সাধন সরকারঃ ‘শিক্ষক’ এমন একটি শব্দ যে শব্দটি উচ্চারণের সঙ্গে ন্যায়নিষ্ঠা, প্রজ্ঞা, অন্তহীন ত্যাগ, মূল্যবোধ, আদর্শবান, অনুপ্রেরণাদানকারী, শুদ্ধতা, সহায়তাকারী ও পরার্থপরতার প্রতিমূর্তি ভেসে ওঠে। ছাত্র-শিক্ষকের সম্পর্ক দুনিয়ার সেরা সম্পর্কগুলোর একটি। যে দেশের শিক্ষাব্যবস্থা যত বেশি উন্নত সে দেশ তত বেশি উন্নত। শিক্ষকতা শুধু একটি পেশা নয়, একটি ব্রত। শিক্ষকতা পেশাকে যেসব দেশ সর্বোচ্চ মর্যাদা ও সম্মান দিয়েছে সেসব দেশ দ্রুত সময়ে এগিয়ে গেছে। শিক্ষক দক্ষ মানবসম্পদ গড়ার কারিগর।
নিজের সেরাটা দিয়ে একটা দেশকে এগিয়ে নিয়ে যান শিক্ষকরা। সময় বদলেছে। বদলেছে শিক্ষাব্যবস্থা। বাংলাদেশের স্বাধীনতা পরবর্তী বা পূর্ববর্তী সময়ের শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে বর্তমান সময়ের শিক্ষাব্যবস্থার অনেক ফারাক। একবিংশ শতাব্দীর শিক্ষকতা অনেক বেশি চ্যালেঞ্জিং। শিক্ষার সঙ্গে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও শিক্ষাব্যবস্থার ওতপ্রোত সম্পর্ক বিদ্যমান। বাস্তবতা বলছে, বর্তমান সময়ে শিক্ষকের সম্মানের ভিত্তিটা কিছুটা হলেও নড়ে গেছে! বাংলাদেশের শিক্ষকতার চারটি স্তর বা সমমানের স্তর রয়েছে। তা হলো বিশ^বিদ্যালয়, কলেজ, মাধ্যমিক ও প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক বা সমপর্যায়ের শিক্ষক। শিক্ষার স্তর অনুযায়ী এসব শিক্ষকদের মর্যাদা, বেতন-ভাতাও ভিন্ন। শিক্ষকতার আবার দুটি ক্যাটাগরি। সরকারি ও বেসরকারি। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকরা এখনও তৃতীয় শ্রেণির মর্যাদা পান। অথচ শিক্ষার্থীর হাতেখড়ির মাধ্যমে শিক্ষার ভিত্তিটা তারাই রচনা করেন। রাষ্ট্র তাদের কাছ থেকে দেশসেরা সেবাটা চান, অথচ বেতনটা দিতে চান নিম্নমানের! এ কারণে প্রাইমারিতে মেধাবীরা চাকরি করতে অনীহা দেখান।
শিক্ষকতা পেশা অন্য সব পেশা থেকে ভিন্ন। পৃথিবীর যেসব দেশ শিক্ষকতা পেশাকে সর্বোচ্চ মর্যাদা ও শিক্ষকদের স্বতন্ত্র বেতন স্কেল দিয়েছে সেসব দেশ আজ উন্নত। শিক্ষায় বিনিয়োগ বৃদ্ধি একটা দেশকে দ্রুত এগিয়ে নিতে যায়। অথচ আমাদের দেশে শিক্ষায় বিনিয়োগ কাক্সিক্ষত মানের নয়।
শিক্ষকের ওপর কোনো ধরনের আঘাত এলে সবাই তার প্রতিবাদ করত। এখন শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও শিক্ষাব্যবস্থার ওপর আঘাত নেমে এলে সম্মিলিত প্রতিবাদও দেখা যায় না। বিশ^বিদ্যালয়-কলেজগুলোতে সিটবাণিজ্য, সাধারণ শিক্ষার্থীদের হয়রানি, র্যাগিংসহ বিভিন্ন অনিয়মের যে অভিযোগ সামনে আসছে তা পুরো শিক্ষার জন্য অশনিসংকেত। একবিংশ শতাব্দীর গত দুই দশকে ছাত্ররাজনীতির নামে শত শত নেতিবাচক ঘটনা সামনে এসেছে। যে ছাত্ররাজনীতি সাধারণ ছাত্রদের স্বার্থরক্ষা করে না, শিক্ষাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার বদলে পিছিয়ে দেয় সেই ছাত্ররাজনীতি নিয়ে প্রশ্ন উঠবেই। বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সাধারণ শিক্ষার্থীদের একটি অংশ শিক্ষার্থীসুলভ আচরণ করছে না। যার কারণে ছাত্র বহিষ্কারের ঘটনাও এখন খবরের শিরোনাম হচ্ছে। আবার সাধারণ ছাত্রদের ক্ষুদ্র একটা অংশ কিশোর গ্যাংয়ের সঙ্গে যুক্ত। সবকিছুর সঙ্গে রাজনীতি মেশানো ঠিক নয়। শিক্ষককে যথাযথ সম্মান দিতে হবে। শিক্ষাব্যবস্থার দুর্বলতায় আমাদের শিক্ষার্থীরা লেখাপড়া শেষ করে কাক্সিক্ষত চাকরি পাচ্ছে না। ফলে দক্ষ কর্মীর অভাবে বিদেশিরা আমাদের দেশে এসে কাজ করে টাকা নিয়ে যাচ্ছে। একটা দেশের এগিয়ে যাওয়ার মূল হলো সে দেশের আদর্শ শিক্ষাব্যবস্থা। শিক্ষককে অপমান করে কোনো জাতি এগিয়ে যেতে পারেনি, পারবেও না। নীতি ও আদর্শের শিক্ষকতার সঙ্গে কখনো আপস করা উচিত নয়। সুস্থ শিক্ষার অর্থই হলো নীতি-নৈতিকতা, সততা, মূল্যবোধসম্পন্ন ও দক্ষ জাতি গঠন।
দেশসেরা মেধাবীরাই শিক্ষকতা পেশায় এলে শিক্ষার্থীরা দক্ষ মানবসম্পদ হয়ে দেশের উন্নয়নে আরও বেশি অবদান রাখতে পারবে। মাধ্যমিক পর্যায়ের ৯২ ভাগ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বেসরকারি। শিক্ষা ক্ষেত্রে সরকারি-বেসরকারি বৈষম্য দূর করতে জাতীয়করণ ভালো সমাধান হতে পারে
লেখকঃ শিক্ষক, মুন্সীগঞ্জ
শিক্ষাবার্তা ডট কম/এএইচএম/০৭/১২/২০২৩
দেশ বিদেশের শিক্ষা, পড়ালেখা, ক্যারিয়ার সম্পর্কিত সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম, ছবি, ভিডিও প্রতিবেদন সবার আগে দেখতে চোখ রাখুন শিক্ষাবার্তায়
“মুক্তমত ও সাক্ষাৎকার কলামে প্রকাশিত নিবন্ধ লেখকের নিজস্ব। শিক্ষাবার্তা’র সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে নিবন্ধ ও সাক্ষাৎকারে প্রকাশিত মত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে। প্রকাশিত লেখাটির ব্যাখ্যা বা বিশ্লেষণ, তথ্য-উপাত্ত, রাজনৈতিক, আইনগতসহ যাবতীয় বিষয়ের দায়ভার লেখকের, শিক্ষাবার্তা কর্তৃপক্ষের নয়।”
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
