এইমাত্র পাওয়া

বেদনা আর বঞ্চনার অপর নাম শিক্ষা ক্যাডার

ড. মোহাম্মদ আব্দুর রউফঃ শিক্ষকের কাছে আব্রাহাম লিংকনের (১৮০৯-১৮৬৫) চিঠি কিংবা কবি কাজী কাদের নেওয়াজের (১৯০৯-১৯৮৩) ‘শিক্ষাগুরুর মর্যাদা’ কবিতাটির কথা আমাদের প্রায় সবারই জানা। সেখানে দুই দেশের দুজন সম্রাটের মহত্ত্বের কথা বাস্তবিকই আমাদের বিস্ময়ে বিমুগ্ধ করে। একদিকে ছিলেন মার্কিন মুল্লুকের প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকন, অপরদিকে ভারত-ভাগ্য-বিধাতা মুঘল সম্রাট আলমগীর। তারা সেদিন শিক্ষাকে সর্বোচ্চ সম্মান দিয়েছিলেন, সম্মান দিয়েছিলেন শিক্ষককে; দিয়েছিলেন অকৃত্রিম ভালোবাসা। হয়তো ওই অকৃত্রিম সম্মান ও সামাজিক মর্যাদার কারণেই একসময় শ্রেণিকক্ষের সর্বোচ্চ মেধাবী ছেলেটি শিক্ষক হওয়ার স্বপ্ন লালন করত। আর এখন! এখন কেউ আর ইচ্ছে করে শিক্ষকতা পেশায় আসতে চায় না। এমনকি স্বয়ং শিক্ষকও তার সন্তানকে শিক্ষক হিসেবে দেখতে চায় না। কারণ পেশা হিসেবে শিক্ষকতা আজ কতটা অবহেলিত, কতটা উপেক্ষিত সেটি সে অস্থিমজ্জায় উপলব্ধি করতে পারে। সব ক্যাডার কর্মকর্তা ওয়ারেন্ট অব প্রেসিডেন্সিতে (পদ মর্যাদাক্রম) স্থান পেলেও বিসিএস শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তার স্থান নেই। পদমর্যাদাক্রমে (শেষ ধাপে) একজন উপসচিব, একজন মেজর কিংবা একজন পুলিশ সুপারের স্থান থাকলেও একজন মহাপরিচালকের (শিক্ষা) স্থান নেই। একই সার্কুলারে, একই প্রশ্নপত্রের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে পুলিশ, প্রশাসন, পররাষ্ট্র, আনসার, অডিটসহ অপরাপর বিসিএস ক্যাডার কর্মকর্তারা গ্রেড ওয়ানে উন্নীত হন। আর বিসিএস শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তাদের চতুর্থ গ্রেড থেকেই বিদায় নিতে হয়। এখানে সহকারী অধ্যাপক থেকে মহাপরিচালক পর্যন্ত প্রায় সবাই চতুর্থ গ্রেড। এমনকি শিক্ষা ক্যাডারের সর্বোচ্চ কর্মকর্তা মহাপরিচালককেও চলতি দায়িত্বে দায়িত্ব পালন করতে হয়। অথচ স্বাস্থ্যের অতিরিক্ত মহাপরিচালক গ্রেড ওয়ানের কর্মকর্তা। এত বিপুল বৈষম্যের কোনো যৌক্তিক কারণ আছে কি? আমরা জানি, স্বাস্থ্য নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু শিক্ষা কি এতই গুরুত্বহীন? প্রমথ চৌধুরীর ভাষায় লাইব্রেরি হাসপাতালের চেয়ে কম উপকারী নয়। ‘লাইব্রেরি’ শব্দটি দিয়ে প্রমথ চৌধুরী এখানে যে শিক্ষার গুরুত্ব বুঝিয়েছেন আমরা কি তা উপলব্ধি করতে পারছি? আচ্ছা, না হয় রাষ্ট্রীয় পদমর্যাদায় কথা বাদই দিলাম। কিন্তু তাকে কি সময়মতো প্রমোশনটাও দেয়া যায় না?

প্রভাষক থেকে সহকারী অধ্যাপক পদে আলাদা বেতন-স্কেল থাকলেও পদোন্নতির গতিবেগ এতটাই মন্থর যে, একজন প্রভাষককে কখনো কখনো একটি দশক কিংবা প্রায় পুরো একটি যুগ প্রতীক্ষায় থাকতে হয়। ফি বছর ইনক্রিমেন্ট পেতে পেতে সে পরবর্তী গ্রেডের বেতনধাপ পেরিয়ে যায়। অথচ এই সময়কালে প্রশাসন কিংবা অনুরূপ অপরাপর ক্যাডারে প্রায় দুটি প্রমোশন হয়ে যায়। এদিকে সহকারী অধ্যাপক থেকে সহযোগী অধ্যাপক পদে প্রমোশনে আলাদা বেতন-স্কেল নেই। অধ্যাপক পর্যায়ে প্রমোশনেও প্রায় একই অবস্থা। প্রায় প্রত্যেক প্রমোশনেই পরবর্তী ধাপে বেতনটা সমন্বয় করে নিতে হয়, এই যা। একটুখানি চিন্তা করলেই এই সত্যটি বেশ স্পষ্ট করেই বোঝা যায় যে, শিক্ষকের বেতন বৃদ্ধি পায় বার্ষিক ইনক্রিমেন্টের মাধ্যমে। প্রমোশনে খুব সামান্যই হয়। ফলে পদোন্নতির যে সুখানুভূতি কিংবা আর্থিক সুযোগ-সুবিধার কোনোটাই হতভাগ্য শিক্ষকের ভাগ্যে জোটে না। অথচ তারই হাতে গড়ে ওঠা অপরাপর ক্যাডারের চাকরিজীবীরা ধাঁই ধাঁই করে ওপরে উঠে যায়। শিক্ষকের এই নিদারুণ মর্মবেদনার কথা দারুণভাবে উপলব্ধি করেছিলেন কবি আশরাফ সিদ্দিকী। তাই তিনি লিখেছিলেন- ‘কত ছাত্র গেল, এলো/ প্রমোশন পেলো/ কিন্তু ১০ টাকার বেশি প্রমোশন হয়নি আমার’। বিসিএস শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তার প্রমোশনও অনেকটা এমনই। মূলত শিক্ষকের প্রমোশনে বিশেষ করে সরকারি কলেজের শিক্ষকদের প্রমোশনে সরকারের তেমন আর্থিক ব্যয়বৃদ্ধি ঘটে না। পদ-পদবির পরিবর্তন হয়, এইটুকু যা। তবুও প্রমোশন প্রদানে রাষ্ট্রের এত অনীহা কেন? মূলত সব দিক থেকেই শিক্ষক সমাজ বঞ্চিত। বেদনা আর বঞ্চনার অপর নাম শিক্ষক সমাজ। তাকে সালামটুকু নিয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হয়। সত্য বলতে, সেই ছালামও ছাত্রছাত্রী কিংবা নিম্ন পর্যায় থেকে আসে। উচ্চবিত্ত, বিদ্যা কিংবা পদ-পদবির লোকেরা শিক্ষককে কমই সালাম দেয়। কথায় আছে- কাজীর গরু কেতাবে আছে গোয়ালে নেই। এই দেশে শিক্ষকের মর্যাদাও অনেকটা এমনই। পেশা হিসেবে এটি এখনো মর্যাদার আসনে সুপ্রতিষ্ঠিত হতে পারেনি। মনে করি, এর দায় যতটা না শিক্ষক সমাজের তার চেয়ে বেশি রাষ্ট্রের। মূলত রাষ্ট্র শিক্ষককে যথাযথ মর্যাদা দিতে চায়নি কিংবা পারেনি।

শিক্ষকের প্রতি রাষ্ট্রের এত অবহেলা কেন? প্রশ্ন জাগে, তাহলে কি শিক্ষকের কাজ কম গুরুত্বপূর্ণ? প্রাচ্য দেশে সাধারণত শ্রেণিকক্ষে পাঠদান করাকে শিক্ষকের গুরুত্বপূর্ণ কর্তব্যকর্ম বলে বিবেচনা করা হয়। কিন্তু আসলে কি তাই? একজন শিক্ষার্থী বাড়িতে বসেও তো তার পাঠ্যবিষয় ঠিকঠাক মতো পড়ে নিতে পারে; প্রয়োজনে গুগোল থেকেও সমাধান খুঁজে নিতে পারে। প্রশ্ন জাগতে পারে- তাহলে কি শিক্ষকের প্রয়োজনীয়তা ফুরিয়ে যাচ্ছে? বিগত দিনের পরিসংখ্যান পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, শিক্ষায় দিন দিন বরাদ্দ কমছে। এমনকি সর্বশেষ বাজেটে ১ দশমিক ৭৬ শতাংশে (জিডিপি) নেমে এসেছে। শিক্ষায় বরাদ্দ না বাড়িয়ে শিক্ষার কি উন্নতি সম্ভব? ‘শিক্ষাই জাতির মেরুদণ্ড’- সর্বজন স্বীকৃত এই প্রবাদপ্রতিম উক্তিটি ভাবসম্প্রসারণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়ে গেছে। শ্রেণিকক্ষের চৌহদ্দির বাইরে আসতে পারেনি। বাস্তবজীবনে এর প্রয়োগ-প্রাচুর্য তেমন একটা লক্ষ করা যায় না। আজকের এই লেখাটি রবীন্দ্রনাথের একটি উক্তি দিয়ে শেষ করতে চাই। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬১-১৯৪১) ‘শিক্ষার মিলন’ প্রবন্ধে আক্ষেপ করে বলেছিলেন- ‘এ কথা মানতেই হবে যে, আজকের দিনে পৃথিবীতে পশ্চিমের লোক জয়ী হয়েছে। পৃথিবীকে তারা কামধেনুর মতো দহন করছে, তাদের পাত্র ছাপিয়ে গেল। আমরা বাইরে দাঁড়িয়ে হাঁ করে তাকিয়ে আছি…।’ রবীন্দ্রনাথের এই উপলব্ধিকে অস্বীকার করার কোনো উপায় আছে কি? তারা কি পৃথিবীকে কামধেনুর মতো দহন করছে না? পশ্চিমা বিশ্ব যে বিপুলভাবে এগিয়ে রয়েছে সেটি তো শিক্ষার কারণেই হয়েছে নাকি? মূলত তারা শিক্ষার গুরুত্ব উপলব্ধি করেছিল, রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে শিক্ষায় বরাদ্দ বৃদ্ধি করেছিল। আমাদেরও ওই পথেই এগোতে হবে। আজ বিশ্ব শিক্ষক দিবসে শিক্ষক সহকর্মীদের প্রতি রইল অকৃত্রিম শুভেচ্ছা।

লেখকঃ সহকারী অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ, শাহজাদপুর সরকারি কলেজ, সিরাজগঞ্জ।

শিক্ষাবার্তা ডট কম/এএইচএম/০৫/১০/২০২৩    

দেশ বিদেশের শিক্ষা, পড়ালেখা, ক্যারিয়ার সম্পর্কিত সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম, ছবি, ভিডিও প্রতিবেদন সবার আগে দেখতে চোখ রাখুন শিক্ষাবার্তায়


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.