।। এ এইচ এম সায়েদুজ্জামান।।
একটা সময় ছিল, যখন শিশুরা “বড় হয়ে কী হবে?”—এই প্রশ্নের উত্তরে ডাক্তার, শিক্ষক, পাইলট বা সেনা কর্মকর্তার স্বপ্ন দেখত। আজ সেই জায়গায় কোথাও কোথাও ভয়ংকর এক মানসিকতার জন্ম হচ্ছে—অভিজ্ঞতা নেওয়ার জন্য অপরাধ! জেল খাটার কৌতূহল মেটাতে একটি নিষ্পাপ শিশুকে হত্যা—এ যেন কেবল একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং আমাদের সমাজের গভীরে জন্ম নেওয়া এক ভয়ংকর অসুখের বহিঃপ্রকাশ।
নারায়ণগঞ্জ এর ফতুল্লার ঘটনাটি আমাদের শুধু শোকাহত করে না, আমাদের বিবেককে নাড়িয়ে দেয়। ছয়জন কিশোর, যাদের বয়স জীবনের সবচেয়ে সুন্দর, নির্মল সময়, তারা কীভাবে এমন সিদ্ধান্ত নিতে পারে? কীভাবে একজন মানুষের জীবন তাদের কাছে “অভিজ্ঞতার উপকরণ” হয়ে ওঠে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের ফিরে তাকাতে হয় পরিবার, সমাজ, শিক্ষা ও সংস্কৃতির দিকে।
প্রথমত, এখানে পরিবার একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। পরিবারই শিশুর প্রথম বিদ্যালয়, যেখানে সে ভালো-মন্দ, নৈতিকতা ও সহমর্মিতার বোধ শেখে। কিন্তু আজকের ব্যস্ত জীবনে অনেক পরিবারে সন্তানের মানসিক বিকাশের দিকে পর্যাপ্ত মনোযোগ দেওয়া হয় না। মোবাইল ফোন, ইন্টারনেট ও ভার্চুয়াল জগৎ হয়ে উঠছে তাদের প্রধান শিক্ষক। সেখানে তারা কী দেখছে, কী শিখছে—সেটা অনেক সময়ই নিয়ন্ত্রণের বাইরে। ফলে বাস্তবতা ও কল্পনার সীমারেখা তাদের কাছে অস্পষ্ট হয়ে যায়।
দ্বিতীয়ত, সামাজিক পরিবেশও এই ধরনের মানসিকতা তৈরিতে বড় ভূমিকা রাখে। আমরা এমন এক সমাজে বসবাস করছি, যেখানে অপরাধের খবর প্রায়ই বিনোদনের মতো পরিবেশন করা হয়। সিনেমা, ওয়েব সিরিজ বা বিভিন্ন কনটেন্টে অপরাধকে অনেক সময় রোমাঞ্চকরভাবে দেখানো হয়। অপরাধীকে কখনো কখনো “হিরো” হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। এসব দেখে কিশোরদের মধ্যে এক ধরনের বিকৃত কৌতূহল তৈরি হতে পারে—“কীভাবে হয়?”, “কেমন লাগে?”—এই প্রশ্নগুলো তাদের মানসিকতাকে বিপজ্জনক দিকে ঠেলে দেয়।
তৃতীয়ত, আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার সীমাবদ্ধতাও এখানে স্পষ্ট। আমরা শিক্ষার্থীদের জিপিএ, নম্বর ও পরীক্ষার ফলাফলের ওপর বেশি গুরুত্ব দিই, কিন্তু তাদের নৈতিক শিক্ষা, মানবিক মূল্যবোধ ও সামাজিক দায়িত্ববোধ গড়ে তোলার বিষয়ে তুলনামূলকভাবে কম মনোযোগ দিই। ফলে তারা জ্ঞান অর্জন করলেও মানুষ হিসেবে পরিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে না। শিক্ষা যদি কেবল বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে তা সমাজকে আলোকিত করতে পারে না।
এই ঘটনাটি আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে নিয়ে আসে—মানসিক স্বাস্থ্যের অবস্থা। কিশোর বয়সে নানা ধরনের মানসিক পরিবর্তন ঘটে। এই সময় তারা সহজেই প্রভাবিত হয়, নতুন কিছু জানার ও করার প্রতি তাদের প্রবল আগ্রহ থাকে। কিন্তু সেই আগ্রহ যদি সঠিক পথে পরিচালিত না হয়, তাহলে তা ভয়ংকর রূপ নিতে পারে। আমাদের সমাজে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে এখনও অনেক ট্যাবু রয়েছে। ফলে অনেক সমস্যাই অদৃশ্য থেকে যায়, যা পরে বড় বিপর্যয়ের কারণ হয়।
এখানে রাষ্ট্র ও প্রশাসনের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও বিচারব্যবস্থার কঠোরতা অপরাধ দমনে প্রয়োজন, কিন্তু তার পাশাপাশি প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থাও জরুরি। স্কুল-কলেজে কাউন্সেলিং ব্যবস্থা, সচেতনতা কার্যক্রম এবং সামাজিক উদ্যোগের মাধ্যমে কিশোরদের সঠিক পথে পরিচালিত করা যেতে পারে। শুধু শাস্তি দিয়ে সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়; প্রয়োজন সচেতনতা ও প্রতিরোধ।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—আমাদের মূল্যবোধের সংকট। আমরা কি আমাদের সন্তানদের শেখাতে পারছি একজন মানুষের জীবনের মূল্য কত? আমরা কি তাদের মধ্যে সহমর্মিতা, ভালোবাসা ও দায়িত্ববোধ গড়ে তুলতে পারছি? যদি না পারি, তাহলে এমন ঘটনা ভবিষ্যতেও ঘটতে পারে।
এই নির্মম ঘটনাটি আমাদের জন্য একটি সতর্কবার্তা। এটি আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়, আমরা কোথায় ভুল করছি। এখনই সময় আত্মসমালোচনার, এখনই সময় পরিবর্তনের। পরিবার, সমাজ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্র—সবাইকে একসাথে কাজ করতে হবে, যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম একটি মানবিক, সহানুভূতিশীল ও দায়িত্বশীল সমাজ গড়ে তুলতে পারে।
শেষ কথা হলো, একটি শিশুর জীবন কোনো অভিজ্ঞতার বিষয় হতে পারে না। এটি অমূল্য, এটি অনন্য। সেই জীবনের প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা ফিরিয়ে আনাই এখন আমাদের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব। যদি আমরা এখনই সচেতন না হই, তাহলে এই নির্মম গল্প হয়তো ভবিষ্যতে আরও অনেকবার আমাদের সামনে ফিরে আসবে—আর প্রতিবারই আমরা একটু একটু করে হারাব আমাদের মানবিকতা।
লেখক: শিক্ষক ও গবেষক।।
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
