এইমাত্র পাওয়া

শিক্ষা সংস্কারে তরুণদের অংশীদারিত্ব

প্রতিবছর আন্তর্জাতিক শিক্ষা দিবস আমাদের সামনে একটি সহজ কিন্তু গভীর প্রশ্ন তুলে ধরে–ভবিষ্যতের জন্য আমরা কেমন শিক্ষা চাই? ২০২৬ সালে ইউনেস্কো নির্ধারিত প্রতিপাদ্য ‘শিক্ষার সহনির্মাণে তরুণদের শক্তি’ এই প্রশ্নের সময়োপযোগী ও প্রয়োজনীয় উত্তর হাজির করেছে। জলবায়ু সংকট ও উদ্বেগ, গণতান্ত্রিক অবক্ষয়, প্রযুক্তিগত রূপান্তর এবং ক্রমবর্ধমান বৈষম্যের এই সময়ে তরুণদের এমন একটি শিক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে বলা–যা তাদের অংশগ্রহণ ছাড়াই তৈরি–দিন দিন অযৌক্তিক হয়ে উঠছে। বরং এবারের প্রতিপাদ্যটি একটি মৌলিক পরিবর্তনের স্বীকৃতি দেয়: তরুণরা আর কেবল শিক্ষার সুবিধাভোগী নয়, তারা শিক্ষার রূপকার।

এটি নিছক ভাষাগত পরিবর্তন নয়; বরং এটি স্বীকার করে যে আগের শতাব্দীর বাস্তবতায় গড়ে ওঠা শিক্ষা ব্যবস্থা আজকের নৈতিক, সামাজিক ও প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় তরুণদের অন্তর্দৃষ্টি, সৃজনশীলতা ও নেতৃত্ব ছাড়া কার্যকর হতে পারে না। শিক্ষা যদি প্রাসঙ্গিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও ভবিষ্যৎ উপযোগী হতে হয়, তবে তা অবশ্যই তরুণদের সঙ্গে মিলেই নির্মিত হতে হবে। কারণ তার বর্তমানের বাসিন্দা তারাই, আর ভবিষ্যতের দায়ও তাদের কাঁধে।

দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষানীতিতে তরুণদের দেখা হয়েছে জ্ঞান ও সংস্কারের নিষ্ক্রিয় গ্রহীতা হিসেবে। পাঠ্যক্রম তৈরি করেছেন বিশেষজ্ঞরা, তা বাস্তবায়ন করেছেন শিক্ষকরা, মূল্যায়ন করেছে প্রতিষ্ঠান ও সরকার; শিক্ষার্থীরা থেকেছে এই দীর্ঘ সিদ্ধান্ত প্রক্রিয়ার একেবারে শেষ প্রান্তে। কোথাও কোথাও পরামর্শ নেওয়া হলেও তা ছিল প্রতীকী, কাঠামোগত নয়। তরুণদের কণ্ঠ শোনা গেছে সম্মেলন বা প্রচারণায়, কিন্তু শিক্ষা শাসনের মূল কাঠামোয় নয়।

২০২৬ সালের প্রতিপাদ্য এই দৃষ্টিভঙ্গিকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ জানায়। তরুণদের দর্শক নয়, স্থপতি হিসেবে দেখার মাধ্যমে এটি স্বীকার করে যে শিক্ষার্থীদের নিজস্ব অভিজ্ঞতা ও প্রেক্ষিত জ্ঞান রয়েছে; যা অর্থবহ শিক্ষানকশার জন্য অপরিহার্য। শ্রেণিকক্ষ কেমন লাগে, পরীক্ষা কীভাবে অনুপ্রাণিত বা নিরুৎসাহিত করে, প্রযুক্তি কীভাবে শেখার অভ্যাস বদলে দেয়–এসব তরুণদের চেয়ে ভালো আর কেউ জানে না। এই জ্ঞানকে উপেক্ষা করাই শিক্ষা সংস্কারের অন্যতম দুর্বলতা ছিল।

বিশ্বের নানা দেশে এখন দেখা যাচ্ছে তরুণদের অংশগ্রহণে শিক্ষা কীভাবে বদলাতে পারে। শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে পাঠ্যক্রম পর্যালোচনা, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ভেতরে যুব পরামর্শ পরিষদ, অংশগ্রহণমূলক বিদ্যালয় শাসন ব্যবস্থা কিংবা সহপাঠী-নেতৃত্বাধীন শেখার উদ্যোগ–এসব উদাহরণ দেখাচ্ছে তরুণদের অংশীদার হিসেবে স্বীকৃতি দিলে শিক্ষা আরও সংবেদনশীল ও ন্যায়সংগত হয়। একই সঙ্গে এতে নাগরিকত্ব, সমালোচনামূলক চিন্তা ও দায়বদ্ধতার বোধও গড়ে ওঠে, যা ওপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া কাঠামোতে খুব কমই সম্ভব।

শিক্ষার সহনির্মাণ আসলে একটি গভীরভাবে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া। এটি শিক্ষাকে কেবল শ্রমবাজার বা প্রযুক্তিগত দক্ষতার সঙ্গে নয়, বরং অংশগ্রহণ, ন্যায়বিচার ও শান্তির মতো বৃহত্তর সামাজিক লক্ষ্যের সঙ্গে যুক্ত করে। ইউনেস্কোর তরুণ নেতৃত্ব ও অংশগ্রহণের ওপর জোর দেওয়ার পেছনে রয়েছে এই উপলব্ধি–শিক্ষা ব্যবস্থা যেমন সমাজকে প্রতিফলিত করে, তেমনি সমাজ গঠনের দিকনির্দেশও দেয়। শিক্ষা সিদ্ধান্তে তরুণদের বাদ দেওয়া মানে অনিচ্ছাকৃতভাবেই জানিয়ে দেওয়া–কার কণ্ঠ গুরুত্বপূর্ণ, আর কারটা নয়।

তরুণদের অর্থবহ অংশগ্রহণ মানে কেবল সীমিত ক্ষমতার ছাত্র সংসদ নয়। এর অর্থ হলো এমন প্রাতিষ্ঠানিক পরিসর তৈরি করা, যেখানে তারা নীতিগত অগ্রাধিকার, পাঠ্যবিষয়বস্তু, মূল্যায়ন পদ্ধতি ও প্রযুক্তির নৈতিক ব্যবহারে প্রভাব রাখতে পারে। এতে প্রাপ্তবয়স্কদের কিছু নিয়ন্ত্রণ ছেড়ে দিতে হয় এবং প্রজন্মান্তরের সংলাপকে বিঘ্ন নয়, শক্তি হিসেবে গ্রহণ করতে হয়।
বিশেষ করে সংঘাতপ্রবণ বা ভঙ্গুর প্রেক্ষাপটে তরুণদের ভূমিকা আরও গুরুত্বপূর্ণ। শান্তি নির্মাণ, সামাজিক সংহতি ও সম্প্রদায়ভিত্তিক সহনশীলতায় তারা প্রায়ই অগ্রণী ভূমিকা রাখে। শিক্ষাব্যবস্থা যখন এই ভূমিকা স্বীকৃতি দেয়, তখন তা কেবল শেখার ফল নয়, বরং সামাজিক স্থিতিশীলতাও নিশ্চিত করে।

শিক্ষা যদিও তরুণদের ক্ষমতায়নের ভাষ্যে এখন জনপ্রিয়, বাস্তবে অংশগ্রহণের সুযোগ সবার জন্য সমান নয়। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর তরুণ, বিশেষ করে মেয়েরা, প্রতিবন্ধী শিশু, শরণার্থী, গ্রামীণ ও দরিদ্র তরুণদের স্বর সবচেয়ে কম শোনা যায়, অথচ তারাই শিক্ষাবঞ্চনার সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী।
শিক্ষা যদি তরুণদের ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত করতে চায়, তবে আগে তাদের বর্তমানকে গুরুত্ব দিতে হবে। সহনির্মাণ কোনো স্লোগান নয়; এটি শিক্ষা ভাবনা, শাসন ও চর্চার এক অপরিহার্য পুনর্বিন্যাস। এখন আর প্রশ্ন এটা নয় যে তরুণেরা কি শিক্ষা গড়তে প্রস্তুত? বরং প্রশ্ন হলো, আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা কি তরুণদের দ্বারা গঠিত হতে প্রস্তুত?

মোশাররফ তানসেন: মালালা ফান্ডের সাবেক কান্ট্রি রিপ্রেজেনটেটিভ এবং মো. রমজান আলী – ইউনেস্কো বাংলাদেশের শিক্ষা কর্মকর্তা


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.