।। এ এইচ এম সায়েদুজ্জামান।।
একটা সময় বেসরকারি শিক্ষকরা শিক্ষামন্ত্রীর প্রতিটা কথাকেই বুকের ভেতর যত্ন কইরা রাখতেন।
মন্ত্রী যখন মঞ্চে দাঁড়াইয়া বলতেন, “এইবার ঈদে শিক্ষকরা ১০% বাড়তি বোনাস পাবেন”—তখন অনেক শিক্ষক ঠিক সেই প্রেমে পড়া মানুষের মতো বিশ্বাস করছিলেন। কেউ বাজারের খাতায় আগাম হিসাব কইরা ফেলছিলেন, কেউ ভাবছিলেন বাচ্চার জন্য একটা ভালো জামা কিনবেন, কেউ আবার বৃদ্ধ মায়ের হাতে ঈদের সকালে কিছু বাড়তি টাকা দিবেন।
এক শিক্ষক তো নাকি স্ত্রীর কাছে গর্ব কইরা কইছিলেন, “দেইখো, সরকার এবার আমাদের কষ্ট বুঝতে শুরু করছে!”
স্ত্রীও খুশি হইয়া পুরান শাড়িটার দিকে তাকাইয়া বলছিলেন, “তাহলে এই ঈদে একটা নতুন শাড়ি হইবো নাকি?”
শিক্ষক সাহেব তখন প্রেমিকের মতো আশ্বাস দিছিলেন—
“হইবো… অবশ্যই হইবো… মন্ত্রীর কথা!”
তারপর ঈদের আগে বেতন-বোনাসের কাগজ আইলো।
শিক্ষক সাহেব কাঁপা হাতে হিসাব মিলাইলেন।
একবার ক্যালকুলেটর চাপলেন।
দুইবার চাপলেন।
পরে পাশের গণিতের স্যাররে ডাক দিলেন।
শেষে দেখা গেল—যেই ৫০% আছিল, সেই ৫০%ই আছে!
বাড়তি ১০% তো দূরের কথা, কাগজে তার ছায়াও নাই!
স্ত্রী তখন মুচকি হাইসা কইল,
“তুমি না কইছিলা মন্ত্রীর কথা?”
স্যার দীর্ঘশ্বাস ফাইলা বললেন,
“হ, বুঝছি… এই দেশে প্রেমিকার আশ্বাস আর মন্ত্রীর ঘোষণা—দুইটাই বেশি বিশ্বাস করা ঠিক না!”
আজ দেশের হাজার হাজার বেসরকারি শিক্ষকের অবস্থা ঠিক এই প্রতারিত প্রেমিকের মতো।
তাদের স্বপ্ন দেখানো হয়েছে, আশ্বাস দেওয়া হয়েছে, আবেগ তৈরি করা হয়েছে—কিন্তু বাস্তবে কিছুই মেলেনি।
যে শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের নৈতিকতা শেখান, সত্যবাদিতা শেখান, প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে শেখান—আজ তারাই রাষ্ট্রের কাছ থেকে শিখছেন, ঘোষণা সবসময় বাস্তব হয় না।
এটা শুধু ১০% বোনাসের প্রশ্ন না; এটা বিশ্বাস ভাঙার গল্প।
এটা সেই শিক্ষকদের গল্প, যাদের আবেগ নিয়ে বারবার রাজনীতি হয়, কিন্তু প্রাপ্যের বেলায় ফাইল ঘুমায়।
শিক্ষামন্ত্রী বিভিন্ন সভা-সেমিনারে স্পষ্ট ভাষায় বললেন—এই ঈদে বেসরকারি শিক্ষকরা অতিরিক্ত ১০% বোনাস পাবেন। দীর্ঘদিনের বঞ্চনার ইতিহাসে এমন ঘোষণা স্বাভাবিকভাবেই আশার আলো জ্বালিয়েছিল। শিক্ষক সমাজ ভেবেছিল, অবশেষে হয়তো রাষ্ট্র তাদের দুঃখ-কষ্ট কিছুটা বুঝতে শুরু করেছে। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল, সেই পুরনো ৫০ শতাংশ বোনাসই বহাল আছে। কোথাও অতিরিক্ত ১০ শতাংশের প্রতিফলন নেই।
তাহলে প্রশ্ন হলো—এই ঘোষণা কেন দেওয়া হয়েছিল? করতালি পাওয়ার জন্য?
শিক্ষকদের সাময়িকভাবে খুশি রাখার জন্য?
নাকি এটা ছিল নিছক প্রশাসনিক অবহেলা?
বিষয়টি শুধু টাকার নয়; এটি সম্মান, বিশ্বাস এবং রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতার প্রশ্ন।
বাংলাদেশের বেসরকারি শিক্ষকরা বহু বছর ধরেই বৈষম্যের শিকার। সরকারি শিক্ষকদের তুলনায় তাদের সুযোগ-সুবিধা কম, আর্থিক নিরাপত্তা কম, সামাজিক মর্যাদাও অনেক ক্ষেত্রে কমে গেছে। অথচ দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার বিশাল একটি অংশ টিকিয়ে রেখেছেন এই বেসরকারি শিক্ষকরা। শহর থেকে গ্রাম—প্রতিটি অঞ্চলে হাজার হাজার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তাদের শ্রমে সচল।
একজন শিক্ষক মাসের পর মাস অল্প বেতনে সংসার চালান। সন্তানদের পড়ান, পরিবারের চিকিৎসা করান, সামাজিক দায়বদ্ধতা পালন করেন। ঈদ আসে তাদের জীবনেও। তারাও চান সন্তানের জন্য নতুন জামা কিনতে, বৃদ্ধ মায়ের হাতে কিছু টাকা দিতে, পরিবারের মুখে একটু হাসি ফুটাতে। তাই যখন সরকার বা মন্ত্রণালয় থেকে বাড়তি বোনাসের ঘোষণা আসে, সেটি তাদের কাছে কেবল অর্থনৈতিক খবর নয়; এটি এক ধরনের মানসিক স্বস্তি।
কিন্তু যখন সেই ঘোষণা বাস্তবায়িত হয় না, তখন ক্ষোভের চেয়েও বড় হয়ে দাঁড়ায় হতাশা। কারণ একজন শিক্ষক তার শিক্ষার্থীদের প্রতিদিন শেখান—“কথা দিলে কথা রাখতে হয়।” অথচ রাষ্ট্রই যদি নিজের ঘোষণার বাস্তবায়ন না করে, তাহলে শিক্ষকের সামনে কী উদাহরণ দাঁড়ায়?
এখানে সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, কোনো পরিষ্কার ব্যাখ্যাও নেই। যদি অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন না থাকে, তবে আগে কেন ঘোষণা দেওয়া হলো? যদি প্রশাসনিক জটিলতা থাকে, তাহলে শিক্ষক সমাজকে স্পষ্টভাবে জানানো হলো না কেন? রাষ্ট্র পরিচালনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা না থাকলে মানুষের আস্থা কমে যায়।
আমাদের দেশে শিক্ষকদের নিয়ে আবেগঘন বক্তৃতা দেওয়া খুব সহজ। শিক্ষককে “জাতি গড়ার কারিগর” বলা হয়, ফুল দেওয়া হয়, দিবস পালন করা হয়। কিন্তু বাস্তবতার আয়নায় দেখা যায় ভিন্ন ছবি। একজন বেসরকারি শিক্ষককে তার ন্যায্য দাবি আদায়ের জন্য আন্দোলন করতে হয়, রাস্তায় দাঁড়াতে হয়, মানববন্ধন করতে হয়। কখনো কখনো পুলিশি বাধার মুখেও পড়তে হয়।
এ যেন এক অদ্ভুত রাষ্ট্রীয় সংস্কৃতি—মঞ্চে সম্মান, বাস্তবে বঞ্চনা। বেসরকারি শিক্ষকদের বোনাস ইস্যুটি তাই একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এটি পুরো ব্যবস্থার প্রতিচ্ছবি। দীর্ঘদিন ধরে এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা নানা বৈষম্যের অভিযোগ করে আসছেন। পূর্ণাঙ্গ উৎসব ভাতা নেই, চিকিৎসা সুবিধা সীমিত, অবসর সুবিধা জটিল, পদোন্নতির সুযোগ সংকুচিত। অনেক শিক্ষক জীবনের শেষ বয়সেও আর্থিক অনিশ্চয়তায় ভোগেন।
তারপরও তারা ক্লাস নেন।
পরীক্ষার খাতা দেখেন।
শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ গড়ে দেন।
কারণ শিক্ষকতা তাদের কাছে শুধু চাকরি নয়, দায়িত্বও।
কিন্তু রাষ্ট্র যদি বারবার সেই দায়িত্ববোধের সুযোগ নেয়, তাহলে একসময় হতাশা পুরো শিক্ষা ব্যবস্থাকে গ্রাস করবে। একজন হতাশ শিক্ষক কখনোই শতভাগ মনোযোগ দিয়ে শিক্ষার্থীদের গড়ে তুলতে পারেন না। শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়ন শুধু নতুন কারিকুলাম বা দৃষ্টিনন্দন ভবন নির্মাণে হয় না; শিক্ষকের মর্যাদা ও আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
এই ঘটনায় আরেকটি বিষয় পরিষ্কার হয়েছে—নীতিনির্ধারকদের অনেকেই হয়তো শিক্ষকদের মনস্তত্ত্ব বোঝেন না। একজন শিক্ষক খুব বেশি কিছু চান না। তিনি চান সম্মান, ন্যায্যতা এবং প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন। তিনি চান না মিথ্যা আশ্বাস। কারণ মিথ্যা আশ্বাস ক্ষুধার থেকেও কষ্টদায়ক।
যখন কোনো মন্ত্রী প্রকাশ্যে ঘোষণা দেন, তখন সেটি সাধারণ মানুষের কাছে সরকারি প্রতিশ্রুতি হিসেবেই বিবেচিত হয়। পরে যদি সেটি বাস্তবায়িত না হয়, তাহলে শুধু একজন মন্ত্রীর বিশ্বাসযোগ্যতাই প্রশ্নবিদ্ধ হয় না; পুরো সরকারের প্রতিশ্রুতির ওপরও মানুষের আস্থা কমে যায়।
সবচেয়ে কষ্টের বিষয় হলো, এই হতাশা এখন শিক্ষকদের মধ্যে এক ধরনের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। ঘোষণা শুনলে তারা আর পুরোপুরি বিশ্বাস করতে পারেন না। কারণ তারা জানেন—ঘোষণা আর বাস্তবতা এক জিনিস নয়। এটি কোনো সুস্থ রাষ্ট্রের লক্ষণ হতে পারে না।
আমরা এমন এক সমাজ গড়ে তুলছি, যেখানে শিক্ষককে সম্মান জানানো হয় ভাষণে, কিন্তু তার ন্যায্য প্রাপ্য নিশ্চিত করা হয় না বাস্তবে। এতে নতুন প্রজন্মের মেধাবীরা শিক্ষকতা পেশায় আসতে নিরুৎসাহিত হবে। ইতোমধ্যে অনেক যোগ্য তরুণ শিক্ষকতা ছেড়ে অন্য পেশায় ঝুঁকছেন। কারণ তারা দেখছেন, এই পেশায় সম্মানের চেয়ে অনিশ্চয়তা বেশি।
সরকার যদি সত্যিই শিক্ষার মান উন্নয়ন করতে চায়, তাহলে প্রথমেই শিক্ষকদের সঙ্গে এই ধরনের “প্রহসনমূলক” আচরণ বন্ধ করতে হবে। ঘোষণা দেওয়ার আগে বাস্তবতা যাচাই করতে হবে। আর যদি কোনো কারণে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন সম্ভব না হয়, তাহলে শিক্ষক সমাজের কাছে খোলাখুলি ব্যাখ্যা দিতে হবে।
কারণ শিক্ষকরা ভিক্ষা চান না; তারা প্রাপ্য সম্মান চান। ঈদের আগে ১০% বাড়তি বোনাস হয়তো রাষ্ট্রের জন্য বিশাল কোনো অর্থনৈতিক চাপ ছিল না। কিন্তু সেটি বাস্তবায়ন করলে হাজার হাজার শিক্ষক পরিবারের মুখে হাসি ফুটত। বিপরীতে এখন যা হয়েছে, তা শিক্ষকদের মনে এক ধরনের অপমানবোধ সৃষ্টি করেছে। তারা মনে করছেন, তাদের আবেগ নিয়ে খেলা করা হয়েছে।
রাষ্ট্রের উচিত দ্রুত এই বিষয়ে স্পষ্ট অবস্থান নেওয়া। যদি সত্যিই ১০% বাড়তি বোনাস দেওয়ার সিদ্ধান্ত থেকে থাকে, তাহলে তা দ্রুত কার্যকর করতে হবে। আর যদি সিদ্ধান্ত পরিবর্তন হয়ে থাকে, তাহলে সেটির কারণ আনুষ্ঠানিকভাবে জানাতে হবে। নীরবতা এখানে সমস্যাকে আরও বড় করছে।
কারণ একটি জাতির ভবিষ্যৎ যাদের হাতে, তাদের সঙ্গে প্রতারণা করে কোনো জাতি দীর্ঘমেয়াদে এগোতে পারে না।
শেষমেশ সেই শিক্ষক সাহেব ঈদের দিন সকালে পুরান পাঞ্জাবিটাই পরে চুপচাপ বারান্দায় বসে ছিলেন।
মোবাইলে তখনও শিক্ষামন্ত্রীর পুরান বক্তৃতার ভিডিও ঘুরতেছিল—
“বেসরকারি শিক্ষকরা এবার ১০% বাড়তি বোনাস পাবেন…”
স্যার ভিডিওটা বন্ধ কইরা মুচকি হাইসা বললেন,
“ভালোবাসার মতোই এই বোনাসও শুধু কথাতেই সুন্দর আছিল!”
পাশে দাঁড়ানো ছোট ছেলে জিজ্ঞেস করল,
“আব্বু, তোমরা শিক্ষক মানুষ, তোমাদের সাথে কেউ মিথ্যা কথা কয় কেমনে?”
স্যার কিছুক্ষণ চুপ থাকলেন।
পরে আকাশের দিকে তাকাইয়া ধীরে ধীরে বললেন,
“বাবা, এই দেশে শিক্ষকরা এখন বইয়ে সম্মান পায়, বক্তৃতায় মর্যাদা পায়… কিন্তু বাস্তবে পায় শুধু আশ্বাস।”
হয়তো এ কারণেই আজ বেসরকারি শিক্ষকরা টাকার চেয়ে বেশি কষ্ট পান ভাঙা প্রতিশ্রুতিতে।
কারণ অভাব মানুষ সহ্য করতে পারে, কিন্তু অপমান আর প্রতারণা সহজে ভুলতে পারে না।
রাষ্ট্রের মনে রাখা উচিত—
যে জাতি শিক্ষকদের স্বপ্ন নিয়ে তামাশা করে, একদিন সেই জাতির ভবিষ্যৎও নীরবে তার ওপর অভিমান করে বসে থাকে।
লেখক: শিক্ষক ও গবেষক।
শিক্ষাবার্তা /এ/ ১৪/০৫/২০২৬
দেশ বিদেশের শিক্ষা, পড়ালেখা, ক্যারিয়ার সম্পর্কিত সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম, ছবি, ভিডিও প্রতিবেদন সবার আগে দেখতে চোখ রাখুন শিক্ষাবার্তায়।
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
