নিউজ ডেস্ক।।
জ্বালানি তেলের সংকট ও মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব এখন দেশজুড়ে, যা স্পষ্টভাবে পড়ছে মানুষের দৈনন্দিন জীবনে। সর্বত্রই এখন জ্বালানির উত্তাপ। গণপরিবহনের ভাড়া বৃদ্ধি, উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়া, লোডশেডিং এবং সরবরাহব্যবস্থায় চাপ তৈরি হওয়ায় বিপাকে পড়েছেন সাধারণ মানুষ থেকে ব্যবসায়ী সবাই। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যও এখন ঊর্ধ্বমুখী।
অর্থনীতিবিদরা আশঙ্কা করছেন, জ্বালানির বাড়তি দামের চাপ পড়বে শিল্পকারখানা থেকে শুরু করে বাসাবাড়ি পর্যন্ত। পরিবহন ভাড়ার পাশাপাশি ধাপে ধাপে শিল্প ও কৃষি উৎপাদন, নির্মাণ ও সেবা সরবরাহব্যবস্থায় ব্যয় বাড়িয়ে দেবে। আর সবটাই শেষ পর্যন্ত যাবে ক্রেতা-ভোক্তার পকেট থেকে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, জ্বালানি খরচ বৃদ্ধির সঙ্গে মূল্যস্ফীতির একটা সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি উৎপাদন ও সরবরাহ চেইনের প্রতিটি স্তরে খরচ বাড়ায়, যার প্রভাব শেষ পর্যন্ত ভোক্তাপর্যায়ে গিয়ে পড়বে। গ্রামাঞ্চলেও এর প্রভাব কম নয়। সেচ ও কৃষিকাজে ব্যবহৃত ডিজেলের দাম বাড়ায় উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে। ফলে কৃষকের লাভ কমে যাচ্ছে, যা ভবিষ্যতে খাদ্যপণ্যের বাজারেও প্রভাব ফেলতে পারে।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘জ্বালানির সংকট যতদিন চলবে ততদিন আমরা কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে যাব। জ্বালানির দাম বৃদ্ধি করা ছাড়া সরকারের কোনো পথ খোলা ছিল না। তেলের দাম বাড়ানোয় এর প্রভাব এখন সব জায়গায় পড়বে। ’ তিনি আরও বলেন, ‘জ্বালানির দাম বাড়া মানে শুধু একটি খাতে চাপ তৈরি হওয়া নয়, এটি পুরো অর্থনীতিতে শৃঙ্খল প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। উৎপাদন, পরিবহন, সরবরাহ সকল পর্যায়ে খরচ বেড়ে যায়; যার প্রভাব শেষ পর্যন্ত ভোক্তার ওপরই পড়ে।
এদিকে রাজধানীর বিভিন্ন বাজারে গিয়ে দেখা গেছে, পণ্য পরিবহনের খরচ বাড়ায় ব্যবসায়ীরা বাড়তি দামে পণ্য বিক্রি করছেন। বিশেষ করে সবজি, মাছ ও নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যে এর প্রভাব বেশি। খুচরা বিক্রেতারা বলছেন, জ্বালানির দাম বাড়ার কারণে ট্রাক ও পিকআপ ভাড়া বেড়েছে। ফলে কম দামে পণ্য বিক্রি করা সম্ভব হচ্ছে না। গতকাল মিরপুর-১১ ও মিরপুর-৬ কাঁচাবাজার ঘুরে দেখা যায়, পটোল, ঢ্যাঁড়শ ৬০-৮০, শিম ও শজিনা ৮০-১২০, ঝিঙ্গা, করলা, বরবটি ৮০-১০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। কাঁকরোল বিক্রি হচ্ছে ১২০-১৩০ টাকায়। কাঁচা মরিচ ৮০-১০০, টম্যাটো ৫০, পেঁপে ৬০-৮০, মিষ্টিকুমড়া ৪০-৫০ ও বেগুন ৭০-৮০ টাকায় পাওয়া যাচ্ছে। আলু ২০-২৫, পিঁয়াজ ৪০-৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। মাঝারি সাইজের লাউ প্রতি পিস ৮০-১০০ টাকা। ব্রয়লার মুরগির কেজি ১৭০-১৮০, সোনালি মুরগি ৩৫০-৩৬০ টাকা।
জ্বালানির উত্তাপ মহাসড়কে : তেলের দামের সঙ্গে সমন্বয় করে বৃহস্পতিবার সড়ক, রেল ও নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় আন্তজেলা বাসে প্রতি কিলোমিটারে ২ টাকা ১২ পয়সা থেকে ১১ পয়সা বাড়িয়ে ২ টাকা ২৩ পয়সা করে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে। কিন্তু সরেজমিন গাবতলী বাস টার্মিনাল ঘুরে দেখা গেছে ভিন্ন চিত্র। তেলের দাম বেড়েছে বলে যাত্রীদের থেকে প্রতি টিকিটে ১৫০-২০০ টাকা বেশি নেওয়া হচ্ছে। বিভিন্ন পরিবহনের কর্মী সেজে একটি চক্র এ বাড়তি টাকাটা নিচ্ছে। এতে যাত্রীদের যাতায়াত খরচ বাড়ছে।
গাবতলী বাস টার্মিনালের সামনে মো. আলতাফ হোসেন বলেন, ‘গ্রামের বাড়ি ঝিনাইদহে যেতে আগে ৫০০ টাকা লাগত, এখন ৭৫০ টাকা নিচ্ছে। দরকষাকষি করে ৬৫০ টাকায় ঈগল পরিবহনের টিকিট কাটলাম। ’
এ ব্যাপারে যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, ‘বাসভাড়ার তালিকা তৈরি করে আঞ্চলিক পরিবহন সমিতি। আঞ্চলিক পরিবহন সমিতি থাকে পরিবহন মালিক সমিতির আওতায়। কিলোমিটার বা ভাড়ার রেট নিয়ে টেম্পারিং হচ্ছে কি না দেখার জন্য কোনো মনিটরিং টিম নেই। হলেও এসব মনিটরিং টিমও থাকে মালিক সমিতির আওতায়। আমাদের নিয়ে তালিকা তৈরি, সেবার মান এবং মনিটরিংয়ের জন্য টিম গঠন করলে একসঙ্গে সমস্যা সমাধানে কাজ করতে পারতাম। ’
তিনি আরও বলেন, ‘বাসভাড়া বাড়ালেও সেবার মানে পরিবর্তন আসে না। যাত্রীদের প্রতিনিধি ছাড়াই সরকার শুধু মালিক সমিতি নিয়ে আলোচনা করে। পুরাতন লক্কড়ঝক্কড় বাস রং করে নতুন হিসেবে দেখানো হয়। এসব বাসের মেয়াদ ১০ বছর হলেও ২০-২৫ বছর রাস্তায় থাকে। এসব নিয়ে বলার জন্য সরকার আমাদের সুযোগও দিচ্ছে না। ’ রাজধানীর ভিতরে চলাচল করা লোকাল বাসেও বাড়তি ভাড়া আদায় করতে দেখা যায়। মিরপুর-১০ থেকে গাবতলী যেতে ‘রাজধানী’ বাসে যাত্রীদের দিতে হচ্ছে ৩০ টাকা। যাত্রীদের থেকে ১০ টাকা করে বেশি ভাড়া নিচ্ছে। আবার মিরপুর-১০ থেকে কুড়িল চৌরাস্তা পর্যন্ত ভাড়া ২০ টাকা হলেও আদায় করা হচ্ছে ৩০ টাকা।
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
