এইমাত্র পাওয়া

সঞ্চয়পত্রে আস্থার ভাঙন টাকা তুলে খাচ্ছে মানুষ

নিজস্ব প্রতিবেদক।।

কয়েক বছর আগেও সঞ্চয়পত্র ছিল সাধারণ মানুষের সবচেয়ে নিরাপদ বিনিয়োগ মাধ্যম। কিন্তু উচ্চ মূল্যস্ফীতি, জীবনযাত্রার বাড়তি ব্যয় এবং আয়ের চাপ সামলাতে গিয়ে অনেকেই এখন সঞ্চয়পত্র ভেঙে সংসার চালাচ্ছে। ফলে সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ কমে প্রায় প্রতি মাসেই নেতিবাচক অবস্থায় যাচ্ছে। সর্বশেষ মার্চ মাসেই নিট বিক্রি ঋণাত্মক হয়েছে প্রায় ২ হাজার ১৩৫ কোটি টাকা। আগের মাস জানুয়ারিতে নিট বিক্রি ঋণাত্মক হয়েছিল ১ হাজার ১৬৫ কোটি টাকা। সব মিলে চলতি অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে (জুলাই-মার্চ) নিট বিক্রি ঋণাত্মক হওয়ার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৬৯০ কোটি টাকা। অর্থাৎ আলোচ্য অর্থবছরে সঞ্চয়পত্র কেনার চেয়ে এই পরিমাণ বেশি ভাঙানো হয়েছে। মূলত সঞ্চয়পত্রে নতুন বিনিয়োগের চেয়ে মেয়াদপূর্তির টাকা উত্তোলন এবং মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই ভাঙানোর পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, মানুষের হাতে উদ্বৃত্ত আয় না ফিরলে এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে না এলে সঞ্চয়পত্রে ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি দ্রুত ফিরবে না। বরং আগামী মাসগুলোতেও আগাম ভাঙানোর প্রবণতা অব্যাহত থাকতে পারে।

সঞ্চয়পত্রের মোট বিক্রি থেকে মেয়াদপূর্তিতে আসল পরিশোধ ও আগাম ভাঙানোর অর্থ বাদ দেওয়ার পর যে পরিমাণ অবশিষ্ট থাকে, সেটিকেই নিট বিক্রি বা নিট বিনিয়োগ হিসেবে ধরা হয়। এই নিট বিক্রির অর্থ সরকার বাজেট ঘাটতি মেটাতে ব্যবহার করে থাকে। খাত সংশ্লিষ্টরা জানান, উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও মুনাফা হ্রাসের কারণে সঞ্চয়পত্রের আকর্ষণ কমেছে। বিশেষ করে জীবনযাত্রার ব্যয় এত বেড়েছে যে অনেকেই দীর্ঘমেয়াদি সঞ্চয় ধরে রাখতে পারছেন না। ফলে অনেকেই বাধ্য হয়ে পূর্বের সঞ্চয় ভেঙে খরচ মেটাচ্ছেন। নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের ওপর এই চাপ বেশি পড়েছে। অন্যদিকে সরকারি ট্রেজারি বিল-বন্ডের সুদের হার বৃদ্ধি পাওয়ায় প্রাতিষ্ঠানিক ও ব্যক্তিপর্যায়ের বিনিয়োগের একটি বড় অংশ সেখানে স্থানান্তর হচ্ছে। একই সঙ্গে আয়কর রিটার্ন, অনলাইন যাচাই এবং বিভিন্ন শর্ত কঠোর হওয়ায় অনেক বিনিয়োগকারী সঞ্চয়পত্র থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন। এর পাশাপাশি ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন এই প্রবণতাকে আরও ত্বরান্বিত করেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন মনে করেন, সঞ্চয়পত্রের বিক্রি কমে যাওয়ার পেছনে একাধিক কারণ কাজ করছে। তিনি আমাদের সময়কে বলেন, আগে সরকারের কাছ থেকে ঋণ নেওয়ার অন্যতম প্রধান মাধ্যম ছিল সঞ্চয়পত্র। তবে এখন ব্যক্তিপর্যায়েও ট্রেজারি বিল ও বন্ডে বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি হওয়ায় মানুষ বিকল্প বিনিয়োগমাধ্যমের দিকে ঝুঁকছে। তার মতে, সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ করলে নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত টাকা আটকে থাকে এবং একটি সময়ের আগে ভাঙালে কোনো মুনাফা পাওয়া যায় না। বিপরীতে ট্রেজারি বিল ও বন্ড সহজে বাজারে বিক্রি করে নগদ অর্থ তুলে নেওয়া যায়। ফলে তারল্য সুবিধার কারণে অনেক বিনিয়োগকারী এখন এসব খাতে বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছেন। সেই সঙ্গে বেসরকারি খাতে খেলাপি ঋণ ও ঝুঁকি বেড়ে যাওয়ায় ব্যাংকগুলোও এখন নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে ট্রেজারি বিল ও বন্ডে বেশি অর্থ বিনিয়োগ করছে। ফলে বাজারে এসব সরকারি ঋণপত্রের ব্যবহার ও গ্রহণযোগ্যতা বেড়েছে। তিনি আরও বলেন, সঞ্চয়পত্রের ওপর সরকারের নির্ভরতা কমানোর একটি দীর্ঘমেয়াদি নীতি রয়েছে। আইএমএফের ঋণ কর্মসূচির অংশ হিসেবে বিনিয়োগের সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণ, সুদের হার পুনর্বিন্যাসসহ বিভিন্ন সংস্কার পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এতে সঞ্চয়পত্রের আকর্ষণ আগের তুলনায় কমেছে। এ ছাড়া উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণেও সঞ্চয়পত্র বিক্রি কমতে পারে।

চলতি অর্থবছরে সঞ্চয়পত্র বিক্রি থেকে নিট ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয় ১২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তরের তথ্যানুযায়ী, সর্বশেষ মার্চ মাসে নিট বিক্রি (প্রকৃত বিনিয়োগ) ঋণাত্মক হয়েছে ২ হাজার ১৩৫ কোটি টাকা। আগের মাস ফেব্রুয়ারিতে নিট বিক্রি (প্রকৃত বিনিয়োগ) ঋণাত্মক হয়েছিল ১ হাজার ১৬৫ কোটি টাকা। আর জানুয়ারিতে ঋণাত্মক হওয়ার পরিমাণ ছিল ১ হাজার ৮৫১ কোটি টাকা। তবে ডিসেম্বর মাসে মোট বিক্রির চেয়ে ভাঙানোর প্রবণতা কম ছিল। ওই মাসে সঞ্চয়পত্রের নিট বিনিয়োগ এসেছিল প্রায় ৩৮৫ কোটি টাকা। তার আগের ৫ মাসের মধ্যে চার মাস নিট বিনিয়োগ ইতিবাচক ধারায় ছিল। সব মিলে চলতি অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে (জুলাই-মার্চ) সঞ্চয়পত্রে নিট বিনিয়োগ ঋণাত্মক হয়েছে ২ হাজার ৬৯০ কোটি টাকা। গত অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে নিট বিনিয়োগ ঋণাত্মক হওয়ার পরিমাণ ছিল প্রায় ৮ হাজার ৬৯১ কোটি টাকা।

পরিসংখ্যান বলছে, শুধু চলতি অর্থবছরেই নয়, গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরেও সঞ্চয়পত্র থেকে কোনো ঋণ পায়নি সরকার। গত অর্থবছরের মূল বাজেটে সঞ্চয়পত্র বিক্রি থেকে ১৫ হাজার ৪০০ কোটি টাকার নিট ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। তবে বিক্রিতে নেতিবাচক ধারা অব্যাহত থাকায় সংশোধিত বাজেটে সেটি কমিয়ে ১৪ হাজার কোটি টাকায় নামিয়ে আনা হয়। তারপরও পুরো অর্থবছরে নিট বিক্রি ঋণাত্মক হয়েছিল ৬ হাজার ৬৩ কোটি টাকা। তার আগের দুই অর্থবছরেও সঞ্চয়পত্রের নিট বিনিয়োগ ঋণাত্মক ধারায় ছিল। এর মধ্যে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে মূল বাজেটে সঞ্চয়পত্র বিক্রি থেকে নিট ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল ১৮ হাজার কোটি টাকা। তবে বিক্রি ধারাবাহিক কমতে থাকায় সংশোধিত বাজেটে এই লক্ষ্যমাত্রা কমিয়ে ৭ হাজার ৩১০ কোটি টাকায় নামিয়ে আনা হয়েছিল। তবে পুরো অর্থবছরে নিট বিনিয়োগ ঋণাত্মক হয়েছিল প্রায় ২১ হাজার ১২৪ কোটি টাকা। আর ২০২২-২৩ অর্থবছরে নিট বিনিয়োগ ঋণাত্মক হওয়ার পরিমাণ ছিল ৩ হাজার ২৯৬ কোটি টাকা। অর্থাৎ টানা চার অর্থবছর ধরে সরকার এই খাত থেকে নতুন করে ঋণ নেওয়ার পরিবর্তে পুরনো দায় পরিশোধেই বেশি অর্থ ব্যয় করছে।

এ পরিস্থিতি সরকারের জন্যও চাপ তৈরি করছে। কারণ সঞ্চয়পত্র থেকে প্রত্যাশিত ঋণ না আসায় বাজেট ঘাটতি মেটাতে সরকারকে ব্যাংক ঋণের ওপর বেশি নির্ভর করতে হচ্ছে। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জন্য ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা ছিল এক লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু অর্থবছরের নয় মাস পার না হতেই সেই সীমা ছাড়িয়ে ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে এক লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ অর্থবছর শেষ হওয়ার আগেই সরকার অতিরিক্ত ঋণের পথে হাঁটছে, যা আর্থিক ব্যবস্থাপনায় চাপ বাড়ার ইঙ্গিত দেয়। অন্যদিকে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে সরকার বেশি ঋণ নেওয়ায় বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ কমে গেছে। গত ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এ খাতে বার্ষিক ঋণের প্রবৃদ্ধি হয়েছে মাত্র ৬ দশমিক ০৩ শতাংশ।

শিক্ষাবার্তা /এ/১৮ /০৫/২০২৬

দেশ বিদেশের শিক্ষা, পড়ালেখা, ক্যারিয়ার সম্পর্কিত সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম, ছবি, ভিডিও প্রতিবেদন সবার আগে দেখতে চোখ রাখুন শিক্ষাবার্তায়।


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.