এইমাত্র পাওয়া

শিক্ষায় বৈষম্য দূরীকরণে একমাত্র সমাধান শিক্ষা জাতীয়করণ

।। উপাধ্যক্ষ, মোঃ আবদুর রহমান।।

শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড। আর শিক্ষার মেরুদণ্ড হলো শিক্ষক। কারিগর যত দক্ষ, আধুনিক, রুচিশীল ও শিল্পমনস্ক হবে; শিল্প তত উন্নত, মানসম্মত ও চিত্তাকর্ষক হবে।

সেবককে ভুখা/অভুক্ত/তৃষ্ণার্ত রেখে উত্তম সেরা আশা করা যায় না। আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশের জাতীয় শিক্ষাব্যবস্থার ৯৭ শতাংশ পরিচালিত হয় বেসরকারি শিক্ষাব্যবস্থার মাধ্যমে। আমাদের শিক্ষকসমাজ নানা প্রতিকূলতা সত্ত্বেও অক্লান্ত পরিশ্রমের মাধ্যমে জাতিকে শিক্ষাসেবা দিয়ে আসছে। নিজেদের শ্রম ও মেধার সর্বোচ্চ প্রয়োগ ঘটিয়ে জাতির মেরুদণ্ডকে সমুন্নত রাখতে তারা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।

দেশের স্বনামধন্য রাষ্ট্রনায়ক, শিক্ষাবিদ, বুদ্ধিজীবী, চিকিৎসক, জ্ঞানী-গুণী তৈরি হয় সম্মানিত শিক্ষকদের রক্ত এবং ঘামের বদৌলতে। অত্যন্ত পরিতাপ ও লজ্জার বিষয় হলো, রাষ্ট্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হওয়ার কথা থাকলেও আমাদের দেশে সবচেয়ে অবহেলিত ও অবমূল্যায়িত ব্যবস্থা হলো বেসরকারি শিক্ষাব্যবস্থা এবং এর সাথে সম্পৃক্ত ব্যক্তিরা। স্বাধীনতার অর্ধশতাব্দী পরও শিক্ষকদের বেতন হয় এমপিওর (গড়হঃযষু ঢ়ধুসবহঃ ড়ৎফবৎ) মাধ্যমে।

একবিংশ শতাব্দীর এ আধুনিক যুগে এসে একজন কায়িক শ্রমিকও মাসিক পারিশ্রমিকের ভিত্তিতে কাজ করতে চায় না। একজন শিক্ষকের জন্য এর চেয়ে অসম্মান আর কী হতে পারে! স্বাধীনতার ৫০ বছর অতিক্রম করার পরও বেতনভাতার দাবিতে শিক্ষককে রাজপথে আন্দোলন করতে হয়, প্রেস ক্লাবে অনশন করতে হয়, বিভিন্নজনের কাছে আবেদন-নিবেদন করতে হয়, শিক্ষকতাকে অন্যসব পেশার সমপর্যায়ভুক্ত করতে বলতে হয়।

উচিত ছিল বেতন কাঠামো, সামাজিক মর্যাদা ও অন্যান্য দিক থেকে সবার ওপরে থাকবে শিক্ষকসমাজ, অন্য সব পেশাজীবী শিক্ষকদের সমপর্যায়ভুক্ত হওয়ার চেষ্টা করবে। ভাগ্যের নির্মম পরিহাস! আজ সম্মানিত শিক্ষকসমাজকে অধিকার আদায়ের জন্য শ্রেণিকক্ষ ছেড়ে রাজপথে নামতে হচ্ছে- এসব কি স্বাধীনতার চেতনার সাথে অসঙ্গতিপূর্ণ নয়? এসব সমস্যার একমাত্র সমাধান হলো শিক্ষাব্যবস্থা জাতীয়করণ করা।

সরকারের কাছে বিনীত অনুরোধ, শিক্ষকসমাজকে আর অপমানিত ও অবহেলিত না করে নিম্নোক্ত সব কারণ বিবেচনায় রেখে দ্রুত শিক্ষাব্যবস্থা জাতীয়করণের ঘোষণা প্রদান করবেন।

কারণগুলো :

আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার ৯৭ শতাংশ বেসরকারি আর মাত্র ৩ শতাংশ সরকারি। এ বৃহৎ জনগোষ্ঠীকে অবহেলিত রেখে কাক্সিক্ষত উন্নতি দুরাশা মাত্র। স্বাধীনতার পর এ পর্যন্ত সাতটি শিক্ষা কমিশন গঠিত হয়। প্রতিটি কমিশন শিক্ষা, জাতীয়করণের পক্ষে মত দিলেও কোনো অজ্ঞাত কারণে জাতীয়করণ হচ্ছে না; তা আমাদের বোধগম্য নয়।

জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০ সালে শিক্ষকদের জন্য পৃথক বেতন স্কেলের কথা থাকলে বাস্তবে তার কোনো প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। জাতীয়করণই একমাত্র সমাধান। জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০ সালে উল্লেখ করা হয়, শিক্ষা ক্ষেত্রে বিরাজমান সব বৈষম্য দূর করে সবার জন্য সমান সুবিধা নিশ্চিত করা হবে। বাস্তব ক্ষেত্রে বৈষম্য দূর হয়নি; আরো প্রকট হয়েছে ।

শিক্ষাব্যবস্থার মাধ্যমেই শিক্ষার্থীর মধ্যকার পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়। সরকারি প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীর বেতন ২০ টাকা; পক্ষান্তরে, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীর বেতন ১০০ থেকে ২০০ টাকা, ক্ষেত্র বিশেষে আরো বেশি। যেমনঃ মতিঝিল আইডিয়ালে টিউশন ফি-১৫০০ টাকা, মতিঝিল মডেল স্কুলে টিউশন ফি-১২০০ টাকা, বিকারুন্নেছা স্কুলে টিউশন ফি-১৬০০ টাকা, বিকারুন্নেছা কলেজ শাখায় টিউশন ফি-২৫০০ টাকা, মাইলস্টোন কলেজে নবম-দশম শ্রেণীতে ২০২০-২০২৪ সালে টিউশন ফি নির্ধারণ করা হয়েছে ২৪৫০ টাকা বলে জানা গেছে। এটি কোনো সুসম শিক্ষাব্যবস্থার চিত্র হতে পারে না। শিক্ষকরা ২৫ শতাংশ করে বছরে দুটি উৎসর ভাতা পান আর কর্মচারীরা পান ৫০ শতাংশ। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির বাজারে ২৫ শতাংশ ভাতা কোনোভাবেই সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

আরেকটি সমস্যা হলো, ১৬০০০ টাকা স্কেলে একজন মাস্টার্স পাস শিক্ষক বোনাস পান ৪০০০ টাকা আর ৮,২৫০ টাকা স্কেলে ৮ম শ্রেণী পাস কর্মচারী বোনাস পান ৪,১২৫ টাকা। এ বৈষম্যের অবসান দরকার। শিক্ষকরা ৫০০ টাকা চিকিৎসা ভাতা পান। একবার চিকিৎসকের কাছে গেলে চিকিৎসকের ভিজিট ফি, বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও ওষুধ বাবদ কয়েক হাজার টাকার দরকার, সেখানে ৫০০ টাকা খুবই অপ্রতুল।

শিক্ষকরা বাড়িভাড়া বাবদ ১০০০ টাকা পান। ১০০০ টাকায় ঢাকা শহর তো দূরের কথা, অন্য কোনো শহর এমনকি গ্রামেও কোনো বাড়ি ভাড়া পাওয়া যায় না। সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য শিক্ষাভাতা থাকলেও বেসরকারীদের জন্য শিক্ষাভাতা নেই। স্বাধীন গণতান্ত্রিক দেশে এটি কাম্য হতে পারে না।

শিক্ষায় যে-সমস্ত বৈষম্য রয়েছে:
বেসরকারি শিক্ষকদের জন্য বদলি নেই, অনার্স মাস্টার্স পাঠদানকারী শিক্ষকদের এমপিও নেই, পূর্ণাঙ্গ ঈদ বোনাস নেই, পূর্ণাঙ্গ বাড়িভাড়া নেই, পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসা ভাতা নেই, টাইম স্কেল নেই, গৃহ ঋণ নেই, প্রমোশন নেই, বিনোদন ভাতা নেই, পূর্ণাঙ্গ পেনশন নেই, পূর্ণাঙ্গ ভবিষ্যত তহবিল নেই, শিক্ষাসহায়ক ভাতা নেই, পাহাড়ি ভাতা নেই, শুধু নেই আর নেই, শিক্ষায় সব সমস্যার সমাধান এমপিওভুক্ত শিক্ষা জাতীয়করণ।

বঙ্গবন্ধু বলেছেন, আমি আগে মুসলমান পরে বাঙ্গালী মক্তবের শিক্ষাই হলো বুনিয়াদি শিক্ষা। মুসলমান একবার মরে, দুইবার মরে না। সেই বঙ্গবন্ধুর দেশে শিক্ষায় বৈষম্য থাকতে পারে না। ৫০০/- টাকা বেতনে প্রাথমিক শিক্ষা ও ইবতেদায়ি শিক্ষা শুরু হয়েছে। হাজার হাজার প্রাথমিক বিদ্যালয় জাতীয়করণ করা হলেও একটি ইবতেদায়ি মাদরাসাও জাতীয়করণ করা হয় নাই। তাই ইবতেদায়ি মাদরাসা জাতীয়করণের দাবী জানাচ্ছি।

লেখক: মোঃ আবদুর রহমান
সহ-সভাপতি,
বাংলাদেশ শিক্ষক কর্মচারি ফোরাম

শিক্ষাবার্তা ডট কম/এএইচএম/১৬/১২/২০২৩ 

দেশ বিদেশের শিক্ষা, পড়ালেখা, ক্যারিয়ার সম্পর্কিত সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম, ছবি, ভিডিও প্রতিবেদন সবার আগে দেখতে চোখ রাখুন শিক্ষাবার্তায়

“মুক্তমত ও সাক্ষাৎকার কলামে প্রকাশিত নিবন্ধ লেখকের নিজস্ব। শিক্ষাবার্তা’র সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে নিবন্ধ ও সাক্ষাৎকারে প্রকাশিত মত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে। প্রকাশিত লেখাটির ব্যাখ্যা বা বিশ্লেষণ, তথ্য-উপাত্ত, রাজনৈতিক, আইনগতসহ যাবতীয় বিষয়ের দায়ভার লেখকের, শিক্ষাবার্তা কর্তৃপক্ষের নয়।”

 


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.