ড. কামরুল হাসান মামুনঃ অনেকের প্রশ্ন, আমি কেন আমার কন্যাদের ইংরেজি মাধ্যমে পড়াই। এরকম প্রশ্ন অনেকের মাথায় ঘুরপাক খেতেই পারে। উত্তর হলো আমি যেমন বাংলা মাধ্যমের স্কুল চাই বাংলা মাধ্যমের তেমন স্কুল, কারিকুলাম এবং শিক্ষক ছিলো না এবং এখন আরো নেই। হবে কীভাবে? শিক্ষায় বরাদ্দ দেয় জিডিপির মাত্র ১.৭৬%। এই কম বরাদ্দের সবচেয়ে বড় ভিক্টিম হলো শিক্ষকরা। দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশের শিক্ষকরা সবচেয়ে কম বেতন পান। এর মধ্যে সরকারি প্রাথমিক বিষদ্যালয়ের শিক্ষকরা আরো বড় ভিক্টিম। তাইতো ভালো শিক্ষক ও ভালো কারিকুলামের জন্য এতো কথা বলি যেন আমি পড়াতে পারিনি তো কী হয়েছে? আমি পড়াইনি বলে আমার ভাই, বোন, পাড়া প্রতিবেশী, সমাজ ও দেশের আর সব মানুষের মঙ্গল চাওয়া নিষিদ্ধ হয়ে গেছে? এদের সন্তান ভালো না থাকলে আমার সন্তান বা আমি কীভাবে ভালো থাকি? আমি নিজেও বাংলা মাধ্যমের তৈরি, আমি এই দেশের সন্তান তাই বাংলা মাধ্যম নিয়ে কথা বলা আমার অধিকার।
আমার বড় কন্যার যখন স্কুলে ভর্তির সময় হয় তখন স্কুলে ভর্তির জন্য ভর্তি পরীক্ষা ছিলো। সেই ভর্তি পরীক্ষার জন্য ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের তখনই কোচিং করাতে হতো, পড়াতে হতো। আমার কন্যাতো তখনো লেখাপড়া তেমনভাবে শুরুই করেনি বা কোচিং করানোর কথা স্বপ্নেও ভাবিনি। আর দেশে দুই তিনটা মাত্র মোটামোটি ভালো বাংলা মাধ্যমের স্কুল আছে। ফলে সেখানে ভর্তির জন্য প্রচণ্ড প্রতিযোগিতা ছিলো। ভর্তির ফর্ম তুলতেই ভোর রাতে গিয়ে লাইন দিতে হতো। তার উপর আমার স্ত্রী ইতালিয়ান। ফলে ওদের মাতৃভাষা ইতালিয়ান। আমার স্ত্রী ২০ বছরের বেশি সময় ধরে কেবল আমার জন্য বাংলাদেশে বাস করে যেখানে বাংলাদেশিরা দলে দলে বিদেশ চলে যাচ্ছে বা যেতে চায় সেখানে ভেঁজাল খাবার খাচ্ছে, দূষিত বায়ু সেবন করছে। তাছাড়া সন্তানের মা হিসাবে সন্তানদের উপর তার মতামতের ঠিক ততোটাই যতোটা আমার। বরং তার ক্ষেত্রে একটু বেশি কারণ সে স্যাক্রিফাইস করে বসবাসের জন্য পৃথিবীর সবচেয়ে অবাসযোগ্য শহর, অথচ বসবাসের ব্যয় টরেন্টো মন্ট্রিল ও লিসবনের চেয়ে বেশি তেমন শহর ঢাকাতে থাকে। শুধু তাই নয়। আমার স্ত্রী ভাষার ছাত্রী তাই সে ভাষার মর্ম বোঝে। যেদিন আমার বড় কন্যা জন্মায় সেদিনই আমাকে বলেছিলো আমি যেন আমার কন্যার সঙ্গে বাংলা ছাড়া অন্য কোনো ভাষায় কথা না বলি।
আমার স্ত্রী বলেছিলো কন্যা ঘরে দুটি ভাষা শিখবে, আর স্কুলে তৃতীয় ভাষা ইংরেজি শিখেবে। সেই পরিকল্পনা মতেই আমার কন্যারা বড় হয়েছে। আমার স্ত্রী কোনোদিন ইতালিয়ান ভাষা ছাড়া অন্য ভাষায় কথা বলে না। না বুঝলেও না। আমার কন্যার সঙ্গে আমি কোনোদিন ইংরেজিতে কথা বলিনি। আমার কন্যা ইংরেজি মাধ্যমে পড়লেও আমার কন্যারা অনেক ভালো বাংলা জানে, বাংলা গান শুনে, বাংলা বই পড়ে। আমার সঙ্গে বা বাঙালির সঙ্গে আমার তারা কখনো ইংরেজি মারায় না। তারা বাংলা সংস্কৃতিকে ভালোবাসে। মোট কথা তারা ভাষার মর্ম বোঝে। তারা যে জন্ম থেকেই দুটি ভাষা শিখে স্কুলে আরেকটি ভাষা শিখলো এটা কি অসাধারণ বুঝতে পারছেন? অথচ আমি অনেক দেখেছি যে ইংরেজি মাধ্যমে পড়লে বাংলা ভাষাকে কি অবহেলা করা হয়। বাবা-মায়েরা সন্তানের সঙ্গে ইংরেজি বলতে চেষ্টা করে। ফলে অনেক ইংরেজি মাধ্যমের ছেলেমেয়েরা বাংলা জানে না। পার্কে হাঁটতে গিয়ে দেখি ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা স্লাইডে খেলছে, দোলনায় দুলছে। তারা নিজেদের মধ্যে ইংরেজি বলছে। কী সাংঘাতিক। অথচ বাবা-মা এবং স্কুল একটু চেষ্টা করলেই বাংলা ভাষাকেও গুরুত্ব দিয়ে শেখাতে পারতো। আমার বড় কন্যা জন্মানোর পর আমার স্ত্রী একটা বই কিনেছিলো, যড়ি ঃড় মৎড়ি ুড়ঁৎ পযরষফ ধং নরষরহমঁধষ! শিশুদের আমরা খুবই আন্ডার এস্টিমেট করি। অথচ তারা অতি সহজেই দুই তিনটি ভাষা শিখে ফেলতে পারে, যা হতে পারে বাবা-মায়ের পক্ষ থেকে সন্তানের প্রতি গিফট।
এখন আমার কন্যারা ইংরেজি মাধ্যমে পড়েছে বলে আমি বাংলা মাধ্যম নিয়ে কথা বলতে পারবো না? আমি বাংলা মাধ্যমে পড়েছি। আমার কোর পরিবারের বাইরে এক্সটেন্ডেড পরিবারের প্রায় সবাই বাংলা মাধ্যমে পড়ে। আমার ভাই-বোনের সন্তানেরা বাংলা মাধ্যমে পড়ে, আমার জীবনে যারা ম্যাটার করে তাদের প্রায় সকলে বাংলা মাধ্যমে পড়ে। আমি সবসময় বলি আমি কিংবা আমার সন্তানেরা ভালো থাকবে যদি আমার চারপাশের মানুষ ভালো থাকে। আমি যদি তাদের মঙ্গলের কথা না বলি আমি বা আমাদের সন্তানের ভালো থাকা নিশ্চিত করবো কীভাবে? আজ যদি দেশে খুব ভালো মানের বাংলা মাধ্যম থাকতো যেখানে ইংরেজি ভাষায় বাংলা ভাষার মতো গুরুত্ব দিয়ে পড়ায় আমি তো আমার সন্তানদের ইংরেজি মাধ্যমে পড়াতাম না। আজ যদি দেশে বাংলা মাধ্যমের প্রশ্ন ফাঁস না থাকতো, শিক্ষকরা উন্নত বেতন পাওয়ার জন্য উন্নত শিক্ষক থাকতো আমি তো আমার সন্তানদের ইংরেজি মাধ্যমে পড়াতাম না। আমি কেন দেশের অধিকাংশ ইংরেজি মাধ্যমের সন্তানদের বাবা-মা-ই তাদের সন্তানদের ইংরেজি মাধ্যমে পড়াতেন না। তবে এটা ঠিক। বাংলা মাধ্যমের যদি উন্নত মানের স্কুল থাকতো যেখানে বাংলা ভাষার পাশাপাশি ভালো ইংরেজি শেখায় আমি আমার সন্তানদের বাংলা মাধ্যমেই পড়াতাম। কিন্তু আমার যুদ্ধ আমার দেশের সকল অন্যায় অবিচারের বিরুদ্ধে। বাংলা মাধ্যম আমাদের দেশে সবচেয়ে অবহেলিত। আমরা যেইদিন থেকে অ আ শিখি সেইদিন থেকেই ধ ন প শিখি। কিন্তু আমাদের কখনো ইংরেজি শেখা হয় না। কারণ যারা ইংরেজি শেখায় সেই শিক্ষকরাই ইংরেজি জানেন না। ভালো ইংরেজি জানে এমন মানুষ বর্তমান বেতন স্কেলের বেতনে চাকরি করবে না।
লেখক: অধ্যাপক, পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
শিক্ষাবার্তা ডট কম/এএইচএম/১৩/০১/২০২৪
দেশ বিদেশের শিক্ষা, পড়ালেখা, ক্যারিয়ার ও শিক্ষা সংশ্লিষ্ট সর্বশেষ সংবাদ, শিরোনাম, ছবি ও ভিডিও প্রতিবেদন সবার আগে দেখতে চোখ রাখুন শিক্ষাবার্তা’য়।
“মতামত ও সাক্ষাৎকার কলামে প্রকাশিত নিবন্ধ লেখকের নিজস্ব। শিক্ষাবার্তা’র সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে মতামত ও সাক্ষাৎকারে প্রকাশিত মত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে। প্রকাশিত লেখাটির ব্যাখ্যা বা বিশ্লেষণ, তথ্য-উপাত্ত, রাজনৈতিক ও আইনগতসহ যাবতীয় বিষয়ের দায়ভার লেখকের;- শিক্ষাবার্তা কর্তৃপক্ষের নয়।”
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
