নিজস্ব প্রতিবেদক।। সব ক্ষেত্রে দুর্নীতি, আদালতে বিচারকের অভাব ও বিচারপ্রার্থীদের নানারকম হয়রানি এবং শিক্ষা খাতের সর্বগ্রাসী অনিয়ম-দুর্নীতি নিয়ে সংসদে ক্ষোভ ঝাড়লেন বিরোধী দল জাতীয় পার্টির (জাপা) এক জন ও স্বতন্ত্র চার জন সংসদ সদস্য। তাদের কেউ বলেছেন, শিক্ষা খাতে টাকা ছাড়া ফাইল নড়ে না, টেবিলে টেবিলে টাকা দিতে হয়। কেউ বলেছেন, শিক্ষায় কেবল ভবন হয়েছে, কিন্তু শিক্ষার মানে বদল হয়নি। আদালত নিয়ে তারা বলেছেন, বিচারের জন্য এ দরজা ঐ দরজা ঘুরতে ঘুরতে মানুষের জীবন শেষ। গতকাল রবিবার সংসদে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বাজেটে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ, আইন ও বিচার বিভাগ এবং সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের মঞ্জুরি দাবির বিরুদ্ধে ছাঁটাই প্রস্তাবের আলোচনায় অংশ নিয়ে তারা এভাবে তোপ দাগান।
মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের মঞ্জুরি দাবির বিরুদ্ধে ছাঁটাই প্রস্তাবের আলোচনায় নাটোর-১ আসনের স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য আবুল কালাম বলেন, সব ক্ষেত্রেই দুর্নীতি। শিক্ষায় ব্যাপক দুর্নীতি, এটা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। টাকা দেওয়া ছাড়া কোনো শিক্ষক অবসরভাতা পাচ্ছেন না। আমার শ্যালক শিক্ষক ছিলেন, মারা গেছেন। আমি নিজে তিন বছর তদবির করলেও অবসর ভাতা পাননি। টাকা ছাড়া কিছুই হয় না। এটা সর্বগ্রাসী দুর্নীতি। এ দুর্নীতির কারণে গোটা জাতি গ্রাস হয়ে যাচ্ছে। শিক্ষিত বেকার যুবকরা আত্মহত্যা করছে।
গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরের বরাত দিয়ে আবুল কালাম বলেন, রেলের খালাসি পদে ২ হাজার ১০০ ছেলেমেয়ের চাকরি হয়েছে, যাদের সবাই অনার্স-মাস্টার্স পাশ। এটা খুবই কষ্টের বিষয়। আমি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দ বাড়ানোর পক্ষে। কিন্তু আগামী অর্থবছরে কমপক্ষে ৫ লাখ অনার্স-মাস্টার্স পাশ ছেলেমেয়ের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে কোনো শিক্ষিত বেকার না থাকে।
কুড়িগ্রাম-২ আসনের স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য হামিদুল হক খন্দকার বলেন, শিক্ষায় বরাদ্দ সব সময় জিডিপির লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় পিছিয়ে থাকে। শিক্ষাব্যবস্থায় বিভিন্ন অনিয়ম, দুর্নীতি, বৈষম্য লেগেই আছে। এখানে প্রাতিষ্ঠানিক, শিক্ষাক্রম ও আঞ্চলিক বৈষম্য রয়েছে। মাঠপর্যায়ের শিক্ষা কর্মকর্তারা একই কর্মস্থলে পাঁচ-সাত বছর থেকে বিভিন্ন ধরনের অনিয়ম-দুর্নীতির সঙ্গে যুক্ত থাকেন।
বরিশাল-৪ আসনের স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য পঙ্কজ নাথ বলেন, এনটিআরসিএর মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগ প্রশংসনীয়। তবে কুড়িগ্রামের চিলমারীর কেউ যদি বরিশালের মেহেন্দীগঞ্জে নিয়োগ পান, তাহলে তিনি যোগদান করেন না। পার্বত্য এলাকায় আরও সমস্যা। এ কারণে শিক্ষক নিয়োগের পরও শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। এ নিয়োগ অঞ্চলভিত্তিক করার বিষয়টি বিবেচনা করতে হবে।
সংসদ সদস্যদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সভাপতি হওয়ার বিষয়ে আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করা হয়েছে কি না, তা শিক্ষামন্ত্রীর কাছে জানতে চেয়ে পঙ্কজ নাথ বলেন, হাইকোর্ট এমপিদের সভাপতি হতে বারণ করলেন। বারবার এমপিরা এটা নিয়ে কথা বলেছিলেন। শিক্ষামন্ত্রী বলেছিলেন আপিল করবেন। আসলে এমপিদের সবাই অপমান করে, এমপিদের অসম্মান করতে খুব উৎসাহ বোধ করেন। জানি না হাইকোর্টের ঐ আদেশের বিরুদ্ধে আদৌ আপিল করেছেন কি না? আজ তিনি মন্ত্রী, কাল কোনো কারণে যদি মন্ত্রী না হন, তাহলে তার অবস্থাও আমার মতো হবে।
জাপাদলীয় সংসদ সদস্য হাফিজ উদ্দিন আহম্মেদ বলেন, শিক্ষাব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন হয়েছে। ভবন হয়েছে, কিন্তু শিক্ষার মানের পরিবর্তন হয়নি। আমার নির্বাচনি এলাকায় একটি সরকারি বিদ্যালয়ে ৪৩টি শ্রেণিকক্ষ আছে। পাঠদান হয়নি পাঁচটিতেও। এই যে অপব্যয়। আমার পাকা বাড়ি, পাকা পায়খানা, কিন্তু খাবার নেই। এটা হচ্ছে আজকের শিক্ষার অবস্থা। তিনি বলেন, এমপিওভুক্তির আবেদন নেওয়া বন্ধ আছে। এমপিওভুক্তির জন্য বিভিন্ন টেবিলে যেতে হয়, টাকা দিতে হয়। ধাপে ধাপে টেবিল মানে ধাপে ধাপে দুর্নীতি। ঝিনাইদহ-২ আসনের স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য নাসের শাহরিয়ার জাহেদী প্রশাসনিক ব্যয় কমিয়ে শিক্ষা গবেষণায় ব্যয় বাড়ানোর প্রস্তাব করেন।
সংসদ সদস্যদের এসব বক্তব্যের জবাবে শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী বলেন, উচ্চ আদালতের আদেশের পরিপ্রেক্ষিতে এনটিআরসিএর মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগের সুপারিশ করা হয়। দূরবর্তী জায়গায় অনেকে যোগদান করেন না, এটা ঠিক। তারপরও গত ছয় মাসে ৯৯ হাজার শিক্ষককে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। আইন সংশোধনের মাধ্যমে সমস্যা নিরসনের চেষ্টা করা হচ্ছে। সংসদ সদস্যদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের গভর্নিং বডির সভাপতি হতে না পারা প্রসঙ্গে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করার ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তবে শিক্ষামন্ত্রী তার বক্তব্যে দুর্নীতির অভিযোগের বিষয়ে কিছু বলেননি।
শিক্ষাবার্তা ডটকম/জামান/০১/০৭/২০২৪
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
