।। এ এইচ এম সায়েদুজ্জামান ।।
বাংলাদেশে আজ এমন কোনো পরিবার খুঁজে পাওয়া দুষ্কর, যেখানে অন্তত একজন মানুষ প্রতিদিন ওষুধ সেবন করে না। শহর থেকে গ্রাম, শিশু থেকে প্রবীণ—সবার জীবনের সঙ্গে ওষুধ এমনভাবে জড়িয়ে গেছে, যেন এটি প্রতিদিনের খাবারের মতোই অপরিহার্য। কিন্তু দুঃখের বিষয়, এই নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম যেন লাগামহীনভাবে বেড়ে চলেছে। সাধারণ মানুষের আয়ের তুলনায় ওষুধের দাম এত বেশি যে অনেকেই সঠিক চিকিৎসা নিতে পারছেন না। একে বলা যায়—এ যেন লাগামছাড়া পাগলা ঘোড়া, যার গতি নিয়ন্ত্রণের কোনো কার্যকর উদ্যোগ দৃশ্যমান নয়।
বাংলাদেশে ওষুধ মানুষের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছে। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ওষুধের দাম এমনভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে যে, সাধারণ মানুষের জন্য সঠিক চিকিৎসা গ্রহণ ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়ছে। শহর থেকে গ্রাম—সবখানেই রোগী ও তাদের পরিবার ওষুধের বাড়তি খরচে বিপাকে পড়ছে।
গত পাঁচ বছরে বহু সাধারণ অ্যান্টিবায়োটিক, ব্যথানাশক ও সর্দি-কাশির ওষুধের দাম ৩০% থেকে ৫০% পর্যন্ত বেড়েছে। ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ ও হার্টের রোগ নিয়ন্ত্রণের জন্য প্রয়োজনীয় ওষুধগুলোর দামও প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। অনেক জীবনরক্ষাকারী ওষুধ এখন দরিদ্র তো দূরের কথা, মধ্যবিত্তেরও নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। একসময় যে ওষুধ ১০০ টাকায় পাওয়া যেত, এখন তা ১৬০-১৮০ টাকা ছাড়া কেনা সম্ভব নয়।
ওষুধের দাম বৃদ্ধির পেছনে রয়েছে বেশ কিছু কারণ—কাঁচামালের জন্য আমদানিনির্ভরতা, ডলারের মূল্য বৃদ্ধি, উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়া, ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানির অতিরিক্ত মুনাফা নীতি এবং বাজার নিয়ন্ত্রণে দুর্বলতা। তাছাড়া, অনেক ফার্মেসি সরকার নির্ধারিত সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য (MRP) মেনে চলে না এবং সুযোগ পেলেই বেশি দাম নেয়।
এই লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি শুধু অর্থনৈতিক চাপই সৃষ্টি করছে না, বরং রোগীদের চিকিৎসা অসম্পূর্ণ রেখে দেওয়া, নিম্নমানের বা নকল ওষুধ ব্যবহারের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। ফলে একদিকে যেমন মানুষের জীবনহানি ঘটছে, অন্যদিকে জাতীয় স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
এ অবস্থায় প্রয়োজন শক্তিশালী বাজার মনিটরিং, কাঁচামাল উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা, জীবনরক্ষাকারী ওষুধে ভর্তুকি এবং মূল্য তালিকা কঠোরভাবে বাস্তবায়ন। নইলে ওষুধের দাম বৃদ্ধির এই প্রবণতা দেশের স্বাস্থ্য খাতের জন্য বড় সংকটে পরিণত হবে।
বাংলাদেশে ওষুধের দাম লাগামহীনভাবে বাড়তে থাকায় এর প্রভাব এখন কেবল স্বাস্থ্যখাতেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও গভীরভাবে পড়ছে। এই প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ছে দরিদ্র ও নিম্নমধ্যবিত্ত মানুষের জীবনে, যারা আয়ের বড় একটি অংশ চিকিৎসা খাতে ব্যয় করতে বাধ্য হচ্ছেন।
প্রথমত, চিকিৎসা অসম্পূর্ণ থেকে যাওয়া একটি বড় সামাজিক সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অর্থের অভাবে অনেক রোগী মাঝপথে ওষুধ বন্ধ করে দেন, ফলে তাদের রোগ জটিল হয়ে পড়ে এবং মৃত্যুঝুঁকি বেড়ে যায়। দীর্ঘস্থায়ী রোগ যেমন—ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ বা হৃদরোগের ক্ষেত্রে এই প্রবণতা বিশেষভাবে বিপজ্জনক।
দ্বিতীয়ত, স্বাস্থ্য বৈষম্য বাড়ছে। শহরের তুলনায় গ্রামের মানুষ চিকিৎসা ও ওষুধের দিক থেকে আরও বঞ্চিত হচ্ছে। দরিদ্র জনগোষ্ঠী সঠিক ওষুধের বদলে অনেক সময় নিম্নমানের বা নকল ওষুধ ব্যবহার করতে বাধ্য হয়, যা তাদের স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর।
অর্থনৈতিক দিক থেকে, পরিবারের মাসিক আয়ের বড় অংশ ওষুধ কিনতে ব্যয় হওয়ায় অন্য খাতে ব্যয় সংকুচিত হচ্ছে। এর ফলে শিক্ষা, পুষ্টি ও বাসস্থানের মতো জরুরি খাতে বিনিয়োগ কমে যাচ্ছে, যা মানবসম্পদ উন্নয়নে দীর্ঘমেয়াদে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
এছাড়া, ওষুধের দাম বৃদ্ধি চিকিৎসা খাতে ব্যক্তিগত ঋণের প্রবণতা বাড়িয়ে তুলছে। অনেক পরিবার চিকিৎসার খরচ মেটাতে ধার করছে, যা অর্থনৈতিকভাবে তাদের আরও দুর্বল করে দিচ্ছে।
সার্বিকভাবে, ওষুধের উচ্চমূল্য শুধু একজন রোগীর ব্যক্তিগত সমস্যা নয়, বরং এটি জাতীয় স্বাস্থ্যব্যবস্থা, অর্থনীতি ও সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্য এক বড় হুমকি। তাই এখনই দরকার কার্যকর নীতি গ্রহণ ও বাস্তবায়ন, যাতে মানুষ সাশ্রয়ী মূল্যে প্রয়োজনীয় ওষুধ পেতে পারে।
বাংলাদেশে ওষুধের দাম লাগামহীনভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে, কিন্তু অনেক দেশ এ সমস্যা কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পেরেছে। বিদেশি প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, উন্নয়নশীল ও উন্নত দেশ উভয় ক্ষেত্রেই সরকার সরাসরি ওষুধের মূল্য নিয়ন্ত্রণ বা ভর্তুকি প্রদান করে জনগণকে সাশ্রয়ী চিকিৎসা নিশ্চিত করছে।
উদাহরণস্বরূপ, ভারতে সরকার “National Pharmaceutical Pricing Authority (NPPA)” গঠন করেছে, যা প্রয়োজনীয় ও জীবনরক্ষাকারী ওষুধের দাম নির্ধারণ ও নিয়ন্ত্রণ করে। এর ফলে বাজারে অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধি কমেছে এবং দরিদ্র মানুষের নাগালে ওষুধ রয়েছে।
শ্রীলঙ্কায় সরকার অনেক ওষুধে সরাসরি ভর্তুকি দেয়। জীবনরক্ষাকারী ওষুধ, ইনসুলিন ও ক্যানসারের ওষুধ তুলনামূলক কম দামে সরবরাহ করা হয়। এছাড়া, সরকারি হাসপাতালগুলোতে অনেক ওষুধ বিনামূল্যে দেওয়া হয়, যা সাধারণ মানুষের চিকিৎসা ব্যয় কমায়।
কানাডা ও যুক্তরাজ্যে “Universal Health Coverage” ব্যবস্থার আওতায় নাগরিকরা সরকারি সহায়তায় কম বা বিনা মূল্যে প্রেসক্রিপশন ওষুধ পায়। এসব দেশে ওষুধের দাম নিয়ন্ত্রণে কঠোর আইন, স্বচ্ছ সরবরাহ ব্যবস্থা ও বাজার মনিটরিং কার্যকরভাবে কাজ করছে।
বাংলাদেশের তুলনায় এসব দেশে ওষুধের বাজারে স্বচ্ছতা বেশি এবং সরকারি হস্তক্ষেপ সরাসরি দৃশ্যমান। বাংলাদেশে যদিও স্থানীয় উৎপাদন শক্তিশালী, তবুও কাঁচামাল আমদানি-নির্ভরতা, দুর্বল বাজার নিয়ন্ত্রণ ও অতিরিক্ত মুনাফা নীতি দাম বৃদ্ধির মূল কারণ।
বিদেশি অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে বাংলাদেশও চাইলে প্রয়োজনীয় ওষুধের জন্য মূল্যসীমা নির্ধারণ, ভর্তুকি ব্যবস্থা চালু এবং সরকারি হাসপাতালগুলোতে বিনামূল্যে বা স্বল্পমূল্যে সরবরাহ নিশ্চিত করতে পারে। এভাবে জনগণ যেমন সাশ্রয়ী মূল্যে চিকিৎসা পাবে, তেমনি জাতীয় স্বাস্থ্যব্যবস্থা আরও টেকসই হবে।
বাংলাদেশে ওষুধের দাম লাগামহীনভাবে বাড়তে থাকায় সাশ্রয়ী চিকিৎসা নিশ্চিত করতে সরকার, ওষুধ কোম্পানি ও সমাজের সমন্বিত উদ্যোগ অপরিহার্য হয়ে উঠেছে।
সরকারের ভূমিকা
সরকারের প্রথম দায়িত্ব হলো প্রয়োজনীয় ও জীবনরক্ষাকারী ওষুধের জন্য ন্যায্য মূল্য নির্ধারণ ও তা কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করা। বাজারে অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধি রোধে কার্যকর মনিটরিং ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের ক্ষমতা, জনবল ও প্রযুক্তি বাড়াতে হবে, যাতে নকল, নিম্নমানের ও অতিমূল্যের ওষুধ প্রতিরোধ করা যায়। পাশাপাশি, দেশীয় কাঁচামাল উৎপাদন বাড়াতে API (Active Pharmaceutical Ingredient) শিল্পকে উৎসাহিত করতে হবে এবং দরিদ্র মানুষের জন্য জীবনরক্ষাকারী ওষুধে ভর্তুকি প্রদান করতে হবে।
ওষুধ কোম্পানির ভূমিকা
ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানিগুলোর উচিত নৈতিক ব্যবসা নীতি অনুসরণ করে যুক্তিসঙ্গত মুনাফা গ্রহণ করা। অযৌক্তিকভাবে দাম বাড়ানো, বাজারে একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ এবং কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করা থেকে বিরত থাকতে হবে। গবেষণা ও উদ্ভাবনে বিনিয়োগ বাড়িয়ে স্থানীয় উৎপাদন ক্ষমতা বৃদ্ধি করলে আমদানিনির্ভরতা কমবে এবং দাম স্থিতিশীল থাকবে।
সমাজের ভূমিকা
সমাজ ও গণমাধ্যমের উচিত ওষুধের দাম, মান ও প্রাপ্যতা নিয়ে জনসচেতনতা সৃষ্টি করা। মানুষকে সরকার নির্ধারিত MRP সম্পর্কে জানাতে হবে এবং অতিরিক্ত দাম নেওয়ার ঘটনা প্রকাশ্যে আনতে হবে। রোগী ও তাদের পরিবারকে মানসম্মত কিন্তু সাশ্রয়ী বিকল্প ওষুধ সম্পর্কে সচেতন করা জরুরি।
সার্বিকভাবে, সরকার, ওষুধ কোম্পানি ও সমাজ যদি দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করে, তবে ওষুধের দাম সাধারণ মানুষের নাগালে রাখা সম্ভব হবে। এতে শুধু চিকিৎসা সহজলভ্য হবে না, জাতীয় স্বাস্থ্যব্যবস্থাও আরও দৃঢ় ও ন্যায়সঙ্গত হবে।
ওষুধ মানুষের মৌলিক চাহিদার একটি অপরিহার্য অংশ, যা বিলাসপণ্য নয় বরং জীবনরক্ষাকারী উপাদান। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ওষুধের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি কেবল একটি স্বাস্থ্য সমস্যা নয়, এটি সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকটেও পরিণত হয়েছে। দরিদ্র থেকে মধ্যবিত্ত—সবারই চিকিৎসা ব্যয় দিন দিন অসহনীয় হয়ে উঠছে, ফলে অনেকেই প্রয়োজনীয় চিকিৎসা অসম্পূর্ণ রেখেই জীবন ঝুঁকিতে ফেলছেন।
এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় জরুরি ভিত্তিতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া দরকার—প্রয়োজনীয় ওষুধে মূল্যসীমা নির্ধারণ, জীবনরক্ষাকারী ওষুধে ভর্তুকি প্রদান, স্থানীয় কাঁচামাল উৎপাদন বৃদ্ধি এবং বাজার মনিটরিং জোরদার করা। পাশাপাশি, ওষুধ কোম্পানির নৈতিক ব্যবসা পরিচালনা এবং সমাজের সচেতন অংশের সক্রিয় অংশগ্রহণও অপরিহার্য।
সময় এসেছে বুঝতে হবে—সাশ্রয়ী মূল্যে ওষুধ সরবরাহ কেবল একটি স্বাস্থ্যনীতি নয়, এটি মানবিক দায়িত্ব ও সাংবিধানিক অঙ্গীকার। এখনই যদি উদ্যোগ নেওয়া যায়, তবে দেশের প্রতিটি মানুষ তার প্রয়োজনীয় ওষুধ পেতে সক্ষম হবে, আর সেই সঙ্গে গড়ে উঠবে সুস্থ, উৎপাদনশীল ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ।
লেখক: সম্পাদক, শিক্ষাবার্তা।
শিক্ষাবার্তা /এ/১২/০৮/২০২৫
দেশ বিদেশের শিক্ষা, পড়ালেখা, ক্যারিয়ার সম্পর্কিত সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম, ছবি, ভিডিও প্রতিবেদন সবার আগে দেখতে চোখ রাখুন শিক্ষাবার্তায়
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
