কারণে সৃষ্ট ক্ষতি সামলাতে। ফলে তামাক কেবল স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর চাপ সৃষ্টি করে না; এটি শিক্ষা ও স্বাস্থ্যে রাষ্ট্রের বিনিয়োগের সক্ষমতাকেও সংকুচিত করে।
এই বাস্তবতায় শিক্ষার অধিকার মানে শুধু স্কুলে ভর্তি নিশ্চিত করা নয়; শিক্ষার অধিকার মানে একটি ধোঁয়ামুক্ত, নিরাপদ শেখার পরিবেশ নিশ্চিত করা। এই বাস্তবতা অনুধাবন করেই সাম্প্রতিক সময়ে বর্তমান সরকার ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫ জারি করেছে। এতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ১০০ মিটারের মধ্যে তামাকজাত দ্রব্য বিক্রিতে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে, যা শিশু ও কিশোরদের সুরক্ষার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ ও সময়োপযোগী নীতিগত অগ্রগতি। জনস্বাস্থ্য ও শিশু অধিকার রক্ষায় এই উদ্যোগ আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশন অন টোব্যাকো কন্ট্রোলের (এফসিটিসি) সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ- এ জন্য অন্তর্বর্তী সরকারের এই উদ্যোগ স্বীকৃতি ও সাধুবাদ পাওয়ার যোগ্য।
তবে এটাও স্পষ্টভাবে বলা দরকার- অধ্যাদেশ পাস হওয়াই শেষ কথা নয়। পরবর্তী সরকার কর্তৃক এটিকে পূর্ণাঙ্গ আইনে রূপান্তর, মাঠপর্যায়ে কঠোর বাস্তবায়ন এবং নিয়মিত নজরদারিই আসল চ্যালেঞ্জ। আইন যদি কাগজে থাকে, আর বাস্তবে স্কুলের গেটের পাশেই সিগারেট বিক্রি চলতে থাকে, তাহলে শিক্ষার্থীদের সুরক্ষা কখনই নিশ্চিত হবে না।
আন্তর্জাতিক শিক্ষা দিবসে তাই আমাদের সামনে একটি নৈতিক প্রশ্ন দাঁড়িয়ে আছে। আমরা কি এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থা চাই, যেখানে শিক্ষার্থীদের হাতে বইয়ের পাশাপাশি সহজেই সিগারেট পৌঁছে যায়? নাকি আমরা সত্যিই চাই, স্কুল হোক শেখার জায়গা, সুস্থ মন-মানসিকতা অর্জনের বড় সোপান- আজীবন সিগারেট আসক্তির সূচনা নয়?
শিক্ষা তখনই অর্থবহ, যখন একজন শিক্ষার্থী নিরাপদে শ্বাস নিতে পারে, সুস্থভাবে শিখতে পারে এবং তার ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা সিগারেটের ধোঁয়ায় ঢাকা পড়ে না। তাই শিক্ষার্থীদের জন্য নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত শিক্ষা পরিবেশ গড়ে তুলতে তামাক নিয়ন্ত্রণ একটি মৌলিক পূর্বশর্ত। এটি নিশ্চিত করা শুধু সরকারের নয়, পরিবার, সমাজসহ রাষ্ট্রের সব অংশের দায়িত্ব।
রাশেদা কে চৌধুরী : শিক্ষাবিদ ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
