।। এ এইচ এম সায়েদুজ্জামান ।।
শিক্ষক জাতির বাতিঘর, জাতি গঠনের কারিগর। কিন্তু কখনো কখনো এই শ্রদ্ধেয় পেশার মানুষের জীবন এমন নিষ্ঠুর বাস্তবতার মুখোমুখি হয় যে, তা সমাজের বিবেককে নাড়া দেওয়ার মতো। এমনই এক হৃদয়বিদারক বাস্তবতার নাম—প্রফেসর বদরুল ইসলাম। ঢাকার প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত শেখ বোরহান উদ্দিন কলেজে প্রায় দুই যুগ সুনামের সাথে অধ্যাপনা করেছেন এই শিক্ষক। কিন্তু ২০২০ সালে এক ভয়াবহ ষড়যন্ত্র তার জীবনে নেমে এনেছে অন্ধকার।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়ালেখা শেষ করে শিক্ষাক্ষেত্রে আত্মনিয়োগ করেন বদরুল ইসলাম। শেখ বোরহান উদ্দিন কলেজে যোগদানের পর থেকেই তিনি শিক্ষার্থীদের মাঝে একজন আদর্শ শিক্ষক হিসেবে পরিচিতি পান। ছাত্র-ছাত্রী, সহকর্মী ও অভিভাবকদের কাছে তিনি ছিলেন নির্ভরতার প্রতীক। শুধু তাই নয়, তিনি বাংলাদেশ বৃহৎ শিক্ষক সমিতির কেন্দ্রীয় কমিটির একজন দায়িত্বশীল নেতা—সহকারী মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
সাধারণত একজন শিক্ষক তার পাঠদান, নীতিনিষ্ঠতা এবং সজ্জনতা দিয়েই পরিচিত হন। কিন্তু ২০২১ সালের এক মধ্য রাতে বদরুল ইসলামের জীবনে নামে এক দুঃস্বপ্ন। পুলিশ তার বাসায় গিয়ে হাজির হয় নারি পাচার মামলার অভিযোগ নিয়ে। তিনি তখন হতবাক! চোখে-মুখে বিস্ময় নিয়ে প্রশ্ন করেন, “আপনারা কেন আমার বাসায়?” পুলিশ জানায়, তার নামে একটি নারী পাচার মামলা হয়েছে ব্রাহ্মণবাড়িয়া কোর্টে।
তবে সবচেয়ে ভয়ানক ব্যাপারটি হলো—তিনি এই মামলার কিছুই জানতেন না। কোনো প্রকার তলব, জিজ্ঞাসাবাদ বা তদন্ত ছাড়াই তার বিরুদ্ধে মামলা দায়ের এবং বারবার পুলিশি হয়রানি তাকে ভেঙে দেয় মানসিকভাবে। পরে জানা যায়, তার কলেজেরই কয়েকজন সহকর্মী পূর্বপরিকল্পিতভাবে এই মামলা সাজিয়েছেন। একজন শিক্ষকের বিরুদ্ধে এমন ভয়ঙ্কর অভিযোগ এবং বাসায় নিয়মিত পুলিশের আনাগোনা—এটি শুধু বদরুল ইসলামের জীবনকেই নয়, তার পরিবারের জীবনকেও তছনছ করে দিয়েছে। তার স্ত্রী এবং দুই সন্তান মানসিকভাবে চরম আঘাতপ্রাপ্ত হন। সন্তানরা ধীরে ধীরে মানসিকভাবে স্থিতিশীল হলেও তার স্ত্রী আজও সেই মানসিক আঘাত থেকে বেরিয়ে আসতে পারেননি। ২০২২ সাল থেকেই তিনি শয্যাশায়ী। মাসের ৩০টা দিনই বাংলাদেশ নয়তো ভারতের কোন হাসপাতালে কাটাতে হয়েছে তাকে। চিকিৎসার পেছনে ব্যয় করেছেন প্রায় ২ কোটি টাকা। কিন্তু এখন স্ত্রীর অবস্থা আরও সংকটাপন্ন—তিনি বাংলাদেশ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের আইসিইউতে ভর্তি।
এই দীর্ঘ চিকিৎসাজনিত ব্যয় বহন করতে গিয়ে বদরুল ইসলাম এখন নিঃস্ব প্রায়। তাঁর নিজের জীবন চলছে চরম মানবেতর অবস্থায়। অথচ তিনি ছিলেন এক সময়ের স্বাবলম্বী, গর্বিত শিক্ষক। সহকর্মীদের ষড়যন্ত্র, রাষ্ট্রযন্ত্রের অন্ধ অনুসরণ, আইনের দুর্বলতাও সমাজের নিস্পৃহতা আজ তাকে চরম দুরবস্থায় ফেলে দিয়েছে। সামাজিকভাবে সম্মানহানির পাশাপাশি এখন তার চিকিৎসার জন্য অর্থ সংগ্রহ করাটাও দুঃসাধ্য হয়ে উঠেছে।
সবচেয়ে বড় কষ্টের জায়গা হলো—এত বড় এক সংকটে পড়ে যাওয়ার পরেও শিক্ষক সমাজ বা বৃহৎ কোনো সংগঠন তার পাশে দাঁড়ায়নি। বরং দুর্নীতিবাজ ও মামলাবাজ শিক্ষকদের রক্ষা করার জন্য বৃহৎ একটি রাজনৈতিক দলের কিছু লোভী রাজনীতিবিদ ও কলেজ পরিচালনা পরিষদ তাদের পাশে দাঁড়িয়েছে। অথচ প্রফেসর বদরুল ইসলাম অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী কন্ঠ। তিনি ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচিত মুখ এবং বেসরকারি শিক্ষক সমাজের কেন্দ্রীয় নেতা। কেউ কেউ সহানুভূতি দেখালেও আইনি সহায়তায় ছিলেন নিঃক্রিয়। ফলে তার মানসিক অবস্থা কঠিন থেকে কঠিনতর হয়ে পড়েছে।
প্রশ্ন আসে, একজন শিক্ষকের বিরুদ্ধে যখন এমন গুরুতর মামলা দায়ের হয়, তখন কি না জানিয়ে মামলা করা যায়? আইনের মৌলিক নীতিই তো বলছে—তদন্ত ছাড়া কাউকে দোষী সাব্যস্ত করা যায় না। কিন্তু বদরুল ইসলামের বেলায় সেটি হয়নি। মামলাটি যেহেতু একেবারেই ষড়যন্ত্রমূলক, তাই আজ অবধি কোনো প্রমাণ উঠে আসেনি। তিনি জামিনে মুক্ত আছেন, কিন্তু আইনি প্রক্রিয়ার খরচ, মামলার হয়রানি এবং সামাজিক দুর্নাম তাকে প্রতিনিয়ত তীব্র যন্ত্রণার মধ্যে ফেলছে।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, কলেজে দুর্নীতির বিরুদ্ধে কথা বলায় কলেজটির দুর্নীতিবাজ সিন্ডিকেট এবং তাদের দুর্নীতির দোসররা বদরুল ইসলামের নামে মামলাটি করিয়েছে। প্রফেসর বদরুল ইসলাম এই মামলার বাদী, সাক্ষী এমনকি আসামিদের কাউকে চিনেন না। মামলায় পূর্বে তিনি কোনদিনও ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় যাননি। মামলা পরবর্তীতে জানতে পারে মামলার আসামিগণ ফ্যাসিস্ট আওয়ামী বিরোধী রাজনীতির সাথে জড়িত এবং মামলার দ্বিতীয় আসামি এরশাদ হোসেন চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী ও সমাজ সেবক এবং বায়েজীদ থানাধীন মোহাম্মদ নগর হাউজিং সোসাইটি বায়েতুন নুর জামে মসজিদ পরিচালনা পরিষদের সিনিয়র যুগ্ম সম্পাদক এবং চট্টগ্রাম মহানগর যুবদলের যুগ্ম সম্পাদক ও নির্যাতিত নেতা। প্রফেসর বদরুল ইসলাম মামলায় বর্ণিত তারিখ ০৮.১১.১৯ ও ১০.০১.২০ তারিখে কলেজে উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস ও সমন্বয়কারী দায়িত্ব পালন করেছেন এবং ০৩.০১.২০ তারিখে সকাল ও বিকাল চাকরি পরীক্ষার ডিউটি করেছে।
কোন তদন্ত ছাড়াই মামলার আসামি হওয়াতে প্রফেসর বদরুল ইসলাম নিজেই স্বপ্রণোদিত হয়ে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় এবং আইনি সংস্থায় তদন্ত চেয়ে আবেদন করেন। এ পরিপ্রেক্ষিতে ০২.০২.২১ তারিখে জেলা গোয়েন্দা সংস্থা, নারায়ণগঞ্জ কর্তৃক প্রদত্ত তদন্ত রিপোর্ট বলা হয়েছে, “মামলার বাদী এবং সাক্ষীগন প্রদত্ত ভাড়াটে ঠিকানায় কখনো থাকেননি। তাছাড়া অন্য সাক্ষীগনকে ২০ হাজার টাকার প্রলোভন দেখিয়ে মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়াইয়ে ৪ হাজার টাকা করে দিয়েছে। এছাড়া উক্ত কলেজে শিক্ষক এবং শিক্ষক প্রতিনিধিদের মধ্যে গ্রুপিং আছে। একপক্ষকে হয়রানি করার জন্য বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করে আসছে মর্মে স্বাক্ষর প্রমাণ পাওয়া গেছে।”
অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, চাঞ্চল্যকর মামলাটির আমলে নেওয়া সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট জাকি-আল-ফারাবী নিজেই স্বপ্রণোদিত হয়ে মামলাবাজ সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে একটি মামলা (৪৯/২১) দায়ের করেন এবং সিআইডি, ব্রাহ্মণবাড়িয়াকে তদন্তের নির্দেশ দেন।
০৩.১২.২২ তারিখে সিআইডি, ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা মামলার তদন্ত রিপোর্ট প্রদান করে। সেখানে বলা হয়েছে, কলেজের দুর্নীতির বিরুদ্ধে কথা বলায় প্রফেসর বদরুল ইসলামের নামে কলেজের কয়েকজন শিক্ষক এবং একটি মামলাবাজ সিন্ডিকেট এই মামলাটি করিয়েছে।
প্রফেসর বদরুল ইসলামের ঘটনা আমাদের সমাজ ও শিক্ষাব্যবস্থার জন্য একটি সতর্কবার্তা। একজন নির্দোষ মানুষ কিভাবে হয়রানির শিকার হতে পারেন, তা এই কাহিনি হৃদয়বিদারকভাবে তুলে ধরে। প্রশ্ন ওঠে—আমাদের প্রশাসনিক ও আইনি কাঠামো কি এতটাই দুর্বল যে, একটি ভিত্তিহীন মামলায় একজন সম্মানিত শিক্ষককে বছরের পর বছর নিপীড়নের শিকার হতে হয়?
এটিও প্রশ্নযোগ্য যে, কেন সমাজে সত্যের পক্ষে দাঁড়ানো মানুষগুলো সংকটে পড়লে আমরা চুপ থাকি? কেন শিক্ষক সমাজের সম্মিলিত শক্তি এমন সময় নিস্তব্ধ থাকে?
প্রফেসর বদরুল ইসলাম একজন শিক্ষক, একজন সংগঠক, একজন দায়িত্বশীল নাগরিক। কিন্তু সমাজ, রাষ্ট্র ও সহকর্মীদের কিছু অসাধু অংশের কারণে আজ তিনি দিশেহারা, নিরুপায়। এখনো সময় আছে—তাঁর পাশে দাঁড়ানোর। আমাদের উচিত তাঁকে শুধু সমবেদনা জানানো নয়, তার পরিবারকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য এগিয়ে আসা। আইনি সহায়তা ও ন্যায়ের জন্য সকলে মিলে আওয়াজ তুললেই কেবল একজন নির্দোষ শিক্ষকের জীবন আবার আলোকিত হতে পারে।
আজকের এই লেখাটি শুধু বদরুল ইসলামের দুর্বিষহ জীবনের গল্প নয়, এটি একজন শিক্ষককে অবমাননার, একটি পরিবারকে ধ্বংস করে দেওয়ার, এবং আমাদের নীরবতা নিয়ে এক কঠিন প্রশ্নের গল্প।
শিক্ষাবার্তা /এ/০৩/০৮/২০২৫
দেশ বিদেশের শিক্ষা, পড়ালেখা, ক্যারিয়ার সম্পর্কিত সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম, ছবি, ভিডিও প্রতিবেদন সবার আগে দেখতে চোখ রাখুন শিক্ষাবার্তায়
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
