গাজী মোহাম্মদ এনামুল হক (ফারুক)।।
২০২০ সাল হয়ে থাকবে কালের সাক্ষী ! কারণ একটাই, সেটা হলো একদিকে বাংলাদেশ প্রস্তুতি নিচ্ছে মুজিব শতবর্ষ উদযাপনের জন্য অন্যদিকে করোনা মহারির আবির্ভাব ও দাপট। ২০২০ সালের ৮ মার্চ সর্বপ্রথম বাংলাদেশে করোনা রোগী সনাক্ত হয়। দিন যত গড়ায় করোনা ততো তীব্রগতি ধারণ করে মহামারিতে রূপ নিতে থাকে। সমগ্র বাংলাদেশের মানুষ হয়ে পড়ে তটস্থ ! পাশাপাশি সরকারও হয়ে পড়ে কিংকর্তব্যবিমূঢ় । একে একে বিভিন্ন অঞ্চল লকডাউনের আওতায় আসতে থাকে।
১৭ মার্চ থেকে বন্ধ হলো দেশের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। দিন যায়, রাত যায় করোনা যেন জেঁকে বসতে থাকে। দেশের সার্বিক পরিস্থিতি গুমোট হতে থাকে। ভেঙে পড়ে চিকিৎসা ও শিক্ষা ব্যবস্থা। মানুষ প্রহর গুনতে থাকে কখন সরকারের কাছ থেকে ভালো কোন দিকনির্দেশনা আসবে। এর মধ্যে যে যেমনিভাবে পেরেছে বেঁচে থাকার চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক সংকট বৃদ্ধি পেতে থাকে আর শিক্ষার্থীরা হয়ে পড়ে অলস। এর মধ্যে সরকারের সিদ্ধান্ত মোতাবেক হোমিওপ্যাথিক ও এলোপ্যাথিক চিকিৎসকেরা চিকিৎসা সেবায় এগিয়ে আসে। মাঠ পর্যবেক্ষণে দেখা যায় হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসকেরা বেশ সফলতা অর্জন করেন, পাশাপাশি এলোপ্যাথিক চিকিৎসা কার্যক্রমও সচল হয়ে ওঠে।
কিন্তু শিক্ষা ব্যবস্থার সংকট কিভাবে কাঁটবে ? এসময় সরকারের পক্ষ থেকে ঘোষণা আসে অনলাইনে শিক্ষা কার্যক্রম চালাতে হবে। যেই ঘোষণা, সেই কাজ ! শিক্ষকেরা এগিয়ে আসে সরকারের ডাকে সাড়া দিয়ে। কেউ বাড়িতে বসে কেউবা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে উপস্থিত হয়ে অনলাইনে ক্লাস নেওয়া শুরু করেন। কিন্তু, সমস্যা হলো সকলের তো আর প্রয়োজনীয় ডিভাইস নেই বা ইন্টারনেট সংযোগও নেই, যার দরুণ অনেকেই এই আয়োজন থেকে বঞ্ছিত হয়েছে আবার অনেকের ডিভাইস ও ইন্টারনেট সংযোগ থাকলেও অলসতার কারণে ক্লাসে আগ্রহ ছিল না । বিভিন্ন জরিপে দেখা যায় ঐ সময়ে ক্লাসের নাম করে অনেক মোবাইল বা ল্যাপটপ বিক্রি হয়েছে ঠিক-ই কিন্তু সেটা পরিচালিত হয়েছে পাবজি, ফ্রি-ফায়ার নামক গেম ও ফেসবুক আসক্তিতে।
করোনা সংক্রমণের কারণে ২০২০ সালের ১৭ মার্চ দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করেছিল সরকার। করোনা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলে দীর্ঘ ১৮ মাস পর ২০২১ এর সেপ্টেম্বরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়া হয়। তখন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দিলেও শ্রেণি কার্যক্রম চলছিল স্বল্প পরিসরে। সব শ্রেণির ক্লাস সব দিন হচ্ছিল না। কিন্তু নতুন করে করোনার সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ায় গত ২১ জানুয়ারি আবার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছুটি ঘোষণা করে সরকার। প্রথম দফায় এই ছুটি শেষ হওয়ার কথা ছিল ৬ ফেব্রুয়ারি, পরে তা আবার বাড়িয়ে ২১ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত করা হয়। যদিও সরকারের আন্তরিকতার ঘাটতি ছিল না । পরিস্থিতির শিকার হয়ে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলতে থাকে শিক্ষাব্যবস্থা। অবশেষে অভিভাবক,বিশিষ্ট্যজনের আলোচনা-সমালোচনার মুখে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খুললো এবং এখনও অব্যাহত ঠিকই কিন্তু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো যেন প্রাণ হারিয়ে নির্জীব হয়ে পড়েছে। নষ্ট হয়ে গিয়েছে হাজার হাজার ইলেকট্রিক ও ইলেকট্রনিক ডিভাইস, আর শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রাণ শিক্ষার্থীদের পদচারণা যেন কোনভাবেই গতি ফিরে পাচ্ছে না। এভাবে আর কত দিন চলবে। ফেরাতে হবে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রাণচাঞ্চল্যতা। কিন্তু, কিভাবে ?? শিক্ষার্থীর উপস্থিতি কম কেন ? এর সমাধানই বা কি ?
সংগদোষে পড়ে শিক্ষার্থীরা ক্লাস বিমুখ হচ্ছে, মোবাইলের প্রতি অতি আসক্তি, রাষ্ট্রীয়, প্রাতিষ্ঠানিক ও পারিবারিক নিয়ন্ত্রনের অভাব, অর্থনৈতিক দীনতা, সামাজিক নিরাপত্তাহীনতা, ছাত্র রাজনীতির কারণে সংঘাতময় ক্যাম্পাস, শিক্ষক-শিক্ষার্থীর মধ্যে দুরত্ব, স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যায়ের ক্লাস টাইমে কোচিং সেন্টারে পাঠদান, অভিভাবকদের সাথে প্রাতিষ্ঠানিক যোগাযোগের অভাব, পরীক্ষায় বেশি বেশি নম্বর প্রদান, সহজে পাশের নিশ্চয়তা, শিক্ষকের ক্লাস পরিচালনা দক্ষতায় ঘাটতি, আকর্ষণীয় ক্লাস পরিচালনায় শিক্ষকের ব্যর্থতা, মোবাইল গেম ও ফেসবুকে আসক্তি, করোনাকালীন সময়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কম্পিউটার, ল্যাপটপ, প্রজেক্টর, আইপিএস, ইউপিএস, প্রিন্টার, স্ক্যানার সহ প্রয়োজনীয় ইলেক্ট্রিক ও ইলেক্ট্রোনিক ডিভাইস বিকল হয়ে পড়ার কারনে যথাযথভাবে পাঠদানে বিঘ্নতা সৃষ্টি, ছাত্রীদের ক্ষেত্রে ইভিটিজিং এর ভীতি ইত্যাদি কারণে স্কুল-কলেজে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি আশংকাজনকহারে কমতে শুরু করেছে। শিক্ষার্থী অনুপস্থিতির জন্য প্রধানত দুইটি কারণ রয়েছে। প্রথমতঃ একাডেমিক দূর্বলতা এবং দ্বিতীয়তঃ প্রশাসনিক দূর্বলতা।
তিনি মনে করেন শিক্ষকদের পাঠদানের কৌশলে ঘাটতি রয়েছে যার দরুণ তাঁরা শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রেষণা তৈরীতে ব্যর্থ হচ্ছেন। আবার প্রশাসনিক দূর্বলতার কারণে স্কুল বা কলেজ প্রধানগণ যথাযথভাবে ক্লাস মনিটরিং করছেন না। যথাসময়ে শিক্ষক তাঁর ক্লাস নিচ্ছেন কি-না তার তদারকিতে আছে ঘাটতি। শিক্ষার্থীরা কেন ক্লাসে উপস্থিত থাকছে না বা শিক্ষক কেমন পাঠদান করেন সে ব্যাপারে কোন খোঁজ খবর নিচ্ছেন না প্রতিষ্ঠানের কর্তা ব্যক্তিগণ, অভিভাবকদের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করছেন না। তাছাড়া অভিভাবক মিটিং আহবান না করায় শিক্ষার্থীর নৈতিকতা সম্পর্কে অভিভাবক অজ্ঞাত থেকে যাচ্ছেন। তিনি আরও মনে করেন সমগ্র শিক্ষা ব্যবস্থাপনার মধ্যেই রয়েছে সমন্বয়হীনতা, নামকাওয়াস্তে গতানুগতিক রিপোর্ট প্রদান করে সবাই ঘাড় গুঁজে চলছেন, নেই চেইন অব কমান্ড যেটা শিক্ষার্থীদের ক্লাসে অনুপস্থিতির অন্যতম কারণ হতে পারে। শ্রেণিকক্ষে উপস্থিতির ব্যাপারে শিক্ষার্থী জরিপ, শিক্ষার্থীদের প্রতিনিয়ত কাউন্সিলিং না করা, অনুপস্থিতির জন্য প্রাতিষ্ঠানিক শাস্তির বিধান কার্যকর না থাকা, অপসংস্কৃতি চর্চা যেমন: Rag-ডে, বিদায়, নবীন বরণ কেন্দ্রিক উচ্ছৃঙ্খলতা বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ শিক্ষার্থীর উপস্থিতি কমছে।
সরকার কোটি কোটি টাকা ব্যয় করে শিক্ষককে মাল্টিমিডিয়া ক্লাসের মাধ্যমে প্রেষণামূলক ও শ্রেণি উপযোগী ক্লাস উপস্থাপন কৌশল ট্রেনিং দিচ্ছেন ঠিকই কিন্তু যথাযথ তদারকিতে ঘাটতির কারণে ট্রেনিং সেশন শেষে শিক্ষকেরা পুরাতন কায়দায় আবারও ক্লাস শুরু করছেন, শিক্ষার্থীকে দিচ্ছেন না তার অর্জিত ট্রেনিং এর ফলাফল। তাছাড়া ছাত্রীদের উপর অভিভাবকদের অনাস্থার সম্পর্ক তৈরি হওয়ায় তাদেরকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যেতে দিতেও ভয় পান। তাঁদের মনে আতঙ্ক কাজ করে না জানি মেয়েটা কোন অঘটন ঘটিয়ে ফেলে, এটাও ছাত্রী শিক্ষার্থীদের ক্লাসে অনুপস্থিতির অন্যতম কারণ।
ক্লাসে শিক্ষকদের আন্তরিকতার যথেষ্ট ঘাটতি রয়েছে। যেসব শিক্ষক ক্লাসে তৎপর, আন্তরিক, যোগ্য ও দক্ষ তাদেরকে অবমূল্যায়ন করলে ধীরে ধীরে তাদের তৎপরতা কমে যেয়ে নিষ্ক্রিয় ও নিস্তেজ হয়ে পড়ে বিধায় যোগ্যতার মূল্যায়ন সাপেক্ষে পুরস্কৃত করলে অন্য শিক্ষকেরাও উৎসাহিত হয়ে ক্লাসের তৎপরতা ও আন্তরিকতা বাড়াবে, যেটা শিক্ষার্থীকে ক্লাসে উপস্থিত হতে সহযোগিতা করতে পারে। যেসব শিক্ষক প্রাইভেট বা কোচিং এর সাথে যুক্ত তাঁরা ডাক্তারদের মত ব্যক্তিগত প্রতিষ্ঠানে আনার ব্যাপারে তৎপর কিন্তু ক্লাসে ততটা আন্তরিক নন। আমি মনে করি শিক্ষকের আন্তরিকতা ও সুন্দর উপস্থাপন থাকলে শিক্ষার্থীরা ক্লাসমূখী হবে।
শিক্ষকদের হাতে কিছু নম্বর থাকা প্রয়োজন যার ভয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে উপস্থিতির হার বাড়তে পারে। তাছাড়া পূর্ণাঙ্গ উপবৃত্তি চালু করে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি নিশ্চিত করার সুযোগ রয়েছে। আনুগত্য, ভদ্রতা, ক্লাসে উপস্থিতি, সদাচরণের উপর অভ্যন্তরীণ মূল্যায়নের পাশাপাশি নিয়মিত খেলাধূলা, সাংস্কৃতিক চর্চা, বিভিন্ন ইনডোর-আউটডোর ইভেন্ট শিক্ষার্থীদের উজ্জীবিত করতে সহযোগিতা করবে। শিক্ষার্থী কোথায় কার সাথে মেলামেশা করছে পরিবার তার তদারকি করবে, প্রাতিষ্ঠানিক ও পারিবারিকভাবে মোবাইলের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ জরুরী হয়ে পড়েছে। ১২/১০/২০১৭ খ্রিঃ সরকার একটি প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মোবাইল নিষিদ্ধ করলেও জেলা, উপজেলা শিক্ষা অফিস অথবা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নিষ্ক্রিয় ভূমিকা কেন পালন করছেন তা জানতে খুব ইচ্ছা করে। প্রতিষ্ঠান প্রধান তাৎক্ষনিক শ্রেণি কক্ষ ভিজিট করে ক্লাস, শিক্ষার্থীদের লেখাপড়া ও উপস্থিতির খোঁজ খবর নিয়ে মোটিভেশনের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারেন খুব সহজেই।
প্রস্তুতিবিহীন গতানুগতিক ক্লাস বর্জন, তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করে আকর্ষণীয় ক্লাস উপস্থাপন হচ্ছে কি-না সে ব্যাপারে মন্ত্রণালয়, জেলা, উপজেলা শিক্ষা অফিস ও প্রতিষ্ঠান প্রধানদের কঠোর ভূমিকা পালন জরুরী। এমতাবস্থায় শ্রেণিকক্ষে কার্যকরী পাঠদান ও শিখন-শেখানো কার্যক্রম শিক্ষার্থী বান্ধব ও গতিশীল করার লক্ষ্যে সরকার, মন্ত্রণালয়, জেলা-উপজেলা শিক্ষা অফিস, সুশীল সমাজ, গভর্ণিং বডি, অধ্যক্ষ, ম্যানেজিং কমিটি, প্রধান শিক্ষক, শিক্ষক-অভিভাবক ও প্রশাসন সকলে মিলে আমরা এক কাঁতারে সামিল না হলে কালের গর্ভে হারিয়ে যাবে আমাদের আগামীর মেধা, ভবিষ্যত ও প্রত্যাশা।
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
