এইমাত্র পাওয়া

জীবনের ১ম স্কুল, নিজের বাবা-মা-ই হলেন প্রথম ও সবচেয়ে ইম্পাক্টফুল শিক্ষক

অধ্যাপক কামরুল হাসান মামুনঃ শিক্ষকতাকে যারা নিছক চাকরি মনে করেন না, বরং ব্রত মনে করেনÑ তাদের সবাইকে শিক্ষক দিবসের জায়ান্ট শুভেচ্ছা। আমি আমার শিক্ষক যারা আমার জীবনের আকার দিয়েছেন তাদের কথা শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছি এবং লেখাটি তাদের নিয়েই। আমি কামরুল হাসান যেমনই হয়েছি, যতটাই হতে পেরেছিÑ এমনি এমনি তো আসমান ফাইরা হয়ে যাইনি। আমি আজকের জায়গায় আসতে পাড়ার পেছনে আমার কিছু শিক্ষকের কথা স্মরণ করবো। নিজের ঘরই হলো প্রত্যেকের জীবনের প্রথম স্কুল এবং নিজের বাবা-মা-ই হলো প্রথম এবং সবচেয়ে ইম্পাক্টফুল শিক্ষক। আমার আব্বার কথা স্মরণ করছি যিনি প্রতি রাতে আমাকে নিয়ে ঘুমাতে যেতেন আর ইংরেজি ট্রান্সলেশন জিজ্ঞেস করতে করতে ঘুম পারতেন। যিনি চেম্বারে বসে পাশের রুমে আমাকে পড়ার টাস্ক দিয়ে কোর্টে যাওয়ার আগে সেগুলো দেখতেন। আমার আম্মা ছিলেন আদর স্নেহ দিয়ে মাঝে মধ্যে আব্বার রুদ্র রূপ থেকে রক্ষা করতেন। আমার জামা কাপড় কেনার জন্য এক্সট্রা পয়সা ও আবদার মেটাতেন।

তারপর যখন প্রাইমারি স্কুলে ভর্তি হই সেখানে লেখাপড়ার প্রতি ভালোবাসাটা তৈরি করেছিলেন আমার প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক ছাব্বির স্যার। স্যারের কথা প্রায়ই মনে পরে। তারপর হাই স্কুলে ভর্তি হলে সেখানে বিজ্ঞান শিখেছি সুধীর স্যারের কাছে, গণিত শিখেছি শশী বাবু স্যারের কাছে আর ইংরেজি শিখেছি রহমান স্যারের কাছে। ইনারা সবাই ছিলেন একদম আপাদমস্তক শিক্ষক। কলেজে উঠে সন্তুষ স্যারের কাছে পদার্থবিজ্ঞান আর গণিত শিখেছি জামান স্যারের কাছে। তাছাড়া কলেজে পেয়েছিলাম কিছু ভালো শিক্ষক যেমন বাংলার আহাদ স্যার, ইংরেজির ফজলে এলাহী স্যার, জীববিজ্ঞানে পরিতোষ স্যার।

তারপর ১৯৮২ সালের শেষে আসি বিশ্ববিদ্যালয়ে। ভর্তি হই পদার্থবিজ্ঞানে। নিজের ইচ্ছেতে নয়। ভর্তি পরীক্ষার সিরিয়েল অনুসারে এটাই পেয়েছিলাম। পদার্থবিজ্ঞান বরাবরই ভালো লাগতো তবে সমাজ এবং অন্যান্য কারণে পদার্থবিজ্ঞানকে ভালোবেসে এই বিষয়েই পড়ার সদ্ধান্ত নেওয়ার মতো এতোটা আলোকিত ছিলাম না তখন। গ্রামের স্কুল এবং কলেজে পড়ে একা একা ঢাকা শহরে এসে নিজের থাকার ব্যবস্থা নিজে করেছি। দেশ তখন রাজনৈতিকভাবে উত্তাল। ক্যাম্পাসের পরিবেশ ভয়াবহ। তবে ভর্তি হওয়ার পরই ওরিয়েন্টেশন ক্লাসেই এমন কিছু শিক্ষকের ক্লাস পেয়েছিলাম যে তখনই পদার্থবিজ্ঞানের প্রেমে পড়ে যাই। আমাদের ওরিয়েন্টেশন ক্লাস হতো ১ মাস ব্যাপী এখন যেটা ৩ থেকে ৫ দিন ব্যাপী। অথচ হওয়া উচিত ১ মাস ব্যাপীই। এই ওরিয়েন্টেশন ক্লাসই আমার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। তারপর প্রথমবর্ষেই পাই হিরণ্ময় স্যার, কবির স্যার, কাইউম সরকার স্যার, অজয় স্যার প্রমুখদের মতো জাদরেল শিক্ষক। এইজন্যই বলি প্রথমবর্ষটা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের সময় আমরা আমাদের বিভাগের সেরা সেরা শিক্ষকদের পেয়েছিলাম। আর এখন প্রথমবর্ষের আমাদের ছাত্রছাত্রীদের শেষ করে দেওয়া হয়। প্রথমবর্ষে এসেই আবাসিক হলগুলোতে হয় টর্চারের শিকার। থাকার জায়গা পায় না।

তবে লেখাপড়া এবং জীবনদর্শনে আমার আমূল পরিবর্তন ঘটে দ্বিতীয়বর্ষের শেষে এবং তৃতীয় বা শেষ বর্ষে এসে। এই সময় পরিচয় ঘটে পদার্থবিজ্ঞানের দুর্দান্ত কিছু বিষয়ের সঙ্গে যেমন কোয়ান্টাম মেকানিক্স, স্ট্যাটিসটিকাল মেকানিক্স, সলিড স্টেট ফিজিক্স, ক্লাসিক্যাল মেকানিক্স ইত্যাদি বিষয়ে। মাস্টার্সে এসে থিসিস নিব। তার জন্য কী বিষয়ে করবো এবং কার সঙ্গে করবো এটা নিয়ে ভাবছিলাম। সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য যে যথেষ্ট জ্ঞান ছিল সেটা বলবো না। সে যাই হোক গেলাম অধ্যাপক মেসবাহউদ্দিন স্যারের কাছে। এর আগে স্যারের ক্লাস করা হয়নি কখনো কিন্তু স্যারের হাঁটা চলা, ড্রেসআপ ইত্যাদি সব কিছু দেখে স্যারকে আমার খুব ভালো লাগতো। স্যারও সানন্দে থিসিস করাতে রাজি হলেন। থিসিস করতে গিয়ে স্যারের সঙ্গে এবং স্যারের পরিবারের সঙ্গেও আমার ঘনিষ্টতা হয়ে যায়। স্যারের হাত ধরেই জীবনের প্রথম দেশের বাহিরে কলকাতায় যাই একটি কনফারেন্সে যোগ দিতে। সেখানে গিয়ে কতজনের সঙ্গে পরিচয় হয় এবং স্বল্প ক’দিন থেকে যেই বন্ধুত্ব হয় সেটা আজও অটুট আছে। কলকাতায় কনফারেন্সে গিয়ে সবচেয়ে বড় পাওয়া ছিল সেখানকার বোস সেন্টারের পরিচালক অভিজিৎ মুখার্জীর সঙ্গে পরিচয় হওয়া। সেই পরিচয় উনার মৃত্যুর আগ পর্যন্ত অটুট ছিল। অসাধারণ মনের একজন মানুষ ছিলেন। অনেকবার ঢাকায় এসেছেন। উনি ছিলেন মেসবাহ স্যারের সবচেয়ে ঘনিষ্ট বন্ধু। এমন নরম বিশাল মনের মানুষ খুবই বিরল।

কনফারেন্স থেকে ফিরে যখন আসি তখন থিসিস করাতো শেষ কিন্তু স্যারের সঙ্গে সম্পর্কতো শেষ হয়নি। বিভাগে আশা যাওয়া করি একটি স্যার একটি দরখাস্তের ফর্ম হাতে দিয়ে বললেন সেখানে দরখাস্ত করতে। ফর্ম পড়ে দেখি ডেডলাইন এসে গেছে। দ্রুত দরখাস্ত করে দিলাম এবং এরপর এটার কথা ভুলে গেলাম। বেশ অনেকদিন পর হঠাৎ একটা উঐখ এর মাধ্যমে একটি চিঠি পেলাম। খুলে দেখি ইতালির প্রফেসর সালামের ইনস্টিটিউটে ডিপ্লোমা ইন কনডেন্সড ম্যাটার পড়ার জন্য আমার স্কলারশিপ হয়ে গেছে। সেই যে কী আনন্দ। সেদিন থেকে আমার জীবনে নতুন বাঁক নেয়। এই বাঁকের জন্য আমি মেসবাহ স্যারের কাছে ঋণী। স্যার যদি সেদিন দরখাস্তের ফর্মটি হাতে না দিতেন আমার জীবনের গতিপথ সম্পূর্ণ অন্যরকম হতে পারতো।

ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর থিওরিটিক্যাল ফিজিক্সতে যেয়েই প্রথম লেকচারটি ছিল প্রফেসর সালামের। টানা ১ ঘণ্টার বেশি সময় ধরে তিনি বলছিলেন আর ১০টি দেশের ২০ জন ছাত্রছাত্রী পিনড্রপ নীরবতায় মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে শুনেছি। ডিপ্লোমা কোর্স সেই বছরই প্রথম চালু হয়। উনি তখন তেমন হাঁটাচলা করতে পারেন না। তাকে কোলে করে তার ড্রাইভার কাম হেল্পার সেন্টারে নিয়ে এসেছে। এই ডিপ্লোমা কোর্স তিনি কেন চেয়েছেন, আইসিটিপি তিনি কেন খুলতে চেয়েছেন সেসব তিনি আমাদের জানিয়েছিলেন।

াইসিটিপিতে পড়তে গিয়ে কিছু অসাধারণ শিক্ষক পেয়েছিলাম যেমন professor Santoro, professor Fazekas, professor N Kumar এবং professor V Kumar. এর মধ্যে প্রফেসর ফ্যাজিকাসের সঙ্গে আমি থিসিস করি। ইনি ছিলেন একজন হাঙ্গেরিয়ান। অসাধারণ গবেষক এবং শিক্ষক। তার ক্লাসে পাঠদান ছিল mesmerizing. কোনোদিন ক্লাসে ১ মিনিট দেরি করে আসতে দেখিনি। প্রচণ্ড ডেডিকেটেড এবং sincere একজন শিক্ষক। আমাদের ওই ক্লাসের উপর ভিত্তি করে পরবর্তী সময়ে একটি বই লেখেন যেটা সিঙ্গাপুরের ওয়ার্ল্ড সায়েন্টিফিক থেকে প্রকাশিত হয়। আইসিটিপি’র এই ডিপ্লোমা কোর্স আমাকে আমূল পরিবর্তন করে দেয়। কোর্সের কোঅর্ডিনেটর ভি কুমারের প্রচণ্ড ভালোবাসা পেয়েছি। সেখানে শিক্ষক হিসাবে প্রফেসর হিলদা সারদিয়েরাকে পেয়েছিলাম যার সঙ্গে এখনো যুক্ত আছি। যিনি একজন ভালো শিক্ষক এবং গবেষক ছাড়াও অসাধারণ একজন মানুষ। আইসিটিপি পড়তে গিয়েই আমি আমার স্ত্রীকে পাই। তাই শুধু একাডেমিক্যালি না সবদিক থেকেই আমার জীবন পাল্টে যায় সেই ১ বছরের জন্য ইতালিতে পড়তে গিয়ে।

ইতালি থেকে ফিরে এসে ঢাকায় থাকি। কয়েকজন বন্ধু, মিলে ঢাকায় একটি ছোট বাসা নিয়ে থাকি। এর মধ্যে এক বন্ধু জানালো যে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগের দরখাস্ত আহবান করেছে। দ্রুত সেখানে দরখাস্ত করলাম এবং সেটা হয়েও গেলো। দরখাস্ত করতে গিয়ে অনেকের সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল এবং পরবর্তী সময়ে সহকর্মী ও বন্ধু হয়ে যাই। শাহজালালে শিক্ষকতা করতে গিয়ে প্রফেসর বসাক স্যারের সঙ্গে পরিচয় হয়। স্যার তখন বিভাগের বিভাগীয় প্রধান এবং ভিসি তখন প্রফেসর সদরুদ্দিন আহমেদ চৌধুরী। বিভাগীয় প্রধান কেমন হতে হয় আর ভিসি কেমন হতে উনাদের না দেখলে আমার বোঝা হতো না। দু’জনেই আমার প্রিয় মানুষদের অন্যতম হয়ে উঠেন।

এরপর ইংল্যান্ডের ব্রুনেল বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি করতে যাওয়া। সেটাও এক অসাধারণ গল্প। আমার তো ইংল্যান্ডে যাওয়ার ইচ্ছে ছিল না। কিন্তু আমার সুপারভাইজারের (জি জে রজার্স, এখন তিনি সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রোভিসি (রিসার্চ)) নিজের হাতের লেখা চিঠির মাধ্যমে যখন জানিয়েছিলেন যে আমাকে সে তার প্রথম পিএইচডি ছাত্র হিসাবে পেতে চায় সেটা আমার আব্বা দেখে বলেছিল পিএইচডি করলে তার সঙ্গেই করবি। এছাড়া গার্লফ্রেন্ড তখন ইউরোপে সেটাও একটা কারণ ছিল। একবার তো আমার সুপারভাইজারকে না করে দিয়েছিলাম। আমার এক ব্রিটিশ বান্ধবী তখন বললো আমি এখনই ব্রুনেলে যাচ্ছি এবং ওই শিক্ষককে বলবো তোমার refusal চিঠি যেন ইগনোর করে। সে ফোন করে জানালো তুমি আসছো এবং এসে আমার সঙ্গে আমার বাসাতেই থাকবে। পিএইচডি শেষে হুমবোল্ডট ফেলো হিসাবে পোস্ট করি প্রফেসর Juergen Kurths এর সঙ্গে। তিনি বর্তমানে AIP প্রকাশিত CHAOS জার্নালের চিফ এডিটর। অসাধারণ একজন মানুষ। আমি এই দুইজনের প্রতি কৃতজ্ঞ। তাদের কাছে অনেক কিছু শিখেছি।

লেখক: শিক্ষক, পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

শিক্ষাবার্তা ডট কম/এএইচএম/১৯/১০/২০২৩   

দেশ বিদেশের শিক্ষা, পড়ালেখা, ক্যারিয়ার সম্পর্কিত সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম, ছবি, ভিডিও প্রতিবেদন সবার আগে দেখতে চোখ রাখুন শিক্ষাবার্তায়


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.