।। এ এইচ এম সায়েদুজ্জামান।।
শিক্ষা একটি জাতির মেরুদণ্ড—এই প্রবাদবাক্য শুধু উচ্চারণেই সীমাবদ্ধ নয়, এটি একটি রাষ্ট্রের উন্নয়ন দর্শনের ভিত্তি। কিন্তু বাংলাদেশে এই মেরুদণ্ড এতটাই নড়বড়ে অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে যে, একটু ধাক্কা লাগলেই তা ভেঙে পড়ার উপক্রম। বছরের পর বছর, সরকারের পর সরকার শিক্ষাকে নানা রকম পরীক্ষা-নিরীক্ষার বিষয়বস্তুতে পরিণত করেছে।
তবে সবচেয়ে দীর্ঘ সময় ধরে ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগ সরকার শিক্ষাকে রাজনৈতিক বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে ব্যবহার করলেও শিক্ষার্থীদের জন্য একটি সুশৃঙ্খল, নির্ভরযোগ্য ও মানবিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ হয়েছে।
এই ব্যর্থতার সর্বশেষ করুণ উদাহরণ—চার কোটিরও বেশি শিক্ষার্থীর জীবন নিয়ে চলা ‘ছিনিমিনি খেলা’। এটা শুধুই কোনো নীতিগত ব্যর্থতা নয়—এটি একটি পুরো প্রজন্মের প্রতি রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের প্রতিচ্ছবি।
২০২৩ সালে নতুন শিক্ষাবর্ষের শুরুতেই ঘোষণা আসে—“শেখানো হবে, মুখস্থ নয়।” এই শ্লোগান শুনে অভিভাবক, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা আশাবাদী হলেও বাস্তবতা ছিল ভিন্ন। নতুন কারিকুলামের বাস্তবায়ন ছিল অগোছালো, তড়িঘড়ি ও মনগড়া। কোনো পর্যায়ে ছিল না পর্যাপ্ত প্রস্তুতি, না ছিল উপযুক্ত প্রশিক্ষণ।
শিক্ষকেরা জানতেন না কোন পদ্ধতিতে পড়াবেন, শিক্ষার্থীরা বুঝতে পারেনি কী পড়বে আর অভিভাবকরা ভেবেছিলেন—এ বুঝি আরেকটা রাজনৈতিক বিজ্ঞাপন।
এই বিশৃঙ্খলার মধ্যে পড়ে শিক্ষার্থীদের ওপর যে মানসিক চাপ তৈরি হয়েছে, তা কোনো পরিসংখ্যানে ধরা পড়বে না; কিন্তু ঘরে ঘরে অভিভাবকদের শঙ্কা, হতাশা এবং শিক্ষার্থীদের অস্বস্তি ছিল চোখে পড়ার মতো।
শিক্ষা বছরে বই না পাওয়া, বই পেলেও ভুলে ভর্তি বই—এসব যেন বাংলাদেশে স্বাভাবিক বিষয় হয়ে গেছে। কিন্তু এবারের ঘটনাগুলো ছিল চরম। বহু শিক্ষার্থী সারা বছরই পাঠ্যবই পায়নি, আবার যারা পেয়েছে, তাদের বইয়ে ছিল অসংখ্য বানান ও তথ্যগত ভুল।
বিশেষ করে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে পাঠ্যবইয়ে যেসব বিতর্কিত বিষয় ঢুকানো হয়েছে, তা নিয়ে সারাদেশে ক্ষোভ ও সমালোচনা দেখা দেয়। কিন্তু সরকার এই ভুলকে সংশোধনের চাইতে অধিকতর শক্তি ব্যয় করেছে সমালোচনাকারীদের দমন করতে।
সরকার ডিজিটাল শিক্ষার নামে নানা পরিকল্পনার কথা বললেও বাস্তবে তা সারা দেশে ছড়িয়ে দিতে পারেনি। বেশিরভাগ গ্রামীণ বিদ্যালয়ে নেই ইন্টারনেট সংযোগ, নেই মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম, নেই প্রশিক্ষিত শিক্ষক। তাহলে প্রযুক্তিনির্ভর এই শিক্ষাব্যবস্থা কার্যকর হলো কোথায়? কেবল রাজধানী বা কয়েকটি বিভাগীয় শহরের কিছু প্রাইভেট স্কুলেই এই সুবিধা সীমাবদ্ধ ছিল।
ফলে একটি বড় অংশ—গ্রামের দরিদ্র ও প্রান্তিক শিক্ষার্থীরা হয়ে পড়েছে এই ‘শিক্ষানীতির’ বলির পাঁঠা।
শিক্ষকদের অবস্থা আরও ভয়াবহ। সরকার একদিকে তাদের ওপর চাপিয়ে দিয়েছে নতুন পাঠদানের দায়িত্ব, আবার সেই দায়িত্ব পালনের জন্য সময়, প্রশিক্ষণ বা সরঞ্জাম কিছুই দেয়নি। এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা বছরের পর বছর ধরে ন্যায্য বেতন, ইনক্রিমেন্ট, বদলি নীতির সংস্কারসহ বিভিন্ন দাবিতে আন্দোলন করে আসলেও সরকার বারবার তা উপেক্ষা করেছে।
এই পরিস্থিতিতে শিক্ষকেরা কীভাবে ক্লাসে গিয়ে শিক্ষার্থীদের আত্মবিশ্বাস দিতে পারবেন? যখন তার নিজের পেশাগত নিরাপত্তা নেই, তখন তিনি অন্যদের ভবিষ্যতের স্থায়িত্ব কীভাবে নিশ্চিত করবেন?
এই শিক্ষানীতির ভুক্তভোগী শুধু শিক্ষক বা শিক্ষার্থী নয়—অভিভাবকরাও সমানভাবে আক্রান্ত। তাদের সন্তান সারাবছর কী পড়ছে, কীভাবে পরীক্ষা দিচ্ছে, কীভাবে মূল্যায়িত হচ্ছে—এই প্রশ্নগুলোর কোনো উত্তর তাদের জানা নেই।
অনিশ্চয়তা থেকে তৈরি হয়েছে দুশ্চিন্তা, দুশ্চিন্তা থেকে হতাশা। অভিভাবকরা বাধ্য হচ্ছেন অতিরিক্ত প্রাইভেট টিউশন দেওয়ার জন্য, যা অর্থনৈতিকভাবে এক বিশাল চাপ। শহরের তুলনায় গ্রামে এই চাপ আরও কষ্টসাধ্য।
মূল্যায়নের ক্ষেত্রে সরকার চালু করেছে “ফলাফলবিহীন মূল্যায়ন” পদ্ধতি। এতে দেখা গেছে, শিক্ষার্থীদেরকে ঘন ঘন ক্লাস টেস্ট, ফর্মেটিভ অ্যাসাইনমেন্ট, ‘পর্যবেক্ষণ’ ইত্যাদির মধ্যে ফেলে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু কোথাও ছিল না স্পষ্ট মাপকাঠি।
ফলে একদিকে শিক্ষার্থী মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছে, অন্যদিকে শিক্ষক হয়ে উঠেছেন মূল্যায়নের ‘লটারি মাস্টার’। যার ফলে শিক্ষার মান নিয়ে একটি ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে, যা ভবিষ্যতে এই প্রজন্মের বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি, চাকরি পরীক্ষা বা উচ্চশিক্ষায় বড় ধাক্কা হয়ে দাঁড়াবে।
একটি রাষ্ট্র যখন শিক্ষাকে রাজনৈতিক পরীক্ষাগার বানিয়ে ফেলে, শিক্ষার্থীদেরকে ব্যবহার করে জনপ্রিয়তা অর্জনের চেষ্টা করে, তখন সেটি নিপীড়নের এক রূপে পরিণত হয়।
এই চার কোটি শিক্ষার্থী কোনো সংখ্যা নয়—এরা একেকটি পরিবার, একেকটি স্বপ্ন। তাদের অনিশ্চয়তার মানে জাতির অনিশ্চয়তা। এই সংকট শুধু সাময়িক নয়, দীর্ঘমেয়াদে দেশের উন্নয়ন ও সামাজিক স্থিতিশীলতা হুমকির মুখে ফেলবে।
এই মুহূর্তে জরুরি—একটি স্বচ্ছ, সমন্বিত, বাস্তবমুখী ও দীর্ঘমেয়াদী শিক্ষানীতি প্রণয়ন। পাঠ্যপুস্তক প্রণয়নে স্বচ্ছতা, কারিকুলাম বাস্তবায়নে সময়োপযোগিতা, শিক্ষক প্রশিক্ষণে গুণগত মান, প্রযুক্তির সমতা নিশ্চিতকরণ এবং মূল্যায়ন পদ্ধতিতে জবাবদিহিতা—এসব বিষয় গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, শিক্ষাকে দলীয় স্বার্থ ও আমলাতান্ত্রিক পরীক্ষার বাইরে রেখে একটি জাতীয় ঐকমত্যের আলোকে পরিচালনা করা।
শিক্ষা নিয়ে এমন ছিনিমিনি খেলা ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের জন্য ভয়াবহ বিপদের ইঙ্গিত দেয়। আজ যারা পড়ালেখা করছে—তাদের হাতে তুলে দেওয়া উচিত পরিকল্পিত, নির্ভরযোগ্য ও মানবিক এক শিক্ষাব্যবস্থা।
আর যদি রাষ্ট্র বারবার এই ব্যর্থতা ও নিপীড়নের ধারা অব্যাহত রাখে, তাহলে আগামী প্রজন্ম হবে কেবল ‘হারানো স্বপ্নের’ প্রতিনিধি। শিক্ষা তখন আর ‘মেরুদণ্ড’ নয়, হবে সমাজের সবচেয়ে দুর্বল ভগ্নাংশ—যেখানে কোনো উন্নয়ন সম্ভব নয়।
লেখক:
এ এইচ এম সায়েদুজ্জামান
শিক্ষা বিশ্লেষক ও কলাম লেখক
শিক্ষাবার্তা /এ/০১/০৮/২০২৫
দেশ বিদেশের শিক্ষা, পড়ালেখা, ক্যারিয়ার সম্পর্কিত সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম, ছবি, ভিডিও প্রতিবেদন সবার আগে দেখতে চোখ রাখুন শিক্ষাবার্তায়
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
