এইমাত্র পাওয়া

যেভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক তৈরি করা হয়

শেখ ফরিদ: যুক্তরাষ্ট্রে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হতে হলে পিএইচডি ডিগ্রি থাকা সাধারণত বাধ্যতামূলক। যার ফলে এখানে পিএইচডি প্রোগ্রাম সাজানো হয় প্রধানত বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক তৈরির উদ্দেশে। পৃথিবীর অন্যান্য দেশে পিএইচডি প্রোগ্রাম তিন বছরের হলেও যুক্তরাষ্ট্রের পিএইচডি প্রোগ্রাম ন্যূনতম ৫ বছরের। পিএইচডি প্রোগ্রাম কম্পিটেটিভ, অনেক প্রক্রিয়ার মধ্যদিয়ে প্রতিটি স্কুল তাদের পিএইচডি স্টুডেন্ট সিলেক্ট করে। প্রতিটি প্রোগ্রামে বছরে ৩-৬ জন স্টুডেন্ট ভর্তি কয়ায়। পিএইচডি এডমিশন সাধারণত ফান্ডিংসহ হয়। তারা পিএইচডি স্টুডেন্টদের টিউশন ফি পরিশোধের পর একটা বেতন দিবে মাসে মাসে। একটা সাবজেক্টে যতজনকে দেওয়ার মতো ফান্ড আছে, ততোজনকে তারা ভর্তি করায়। কারণ অনার্স ও মাস্টার্স শেষ করার পর বেতন না পেলে কেউই পিএইচডি করতে আগ্রহী হবে না। তার মানে, পিএইচডিতে ভর্তির সুযোগ পাওয়ার অর্থ একধরনের চাকরি পাওয়াও। তবে এটা হাফ এম্পলয়মেন্ট। কারণ এখানে স্টুডেন্টদের সপ্তাহে ২০ ঘণ্টার বেশি চাকরি করার সুযোগ নেই।

এই ৫ বছরের প্রথম ২ বছর কোর্সওয়ার্ক করতে হয়। চার সেমিস্টার। আরেকটা মাস্টার্স করার মতোই। কোর্সওয়ার্ক খুব রিগোরাস হবে, যেহেতু ক্লাসের স্টুডেন্টের সংখ্যা ৪/৫ জন। আলোচনা একটু এডভান্স লেভেলের হবে, এক্সপেকটেশন একটু বেশি থাকবে, অনেক এইংগেজিং ক্লাস হবে। একই সঙ্গে এই দুই বছর একজন প্রফেসরের সাথে রিসার্চ এসিস্ট্যান্ট হিসেবে কাজ করতে হয়। উদ্দেশ্য হলো পিএইচডি গবেষণা শুরু করার আগে কীভাবে গবেষণা করতে হবে সেটা ক্লাসে শেখার পাশাপাশি একজন প্রফেসরের সাথে প্র্যাক্টিক্যালি শেখা। একটা উদাহরণ দিই, আমি এই সেমিস্টারে ডিফারেন্স ইন ডিফারেন্স এনালাইসিস শিখেছি আমার স্ট্যাটিসটিকস কোর্সে, আবার আমার সুপারভাইজারের সাথে যে গবেষণায় কাজ করছি, সেখানেও এই মডেলটা ব্যবহার করেছি। এটা আমাকে প্র্যাক্টিক্যালি গবেষণা শেখার সুযোগ করে দিয়েছে।

দুই বছর পর পিএইচডি স্টুডেন্টরা নিজের স্বতন্ত্র গবেষণা নিয়ে কাজ করা শুরু করে। এ সময়ে সাধারণত তারা টিচিং এসিস্ট্যান্ট হিসেবে কাজ করে। অধিকাংশ প্রোগ্রামে অনার্স ও মাস্টার্সের স্টুডেন্টদের ক্লাস নিতে হয়। অর্থাৎ এই তিনবছর সে অনার্স ও মাস্টার্সের স্টুডেন্টদের পড়াবে এবং পড়ানোর দক্ষতা অর্জন করবে। পড়ানোর সাথে সাথে নিজের গবেষণার কাজও চালিয়ে যেতে হবে। একটা কমিটি যখন সেই গবেষণাকে মৌলিক জ্ঞান হিসেবে স্বীকৃতি দিবে, তখনই সে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করবে। এই ৫ বছরে পিএইচডি স্টুডেন্টদের ডেভেলপমেন্টের জন্য আরো অনেকে কিছু থাকে, সবকিছুই তাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে তৈরি করার জন্য। রিসার্চ সুপারভাইজার ছাড়াও আমার একজন ডক্টরাল এডভাইজার আছেন, উনার সাথে আমি প্রতি ১৫ দিনে একবার মিটিং করি। উনি আমার ক্যারিয়ার ডেভেলপমেন্টের যাবতীয় গাইডলাইন দেন। আমার ক্যারিয়ার ডেভেলপমেন্টের জন্য কিছু টার্গেট উনি আর আমি দুজন মিলে সেট করেছি, সেই টার্গেট পূরণে উনি আমাকে সহযোগিতা করেন।

প্রতি ১৫ দিনে একবার আমাদের জন্য ডক্টরাল স্টুডেন্টস সেমিনার হয়। এই সেমিনারে আমাদের সাব্জেক্ট ও প্রফেশনে অভিজ্ঞ একজন স্কলার আসেন এবং একটা নির্দিষ্ট বিষয় নিয়ে আলোচনা করেন। এছাড়াও প্রতি বছর একটা কনফারেন্সে পেপার প্রেজেন্ট করার জন্য ফান্ড আছে। এভাবে ৫ বছর একজনকে গবেষণা ও শিক্ষকতা শেখানোর পর পিএইচডি ডিগ্রি দিয়ে তারপর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগে আবেদন করার জন্য জব মার্কেটে ছেড়ে দেওয়া হয়। এরপর একটা স্বচ্ছ নিয়োগ প্রক্রিয়ায় নিজেকে প্রমাণ করতে পারলেই এখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হতে পারবে। এই যখন একটা দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক তৈরির ম্যাকানিজম, সেখানে আমাদের দেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হতে কেবল অনার্স ও মাস্টার্স করা লাগে। এরপর একটা ভাইভা, ভাইভার আগে দেখা করা, কথা দেওয়া, টাকা দেওয়া। ব্যাস। হয়ে গেলো শিক্ষক। ৩০-৪০ বছর সে পড়াবে, গবেষণা করবে, ধরে ধরে প্রিডেটরি ও ইন্ডেক্স ছাড়া জার্নালে পাব্লিশ করবে। সেই গবেষকের উপরও কারো আস্থা নেই, কেউ ফান্ড দেবে না। সেই পড়াশোনার প্রতিও কারো আস্থা নেই।

এমপি, মন্ত্রী এমনকি তাদের নিজেদের সন্তানদেরও সেখানে পড়াবে না। পারলে বাইরেই পড়াবেন। আর আমাদের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সবক দেবেন। শিক্ষক হওয়ার আবেদন করতে গেলে এখনো ৭-১০ কপি ফটোকপি করা লাগে, ব্যাংকে গিয়ে টাকা ডিডি করা লাগে, আবেদনপত্রে প্রকাশনার তালিকা দেওয়ারও জায়গা থাকে না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পিএইচডির আবেদন ফরমটা একশ বছরের পুরোনো, কেউ দেখার নেই। গবেষণার তালিকা চেয়েছে একটা লাইনে, কিন্তু দুই শব্দ লেখার জায়গা নেই। ভাবার কেউ নেই, পরিবর্তন করার মতো ক্উে নেই। একাডেমিক কোনো কন্ট্রিবিউশান নেই, তথ্য প্রযুক্তির ন্যূনতম জ্ঞান নেই, সায়েন্টেফিক আর্টিকেল সার্চ করার তিনটা টুল বলতে পারবে না, তাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রোভিসি বানিয়ে রেখেছে। সেই প্রোভিসি বসে বসে সব বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগ দেয়, সাথে ২০ লাখ টাকা করেও নেয়, নিজে নেয় না, আরেকজনের মাধ্যমে নেয়। স্কোপাস, ওয়েব অব সায়েন্সে নাম সার্চ দিলেও একটা আর্টিকেল আসে না, তাকে বানিয়েছে সব নিয়োগ বোর্ডের সদস্য। সে কীভাবে ইনোভেশন করবে। সে কীভাবে আন্তর্জাতিক মানের বিশ্ববিদ্যালয় বানাবে! আহারে দেশ। আহারে বিশ্ববিদ্যালয়।

২ মিনিটের জন্য নিজের ওই সংকীর্ণ গণ্ডি থেকে বের হোন। পৃথিবী দেখেন। কত এগিয়েছে বিশ্বের শিক্ষা ব্যবস্থা, দেখেন। পিএইচডি ছাড়া শিক্ষক নিয়োগ থেকে বিশ্ব বের হয়ে আসছে বহু আগে, অথচ আপনি পারলে আপনার ইন্টার পাস ছেলেকেও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক বানাবেন। নকল করে পাস করা, পুরো ছাত্রজীবনে কোনোদিন বিভাগের লাইব্রেরিতে না যাওয়া কয়েকজনকে দেখেছি শিক্ষক হতে। শিক্ষায় প্রযুক্তির ব্যবহার শিক্ষাকে কোথায় নিয়ে গেছে দেখেন। উন্নত বিশ্বে গবেষণার মূল কেন্দ্রে আছে বিশ্ববিদ্যালয়। সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের প্রতিও মানুষের আস্থা আছে। প্রাইভেট কোম্পানিগুলো শিক্ষকদের কোটি কোটি টাকা ফান্ড দিচ্ছে গবেষণার জন্য। প্রতিটি গবেষণা প্রস্তাবনায় পিএইচডি স্টুডেন্টদের ইনক্লুড করার কথা থাকে, যাতে ভবিষ্যৎ গবেষক তৈরি হয়। এভাবেই একটা সিস্টেম দাঁড় করানো হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা পুরোটা নির্ভর করে আপনি কেমন শিক্ষক নিয়োগ দিয়েছেন সেটার উপর। পরিবর্তন করেন এসব নিয়ম। উচ্চ শিক্ষা নিয়ে এসব তামাশা বন্ধ করেন। আমার এসব কথা আপনারা কানে নেবেন, সেটা আমি বিশ্বাস করি না। এসব পরিবর্তন না করলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম আপনাদের ক্ষমা করবে না।

শিক্ষাবার্তা ডট কম/এএইচএম/২১/১২/২০২৩ 

দেশ বিদেশের শিক্ষা, পড়ালেখা, ক্যারিয়ার সম্পর্কিত সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম, ছবি, ভিডিও প্রতিবেদন সবার আগে দেখতে চোখ রাখুন শিক্ষাবার্তায়

“মুক্তমত ও সাক্ষাৎকার কলামে প্রকাশিত নিবন্ধ লেখকের নিজস্ব। শিক্ষাবার্তা’র সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে নিবন্ধ ও সাক্ষাৎকারে প্রকাশিত মত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে। প্রকাশিত লেখাটির ব্যাখ্যা বা বিশ্লেষণ, তথ্য-উপাত্ত, রাজনৈতিক, আইনগতসহ যাবতীয় বিষয়ের দায়ভার লেখকের, শিক্ষাবার্তা কর্তৃপক্ষের নয়।”


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.