টিকটকের উন্মাদনায় শিক্ষার্থীদের বিদায় অনুষ্ঠানে ভাঙচুর: নতুন ‘সংস্কৃতি’ নিয়ে উদ্বেগ

।। এ এইচ এম সায়েদুজ্জামান  ।।

বর্তমান সময়ের তরুণ প্রজন্ম এমন এক বাস্তবতার মধ্যে বেড়ে উঠছে, যেখানে বাস্তব জীবনের চেয়ে ভার্চুয়াল জগতের প্রভাব অনেক বেশি। বিশেষ করে টিকটকের মতো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম তাদের চিন্তা, আচরণ এবং রুচির ওপর গভীর প্রভাব ফেলছে।

সম্প্রতি বরিশালের আগৈরঝরা বাঘধা মডেল হাইস্কুলের শিক্ষার্থীদের বিদায় অনুষ্ঠানে বেঞ্চ-ফ্যান ভাঙচুরের ঘটনা সেই উদ্বেগকেই সামনে নিয়ে এসেছে। এটি নিছক একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং একটি বৃহত্তর সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অবক্ষয়ের প্রতিচ্ছবি। বিদায় অনুষ্ঠান একটি আবেগঘন মুহূর্ত। শিক্ষাজীবনের দীর্ঘ পথচলার একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটে এই দিনে। সাধারণত এই আয়োজন স্মৃতিচারণ, কৃতজ্ঞতা প্রকাশ এবং ভবিষ্যতের স্বপ্ন বিনির্মাণের মধ্য দিয়ে সম্পন্ন হওয়ার কথা।

কিন্তু যখন এই অনুষ্ঠানই ভাঙচুর, বিশৃঙ্খলা এবং দায়িত্বহীনতার মঞ্চে পরিণত হয়, তখন তা শুধু দুঃখজনক নয়—বরং বিপজ্জনকও বটে। প্রশ্ন হচ্ছে, কেন এমন আচরণ করছে শিক্ষার্থীরা?

এর একটি বড় কারণ হলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার প্রবণতা। আজকের কিশোর-তরুণদের একটি বড় অংশ ‘লাইক’, ‘শেয়ার’ এবং ‘ভিউ’-এর নেশায় আক্রান্ত। তারা মনে করে, অদ্ভুত, ব্যতিক্রমী কিংবা চমকপ্রদ কিছু করতে পারলেই তারা আলোচনায় আসবে। আর এই ‘চমকপ্রদ’ কাজের সংজ্ঞা দিন দিন বিকৃত হয়ে যাচ্ছে।

ভাঙচুর, বিশৃঙ্খলা কিংবা অশোভন আচরণও তাদের কাছে বিনোদনের উপকরণে পরিণত হচ্ছে। টিকটকের মতো প্ল্যাটফর্মে বিভিন্ন সময় দেখা যায়, স্কুল-কলেজের বিদায় অনুষ্ঠান বা অন্য কোনো উপলক্ষে শিক্ষার্থীরা উচ্ছৃঙ্খল আচরণ করছে, এবং সেই ভিডিওগুলো ভাইরাল হচ্ছে। এসব ভিডিও দেখে অন্যরাও উৎসাহিত হচ্ছে একই ধরনের কাজ করতে। ফলে এটি এক ধরনের ‘ট্রেন্ড’-এ পরিণত হচ্ছে।

কিন্তু এই ট্রেন্ড যে কতটা ক্ষতিকর, তা অনেকেই বুঝতে চাইছে না। শিক্ষাঙ্গন শুধু পাঠদানের স্থান নয়; এটি মূল্যবোধ গঠনেরও কেন্দ্র। এখানে শৃঙ্খলা, দায়িত্ববোধ, সম্মানবোধ এবং সহমর্মিতা শেখানো হয়। কিন্তু যখন শিক্ষার্থীরাই সেই শিক্ষাঙ্গনের সম্পদ নষ্ট করে, তখন প্রশ্ন ওঠে—আমরা কী শেখাতে পারছি? কোথায় ব্যর্থ হচ্ছি?

এই ব্যর্থতার দায় শুধু শিক্ষার্থীদের ওপর চাপিয়ে দিলে চলবে না। এর পেছনে পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং বৃহত্তর সমাজেরও ভূমিকা রয়েছে। পরিবারে যদি সন্তানের প্রতি সঠিক নজরদারি ও মূল্যবোধ শিক্ষা না থাকে, তাহলে সে সহজেই বিভ্রান্ত হতে পারে।

একইভাবে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান যদি কেবল পরীক্ষার ফলাফল নিয়ে ব্যস্ত থাকে এবং নৈতিক শিক্ষাকে গুরুত্ব না দেয়, তাহলে শিক্ষার্থীরা দিকভ্রষ্ট হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ে। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, আমরা কি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের সঠিক দিকনির্দেশনা দিচ্ছি? প্রযুক্তি নিজে কখনো খারাপ নয়; এর ব্যবহারই নির্ধারণ করে এর প্রভাব। কিন্তু আমাদের সমাজে প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রে সচেতনতার ঘাটতি রয়েছে।

ফলে তরুণরা অনেক সময় বুঝতে পারে না কোনটি গ্রহণযোগ্য আর কোনটি নয়। এই ধরনের ঘটনার আরেকটি দিক হলো ‘গ্রুপ সাইকোলজি’ বা দলগত মানসিকতা। অনেক সময় দেখা যায়, একজন হয়তো এমন কাজ করতে চায় না, কিন্তু দলগত চাপে পড়ে সে-ও অংশগ্রহণ করে। ফলে পুরো একটি দলই ভুল পথে চলে যায়।

এই প্রবণতা রোধে প্রয়োজন ব্যক্তিগত সচেতনতা এবং দৃঢ় নৈতিক অবস্থান। এখন প্রশ্ন—সমাধান কী?

প্রথমত, পরিবারকে আরও দায়িত্বশীল হতে হবে। সন্তানের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে, যাতে সে তার চিন্তা-ভাবনা ও সমস্যাগুলো খোলামেলা বলতে পারে। একই সঙ্গে তাকে সঠিক-ভুলের পার্থক্য শেখাতে হবে।

দ্বিতীয়ত, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে শুধু একাডেমিক শিক্ষার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে নৈতিক ও সামাজিক শিক্ষার ওপর জোর দিতে হবে। বিদায় অনুষ্ঠানের মতো আয়োজনগুলোকে আরও সুশৃঙ্খল ও অর্থবহ করতে হবে, যাতে শিক্ষার্থীরা এর প্রকৃত গুরুত্ব উপলব্ধি করতে পারে।

তৃতীয়ত, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে সচেতনতা বাড়াতে হবে। শিক্ষার্থীদের বোঝাতে হবে যে, ভাইরাল হওয়ার চেয়ে ভালো মানুষ হওয়া অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।প্রয়োজন হলে এ বিষয়ে ওয়ার্কশপ, সেমিনার আয়োজন করা যেতে পারে।

চতুর্থত, প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে এ ধরনের ঘটনায় যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে। যাতে ভবিষ্যতে কেউ এমন কাজ করতে সাহস না পায়। তবে শাস্তির পাশাপাশি সচেতনতা বৃদ্ধির দিকেও নজর দিতে হবে। সবশেষে বলতে হয়, একটি সমাজের ভবিষ্যৎ নির্ভর করে তার তরুণ প্রজন্মের ওপর। যদি সেই প্রজন্মই মূল্যবোধের সংকটে ভোগে, তাহলে পুরো সমাজই ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

তাই এখনই সময় এই বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দিয়ে দেখার। টিকটকের ক্ষণস্থায়ী জনপ্রিয়তার জন্য যদি আমরা আমাদের মূল্যবোধ, শৃঙ্খলা এবং দায়িত্ববোধ বিসর্জন দিই, তাহলে তার মূল্য দিতে হবে পুরো জাতিকে। বিদায় অনুষ্ঠান হোক স্মৃতিময়, সৃজনশীল এবং সম্মানজনক—ভাঙচুর ও উচ্ছৃঙ্খলতার নয়। এই প্রত্যাশাই এখন সবার।

লেখক: শিক্ষক ও গবেষক। 

শিক্ষাবার্তা /এ/ ২১/০৪/২০২৬

দেশ বিদেশের শিক্ষা, পড়ালেখা, ক্যারিয়ার সম্পর্কিত সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম, ছবি, ভিডিও প্রতিবেদন সবার আগে দেখতে চোখ রাখুন শিক্ষাবার্তায়


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.