অধ্যাপক ড. কামরুল হাসান মামুন: বিশ্বের ১৬০টি দেশে ইংরেজি মাধ্যম প্রচলিত। বাংলাদেশে ১৩৭টি ইংরেজি মাধ্যমের স্কুল আছে। পশ্চিমবঙ্গেও ইংরেজি মাধ্যম খুবই জনপ্রিয়। তবে সাধারণ নিম্নবিত্ত ও নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবার তাদের ছেলেমেয়েদের এই মাধ্যমে পড়াতে পারেন না। ইংরেজি মাধ্যম কতটা জনপ্রিয় সেটা শিক্ষিত কিংবা অশিক্ষিত উচ্চ মধ্যবিত্ত কিংবা উচ্চবিত্ত পরিবারের মধ্যে একটু জরিপ নিলেই টের পাওয়া যাবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মাঝে জরিপ নিন কিংবা আমলা, এমপি, মন্ত্রী অথবা ধনী ব্যবসায়ীদের মাঝে জরিপ নিন দেখবেন প্রায় ৬০%-৭০% কিংবা এর চেয়ে বেশি ছেলেমেয়েই পাবেন ইংরেজি মাধ্যমের। একটা সময় ছিল যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের ছেলেমেয়েরা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হতো। গত ৫০ বছরের জরিপ নিন দেখবেন এই ট্রেন্ড এখন বিলীন হয়ে গেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে দুটো স্কুল আছে। একটির নাম উদয়ন এবং আরেকটির নাম ইউনিভার্সিটি ল্যাবরেটরি স্কুল। দ্বিতীয়টি হলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অফ এডুকেশন রিসার্চের গবেষণা কেন্দ্র। একসময় এই দুটোতেই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের ছেলেমেয়েরা পড়তো। এখন এই সংখ্যা কমতে কমতে অনেক কমে গিয়েছে। একই সাথে স্কুল দুটোর মানও কমেছে।
কথা হলো উচ্চ শিক্ষিত কিংবা উচ্চবিত্তের ছেলেমেয়েরা ইংরেজি মাধ্যমে পড়ে কেন? নিশ্চই তারা মনে করেন এই মাধ্যমের কারিকুলাম খুবই ভালো। এই উচ্চবিত্তের একটা বড় অংশ যারা নিজের সন্তানদের জন্য মনে করে ইংরেজি মাধ্যম ভালো আর অন্যের সন্তানের কথা আসলে একদিকে বাংলা মাধ্যমের গুণগান গায় আর অন্যদিকে এই মাধ্যমের উন্নতির নামে নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা নিশ্চিন্ত মনে করে। কারণ এসব পরীক্ষায় তাদের সন্তানরা ক্ষতিগ্রস্ত হবে না। তারা হয়তো মনে করেন, ইংরেজি হলো আভিজাত্যের সিম্বল এইটা সবার হবে কেন? চাষাভুষার ছেলেমেয়েদের বেশি ইংরেজি জানার দরকার নেই! আমরা ইংরেজি ভাষা জানার সাথে জ্ঞানের সম্পর্ক তৈরি করে ফেলেছি। যে ভালো ইংরেজি জানে তাকে মহাজ্ঞানী মনে করি। যা আহাম্মকি। পৃথিবীতে এমন একটি দেশ নেই যেই দেশের ছেলেমেয়েরা বিদেশি ভাষায় লেখাপড়া করে উন্নত হয়েছে।
আমাদের উন্নতি করতে হলে অবশ্যই বাংলা মাধ্যমকে উন্নত করতে হবে। তারা চাইলেই বাংলা মাধ্যমকে উন্নত করতে পারতো। বাংলা মাধ্যমের উন্নতির জন্য কারিকুলাম পরিবর্তন কি সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারের মধ্যে পরে? একদম নয়। কোনোভাবেই নয়। ইনফ্যাক্ট, আমরা দিল্লির মুখ্যমন্ত্রীর কেজরিওয়ালের মডেলের সফলতা দেখে সেই মডেল মতো কাজ করলেই বাংলা মাধ্যমের অভূতপূর্ব উন্নতি সম্ভব ছিলো। বিষয়টা সহজ। জাস্ট ভালো মানের শিক্ষক দিন এবং স্কুলের অবকাঠামোর একটু উন্নতি করুন। এমন মানের শিক্ষক দিন যারা শিক্ষক হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে বড় হয়েছে। এরপর দেখবেন উচ্চবিত্তের ছেলেমেয়েরাও বাংলা মাধ্যমে আসা শুরু হবে। বাংলা মাধ্যম তার পূর্বেকার গ্লোরি ফিরে পাবে। বাংলা মাধ্যমকে ভালো করার কোনো বিকল্প নেই।
কেজরিওয়াল মডেল ফলো করে সুফল পেলে ধীরে ধীরে বাংলা মাধ্যমের কারিকুলামকে ইংরেজি মাধ্যমের আদলে চালু করুন। কারণ পৃথিবীর ১৬০টি দেশে যেই মাধ্যম চালু সেটি নিশ্চয়ই খারাপ না। খোদ এই দেশের উচ্চ শিক্ষিত মানুষেরা যেহেতু তাদের ছেলেমেয়েদের ওখানে পড়ান নিশ্চয়ই ইংরেজি মাধ্যম ভালো মনে করেই পড়ান। এখন বাংলা মাধ্যমের কারিকুলামকে ইংরেজি মাধ্যমের আদলে করলে এই দুই মাধ্যমের বৈষম্য কমবে। নিম্নবিত্তের মানুষেরাও তাদের সন্তানদের উচ্চবিত্তের মানের লেখাপড়া দিতে পারবে। কিন্তু সরকার এইটা করবে না। এরা সেটাই করবে যার মাধ্যমে লুটপাট করা যায়। উদ্দেশ্য শিক্ষার মানের উন্নয়ন নয়। যারা বলছেন, নতুন শিক্ষাক্রম খুবই ভালো তাদের কেউই কি তাদের ছেলেমেয়েদের এই নতুন কারিকুলামে পড়াবেন বা পড়াচ্ছেন? আইন করে দিক না যে এখন থেকে সরকারি আমলা, এমপি, মন্ত্রীদের ছেলেমেয়েরা ইংরেজি মাধ্যমে পড়তে পারবে না। যেদিন এরকম একটা প্রজ্ঞাপন জারি করবে সেইদিন থেকে নতুন শিক্ষাক্রম নিয়ে আর একটি নেতিবাচক কথা কিংবা সমালোচনা করবো না। লেখক: শিক্ষক, পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
শিক্ষাবার্তা ডট কম/এএইচএম/২১/১২/২০২৩
দেশ বিদেশের শিক্ষা, পড়ালেখা, ক্যারিয়ার সম্পর্কিত সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম, ছবি, ভিডিও প্রতিবেদন সবার আগে দেখতে চোখ রাখুন শিক্ষাবার্তায়
“মুক্তমত ও সাক্ষাৎকার কলামে প্রকাশিত নিবন্ধ লেখকের নিজস্ব। শিক্ষাবার্তা’র সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে নিবন্ধ ও সাক্ষাৎকারে প্রকাশিত মত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে। প্রকাশিত লেখাটির ব্যাখ্যা বা বিশ্লেষণ, তথ্য-উপাত্ত, রাজনৈতিক, আইনগতসহ যাবতীয় বিষয়ের দায়ভার লেখকের, শিক্ষাবার্তা কর্তৃপক্ষের নয়।”
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
