এইমাত্র পাওয়া

পে কমিশনে শিক্ষকদের আলাদা বেতন কাঠামো কেন নয়

নতুন পে কমিশন ২০২৬-এর প্রতিবেদন ২১ জানুয়ারি প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে জমা দেওয়া হয়েছে। তাতে স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের জন্য আলাদা বেতন স্কেল রাখার প্রস্তাব নেই বলে জানা যাচ্ছে। অর্থাৎ জ্ঞান তৈরির কারখানা আর প্রশাসন সামলানোর দপ্তর–দুটোকেই একই মাপের পাল্লায় ওজন করা হচ্ছে।

যে শিক্ষক গবেষণা করে নতুন বীজ উদ্ভাবন করেন, জলবায়ু পরিবর্তনের সমাধান খোঁজেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে কাজ করেন–তার মূল্যায়ন কি সাধারণ প্রশাসনিক কাঠামোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে? উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর অভিজ্ঞতা বলে, উচ্চশিক্ষা ও গবেষণা ছাড়া কোনো দেশ দীর্ঘ মেয়াদে টিকে থাকতে পারে না। শিক্ষা শুধু ডিগ্রি দেওয়ার কারখানা নয়; এটি নতুন চিন্তা, প্রযুক্তি, নীতি ও উদ্ভাবনের জন্মভূমি। তাই অনেক দেশ শিক্ষা খাতকে আলাদা মর্যাদা দেয়, বিশেষ বেতন কাঠামো দেয়, যাতে মেধাবীরা শিক্ষকতা ও গবেষণায় আসতে উৎসাহ পায়।

উন্নয়নশীল দেশগুলোর অভিজ্ঞতা বলে, শিক্ষা ও গবেষণাকে আলাদা গুরুত্ব না দিলে জাতির ভবিষ্যৎ ঝুঁকিতে পড়ে। ভারত বহু আগেই বিষয়টি বুঝেছে। সেখানে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) আলাদা পে-স্কেল নির্ধারণ করে, যেখানে অধ্যাপক, সহযোগী অধ্যাপক ও গবেষকদের বেতন সাধারণ প্রশাসনিক ক্যাডারের চেয়ে আলাদা কাঠামোয় নির্ধারিত হয়। এর উদ্দেশ্য একটাই–মেধাবীরা যেন শিক্ষকতা ও গবেষণায় আসতে আগ্রহী হয়, বিদেশে পাড়ি না জমায়। নেপালেও বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ শিক্ষকদের জন্য স্বতন্ত্র বেতন কাঠামো আছে, যা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে বিশেষ স্কেলে নির্ধারিত হয়, কারণ তারা শিক্ষা ও গবেষণাকে দীর্ঘমেয়াদি মানবসম্পদ বিনিয়োগ হিসেবে দেখে। শ্রীলঙ্কায়ও একই চিত্র–সেখানে ইউনিভার্সিটি টিচার্স সার্ভিস একটি পৃথক সার্ভিস ক্যাডার, আলাদা বেতন গ্রেড ও পদোন্নতি কাঠামোসহ যাতে গবেষণা ও উচ্চশিক্ষার মান ধরে রাখা যায়।

চীনের কথাই ধরা যাক। কয়েক দশক আগেও তারা ছিল উন্নয়নশীল দেশের কাতারে। কিন্তু তারা দ্রুত বুঝেছিল–বিশ্বে নেতৃত্ব দিতে হলে আগে বিশ্ববিদ্যালয় আর গবেষণাগার শক্ত করতে হবে। তাই তারা শিক্ষকদের উচ্চবেতন, গবেষণায় বিপুল অর্থ, আধুনিক ল্যাব, আন্তর্জাতিক মানের সুযোগ-সুবিধা দিয়েছে। ফলাফল আজ চোখে দেখা: চীনের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বিশ্ব র‍্যাংকিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, মহাকাশ প্রযুক্তি, বায়োটেকনোলজিতে তারা নেতৃত্বের আসনে। তারা প্রকাশ্যেই বলেছে–শিক্ষা ও গবেষণা ছাড়া বিশ্বে প্রভাব বিস্তার অসম্ভব।

বাংলাদেশের বাস্তবতায় শিক্ষকরা এখনও সাধারণ গ্রেডভিত্তিক কাঠামোর ভেতরে বন্দি। পে কমিশন বলছে, আলাদা স্কেল দেওয়া তাদের আইনি এখতিয়ারের বাইরে। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়–জাতির ভবিষ্যৎ গড়ার দায়িত্ব যাদের হাতে, তাদের জন্য আলাদা করে ভাববে কে? শিক্ষক সংগঠনগুলো বহুদিন ধরেই বলছে, বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণামুখী শিক্ষকদের জন্য আন্তর্জাতিক মানের বেতন কাঠামো না হলে মেধা ধরে রাখা যাবে না, গবেষণার গুণগত মান বাড়বে না।

বাংলাদেশের বাস্তবতায় আরেকটি বিষয়ও সৎভাবে স্বীকার করা দরকার–সব বিশ্ববিদ্যালয় বা সব শিক্ষকের গবেষণা ও একাডেমিক আউটপুট সমান নয়। কেউ আন্তর্জাতিক মানের জার্নালে নিয়মিত কাজ করেন, নতুন জ্ঞান সৃষ্টি করেন; আবার কেউ মূলত রুটিন ক্লাসেই সীমাবদ্ধ থাকেন। কিন্তু এই বৈচিত্র্য কোনো অজুহাত হতে পারে না আলাদা বেতন কাঠামো না দেওয়ার। বরং এটিই সরকারের জন্য একটি বড় সুযোগ। সরকার যদি আলাদা বেতন স্কেলের সঙ্গে সঙ্গে আধুনিক গবেষণাগার, তহবিল, প্রশিক্ষণ, আন্তর্জাতিক সম্মেলনে অংশগ্রহণের সুযোগ, পোস্টডক ও ভিজিটিং প্রফেসরশিপের মতো সুবিধা নিশ্চিত করে, তাহলে একই সঙ্গে একটি শক্তিশালী মূল্যায়ন ব্যবস্থাও চালু করতে পারে। যাদের গবেষণা ও পাঠদানের মান ভালো, তারা পুরস্কৃত হবেন; আর যাদের পারফরম্যান্স ধারাবাহিকভাবে দুর্বল, তাদের উন্নয়নের জন্য প্রশিক্ষণ, পুনর্মূল্যায়ন করা হবে। অর্থাৎ আলাদা বেতন মানেই অন্ধ সুবিধা নয়, বরং পারফরম্যান্সভিত্তিক জবাবদিহি।

এখানেই আসে আরেকটি সংবেদনশীল কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়–বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের মূল পরিচয় হওয়া উচিত গবেষক ও শিক্ষক হিসেবে, রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে নয়। উন্নত ও অনেক উন্নয়নশীল দেশেই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা দলীয় রাজনীতির বাইরে থেকে একাডেমিক স্বাধীনতা ও বুদ্ধিবৃত্তিক নিরপেক্ষতা রক্ষা করেন, যাতে তাদের সময়, মেধা ও শক্তি মূলত গবেষণা, পাঠদান ও শিক্ষার্থী গঠনে ব্যয় হয়। বাংলাদেশে যদি আলাদা বেতন কাঠামো ও গবেষণার সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা হয়, তার সঙ্গে সঙ্গে একটি স্পষ্ট নীতি থাকা দরকার–বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকরা যেন দলীয় রাজনীতির সরাসরি সংঘাতে জড়িয়ে না পড়েন, বরং জ্ঞান সৃষ্টি ও জাতির বুদ্ধিবৃত্তিক নেতৃত্ব দেওয়াকেই তাদের প্রধান দায়িত্ব হিসেবে গ্রহণ করেন।

সরকার দেবে আলাদা মর্যাদা, আলাদা বেতন, উন্নত গবেষণা সুবিধা; বিনিময়ে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক দেবেন উন্নত গবেষণা, মানসম্মত শিক্ষা, আন্তর্জাতিক মানের প্রকাশনা ও নতুন প্রজন্ম গড়ার নেতৃত্ব। যদি কেউ এই প্রত্যাশা পূরণ না করেন, তাহলে স্বচ্ছ মূল্যায়ন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তাঁর দায়িত্ব ও ভূমিকা পুনর্বিবেচনা করা হবে। এভাবেই আলাদা বেতন কাঠামো হবে শুধু সম্মান নয়, বরং একটি পারফরম্যান্সভিত্তিক সামাজিক চুক্তি, যার লক্ষ্য একটাই–রাজনীতি নয়, পদ-পদবি নয়; বরং জ্ঞান, গবেষণা ও জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণ।

পে কমিশনের কাঠামোতে যদি শিক্ষা ও গবেষণাকে আলাদা গুরুত্ব না দেওয়া হয়, তাহলে প্রশাসন চলবে, ফাইল চলবে কিন্তু জ্ঞানভিত্তিক জাতি গড়ে উঠবে না। তাই আজকের দাবি শুধু বেতন বাড়ানোর নয়, দাবি হলো উচ্চশিক্ষা ও গবেষণাকে রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকারের কেন্দ্রে এনে আলাদা বেতন কাঠামোর মাধ্যমে সেই মর্যাদা স্বীকার করার। না হলে আগামী দিনের প্রতিযোগিতায় আমরা শুধু দর্শক হয়েই থেকে যাব।

ড. জিয়া আহমেদ: শিক্ষক, ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগ; শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.