ড. মঞ্জুরে খোদাঃ বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও ধারা হচ্ছে, যে কোনো ইস্যুতে এক দল পক্ষে থাকবে, অন্য দল বিপক্ষে। নতুন শিক্ষাক্রমের বেলাতেও এর ব্যতিক্রম হয়নি। তবে কিছু মানুষের আলোচনায় দেখছি, তারা এই নীতির প্রচণ্ড দুর্বলতার দিকগুলো তুলে ধরছেন। সেটা নিয়ে কাজ করে যাচ্ছেন; নাগরিক মত তৈরির চেষ্টা করছেন। একে আমি ইতিবাচক মনে করি, সমর্থন করি।
এর আগে যে সৃজনশীল, জিপিএ, জেএসসি প্রভৃতি ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল, তা কীসের ভিত্তিতে এবং কেন বাতিল করা হলো? কোন গবেষণার ভিত্তিতেই তা নেওয়া হয়েছিল, এর কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি। নতুন শিক্ষানীতির ক্ষেত্রে নীতিনির্ধারকরা দাবি করছেন, তারা তিন বছর গবেষণা করে নতুন এ পদ্ধতি প্রবর্তন করেছেন। দাবি করেছেন, এটা নিয়ে অনেক দিন ধরে তারা কাজ করছেন। সেটাই যদি হয়, তাহলে এই নীতি নিয়ে সমাজে এত বিতর্ক, প্রশ্ন ও বিভ্রান্তি কেন?
ধরে নেওয়া যায়, আগের কথিত সৃজনশীল পদ্ধতির পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও ব্যর্থতার পর এই নীতি প্রচলন করা হলো। এর ফলাফল কী হবে, তাও হয়তো আগের মতো ভাগ্যের ওপর ছেড়ে দিতে হবে। প্রশ্ন হচ্ছে, শিক্ষার্থীদের ওপর এভাবে এক্সপেরিমেন্ট করা কতটা যৌক্তিক ও বিজ্ঞানসম্মত? এর উত্তর কি তাদের কাছে আছে? শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়নে পরিবর্তন একটি নিয়মিত বিষয়। কিন্তু বর্তমানে যা চলছে তাকে কিছুটা তুঘলকি বলা যায়। নীতিনির্ধারকরা যেটা ভাববেন, করবেন, সেটাই চূড়ান্ত কেন? কেন কোনো বিকল্প ভাবনা-প্রস্তাবনা থাকবে না? কেউ করলে তাঁকে কেন প্রতিপক্ষ মনে করা হবে? শিক্ষা তো কোনো পক্ষ, শ্রেণির বিষয় নয়। তা সবার। তাহলে এটি নিয়ে আলোচনা বা বিতর্ক করতে সমস্যা কোথায়? সংসদে যেমন কোনো বিল-বিষয় নিয়ে আলোচনা-বিতর্ক হয়; এ ক্ষেত্রে সমস্যা কোথায়?
বাংলাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ‘শিক্ষা উন্নয়ন, শিক্ষা গবেষণা, শিক্ষা বিজ্ঞান বিভাগ’ আছে। এই ডিপার্টমেন্টের কাজ কী? তাদের তো বাংলাদেশের ‘শিক্ষা-সংকট-উন্নয়ন’ প্রভৃতি বিষয়ে কথা বলতে শুনিনি। বিকল্প প্রস্তাবনা কখনও হাজির করেছেন বলে শুনিনি। আবার সরকার এসব বিভাগের শিক্ষক-গবেষকদের যে কাজে লাগাবে, সেটাও করছে না! এটা কি বিস্ময়ের বিষয় নয়?
আমাদের দেশে শিক্ষার সংকটের একটি বড় কারণ যতটা না শিক্ষানীতি ও পদ্ধতির, তার চেয়ে বড় হচ্ছে শিক্ষা প্রশাসনের। দেশে অনেক অন্যায়-অপরাধ হয়; তার কোনো শাস্তি হয় না। অপরাধীরা, সমাজবিরোধীরা ক্ষমতাবান হয়ে উঠছে। সেটা কি আইনের সংকটে, না শাসক ও শাসনের দুর্বলতার কারণে? দেশে শিক্ষাসংক্রান্ত সংকটের একটি বড় কারণ গুণগত শিক্ষা কার্যকর করার মতো উপযুক্ত নেতৃত্ব ও পরিবেশের অভাব– সে কথা কি সংশ্লিষ্টরা অস্বীকার করতে পারবেন?
বাংলাদেশে শিক্ষার সংকট বহুমুখী– অর্থায়ন, শিক্ষানীতি, কারিকুলাম, সরকার, শিক্ষা প্রশাসন, আমলাতন্ত্র, অবকাঠামো, শিক্ষার পরিবেশ, শিক্ষকের সুযোগ-সুবিধা, ধর্মীয়-সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংকট প্রভৃতি। এসব সমস্যার রাতারাতি কোনো সমাধান নেই। কিন্তু তা সমাধানে দীর্ঘমেয়াদি বিভিন্ন ধাপের কোনো পরিকল্পনাও দেখছি না।
শিক্ষা বাংলাদেশের কোনো শাসকের (কুদরাত-এ-খুদা কমিশন বাদে) কাছেই সর্বাধিক গুরুত্বের জায়গায় ছিল না। যেটুকু গুরুত্ব ছিল তা শুধু কথায় ও কাগজে; বাস্তবে নয়। সেটা হলে শিক্ষায় বরাদ্দের এই গরিবানা হাল, শিক্ষার বহুমুখী ধারা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও শিক্ষকের চেহারা, সামাজিক অবস্থান এমন হতো না।
এটা ঠিক যে, কোনো পদ্ধতির প্রয়োগ-পরীক্ষা ব্যতিরেকে তাৎক্ষণিক তার ভালো-মন্দ বলে দেওয়া কঠিন। কোথায় কোন ব্যবস্থা কীভাবে কার্যকর, তা জনগণ দ্বারা সমর্থিত হবে। এটি কোনো অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে না গেলে আগে থেকে বলে দেওয়া মুশকিল। শিক্ষার বিষয়ও তাই। তবে নতুন শিক্ষানীতির যেসব দৃশ্যমান অসংগতি আছে, তা অবশ্যই দূর করতে হবে।
যে কোনো কিছু নতুন হলে তাতে বিগত দিনে অভ্যস্ত হয়ে ওঠা মানুষের পক্ষে তা মেনে নেওয়া কঠিন। মানুষ তার অভ্যাস ও বিশ্বাস পরিবর্তন করতে চায় না। তার চেয়ে বড় বিষয়, শিক্ষার মতো অত্যন্ত স্পর্শকাতর জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়ে জাতীয় পর্যায়ে কোনো কমিশন গঠন না করে শুধু আমলানির্ভর হয়ে বিদেশি নীতির অনুকরণ ঠিক নয়। অনুকরণ ও অনুসরণ এক কথা নয়।
জাপান তার আধুনিক উন্নয়ন শুরুর পর্যায়ে আমেরিকা, ব্রিটিশ, জার্মান, ফ্রান্সের শিক্ষাধারাকে গ্রহণ করেছে। শুধু তাই নয়; তারা শত শত শিক্ষক, নীতিনির্ধারক, শিক্ষার্থীকে সেসব দেশে পাঠিয়ে প্রশিক্ষণ করিয়ে এনে নিজ দেশে তাদের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে ইতিবাচক ফল পেয়েছে। সেসব দেশ থেকে শিক্ষক-প্রশিক্ষকদের নিজ দেশে এনে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেছে। বিভিন্ন বিষয়ে বিশ্বের সেরা সেরা বই-টেক্সটকে তারা রাতারাতি অনুবাদ করে শিক্ষার্থীদের হাতে তুলে দিয়েছে। তাদের অনুবাদ সংস্থাকে বিশ্বের সেরা অনুবাদ সংস্থায় পরিণত করেছে। পুস্তক অনুবাদে তারা ব্রিটেনকেও ছাড়িয়ে গিয়েছিল।
আমাদের শাসকরা কি সেটা করবেন? তারা আলু চাষ, পুকুর কাটার জন্য বিদেশে প্রতিনিধি দল পাঠান। কিন্তু বিদেশ থেকে ভালো মানের শিক্ষক-প্রশিক্ষক আনিয়ে আমাদের শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দিতে পারেন না। বাংলাদেশেও মেধাবী শিক্ষক-প্রশিক্ষকের অভাব নেই। তাদের সেই সুযোগ-সুবিধা দিলে তারাও হয়তো সে কাজটি সাফল্যের সঙ্গে করবেন।
লেখকঃ,শিক্ষা উন্নয়ন গবেষক
শিক্ষাবার্তা ডট কম/এএইচএম/২৫/১২/২০২৩
দেশ বিদেশের শিক্ষা, পড়ালেখা, ক্যারিয়ার সম্পর্কিত সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম, ছবি, ভিডিও প্রতিবেদন সবার আগে দেখতে চোখ রাখুন শিক্ষাবার্তায়
| “মুক্তমত ও সাক্ষাৎকার কলামে প্রকাশিত নিবন্ধ লেখকের নিজস্ব। শিক্ষাবার্তা’র সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে মুক্তমত ও সাক্ষাৎকারে প্রকাশিত মত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে। প্রকাশিত লেখাটির ব্যাখ্যা বা বিশ্লেষণ, তথ্য-উপাত্ত, রাজনৈতিক ও আইনগতসহ যাবতীয় বিষয়ের দায়ভার লেখকের;- শিক্ষাবার্তা কর্তৃপক্ষের নয়।” |
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
