এইমাত্র পাওয়া

কার্ড ঝুলালেই সাংবাদিক—এ কেমন বাস্তবতা!

।। এ এইচ এম সায়েদুজ্জামান।। 
গ্রামের নাম চরখালপাড়া। সেখানে সফিক নামের এক যুবক ছিল। একসময় বাজারে চায়ের দোকানে বসে সারাদিন রাজনীতি, ক্রিকেট আর মানুষের সমালোচনা করাই ছিল তার প্রধান কাজ। লেখাপড়া বলতে কোনোমতে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত। কিন্তু হঠাৎ একদিন তার জীবনে যেন আলোর ঝলকানি নামল। স্থানীয় এক অনলাইন পোর্টালের “স্টাফ রিপোর্টার” লেখা একটি কার্ড গলায় ঝুলিয়ে সে বাজারে হাজির।
সেদিন থেকেই সফিক আর সাধারণ মানুষ নেই। এখন সে “সাংবাদিক সফিক ভাই”।

বাজারে ঢুকতেই সে গলা খাঁকারি দিয়ে বলে, —“এই যে, খবরদার! আমি কিন্তু প্রেসের লোক!” চায়ের দোকানদার আগে যেখানে তাকে বাকিতে চা দিত না, এখন হাসিমুখে বলে, —“সাংবাদিক ভাই, এক কাপ স্পেশাল দেই?”

সফিকের সাংবাদিকতার প্রধান কাজ ছিল যেকোনো অনুষ্ঠানে গিয়ে মোবাইল উঁচু করে দুই মিনিট ভিডিও করা। এরপর সভাপতি, সেক্রেটারি কিংবা প্রধান অতিথির পেছনে ঘুরঘুর করা। —“ভাই, নিউজটা কিন্তু সুন্দর করে দিমু… একটু দেখেন।”

“একটু দেখেন” কথাটার মানে সবাই বুঝত। কেউ ২০০ টাকা দিত, কেউ ৫০০। বড় অনুষ্ঠান হলে এক প্লেট বিরিয়ানি আর যাতায়াত ভাড়াও মিলত। একদিন উপজেলা পরিষদের এক সভায় সফিক গিয়ে সামনের সারিতে দাঁড়িয়ে ভিডিও করছিল। হঠাৎ একজন প্রকৃত সাংবাদিক তাকে জিজ্ঞেস করলেন, —“আপনি কোন মিডিয়ায়?”

সফিক গর্ব করে বলল, —“অনলাইন নিউজ টোয়েন্টিফোর ডট কম বাংলা আন্তর্জাতিক মাল্টিমিডিয়া প্রেস।” সাংবাদিক আবার প্রশ্ন করলেন, —“আচ্ছা, সাংবাদিক বানানটা বলতে পারবেন?”

সফিক কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল, —“এইসব বানান জানা লাগে নাকি? কাজ জানলেই হইব!” ঘরে ফেরার পথে সফিক তার ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিল— “সত্যের সন্ধানে নির্ভীক কলম সৈনিক।” অথচ তার জীবনে কখনো কলম দিয়ে দুই লাইন সংবাদও লেখা হয়নি।

আজ বাংলাদেশের বহু জায়গায় সফিক একা নয়। হাজার হাজার “সফিক” জন্ম নিয়েছে। হাতে একটি মোবাইল, গলায় একটি কার্ড আর ফেসবুক লাইভ করার ক্ষমতা থাকলেই যেন সাংবাদিক হওয়া যায়। ফলে প্রকৃত সাংবাদিকতা আজ প্রশ্নবিদ্ধ, পেশাটির মর্যাদা ক্ষতিগ্রস্ত এবং সমাজ বিভ্রান্ত।

একসময় সাংবাদিকতা ছিল জ্ঞান, সততা, সাহস ও দায়বদ্ধতার পেশা। সমাজের অসঙ্গতি তুলে ধরা, ক্ষমতাবানদের জবাবদিহির আওতায় আনা এবং মানুষের কথা রাষ্ট্রের কাছে পৌঁছে দেওয়াই ছিল সাংবাদিকদের মূল দায়িত্ব। সাংবাদিক মানে ছিল একজন সচেতন, পড়াশোনায় সমৃদ্ধ, দায়িত্বশীল মানুষ। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই মর্যাদাপূর্ণ পেশাটি আজ অনেকাংশে হাস্যরসের উপাদানে পরিণত হয়েছে।

বর্তমানে দেশের আনাচে-কানাচে এমন এক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে যেখানে একটি ভাঙাচোরা মোবাইল ফোন, একটি ফেসবুক আইডি আর গলায় ঝোলানো একটি পরিচয়পত্র থাকলেই মানুষ নিজেকে সাংবাদিক পরিচয় দিচ্ছে। কোনো প্রশিক্ষণ নেই, ন্যূনতম ভাষাজ্ঞান নেই, সংবাদ লেখার দক্ষতা নেই—তবুও তারা “প্রেস” পরিচয়ে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে।

গ্রামগঞ্জে এখন এমন দৃশ্য অহরহ দেখা যায়—কোথাও একটি মানববন্ধন, সভা কিংবা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হলেই একদল লোক মোবাইল হাতে সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে। তাদের আচরণ দেখে বোঝা কঠিন হয়ে যায় কারা প্রকৃত সাংবাদিক আর কারা অনুষ্ঠানের দর্শক। অনুষ্ঠান শেষে তাদের অনেকের মূল কাজ শুরু হয় সভাপতি, সম্পাদক কিংবা অতিথিদের পেছনে ঘুরঘুর করা। লক্ষ্য একটাই—কিছু টাকা পাওয়া যাবে কি না।

এ এক ভয়ংকর সংস্কৃতি। সাংবাদিকতা যেন অনেকের কাছে পেশা নয়, বরং সহজে পরিচিতি ও প্রভাব খাটানোর মাধ্যম হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো, এই তথাকথিত সাংবাদিকদের অনেকেই ভাষা ও বানানের ন্যূনতম জ্ঞান রাখেন না। “সাংবাদিক” শব্দের বানান লিখতে পারেন না, অথচ নিজেকে “জাতীয় দৈনিকের বিশেষ প্রতিনিধি” দাবি করেন। সংবাদ কী, মতামত কী, সম্পাদকীয় কী—এসবের কোনো ধারণাই নেই। কিন্তু ফেসবুক লাইভে বড় বড় কথা বলতে তাদের জুড়ি নেই।

এর পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ হলো অনলাইন মিডিয়ার অনিয়ন্ত্রিত বিস্তার। বর্তমানে দেশে অসংখ্য নামসর্বস্ব অনলাইন পোর্টাল গড়ে উঠেছে, যাদের অনেকের নেই অফিস, নেই সম্পাদকীয় নীতি, নেই প্রশিক্ষিত জনবল। শুধু একটি ওয়েবসাইট খুলে কিংবা ফেসবুক পেজ চালু করেই সাংবাদিক নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে। বিনিময়ে দেওয়া হচ্ছে একটি আইডি কার্ড। আর সেই কার্ডই হয়ে উঠছে ক্ষমতা দেখানোর অস্ত্র।

ফলে প্রকৃত সাংবাদিকরা আজ বিব্রত। যারা বছরের পর বছর পড়াশোনা, প্রশিক্ষণ ও মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতার মাধ্যমে সাংবাদিকতায় এসেছেন, তাদের সঙ্গে একই কাতারে দাঁড়িয়ে যাচ্ছে অদক্ষ ও অপেশাদার মানুষ। এতে পুরো পেশাটিই প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে।

সাংবাদিকতা কখনোই শুধুমাত্র ভিডিও করা নয়। এটি একটি জ্ঞানভিত্তিক ও নৈতিক দায়িত্বপূর্ণ কাজ। একজন প্রকৃত সাংবাদিককে ইতিহাস জানতে হয়, রাষ্ট্রব্যবস্থা বুঝতে হয়, আইন সম্পর্কে ধারণা রাখতে হয়, ভাষা ও উপস্থাপনায় দক্ষ হতে হয়। সর্বোপরি সত্যের প্রতি দায়বদ্ধ থাকতে হয়। কিন্তু বর্তমানে অনেকেই সাংবাদিকতাকে শুধুমাত্র “মাইক ধরা” কিংবা “ভিডিও করা” বলে মনে করছে।

এই প্রবণতা সমাজের জন্যও ক্ষতিকর। কারণ অপেশাদার সাংবাদিকতা গুজব, বিভ্রান্তি ও ব্ল্যাকমেইলের সংস্কৃতি তৈরি করে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, ছোটখাটো ব্যবসায়ী কিংবা সরকারি কর্মকর্তাদের ভয় দেখিয়ে সুবিধা নেওয়া হচ্ছে। সংবাদ প্রকাশের ভয় দেখিয়ে টাকা আদায়ের ঘটনাও কম নয়। এতে সাধারণ মানুষের চোখে সাংবাদিকদের প্রতি নেতিবাচক ধারণা তৈরি হচ্ছে।

রাষ্ট্র ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষেরও এ বিষয়ে দায়িত্ব রয়েছে। সাংবাদিক পরিচয় দেওয়ার জন্য একটি সুস্পষ্ট নীতিমালা থাকা প্রয়োজন। কে সাংবাদিক হবেন, তার ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা কী হবে, কোন প্রতিষ্ঠান বৈধ—এসব বিষয়ে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। শুধু আইডি কার্ড ছাপিয়ে সাংবাদিকতা করার সুযোগ বন্ধ করতে হবে।

একই সঙ্গে সাংবাদিক সংগঠনগুলোকেও এগিয়ে আসতে হবে। প্রকৃত সাংবাদিকদের মর্যাদা রক্ষায় অপসাংবাদিকতার বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে হবে। না হলে একসময় সমাজে “সাংবাদিক” শব্দটির প্রতি মানুষের শ্রদ্ধাই হারিয়ে যাবে।

আজ প্রয়োজন সাংবাদিকতার মান ও মর্যাদা পুনরুদ্ধার করা। কারণ একটি রাষ্ট্রে গণমাধ্যম দুর্বল হলে গণতন্ত্রও দুর্বল হয়ে পড়ে। আর গণমাধ্যম শক্তিশালী হয় তখনই, যখন সেখানে জ্ঞান, সততা ও পেশাদারিত্ব থাকে।

সাংবাদিকতা কোনো ভিক্ষাবৃত্তি নয়, কোনো দাপট দেখানোর লাইসেন্স নয়। এটি মানুষের অধিকার রক্ষার সংগ্রাম। তাই হাতে মোবাইল আর গলায় কার্ড ঝুলালেই কেউ সাংবাদিক হয়ে যায় না। সাংবাদিক হতে হলে প্রয়োজন শিক্ষা, নৈতিকতা, দায়িত্ববোধ এবং সত্যের প্রতি অঙ্গীকার।

লেখক: সম্পাদক,  শিক্ষাবার্তা।


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.