লায়লা ফেরদৌস হিমেলঃ বিশ্ববিদ্যালয় একটি অলাভজনক প্রতিষ্ঠান জেনেও বিশ্ববিদ্যালয়ে এমন ছাত্র খুব কমই খুঁজে পাওয়া যাবে যারা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ন করেছে অথচ শিক্ষক হওয়ার স্বপ্ন দেখেননি। তাই যাদের এ স্বপ্ন পূরণ হয়, তারা মেধার বিনিময়ে কেবল সম্মানপ্রাপ্ত হতে চান। সে সম্মান দুইভাবে প্রাপ্ত হন একজন শিক্ষক- ক. শিক্ষার্থীদের আচরণে ও খ. পদোন্নতি। শিক্ষার্থীদের আচরণ ব্যক্তি থেকে ব্যক্তিতে পৃথক হয় বিধায় শিক্ষক তা আশানুরূপ না হলেও মেনে নেন। কিন্তু কেবল সিস্টেম লসের কারণে শর্তপূরণ হওয়া সত্ত্বেও বছরের পর বছর পদোন্নতিপ্রাপ্ত না হওয়া শিক্ষকমনে হতাশার সৃষ্টি করতেই পারে। যোগ্যতম ব্যক্তিটিকে উপেক্ষা করে কেবল কোরাম রক্ষার স্বার্থে অযোগ্য ব্যক্তির ওপর একাধিক দায়িত্ব ও পদ প্রদান করলে যোগ্যতম ব্যক্তিটি হতাশাগ্রস্ত হতেই পারে। একই পদে অধিষ্ঠিত একই যোগ্যতাসম্পন্ন দুজন শিক্ষক কোনো প্রাপ্য সুবিধা ভোগের ক্ষেত্রে বৈষম্যের শিকার হলেও তা থেকে হতাশাগ্রস্ত হতে পারেন শিক্ষক।
বর্তমান সময়ের শিক্ষার্থীরা, যারা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছেন তারা অনেকে জানেনই না তারা কেন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছে। বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজের পার্থক্য সম্পর্কে তাদের ধারণা যথেষ্ট নয়। যদিও তারা অধিকাংশই স্থানীয় নিকটবর্তী কলেজে স্নাতকে ভর্তি না হয়ে তুলনামূলক নিকটবর্তী বা প্রয়োজনবোধে দূরবর্তী কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতকে ভর্তি হওয়ার চেষ্টা করেছেন আপ্রাণ। বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠদানের পদ্ধতি ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে অবগত না হওয়ায় তারা বিশ্ববিদ্যালয়ে এসেও স্কুল-কলেজের মতো কেবল শৃঙ্খলিত শ্রেণিভুক্ত পাঠ গ্রহণের দিকে ঝুঁকছে দেশপ্রেম বা উন্মুক্ত কোনো পাঠের প্রতি তাদের আগ্রহ কম। সেক্ষেত্রে শিক্ষকদের যথাযথ দায়িত্ব পালনে অবহেলার বিষয়টিও দৃষ্টিগোচর হয় বরাবরই। কারণ শিক্ষার্থীদের জ্ঞানের স্বল্পতা যেখানে, সেখানে যথাযথ জ্ঞান প্রদান করা শিক্ষকের দায়িত্বের আওতাভুক্ত। বিশ্ববিদ্যালয় কেবল একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়।
বিশ্ববিদ্যালয় হলো খাঁটি মানুষ তৈরির কারখানা। উপযুক্ত প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাাশি একজন সৎ ও সুনাগরিক হিসেবে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করার দায় বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক তাই এড়াতে পারেন না।
অর্থাৎ যে ছাত্রটির কাছে বিশ্ববিদ্যালয় কেবল গ্র্যাজুয়েট তৈরির কারখানা, যে ছাত্রটি কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যকার বিভাজন বা এদের উদ্দেশ্য সম্পর্কে অবগত নয় অথবা বিশ্ববিদ্যালয় যার কাছে এখন একটি প্রতিষ্ঠানমাত্র, যেখানে চাকরির শর্তসাপেক্ষে মানসম্মত কিছু সার্টিফিকেট পাওয়া যায়- তার দ্বারা শিক্ষকরা কোন মানদণ্ডে মূল্যায়িত হবেন তা নিয়ে সংশয় থাকলেও শ্রেণিমূল্যায়ন বা শিক্ষক মূল্যায়নের প্রক্রিয়াটিকে বর্তমান সময়ের প্রেক্ষিতে অস্বীকার করার অবকাশও নেই। বর্তমান সময়ে নব্যপ্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষা কার্যক্রম পর্যালোচনা করে জানা যায়, নতুন নতুন বিষয় খুলে ভর্তি কার্যক্রম ও পাঠদান শুরুর বিষয়ে অনাগ্রহী তারা।
কিছু বিশ্ববিদ্যালয় আবার শুরুর দিকে নতুন কিছু বিষয় খুলে পাঠদান শুরু করলেও পরে নাম পরিবর্তন করে পুনরায় ‘রিলেটেড মাদার সাবজেক্ট’ বা পুরোনো প্রচলিত বিষয়ে রূপান্তরিত করে নিচ্ছে সে বিষয়গুলোকে। যদিও বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যই হলো উচ্চশিক্ষা প্রদানের পাশাপাশি নতুন নতুন বিষয়ে গবেষণা ও পাঠের দ্বার উন্মোচিত হওয়া। দেশ স্বাধীন হওয়ার মাত্র এক বছরের মাথায় এ দেশের সব বিশ্ববিদ্যালয়কে স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান হিসেবে ঘোষণা দেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।
সদ্য-স্বাধীন দেশে এ সিদ্ধান্ত ছিল মুক্তচিন্তায় উদ্বুদ্ধ মানবিক ও গণতান্ত্রিকবোধ সম্পন্ন আগামী প্রজন্ম গড়ে তোলার সহায়ক প্রথম ধাপ। আজ এ প্রজন্মই মূল্যায়নের কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে চাইছে বঙ্গবন্ধু ঘোষিত স্বায়ত্তশাসিত বিদ্যাপীঠের শিক্ষকদের। এ প্রজন্ম চায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা মূল্যায়িত হোক শিক্ষার্থীদের দ্বারা। এর পেছনে রয়েছে যুক্তিযুক্ত যথেষ্ট কারণও।
‘দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের এবার দাঁড়াতে হবে মূল্যায়নের কাঠগড়ায়’- নিয়মভঙ্গের নিয়ম গড়ার এমন সিদ্ধান্ত যতটা আশা জাগায়, শঙ্কা জাগে তার থেকে বেশি বৈ কম নয়। তবু যা সময়ের আবর্তে শীর্ণ তা বিদায় হোক। নবদিগন্ত উন্মোচিত হোক জ্ঞানচর্চার) এই প্রত্যাশা। তাতে যদি প্রয়োজন হয়, দাঁড়াক শিক্ষক মূল্যায়নের কাঠগড়ায়। তবে প্রশ্ন থেকে যায়, কাদের দ্বারা মূল্যায়িত হবেন শিক্ষক।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মধ্যে মতাদর্শের পার্থক্যের কারণে বিভাজনের বিষয়টি কারও অজানা নয়। এই বিভিন্ন গ্রুপে বিভাজিত শিক্ষকরা প্রতিপক্ষ গ্রুপের শিক্ষকদের হেনস্তা করার জন্য একে অপরের নামে বিদ্বেষমূলক কথা শিক্ষার্থীদের মাঝে ছড়িয়ে দেয়। এর মধ্যে কমন একটি বিষয় হলো, নিয়োগে দুর্নীতি।
একই নিয়োগ বোর্ড থেকে নিয়োগপ্রাপ্ত দুজন শিক্ষক উভয়েই বিপরীতজনের নিয়োগকে পক্ষপাতদুষ্ট বা বেআইনি বলছে- এমন ঘটনা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বিরল নয়। ফলে উভয় দলের শিক্ষকই একটা সময়ে ইমেজ-সংকটে ভুগছেন। শিক্ষার্থীরা হারাচ্ছেন শিক্ষকদের প্রতি তাদের আস্থা বা সম্মানবোধ। তাই তারা আজ শিক্ষকদের কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে চাইছেন। আবার নিয়োগের ক্ষেত্রে যে অনিয়ম একেবারেই হচ্ছে না, তাও তো নয়।
শিক্ষক নিয়োগে দুর্নীতি বিষয়ে কথা বলতে হলে আরও একটু পেছন থেকে শুরু করাই ভালো। তা না হলে ‘ডিম আগে নাকি মুরগি আগে’ জাতীয় প্রশ্ন থেকে যাবে। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের একটি বছর পার হতে না হতেই তুমি অমুক শিক্ষকের ছাত্র এবং ও তমুক শিক্ষকের ছাত্র বলে যে বিভাজনের শিকার হয় ছাত্ররা তা একপর্যায়ে মনে-মগজে স্বীকার করে নিয়েই শিক্ষাজীবন শেষ করতে হয় অধিকাংশ শিক্ষার্থীকে। এই অমুক-তমুক শিক্ষকের ছাত্ররা গোত্রের প্রধান সেই প্রভাবশালী শিক্ষকের শক্তিতে শক্তিমান যেমন হয়, তেমনি অন্য গোত্রের প্রভাবশালী শিক্ষক কর্তৃক লাঞ্ছিতও হয় পদে পদে। সেক্ষেত্রে শিক্ষক মূল্যায়ন বা শ্রেণিপাঠ মূল্যায়নের বিষয়টি নির্ভর করবে কোন তথাকথিত প্রভাবশালী শিক্ষকের ঝোলায় কতজন ছাত্র আছে তার ওপর। তাই মূল্যায়ন ফর্মে নিজের অবস্থান ঠিক রাখতে শিক্ষক কর্তৃক ছাত্রদের আরও বেশি গ্রুপিংয়ের শিকার হওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়াটা বোকামি। আর এর সঙ্গে কোনো শিক্ষক যদি বাসায় বসে পরিশ্রম করে হ্যান্ডনোট বা তথ্যসংকলন (গাইড বই) তৈরি করে মূল্যের বিনিময়ে তা ছাত্রদের মধ্যে বিতরণ করেন, তাহলে মোটা অঙ্কের অর্থের জোগান হোক বা না হোক, শিক্ষার্থীদের কাছে সেই শিক্ষক জনপ্রিয় হয়ে উঠবেন, এটা নিশ্চিত। অথচ লাতিন যে শব্দটি থেকে বাংলা ‘বিশ্ববিদ্যালয়’ শব্দটির ইংরেজি প্রতিশব্দ ইউনিভার্সিটির উদ্ভব তা হলো, ‘ইউনিভার্সিটাস’ যার অর্থ একত্রকরণ বা সমন্বয়। এ সমন্বয় বৈশ্বিক জ্ঞানের সমন্বয় ভিন্ন কিছু নয়।
পূর্ণাঙ্গ অনুমোদিত সিলেবাস অনুযায়ী শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করছে, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের আওতাধীন বা এমপিওভুক্ত এমন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা কলেজের সংখ্যা নিতান্ত কম নয়। এ ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকেও চাকরির শর্ত অনুযায়ী মানসম্মত সার্টিফিকেট প্রদান করা হয়। তথাপি দেশে এত অসংখ্য বিশ^বিদ্যালয় গড়ে ওঠার কারণ অনুসন্ধানের প্রয়োজন রয়েছে। এ দায়িত্ব শিক্ষার্থীদের নিজেদের। কারণ এই জানা-অজানার দোলাচলে যেটুকু হারানোর তা কেবলই তাদের। তবে শিক্ষক মূল্যায়নের যে বিষয়টি ঘটবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে, তা আদতে শুরু হয়ে গেছে আরও আগেই।
বছরের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত শিক্ষকদের নিয়ে কৃত শিক্ষার্থীদের নানান সমালোচনা অভিযোগ হিসেবে জমা হয় চেয়ারম্যানের দফতরে। এর কিছু বিষয় একাডেমিক মিটিংয়ে উঠে আসে আবার কিছু শূন্যে মিলিয়ে যায়। এর কিছু অভিযোগ মিথ্যে থাকলেও কিছু থাকে সত্য। সে সত্য অভিযোগগুলোর কারণ অনুসন্ধান করলে শিক্ষকদের দায়িত্বে অবহেলার কথা জানা যায়।
এ অবহেলা যদি অনাগ্রহ থেকে সৃষ্ট হয় তবে এর কারণ খুঁজে বের করা জরুরি। অসুখ নির্ণীত না হলে সঠিক ওষুধ প্রয়োগ সম্ভব নয়। তাই খুঁজে বের করা জরুরি বহু কাক্সিক্ষত পেশায় যুক্ত হওয়ার পর কেন তৈরি হচ্ছে এমন অনাগ্রহ। এ কারণ খুঁজে বের করা খুব কঠিনও নয়। তাই শিক্ষক মূল্যায়নের পাশাপাশি মূল্যায়িত হোক উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থাও, এই কামনা।
লেখক : শিক্ষক, বাংলা বিভাগ, রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়
শিক্ষাবার্তা ডট কম/এএইচএম/২৫/১২/২০২৩
দেশ বিদেশের শিক্ষা, পড়ালেখা, ক্যারিয়ার সম্পর্কিত সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম, ছবি, ভিডিও প্রতিবেদন সবার আগে দেখতে চোখ রাখুন শিক্ষাবার্তায়
| “মুক্তমত ও সাক্ষাৎকার কলামে প্রকাশিত নিবন্ধ লেখকের নিজস্ব। শিক্ষাবার্তা’র সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে মুক্তমত ও সাক্ষাৎকারে প্রকাশিত মত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে। প্রকাশিত লেখাটির ব্যাখ্যা বা বিশ্লেষণ, তথ্য-উপাত্ত, রাজনৈতিক ও আইনগতসহ যাবতীয় বিষয়ের দায়ভার লেখকের;- শিক্ষাবার্তা কর্তৃপক্ষের নয়।” |
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
