এইমাত্র পাওয়া

প্রাইভেট ও কোচিংয়ের থাবা থেকে শিক্ষার্থীদের রক্ষা করবে নতুন কারিকুলাম

রেজাউল করিমঃ বাঙালি শুধু চিন্তায় রক্ষণশীল। তাই সে পরিবর্তন চায় না। অথচ জগত্ পরিবর্তনশীল। পরিবর্তনশীল জগতে নিজেকে খাপ খাওয়াতে হলে নিজেকে পরিবর্তন করতে হবে। প্রশ্ন হলো, কে তাকে পরিবর্তন করবে? শিক্ষাই তাকে পরিবর্তন করবে। কিন্তু বাঙালি পরিবর্তনে বিশ্বাসী নয়। সে মুখস্থবিদ্যায় বিশ্বাসী। মুখস্থবিদ্যা দিয়ে কেরানি হওয়া যায়, সৃষ্টি করা যায় না। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ‘শিক্ষার বাহন’ প্রবন্ধে বলেছেন, ‘মুখস্থ করিয়া পাস করাই তো চৌর্যবৃত্তি। যে ছেলে পরীক্ষাশালায় গোপনে বই লইয়া যায়, তাকে খেদাইয়া দেওয়া হয়; আর যে ছেলে তার চেয়েও লুকাইয়া লয়, অর্থাত্ চাদরের মধ্যে না লইয়া মগজের মধ্যে লইয়া যায়, সে-ই বা কম কী করিল? সভ্যতার নিয়ম অনুসারে মানুষের স্মরণশক্তির মহলটা ছাপাখানায় অধিকার করিয়াছে। অতএব, যারা বই মুখস্থ করিয়া পাস করে, তারা অসভ্যরকমে চুরি করে অথচ সভ্যতার যুগে পুরস্কার পাইবে তারাই?’

শিশু শিক্ষা লাভ করবে আনন্দের মাধ্যমে। মুখস্থবিদ্যায় আনন্দ নেই। কয়েক বছর আগেও শিক্ষার্থীরা পড়া মুখস্থ না করতে পারলে তাদের বেত দিয়ে পেটানো হতো। মার খাওয়ার ভয়ে বহু শিক্ষার্থী স্কুল পালিয়েছে, শিক্ষা থেকে ঝরে পড়েছে। আধুনিক পাশ্চাত্য শিক্ষা এসেছে ইউরোপ থেকে। ব্রিটিশের বদৌলতে আমরা তা পেয়েছি। তখন মুখস্থ করেই বিদ্যা শিখতে হতো। এখন যুগ পালটেছে, কাজের ধরন পালটেছে, বিদ্যার ধরন পালটেছে। বর্তমানে ইউরোপে মুখস্থবিদ্যার সিস্টেম নেই। বর্তমানে বাংলাদেশে যে শিক্ষাক্রম চালু করা হচ্ছে, তা ইউরোপ থেকেই আমদানি করা হয়েছে।

বর্তমানে ফিনল্যান্ডের কারিকুলাম সারা বিশ্বে মডেল হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফিনল্যান্ডে প্রথম থেকে নবম গ্রেডের শিক্ষার্থীরা প্রতি সপ্তাহে চার থেকে এগারো পিরিয়ড পর্যন্ত শিল্প, সংগীত, রান্না, কাঠমিস্ত্রি, ধাতুর কাজ, বিদ্যুত্, স্যানিটারি ও বস্ত্রশিল্পের ক্লাস করে। মুখস্থবিদ্যা মানুষকে বেকার ও অথর্ব হিসেবে গড়ে তোলে। আমাদের দেশে যারা সচিব হন, অধ্যাপক হন, তারা একটা বিদ্যুতের বাল্ব লাগাতে পারেন না। বাল্ব লাগাতে ইলেকট্রিশিয়ান ডাকতে হয়। কেননা, বাংলাদেশের কারিকুলামে মুখস্থ ছাড়া কিছু শেখানো হয় না। আর ইউরোপে মুখস্থবিদ্যা নয়, হাতে-কলমে সবকিছু শেখানো হয়।

মানুষ হচ্ছে অভ্যাসের দাস। সে যা করে এসেছে, সেটাকেই সে বড় করে দেখে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকন দাসপ্রথা বাতিল করে দিলে দাসরা বিদ্রোহ করে। নারীমুক্তির কথা বললে নারীরাই তার বিরোধিতা করে। নতুন কারিকুলাম হচ্ছে আনন্দের মাধ্যমে শিক্ষা, দক্ষ মানবসম্পদ হিসেবে গড়ে তোলার শিক্ষা। এই কারিকুলাম ইউরোপকে অনুসরণ করে করা হয়েছে। জ্ঞানবিজ্ঞান শিক্ষা-দীক্ষার গুরু হচ্ছে ইউরোপ। সুতরাং ইউরোপ কীভাবে তাদের ছেলেমেয়েদের শিক্ষা দেয়, সেটাই আমাদের অনুসরণ করা উচিত। আর যদি কেউ মনে করেন, ইউরোপের ইহুদি-নাসারাদের শিক্ষা আমাদের ছেলেমেয়েদের শেখাব না, তাহলে তা হবে ভিন্ন কথা।

কিছু মা প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন যে, রান্না শেখানোর জন্য কি ছেলেমেয়েদের স্কুলে পাঠিয়েছি? রান্না তো আমরা বাসায়ই শেখাতে পারি! যিনি সচিব, অধ্যাপক, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, তিনিও তো বলতে পারেন, ছেলেমেয়েদের স্কুলে পাঠাব কী জন্য? আমিই তো বাসায় শেখাতে পারি! তারা কি স্কুলের শিক্ষকের চেয়ে কম জানেন? তারা তো এরকম কথা বলেন না। তাহলে রান্না জানা মায়েরা কেন এ কথা বলেন? শিক্ষিত বাঙালি মায়েরা আবেগবশত অতি আদর দিয়ে ছেলেমেয়েদের পঙ্গু করে দিচ্ছেন। তাদের স্বাবলম্বী হতে দিচ্ছেন না। ছেলেমেয়ে নবম-দশম শ্রেণিতে পড়ে, কলেজে পড়ে, তাকে ভাত খাইয়ে দেন।

ইউরোপে, জাপানে, কোরিয়ায় শিশুদের প্রথমেই শেখানো হয় নিজের কাজ নিজে কীভাবে করবে। দাঁত ব্রাশ করা, গোসল করা, খাওয়া-দাওয়া করা, জামাকাপড় ধোয়া, জামাকাপড় গোছানো, বইপত্র গোছানো প্রভৃতি তাদের শেখানো হয়। তারা নিজেরাই এসব কাজ করে। আমাদের দেশের শিশুরা ভুলেই গেছে এগুলো তাদের কাজ। তাদের এসব কাজ করছে মাতা-পিতা বা কাজের মহিলা। আমাদের দেশের ছেলেমেয়েরা যখন বিদেশে পড়তে যায়, তখন তো ঠিকই তাদের নিজের হাতে এসব করতে হয়। আমাদের দেশের লোক বিদেশে সব কাজ করতে পারে, আর দেশে করলে তাদের মান-সম্মানের হানি ঘটে। নিজের কাজ নিজে করবে, তাতে যদি মান-সম্মান খোয়া যায়, তবে তাকে পথ দেখাবে কে?

মুখস্থবিদ্যা হচ্ছে বেকারত্ব সৃষ্টির কারিগর। লাখ লাখ ছেলেমেয়ে অনার্স মাস্টার্স পাস করে। কোনো কাজ জানে না, কোনো কাজ শেখানো হয় না। ফলে তারা বেকার হয়। অনার্স-মাস্টার্স পাস করে অষ্টম শ্রেণি পাসের চাকরির জন্য আবেদন করে। সবাই চাকরি চায়। পিয়ন, দারোয়ান, কেরানি হলেও আপত্তি নেই। কেননা, উপায় নেই। কী করে খাবে? এর জন্য শিক্ষা দিতে হবে হাতে-কলমে। শিক্ষা শেষে শিক্ষার্থী যেন একটা কিছু করে খেতে পারে। দরকার শিক্ষিত দর্জি, ইলেকট্রিশিয়ান, ড্রাইভার, কাঠমিস্ত্রি, রাজমিস্ত্রি, স্যানিটারি মিস্ত্রি, ফ্রিজ মিস্ত্রি, ধোপা, নাপিত, কৃষক, বিভিন্ন পেশার কারিগর। এর জন্য দরকার পেশাভিত্তিক শিক্ষা, পেশাভিত্তিক স্কুল-কলেজ। সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি দরকার নিদেনপক্ষে এক-দুটি পেশাভিত্তিক শিক্ষা।

এমন একদিন আসবে, যখন কাজের বুয়া বলে কোনো শব্দ বাস্তবে থাকবে না। যেমন—বর্তমানে রাখাল বলে বাস্তবে কিছু নেই। অথচ আশির দশক পর্যন্ত সমাজে ছিল রাখালের ছড়াছড়ি। যখন কাজের মহিলা বা বুয়া থাকবে না, তখন কে রান্নাবান্না, ধোয়ামোছা করবে? তখন তো ঠিকই নিজেকে সব করতে হবে। যেমন উন্নত দেশের মানুষ করে। নিজের কাজ নিজে করাতে দোষ কোথায়? নিজের কাজ অন্যকে দিয়ে করানো কি অন্যায় নয়? তাছাড়া এই যুগে কাজের বুয়া কি দাস-দাসির রূপান্তরিত রূপ নয়? স্কুলে পড়াশোনার পাশাপাশি আমাদের নানা কাজ করতে হতো। ইটা-মুগুর দিয়ে মাটির ডেলা গুঁড়া করা, খেত নিড়ানো, রসুন-পেঁয়াজ লাগানো ও ওঠানো, ধান মলন দেওয়া, গরুকে খাওয়ানো, বাপজানের জন্য খেতে খাবার নিয়ে যাওয়া, হাটবাজারে যাওয়া ইত্যাদি কাজ করতে হতো। সব জায়গায় যেতে হতো পায়ে হেঁটে, বর্ষাকালে নৌকা বেয়ে। এখনকার ছেলেমেয়েরা কাজ তো দূরের কথা, পায়ে হেঁটেও চলতে পারে না, যেন পোলট্রি মুরগি। মনে রাখা উচিত, ‘শরীরের নাম মহাশয়, যাহা সহায় তাই সয়।’ শরীরকে যত আরাম দেবেন, ততই ব্যারামের অধিকারী হবেন।

বাংলাদেশের শিক্ষাক্রম প্রাইভেট টিউশন ও কোচিং টিউশনের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। বর্তমান কারিকুলাম প্রাইভেট টিউশন ও কোচিংয়ের থাবা থেকে শিক্ষার্থীদের রক্ষা করবে। ছেলেমেয়েরা স্কুলের শিক্ষা স্কুলে শিখবে। ইউরোপের ছেলেমেয়েরা স্কুলের শিক্ষা স্কুলেই শেখে এবং আনন্দের মধ্য দিয়ে শেখে। আমাদের দেশে স্কুল বন্ধ দিলে ছেলেমেয়েরা খুশি হয়। ইউরোপে স্কুল খোলা থাকলেই ছেলেমেয়েরা খুশি হয়। প্রাইভেট, কোচিং, মুখস্থবিদ্যা উন্নত বিশ্বে না থাকলেও বাংলাদেশে বহালতবিয়তে আছে। এসব বদলাতে গেলেও সমস্যায় পড়তে হয়। বিদ্যালয়ে যাওয়া হয় বিদ্যার জন্য, সেখানে শিক্ষক রয়েছেন। তাহলে কেন প্রাইভেট পড়তে হবে বা কোচিং সেন্টারে যেতে হবে? প্রাইভেট ও কোচিংয়ের কারণে শিক্ষক ও শিক্ষার্থী কেউ ক্লাসে মনোযোগী হয় না। বিদ্যা দানের বিষয়, অর্থের বিনিময়ে বিক্রির বিষয় নয়। বিদ্যা বিক্রির কারণে শিক্ষকেরা প্রাপ্য সম্মান পান না। আর সামগ্রিক বিষয় বিবেচনা করে একজন শিক্ষার্থীকে মূল্যায়ন করা উচিত। যেমন—আচার-আচরণ, নীতি- আদর্শ, সৃজনশীলতা, নেতত্ব, মেধা, দক্ষতা প্রভৃতি বিষয় বিবেচনায় নেওয়া উচিত। আমাদের দেশে পরীক্ষায় ভালো করাকে মূল্যায়নের একমাত্র চাবিকাঠি বিবেচনা করা হয়। পরীক্ষায় ভালো করলেই সে ভালো মানুষ হবে—এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই। পারফরম্যান্স ইনডিকেটর মূল্যায়নের মানদণ্ডে একটি বিষয়ে শুধু পরীক্ষা হতে পারে না। তাই মূল্যায়নের ক্ষেত্রে মেধার সঙ্গে অন্য গুণাবলিও বিবেচনায় নিতে হবে। নতুন কারিকুলামে সামষ্টিক মূল্যায়নের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। এটা একটা ভালো দিক। তার পরেও নতুন কারিকুলাম একটি পরীক্ষামূলক ব্যবস্থা। আশা করি এতে সুফল মিলবে। আর এর ব্যত্যয় হলে পরিবর্তন, পরিমার্জন করতে অসুবিধা নেই।

লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, ইতিহাস, সম্পাদক, এনসিটিবি

শিক্ষাবার্তা ডট কম/এএইচএম/২৪/১২/২০২৩  

দেশ বিদেশের শিক্ষা, পড়ালেখা, ক্যারিয়ার সম্পর্কিত সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম, ছবি, ভিডিও প্রতিবেদন সবার আগে দেখতে চোখ রাখুন শিক্ষাবার্তায়

“মুক্তমত ও সাক্ষাৎকার কলামে প্রকাশিত নিবন্ধ লেখকের নিজস্ব। শিক্ষাবার্তা’র সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে নিবন্ধ ও সাক্ষাৎকারে প্রকাশিত মত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে। প্রকাশিত লেখাটির ব্যাখ্যা বা বিশ্লেষণ, তথ্য-উপাত্ত, রাজনৈতিক, আইনগতসহ যাবতীয় বিষয়ের দায়ভার লেখকের, শিক্ষাবার্তা কর্তৃপক্ষের নয়।”


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.