এইমাত্র পাওয়া

শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন জরুরী

শিক্ষার্থীদের জন্যই সব আয়োজন—শিক্ষক, প্রতিষ্ঠান, ব্যবস্থাপনা কমিটি, প্রশাসন, বই, শিক্ষা উপকরণ, শিখন-শেখানো কার্যক্রম, বৃত্তি, উপবৃত্তি, পরীক্ষা, মূল্যায়ন, সহশিক্ষা কার্যক্রমসহ যাবতীয় সবই। এখানে যোগ্যতম ও প্রকৃত ব্রতচারী শিক্ষকের ভূমিকাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তবে দুর্ভাগ্যের বিষয়, বাংলাদেশের সব পর্যায়ে শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়া আশঙ্কাজনক ত্রুটিপূর্ণ। তাই স্বতন্ত্র শিক্ষক নিয়োগ কমিশনের বিকল্প নেই। স্নাতক পাশ একজন শিক্ষার্থীকে সরাসরি শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেওয়াটা ঠিক নয়। একজন সেরা মেধাবী সব সময় সেরা শিক্ষক হবেন—এমন কোনো কথা নেই। আবার মেধাহীন শিক্ষক কোনো যুক্তিতেই কাম্য নয়। মেধার সঙ্গে শিক্ষাকে ব্রত করে যিনি আন্তরিকতা নিয়ে শিক্ষক হতে চান তিনিই হবেন শ্রেষ্ঠ শিক্ষক। অবশ্যই একজন আদর্শ শিক্ষকের দেশপ্রেম, নৈতিকতা, মূল্যবোধ, ইতিহাস-ঐতিহ্য লালনের পাশাপাশি থাকতে হবে প্রযুক্তিগত জ্ঞান। শ্রেণি কার্যক্রম, সহশিক্ষা কার্যক্রম, দাপ্তরিক কাজে সহযোগিতা ও বিশেষ করে মূল্যায়নকার্যে একজন আদর্শ শিক্ষক নির্মোহ দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে সর্বোচ্চ সততা ও নিষ্ঠা বজায় রাখবেন। বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে যে কোনো পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে সবার আগে একজন শিক্ষককেই মানিয়ে নিতে হবে। বিশেষ করে প্রযুক্তির ব্যবহার, ব্যবহারিক ক্লাস, শিক্ষার্থীর দক্ষতার স্তর নিরূপণকল্পে শিক্ষাদান, প্রজেক্টভিত্তিক শিখন কার্যক্রম বাস্তবায়নে শিক্ষার্থীদের সরাসরি ও প্রান্তিক অভিজ্ঞতা লাভের সুযোগ প্রদানে একজন শিক্ষক হবেন প্রাণপ্রাচুর্যে ভরপুর। শিক্ষার্থীর প্রতিটি ইতিবাচক অভ্যাস তৈরি ও স্বপ্নের পরিধি বড় করে সেই পথে ভ্রমণের আনন্দ উপভোগ্য রাখতে আগ্রহের জায়গাটি তীব্রতর করতে পারাটাই একজন শিক্ষকের সার্থকতা। অথচ বর্তমান নিয়োগ প্রক্রিয়ায় যেভাবে শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয় তাতে প্রকৃত শিক্ষকের পরিবর্তে ঘটনাচক্রে চাকরি করাদেরই অনুপ্রবেশ বেশি ঘটে। তাই শিক্ষক নিয়োগে প্রক্রিয়াগত পরিবর্তন অবশ্যই জরুরি।
সরাসরি শিক্ষক নিয়োগের আগে শিক্ষক হয়ে ওঠায় গভীর যত্নশীল মনোযোগ দেওয়া এখন সময়ের দাবি। স্নাতক (বিশেষায়িত) পরীক্ষার পর যাঁরা শিক্ষক হতে চান তাঁদের অনলাইনে কাম্য যোগ্যতা ও ছাত্রজীবনে অর্জিত সহশিক্ষাক্রমিক অতিরিক্ত যোগ্যতার ভিত্তিতে আবেদনপূর্বক ডাটাবেজ করা যেতে পারে। ডাটাবেজ থেকে অনুকূল এলাকাভিত্তিক প্রতিষ্ঠানে ক্লাস পেমেন্ট টিচার (সিপিটি) হিসেবে একজন সিনিয়র গাইড শিক্ষকের তত্ত্বাবধানে তাঁদের প্রারম্ভিক নিয়োগ দেওয়া যেতে পারে। তাঁরা মূল শিক্ষকের শূন্যস্থানে সাময়িক প্রয়োজনে তাঁদের দক্ষতা বাড়াতে ক্লাস নেবেন। সমস্ত ক্লাস এমএমসি ড্যাশ বোর্ডের মতো অনলাইনে আপলোড থাকবে। এভাবে দু বছর তাঁরা সিপিটি হিসেবে কমপক্ষে এক হাজারটি ক্লাসের প্রতিটি ক্লাসের জন্য সরকার কর্তৃক সম্মানজনক হারে সম্মানী পাবেন। একইসঙ্গে এই সময়ের অর্জিত অভিজ্ঞতার আলোকে একটি অ্যাসাইনমেন্ট গাইড শিক্ষকের কাছে জমা দেবেন। পাশাপাশি কমপক্ষে তিনটি পাবলিকেশন স্বীকৃত জার্নালে প্রকাশ করতে হবে। এই সময়ের মধ্যে তিনি স্নাতকোত্তর ডিগ্রিও অর্জন করে ফেলবেন। স্নাতকোত্তর পর্যায়ে শিক্ষা বিষয়ক একটি অতিরিক্ত কোর্স তাঁদের অধ্যয়ন করতে হবে। গাইড শিক্ষকের নির্দেশনার আলোকে শিক্ষকতায় প্রাথমিক অভিজ্ঞতার পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে একটি মূল্যায়ন সনদপ্রাপ্ত হবেন। এরপর সিপিটিদের মধ্য থেকে ভর্তি পরীক্ষার মাধ্যমে সিইএনএড, বিএড, বিপিএড প্রশিক্ষণার্থী বাছাই করা হবে। প্রশিক্ষণটি অবশ্যই সরকারি ব্যবস্থাপনায় হবে এবং সব প্রশিক্ষণার্থীকে নির্দিষ্ট হারে ভাতা প্রদানের ব্যবস্থা থাকবে। সফলভাবে উত্তীর্ণ প্রশিক্ষণার্থীদের মধ্য থেকে শিক্ষক নিয়োগ কমিশনের মাধ্যমে নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ায় চূড়ান্ত বাছাই করে প্রাথমিক থেকে পরবর্তী পর্যায়ের সব শিক্ষক নিয়োগ দিতে হবে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপকের মতো ইমেরিটাস শিক্ষক পদ সৃষ্টি করা যেতে পারে। এ সম্মানজনক পদে অবসর গ্রহণের পর অসাধারণ যোগ্যতা, পেশাগত দক্ষতা, অভিজ্ঞতা, পাবলিকেশন, জাতীয় পর্যায়ে স্বীকৃতিসহ শারীরিক ও মানসিক সামর্থ্য থাকা সাপেক্ষে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য নিয়োগপ্রাপ্ত হবেন। ইমেরিটাস শিক্ষকগণ সব প্রশিক্ষণ কার্যক্রমে মাস্টার ট্রেইনার, প্রশ্নপত্র মডারেশন ও কারিকুলাম উন্নয়নে ভূমিকা রাখার ক্ষেত্রে প্রাধিকার পাবেন। তাঁরা বিশেষ শিক্ষা কার্যক্রমে সংযুক্ত থাকার পাশাপাশি সিপিটিদের গাইড শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। শিক্ষকদের আর্থিক সুবিধা কোনো শ্রেণিতে না ফেলে তাঁদেরকে রাখতে হবে শ্রেণির ঊর্ধ্বে।


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.