এইমাত্র পাওয়া

৪৮ বছরের নারীকে ৩৫ বানিয়ে নিয়োগ দিলেন জগন্নাথপুরের সুপার তাজুল

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকাঃ সুনামগঞ্জ জেলার জগন্নাথপুর উপজেলার চিলাউড়া দারুচ্ছুন্নাহ দাখিল মাদরাসার সুপার  কাজী মোঃ তাজুল ইসলাম আলফাজের বিরুদ্ধে বয়স জালিয়াতি করে নিয়োগ বাণিজ্য ও নিয়োগে ঘুষ বাণিজ্য, বাল্য বিয়ে, কাবিন ও বয়স জালিয়াতি করে নামে বেনামে কোটি টাকার সম্পদ গড়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। মাদ্রাসার সুপারের দায়িত্বে থেকে মোটা অংকের অর্থের মাধ্যমে জালিয়াতি করে নিয়োগ দিয়ে এবং নিজে বিবাহ, নিকাহ ও তালাক রেজিষ্ট্রার হবার সুবাধে একাধিক ব্যক্তির কাবিন ও বয়স জালিয়াতির ফাঁদে ফেলে মোটা অংকের অর্থ কামিয়ে কোটি টাকার মালিক হয়েছেন তিনি। 

শিক্ষাবার্তা’র অনুসন্ধানে জানা গেছে, গত ০১ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ খ্রিষ্টাব্দে দারুচ্ছুন্নাহ দাখিল মাদরাসায় সৃষ্ট পদে ১ জন নিরাপত্তা কর্মী এবং সৃষ্ট পদে একজন আয়া নিয়োগ দেওয়া হয়। এতে  নিরাপত্তাকর্মী পদে নিয়োগ পান ইসলামুল হক এবং আয়া পদে নিয়োগ পান মোছাঃ তাজফুল বেগম। নিয়োগে তাজফুল বেগমের বয়স দেখানো হয় ২ জানুয়ারি ১৯৮৮ খ্রিষ্টাব্দ। কিন্তু তাজফুল বেগমের জাতীয় পরিচয় পত্রে দেওয়া বয়স ২ ফেব্রুয়ারি ১৯৭৫ খ্রিষ্টাব্দ।  বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান (মাদ্রাসা) জনবল কাঠামো ও এমপিও নীতিমালা ২০১৮ (২৩ নভেম্বর ২০২০ পর্যন্ত সংশোধিত) অনুযায়ী মাদ্রাসার কর্মচারী পদে বয়স নির্ধারণ করা হয়েছে ৩৫ বছর। এমপিও নীতিমালা অনুযায়ী আবেদনের যোগ্যতা ৩৫ বছর নির্ধারণ করা হলেও নিয়োগের দিন তার বয়স ছিল ৪৮ বছর। 

বয়স জালিয়াতি করে এবং অষ্টম শ্রেণির জাল সনদ সরবরাহ করে অন্তত দশ লক্ষ টাকা নিয়ে তাকে এই পদে নিয়োগ দেন সুপার কাজী মোঃ তাজুল ইসলাম আলফাজ। প্রকৃত পক্ষে তাজফুল বেগম নামেমাত্র স্বাক্ষর করতে পারলেও বাংলা লিখতে এবং পড়তেও পারেন না তিনি। একই সময়ে নিরাপত্তাকর্মী পদে নিয়োগ পাওয়া ইসলামুল হককেও মোটা অংকের অর্থের মাধ্যমে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। 

মোছাঃ তাজফুল বেগমের নিয়োগে তার জন্ম তারিখ পরিবর্তিন করে সুপার কাজী মোঃ তাজুল ইসলাম আলফাজ দেন ২ জানুয়ারি ১৯৮৮ খ্রিষ্টাব্দ। একাধিক কাবিনে বয়স জালিয়াতি করা কাজী তাজুল খুব সহজেই তার বয়স পরিবর্তন করে দেন। 

গত ০১ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ খ্রিষ্টাব্দে দারুচ্ছুন্নাহ দাখিল মাদরাসার উক্ত দুই পদে নিয়োগে ডিজি প্রতিনিধি মনোনয়ন দেয়া হয় ১৬ জানুয়ারি ২০২৩ খ্রিষ্টাব্দে।  নিয়োগে ডিজি প্রতিনিধি ছিলেন সিলেট সরকারি আলিয়া মাদ্রাসার সহকারী অধ্যাপক মো. জিয়াউল হক চৌধুরী। তার মুঠোফোন নম্বর কল করলে সেটি বন্ধ পাওয়া যায়। 

গত ৩ ডিসেম্বর ২০২৪ খ্রিষ্টাব্দে কাজী মোঃ তাজুল ইসলাম আলফাজের বিরুদ্ধে নিয়োগ বাণিজ্য ও ঘুষ দুর্নীতির মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে জগন্নাথপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার বরাবর লিখিত অভিযোগ দেন রেজাউল করিম রিপন ওরফে রিপন মিয়া নামের এক ব্যক্তি। লিখিত অভিযোগে তিনি উল্লেখ করেন, “চিলাউড়া দারুচ্ছুন্নাহ মাদ্রাসার সুপার কাজী মো: তাজুল ইসলাম আলফাজ মাদ্রাসার দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই রাতারাতি প্রচুর পরিমাণ সম্পদের মালিক হয়ে উঠেন। লোক মুখে উনার বেড়ে উঠা সম্পদের কথা প্রায় এলাকার সবাই বলে থাকে এবং সবাই উনার এই হঠাৎ আর্থিক উত্তানের পিছনের রহস্য নিয়ে নানান গুঞ্জনের মধ্যে দিয়ে দিন যাপন করছেন। এই পরিপ্রেক্ষিতে বিভিন্ন সূত্রের মাধ্যমে জানতে পারা যায় যে, বিগত ০১/০২/২০২৩ইং সালে মাদ্রাসায় বিভিন্ন পদে কিছু সংখ্যক লোক নিয়োগ করা হয়। তার মধ্যে অন্যতম হল আয়া-সৃষ্ট পদে মোছা: তাজফুল বেগম, পিতা: শাহিদ উল্লাহ, জন্ম তারিখ ০২/০১/১৯৭৫ইং। তাহার চাকুরীর বয়স অতিবাহিত হওয়ার পরও তিনি তাহার প্রয়োজনীয় কাগজপত্রে জন্ম তারিখ গোপন করে বয়স কমিয়ে মাদ্রাসার সুপার এর সহিত অর্থ সিন্ডিকেট এর মাধ্যমে তাহাকে নিয়োগ প্রদান করা হয়। এরকম আরও অনেকের ক্ষেত্রে মাদ্রাসার সুপার সিন্ডিকেট করে নিয়োগ বানিজ্যসহ, ঘুষ ও দুর্নীতির মাধ্যমে কোটি টাকার দৃশ্যমান সম্পদের পাহাড় গড়েছেন। উল্লেখ্য, তিনি ৫নং চিলাউড়া হলদিপুর ইউনিয়নের বিবাহ তালাক রেজিষ্ট্রার হওয়ার পর থেকে বাল্য বিবাহ, কন্ট্রাক ম্যারিজ এর সার্টিফিকেট প্রদানের মাধ্যমে লক্ষ লক্ষ টাকা অবৈধভাবে হাতিয়ে নিচ্ছেন।” 

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান (মাদ্রাসা) জনবল কাঠামো ও এমপিও নীতিমালা ২০১৮ (২৩ নভেম্বর ২০২০ পর্যন্ত সংশোধিত) ১১.১০ (ক) ধারা অনুযায়ী, এমপিও প্রাপ্তির জন্য আবেদনকারি শিক্ষক -কর্মচারীগণ একই সাথে একাধিক পদে চাকরিতে বা আর্থিক লাভজনক কোন পদে নিয়োজিত থাকতে পারবেন না। বিবাহ তালাক ও নিকাহ রেজিষ্ট্রার সরকারি চাকরি না হলেও একটি লাভজনক পদ। প্রতিটি বিবাহ, নিকাহ ও তালাকে নির্দিষ্ট পরিমাণ কমিশন পান এবং বর পক্ষ কিংবা কণে পক্ষ থেকেই মোটা অংকের অর্থ নিয়ে থাকেন। তিনি একই সাথে শিক্ষক এবং বিবাহ রেজিষ্ট্রার হিসেবে কর্মরত থেকে বাল্যবিবাহ ও কন্টাক্ট ম্যারিজ এর সনদ প্রদান করে মানব পাচারের সাথে জড়িত রয়েছেন। কন্টাক্ট ম্যারিজ করে কামিয়েছেন লক্ষ লক্ষ টাকা। 

মোঃ মানিক নামের এক ব্যক্তি জানান, মাদ্রাসা সুপার ও কাজী মোঃ তাজুল ইসলাম আলফাজ আব্দুর রশিদ মিয়াদাদের বিয়ের কাবিন নামায় “মিয়াদদ” লিখেন পরে এটি সংশোধনের জন্য ১০ হাজার টাকা নিয়ে মিয়াদাদ করে দেন। এই এলাকায় যেহেতু প্রবাসী বেশি তাই বিদেশ যেতে গেলে ঝামেলা সৃষ্টি করতে পারে নামের বানানটি নিয়ে তাই টাকা দিয়ে হলেও ঠিক করতে হয়। বিদেশ যাবে যারা তাদের নাম ইচ্ছেকৃত ভুল করেন তিনি। এরকম বহু প্রমাণ আছে আমাদের কাছে।

আরেক ভুক্তোভুগী মো: হোসাইন আহম্মেদ জানান, মোটা অংকের টাকা নিয়ে স্থানীয় চেয়ারম্যান ও মেম্বারের সহযোগিতায় জন্ম নিবন্ধন ভোটার আইডি কার্ড- এ বয়স বাড়িয়ে একাধিক অবৈধভাবে বাল্যবিবাহ দিয়েছেন তিনি। এ বিষয়ে সিলেট জেলা জজ আদালতে, ঢাকা হাইকোর্টে ও সুনামগঞ্জ রেজিস্ট্রি অফিসে লিখিত অভিযোগ ও মামলা দেয়া আছে। সবচেয়ে বড় বিষয় এক ব্যক্তি কিভাবে কাজী ও মাদ্রাসা সুপারের দায়িত্ব পালন করতে পারে এটি আমাদের বোধগম্য নয়। একই সাথে কাজী ও মাদ্রাসা সুপার হওয়ায় তার দুর্নীতি ও প্রতারণা সকল সীমা অতিক্রম করেছে।

জালিয়াতির শিকার একাধিক ব্যক্তি জানান, কাবিনের জন্য লম্বাহাটির আকল মিয়ার কাছ থেকে ৮হাজার ঘুষ নিয়েছেন , মাঝপাড়ার রুপিয়া কাছ থেকে নিয়েছেন ৪০ হাজার। অন্তত ৫০০ মানুষের কাছ থেকে তিনি টাকা নিয়েছেন। তিনি জালিয়াতির মাধ্যমে বিদেশে মানব পাচারের সাথে জড়িত। তার বিরুদ্ধে দুদক তদন্ত করলে মানব পাচারের বিষয়টি উঠে আসবে। 

উল্লেখ্য, সুপার  কাজী মোঃ তাজুল ইসলাম আলফাজ, একই উপজেলার হুলিয়ারপাড়া জামেয়া কাসেমিয়া আলিম মাদ্রাসার অধ্যক্ষ মো. মইনুল ইসলাম পারভেজসহ সুনামগঞ্জ জেলায় একটি চক্র রয়েছে যারা একই সাথে মাদ্রাসা শিক্ষকতা করেন এবং কাজী। এই সিন্ডেকেট সুনামগঞ্জ এলাকাটি লন্ডন প্রবাসী বেশি হওয়ায় কন্টাক্ট ম্যারেজ, কাবিন জালিয়াতি করে মানব পাচারের সাথে জড়িত রয়েছে।  

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে চিলাউড়া দারুচ্ছুন্নাহ দাখিল মাদরাসার সুপার  কাজী মোঃ তাজুল ইসলাম আলফাজ শিক্ষাবার্তা’কে বলেন, নিয়োগ বোর্ডের সবাই যাচাই করেই নিয়োগ দিয়েছে। বয়স জালিয়াতির কোন ঘটনা ঘটেনি। জাতীয় পরিচয়পত্র এবং জন্ম নিবন্ধনে জন্ম সাল ১৯৭৫ কিভাবে ৩৫ হয়ে গেলো, ৪৯ বছর আর ৩৫ বছরের চেহারার পার্থক্য তো বোঝা যায় জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, এমন হয়ে থাকলে তাজফুল দায়ী আমি নয়। যে বাংলা লিখতে ও পড়তে পারে না তিনি কিভাবে অষ্টম শ্রেণি পাস হলেন জিজ্ঞেস করলে তিনি জানান, তার সনদ দিয়েছে চিলাউরা উচ্চ বিদ্যালয় তারা ভালো বলতে পারবেন। কাবিন জালিয়াতি, কন্টাক্ট ম্যারেজ ও বাল্যবিয়ে দিয়ে অবৈধ অর্থ উপায়ের কথা অস্বীকার করেন তিনি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে জগন্নাথপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো: বরকত উল্লাহ শিক্ষাবার্তা’কে বলেন, মাদ্রাসার সুপার কাজী মোঃ তাজুল ইসলাম আলফাজ এর অনিয়মের বিষয়ে জানা নেই। আমি নুতন এসেছি যদি অনিয়ম বা অভিযোগ দিয়ে থাকে তাহলে আমাকে আবার পাঠিয়ে দিন। আমি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করব।

জানতে চাইলে মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মোঃ জাকির হোসাইন শিক্ষাবার্তা’কে বলেন, বিষয়টি খতিয়ে দেখে বিধি মোতাবেক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। 

উল্লেখ্য, একই উপজেলার হুলিয়ারপাড়া জামেয়া কাসেমিয়া আলিম মাদ্রাসার অধ্যক্ষ মো. মইনুল ইসলাম পারভেজের বিরুদ্ধেও বর ও কনে পক্ষকে নানা কায়দায় প্ররোচিত করে কাবিনামায় বয়স জালিয়াতি করে বাল্যবিয়ে দেওয়ার অভিযোগে তার এমপিও কেন  বন্ধ করা হবে না তা জানতে চেয়ে শোকজ করে মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদফতর। একই সাথে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষা বিভাগের নির্দেশে মাদ্রাসা অধিদপ্তরের করা তদন্তের তদন্ত প্রতিবেদনে কাবিন জালিয়াতির বিষয়টি উঠে আসে। তবে তার এমপিও এখনও বন্ধ হয়নি। 

আরও পড়ুনঃ 

শিক্ষাবার্তা ডটকম/এএইচএম/১৫/১২/২০২৪


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.