প্রথমে একই শিরোনামে আমার আগের দুটি পর্ব ‘শিক্ষাবার্তা ডট কম’ এ প্রকাশিত হওয়ায় কর্তৃপক্ষকে আন্তরিক অভিনন্দন ও অশেষ কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছি। আমার লেখা প্রথম পর্বটি গত বছরের ২৮ আগস্ট এবং দ্বিতীয় পর্বটি ১০ সেপ্টেম্বর শিক্ষাবার্তায় প্রকাশিত হয়। যদিও আরো অনেকগুলো লেখা এর পরে বিভিন্ন শিরোনামে শিক্ষাবার্তায় প্রকাশিত হয়েছে তারপরেও কলেজ সরকারিকরণের কাজে নতুন করে কিছু অসংগতি নজরে আসায় এ শিরোনামে তৃতীয় পর্বটি লেখা খুবই গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছি।
আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের শিক্ষা বিপ্লবের অন্যতম পুরোধা দেশরত্ন শেখ হাসিনার একান্ত ব্যক্তিগত উদ্যোগে ২০১৬ সাল থেকে প্রতিটি উপজেলায় একটি করে কলেজ ও একটি করে মাধ্যমিক বিদ্যালয় সরকারিকরণের কাজ শুরু হয়। বর্তমানে ৩০২ টি কলেজ সরকারিকরণের চূড়ান্ত প্রক্রিয়ায় রয়েছে।
কিন্তু ২০১৬ সালে শুরু হওয়া কাজ ২০২০ সালে এসেও শেষ করতে পারছেনা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। ছাত্রছাত্রীরা যখন প্রশ্ন করে কলেজ সরকারি হয়ে গেছে এখন আমরা বেসরকারি নিয়মে বেতন ও ফি দিব কেন? এর কোনো সদুত্তর আমরা তখন দিতে পারিনা। এ দীর্ঘ সময়ের মধ্যে একটি কলেজের কাজও শেষ হয়নি। কবে নাগাদ শেষ হবে সেটাও অনিশ্চিত! বিভিন্ন সূত্রে জানতে পেরেছি এ পর্যন্ত গুটিকয়েক কলেজের ফাইল শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।
বিভিন্ন কলেজের মূল কাগজপত্র মাউশিতে দেখানোর কাজ ছয় মাস অতিক্রান্ত হলেও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে মূল কাগজপত্র দেখানোর জন্য এখনো ডাকা হয়নি তাদের! মাউশি থেকে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে ফাইলগুলো আসতে সময় লেগেছে ২০১৬ সাল থেকে এখন পর্যন্ত প্রায় সাড়ে ৪ বছর। এখন শিক্ষা মন্ত্রণালয় আবার ফাইলগুলো যাচাই-বাছাই করে পাঠাবে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে। সেখানে পদ সৃষ্টির পর অর্থ বিভাগের ব্যবস্থাপনা, বাস্তবায়ন অনুবিভাগ এবং প্রশাসনিক উন্নয়ন সংস্থার সচিব কমিটির অনুমোদনের পর শিক্ষা মন্ত্রণালয় নীতিমালা অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট শিক্ষক-কর্মচারিদের নিয়োগ প্রদান করবে। যদি মাউশি থেকে মন্ত্রণালয়ে যেতে সময় লাগে সাড়ে ৪ বছর তাহলে বাকি কাজ শেষ হতে কত সময় লাগবে তা কে জানে!
এদিকে গেল বছরের ২২ ডিসেম্বরে বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে জানুয়ারিতে এডহক নিয়োগ সম্পন্নের যে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে তা ইতোমধ্যে মিথ্যা প্রতিপন্ন হয়েছে। মিডিয়ায় দেয়া এমন বক্তব্যে সাধারণ শিক্ষকরা বিভ্রান্তিতে পড়ছেন। আমাদের সদ্য সরকারিকৃত কলেজগুলোর বিভিন্ন সংগঠনের নেতৃবৃন্দকেও ইলেকট্রনিক বা প্রিন্ট মিডিয়ায় বক্তব্য দেয়ার সময় আরো বেশি সাবধানতা অবলম্বন করা উচিৎ। কারে কোনো বক্তব্যের কারণে আমাদের সাধারণ শিক্ষকরা যাতে বিভ্রান্তিতে না পরে সেদিকে খেয়াল রেখে বক্তব্য প্রদান করা খুবই জরুরি।
কাজের দীর্ঘসূত্রিতার কারণে দিন দিন আমাদের শিক্ষকরা চাকরি থেকে শূন্য হাতে অবসরে যাচ্ছেন। কেউ কেউ আবার অকালে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ার কারণে স্ত্রী-সন্তানরা অনিশ্চিত গন্তব্যের দিকে ধাবিত হচ্ছে। কলেজ সরকারিকরণের গেজেটের তারিখে যাদের বয়স ৫৯ হয়নি কিন্তু বর্তমানে তাদের বয়স অতিক্রম করেছে এরকম শিক্ষক-কর্মচারিদের ব্যাপারে কর্মকর্তাদের আরো বিচার বিবেচনার দ্বারা সিদ্ধান্ত নেয়া উচিৎ। কারণ এক্ষেত্রে কর্মকর্তাদের কাজের দীর্ঘসূত্রিতাই নিয়োগ না পেয়ে বয়স পেরিয়ে যাওয়ার মূল কারণ।
চাকরি স্থায়ীকরণের বিষয়ে ‘সরকারিকৃত কলেজ শিক্ষক ও কর্মচারী আত্তীকরণ বিধিমালা ২০১৮’ এর ৭(৩) ধারায় উল্লেখ আছে, “উপবিধি (২) এ যাহা কিছুই থাকুক না কেন, অস্থায়ীভাবে নিয়োগকৃত কোনো শিক্ষক বা কর্মচারী অবসরোত্তর ছুটি ভোগরত থাকিলে বা অবসর গ্রহণের বয়স উত্তীর্ণ হইলে বা মৃত্যুবরণ করিলে, তাহাকে, ক্ষেত্রমত, অবসরোত্তর ছুটিতে গমনের তারিখ বা অবসর গ্রহণের বয়স উত্তীর্ণের তারিখ বা মৃত্যুবরণের তারিখের অব্যবহিত পূর্ব তারিখে, সন্তোষজনক চাকরি সাপেক্ষে, ভূতাপেক্ষ কার্যকারিতা প্রদান করিয়া চাকরি স্থায়ী করা যাইবে।”
আমি মনে করি যদি চাকরি স্থায়ী করার ক্ষেত্রে এ ধারা কার্যকর করা যায় তাহলে কলেজ গেজেটের সময় যাদের বয়স ছিল কিন্ত পরে বয়স অতিক্রম করেছে তাদেরকে অবসর গ্রহণ বা মৃত্যুবরণের অব্যবহিত পূর্ব তারিখে সন্তোষজনক চাকরি দেখিয়ে ভূতাপেক্ষ কার্যকারিতা প্রদান করে নিয়োগ এবং স্থায়ীকরণের কাজ দুটোই একসাথে সমাপ্ত করে ভুক্তভোগী শিক্ষক-কর্মচারি বা তাঁদের পরিবারের সদস্যদের জীবনে আলো ফোটানো সম্ভব। আশাকরি কর্তৃপক্ষ এ ব্যাপারে আরেকটু সচেতন হবেন।
গত কয়েকদিন আগে বিভিন্ন পত্রিকায় এসেছে সদ্য সরকারিকৃত কলেজের শিক্ষক-কর্মচারিদের নিয়োগের দিন থেকে বেতন-ভাতা নির্ধারণ করা হবে নাকি কলেজ সরকারিকরণের তারিখ থেকে দেয়া হবে সেটা নিয়েও চিন্তাভাবনা চলছে! বিষয়টি নতুন করে শিক্ষকদেরকে চিন্তায় ফেলছে! আত্তীকরণ বিধিমালা ২০১৮ এর ৯ ধারায় বেতন ভাতাদি নির্ধারণ নিয়ে স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে “অস্থায়ীভাবে নিয়োগকৃত শিক্ষক ও কর্মচারিগণ, সংশ্লিষ্ট কলেজ সরকারিকরণের তারিখ হইতে, বিদ্যমান জাতীয় বেতন স্কেলের স্কেলের সংশ্লিষ্ট গ্রেডের প্ররাম্ভিক ধাপে স্ব স্ব পদের বেতন ভাতাদি প্রাপ্য হইবেন”
বিধিমালায় স্পষ্ট উল্লেখ থাকার পরেও এটা নিয়ে চিন্তা ভাবনার কি আছে? নাকি এটাও কাজকে দীর্ঘায়িত করার আরেকটা নতুন অপকৌশল? এসমস্ত নতুন নতুন বিষয় যোগ করার ফলে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী গ্রামীণ ও শহুরে শিক্ষা ব্যাবস্থার পার্থক্য কমিয়ে যে সোনার বাংলা উপহার দেয়ার মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করেছেন তা অধরাই থেকে যাবে। এমনকি প্রতিষ্ঠান সরকারিকরণের পুরো প্রক্রিয়াটি জনমনে বিরূপ প্রভাব ফেলে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর এ মহতী উদ্যোগটি প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে! এব্যাপারে সংশ্লিষ্ট সকলকে সতর্ক ও সজাগ থাকা উচিৎ।
সর্বোপরি উপজেলা ভিত্তিক প্রতিষ্ঠান সরকারিকরণের মূল উদ্দেশ্য যাতে অটুট থাকে এবং জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর এ মহতী উদ্যোগ যেন দ্রুত বাস্তবায়ন হয় সেদিকে সুনজর দেয়ার জন্য সরকারি কলেজ স্বাধীনতা শিক্ষক সমিতির পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্ট সকলের আন্তরিক সহযোগিতা কামনা করছি।
মো. শরীফ উদ্দিন
প্রভাষক, বিশ্বনাথ সরকারি কলেজ
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
