এইমাত্র পাওয়া

শিক্ষার্থীর আন্দোলন পরিণতি পেলে শিক্ষকেরটা কেন নয়?

মো. আশরাফুল আলম।।

শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের আন্দোলনের ফলে জুলাইয়ের শুরু থেকে দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠগুলো স্থবির। যদিও ইতোমধ্যে সরকারি চাকরির কোটা ব্যবস্থা নিয়ে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন আদালতের রায়ে একটা যৌক্তিক পরিণতি পেয়েছে; পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সরকার ঘোষিত সর্বজনীন পেনশনের নতুন স্কিম ‘প্রত্যয়’ বাতিলসহ তিন দফা যৌক্তিক দাবি নিয়ে আন্দোলন চালিয়ে যেতে হচ্ছে। ফলে অন্তত পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অচলাবস্থার আশু অবসানকল্পে প্রশ্ন উঠেছে, শিক্ষার্থীর আন্দোলন পরিণতি পেলে শিক্ষকেরটা কেন নয়?

আন্দোলন দুটি পরিকল্পিতভাবে একসঙ্গে চলেছিল, তা নয়। তবে সাধারণ দৃষ্টিতে দুটি আন্দোলনের উদ্দেশ্য ভিন্ন মনে হলেও সার্বিক বিচারে উভয়ের মধ্যে মিল আছে। তা হলো শিক্ষার্থীরা যেমন নিয়োগে মেধার মূল্যায়ন চান, তেমনি প্রত্যয় স্কিম বাতিলসহ স্বতন্ত্র বেতন স্কেল প্রদানের মাধ্যমে মেধাবীদের শিক্ষকতা পেশায় আগ্রহী করে তোলা শিক্ষকদের চাওয়া।
শিক্ষক আন্দোলনের একটা মৌলিক বৈশিষ্ট্য হলো, এ আন্দোলন মূলত তাদের আত্মমর্যাদা, ভবিষ্যৎ শিক্ষা ও শিক্ষকদের জন্য। অন্তত এই একটি দিক বিবেচনা করলেই এ আন্দোলনের যৌক্তিকতা ও মহৎ উদ্দেশ্য খুঁজে পাওয়া যায়। অথচ এ আন্দোলনে উচ্চশিক্ষা কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বা সরকার বিষয়টিকে যথাযথ গুরুত্ব দিচ্ছে বলে মনে হয় না। আন্দোলনকারী শিক্ষকরা ক্লান্ত হয়ে পড়া পর্যন্ত অপেক্ষা করলে উচ্চশিক্ষা কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে, কে জানে! শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এক দিনও বন্ধ থাকার ক্ষতি বোধ করি সরকার উপলব্ধি করতে পারছে না কিংবা পারলেও তা গুরুত্বপূর্ণ মনে করছে না। এটি একটি জাতির জন্য চরম দুর্ভাগ্যের।

কিছু ব্যতিক্রম বাদে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে দেশের সবচেয়ে মেধাবী শিক্ষার্থীরাই শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। সুযোগ থাকা সত্ত্বেও অন্য কোনো চাকরিতে না গিয়ে ভালোবেসে, জ্ঞানচর্চা ও জ্ঞান বিতরণের মহৎ বাসনা থেকে তাদের বেশির ভাগ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতাকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করেন। এ কারণে দেশের সর্বোচ্চ সুযোগ-সুবিধা, মর্যাদা তাদেরই প্রাপ্য। অথচ বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকরা যেসব সুযোগ-সুবিধা ভোগ করছেন, তা সমপর্যায়ের অন্যান্য চাকরির তুলনায় যথেষ্ট কম। আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর সঙ্গে তুলনা করলেও দেখা যায়, বাংলাদেশের শিক্ষকদের (সব শ্রেণির) বেতন সবচেয়ে কম। ফলে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মেধাবী শিক্ষার্থীদের শিক্ষকতা পেশার প্রতি উদাসীনতা, বিদেশমুখী প্রবণতা বহুগুণে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা জাতির জন্য অশনিসংকেত। মেধাবী শিক্ষক না থাকলে একটি মেধাভিত্তিক টেকসই ও সভ্য জাতি বিনির্মাণ সম্ভব নয়।

সে বিবেচনায় যেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সুযোগ-সুবিধা বাড়ানো উচিত, সেখানে প্রত্যয় স্কিমের মাধ্যমে তা কমানোর উদ্যোগ স্বাভাবিকভাবেই শিক্ষকদের হতাশ করেছে। এ কারণে গত ১৩ মার্চ প্রত্যয় স্কিম-সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারির পর থেকে শিক্ষকরা তা বাতিলের দাবিতে ধারাবাহিক কর্মসূচি পালন করে আসছেন। সরকারের কোনো সদর্থক সাড়া না পেয়ে অনেকটা বাধ্য হয়েই তারা টানা কর্মবিরতি পালন করছেন। পাশাপাশি তারা আন্দোলনের শুরু থেকে আলোচনার আহ্বানও জানিয়ে আসছেন। তারা কোনোভাবেই চান না শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এক দিনও বন্ধ থাকুক; শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হোক। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, সরকারের দিক থেকে চরম উদাসীনতা লক্ষ্য করা গেছে।

১২ দিন টানা কর্মবিরতির পর গত শনিবার আলোচনায় বসার সুযোগ হয়, যেখানে তথ্যগত বিভ্রাটের কথা বলে প্রত্যয় স্কিম এ বছরের পরিবর্তে আগামী বছর ১ জুলাই থেকে কার্যকরের কথা বলা হয়, যা ইতোমধ্যে এক বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমেও জানানো হয়েছে। তবে শিক্ষকরা এতে খুশি হতে পারেননি এবং তাদের কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। কেননা, তারা প্রত্যয় স্কিম এক বছর পিছিয়ে দেওয়া নয়; বাতিল চেয়েছেন। এ ছাড়া তাদের অন্য দুটি দাবির ব্যাপারেও কোনো অগ্রগতি হয়নি।

বাংলাদেশের মতো রাষ্ট্রে সরকার না চাইতে কারও সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি করেছে– তেমন নজির কম। তদুপরি শিক্ষকরা এ প্রত্যয় স্কিমের মতো কোনো বিশেষ সুবিধার কথা কোথাও দাবি করেননি। কাজেই এর উদ্দেশ্য নিয়ে সংশয় থাকা অস্বাভাবিক কিছু নয়। আর শিক্ষকরা যদি বিদ্যমান অল্প সুবিধা নিয়েই সন্তুষ্ট থাকেন, তাহলে আগ বাড়িয়ে বেশি (?) সুবিধাযুক্ত প্রত্যয় স্কিমে যুক্ত হতে বাধ্য করার যৌক্তিকতা দেখছি না।

বিশ্ববিদ্যালয় একটি জাতির মস্তিষ্ক। একজন ব্যক্তির মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ হলে তার বেঁচে থাকা কঠিন হয়ে পড়ে। একইভাবে উচ্চশিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হলে জাতি পিছিয়ে পড়ে, উন্নতি-অগ্রগতি ব্যাহত হয়। কাজেই সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে সমস্যা সমাধানে আন্তরিকভাবে এগিয়ে আসতে হবে। যত দ্রুত সমস্যা সমাধান করে স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রম ফিরিয়ে আনা যায় ততই মঙ্গল।

ড. মো. আশরাফুল আলম: সহযোগী অধ্যাপক, সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.