মৌলভীবাজারঃ জেলার শ্রীমঙ্গলের প্রতিটি স্কুলে একটি করে হাসপাতাল খুলেছেন শ্রীমঙ্গল উপজেলা নির্বাহী অফিসার। নিয়োগ দিয়েছেন একজন করে ডাক্তারও। আছেন একাধিক নার্সও। প্রত্যেক স্কুলেই ২০ থেকে ৩৬ জন করে রোগীও ভর্তি হয়েছেন। আর নার্স ও ডাক্তারদের সেবায় অনেক রোগী ইতোমধ্যে সুস্থ হয়ে বাড়িতেও ফিরেছেন। যা এখন অনুকরণীয় হয়ে উঠেছে।
বিগত করোনা মহামারির সময় লেখাপড়ায় পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের জন্য শ্রীমঙ্গল উপজেলা নির্বাহী অফিসার আলী রাজিব মাহমুদ মিঠুন উপজেলার ১৩৮টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ইতোমধ্যে ৮৬টিতে এই হাসপাতাল স্থাপন করেছেন। বাকি বিদ্যালয়গুলো রয়েছে আন্ডার কনস্ট্রাকশনে। গতকাল বুধবার দুপুর ২টায় শ্রীমঙ্গল কালাপুর ইউনিয়নের কাকিয়াবাজারসংলগ্ন সিংহবীজ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সরজমিন গেলে শিক্ষক কেয়া চক্রবর্তী জানান, দ্বিতীয় তলায় তাদের হাসপাতাল। উপরে উঠে দেখতে পাওয়া যায় একটি কক্ষের সামনে বিলবোর্ডে রয়েছে রিডিং অ্যান্ড রাইটিং হসপিটাল, অপর একটি কক্ষের সামনে আরো একটি বিলবোর্ডে, রিডিং রাইটিং হসপিটাল চেকিং রুম।
প্রথমে রিডিং রাইটিং হসপিটালে প্রবেশ করলে চোখে পড়ে ৬টি গ্রুপে ৫ জন করে ৩০ জন শিশু লুডু খেলায় মত্ত। এ প্রতিবেদককে দেখে এগিয়ে এলেন বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা রুবি রায়। যার বর্তমান পরিচয় তিনি রিডিং অ্যান্ড রাইটিং হাসপাতালের কনসালট্যান্ট। রুবি রায় জানান, শিশুরা খেলে খেলে অক্ষর, যুক্তাক্ষর, ইংরেজি ওয়ার্ড, অঙ্ক শিখছে। এটি একটি বিশেষ কৌশল যা প্রণয়ন করেছেন শ্রীমঙ্গল উপজেলা নির্বাহী অফিসার আলী রাজিব মাহমুদ মিঠুন। এ সময় ক্লাসে আসেন বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মলয় কান্তি তালুকদার। মলয় কান্তি তালুকদার বলেন, এই রির্ডিং হসপিটালে তার পদবি ‘তত্ত্বাবধায়ক’। তিনি বলেন, বিগত করোনায় লেখাপড়ায় পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের শিক্ষার মান বাড়াতে তারা অভাবনীয় একটি ফরমুলা পেয়েছেন। যা দিয়েছেন শ্রীমঙ্গল উপজেলা নির্বাহী অফিসার।
এই ফরমুলাটি হলো- বিদ্যালয়ে বেশ কিছু শিক্ষার্থী লেখাপড়ায় অনেক দুর্বল। অনেকে যুক্তাক্ষর পড়তে পারে না। অনেকে বড় বানান উচ্চারণ করতে পারে না। অনেকে ইংরেজি শব্দ শেখেনি। করোনা মহামারির সময় যেগুলো না পড়েই তারা উপরের ক্লাসে চলে এসেছে। এই পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের জন্য উপজেলা নির্বাহী অফিসার প্রথমে বর্ণমালা, শব্দ ও ওয়ার্ড দিয়ে কয়েকটি লুডু তৈরি করে দিয়েছেন। আর এই লুডু খেলার জন্য প্রথমে বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের লাল ও সবুজ দুই দলে বিভক্ত করি। লাল দলে রয়েছেন যারা শব্দ ভালো করে উচ্চারণ করতে পারে না, যুক্তবর্ণের ব্যবহার জানে না। অর্থাৎ বিদ্যালয়ের অধিকতর দুর্বল শিক্ষার্থী। আর সবুজ দলে রয়েছেন যারা রিডিং পড়তে ও লিখতে পারে। তার বিদ্যালয়ে প্রাথমিক বাছাইয়ে লাল দলের শিক্ষার্থী পেয়েছেন ৩০ জন। এই ৩০ জনের জন্য সবুজ দল থেকে ভালো দেখে প্রতি ৪ জনে একজন করে শিক্ষার্থী বাছাই করেছেন, যে শিক্ষার্থী ভালো করে রিডিং পড়তে পারে। যাদের পদবি হচ্ছে নার্স বা কেয়ারার। এই একজনকে দিয়ে ৪ জনের গ্রুপ করে বড় একটি লুডু খেলতে বসিয়ে দেন। এই লুডুটির প্রত্যেক ঘরে রয়েছে বর্ণমালা। একইভাবে একটি লুডু রয়েছে ইংরেজি বর্ণমালা দিয়ে। আরো দুটি বাংলা ও ইংরেজি শব্দ দিয়ে। শিক্ষার্থীরা লুডুতে কটি মেরে ওই ঘরে ঘুঁটি নিয়ে যায় এবং সঙ্গে সঙ্গে পড়তে থাকে। প্রথমে একবার পড়িয়ে দেন সবুজ দল থেকে আসা দলনেতা বা ওই হাসপাতালের নার্স। জটিল বানানে সাহায্য করেন ডাক্তার ও কনসালটেন্ট। তিনি জানান, এই রিডিং হাসপাতালটি খোলা হয় প্রতিদিন বিকাল ২টার পর। এখানে কয়েকদিন ক্লাস করার পর যারা সব পড়তে পারে তাদের পাঠানো হয় রিডিং রাইটিং হসপিটালের চেকিং রুমে। সেখানে থাকেন খুবই ভালোমানের আরেকজন শিক্ষার্থী। যার পরিচয় তিনি ওই হাসপাতালের ডাক্তার। ডাক্তারের ভূমিকায় থাকা চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী তন্ময় চক্রবর্তী জানায়, রিডিং রাইটিং হসপিটালের চেকিং রুমে যারা আসেন তাদের আরো কিছু ধাপ অতিক্রম করতে হয়। এখানে দেয়ালে টাঙানো কয়েকটি ছবি দেখে গল্প বলতে হয় এবং তা লিখে দিতে হয়। ফলের গাছের ফলগুলো পড়তে হয়। ইংরেজি বর্ণমালার গাছগুলো থেকে বর্ণমালা ও ওয়ার্ড পড়তে হয়। সব শেষে পেপার স্ট্যান্ডে গিয়ে পড়তে হয় পত্রিকা। এখানেই শেষ নয় এই চেকিং রুমে যে সবচেয়ে ভালো করবে তাকে দেয়া হয় ‘স্টুডেন্ট অফ দ্য ডে’ পুরস্কার।
তন্ময় চক্রবর্তী জানান, চেকিং রুমের কাজ যারা সুন্দরভাবে করে দিতে পারেন তারা আবার ক্লাসে ফিরে যান। আর যারা পারেন না বা জড়তা থাকে তাদের আবার ফেরত পাঠানো হয় রিডিং রাইটিং হসপিটালে।
এ ব্যাপারে শ্রীমঙ্গল উপজেলা নির্বাহী অফিসার আলী রাজিব মাহমুদ মিঠুন জানান, ‘তার রুটিন ওয়ার্কের মধ্যে একটি হলো বিভিন্ন বিদ্যালয় পরিদর্শন করা। আর এই বিদ্যালয় পরিদর্শন করতে গিয়ে বিভিন্ন বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের প্রশ্ন করলে বেশ কিছু শিক্ষার্থী উত্তর দিতে পারে না। ৩য় থেকে ৫ম শ্রেণির অনেক শিক্ষার্থী রিডিং পড়তে পারে না’। দুর্বল শিক্ষার্থীদের বিষয়ে জানতে চাইলে ওই সময় শিক্ষকরা তাকে জানান, ‘এরা করোনা মহামারির সময় পড়তে পারেনি। কিন্তু উপরের ক্লাসে তুলে দিতে হয়েছে। এজন্য এরা দুর্বল।’
আলী রাজিব মাহমুদ মিঠুন আরো জানান, বিষয়টি নিয়ে তিনি উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলাপ করে এর কৌশল খোঁজেন এবং টিম ওয়ার্কের মাধ্যমে এই ফরমুলাটি তৈরি করেন। তিনি জানান, ‘এই ফরমুলাটি তৈরি করতে বড় উদ্যোগী ভূমিকা পালন করেছেন শ্রীমঙ্গল উপজেলা সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম ভূঁইয়া।’ আর এটি বাস্তবায়ন সম্ভব হয়েছে প্রাথমিক শিক্ষা পরিবার অর্থাৎ শিক্ষার্থী, শিক্ষক, সহকারী শিক্ষা অফিসার, উপজেলা ভারপ্রাপ্ত শিক্ষা অফিসার এবং বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের আন্তরিক প্রচেষ্টা ও উদ্যোমের কারণে।
তিনি বলেন, ‘এ কার্যক্রমের পুরো বিষয়টি মৌলভীবাজার জেলা প্রশাসকের সরাসরি তত্ত্বাবধান ও নির্দেশনায় বাস্তবায়ন করা আমার পক্ষে সম্ভব হয়েছে। জেলা প্রশাসক নিজেও একজন শিক্ষানুরাগী ও জাতীয় পর্যায়ে পদকপ্রাপ্ত কর্মকর্তা।’ তিনি বলেন, ‘আমার ভালো লাগছে এজন্য যে, এই রিডিং রাইটিং হসপিটালে ভর্তি হয়ে অনেক দুর্বল শিক্ষার্থী সবল হয়েছে।’
এ ব্যাপারে সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম ভূঁইয়া বলেন, উপজেলা নির্বাহী অফিসারের আন্তরিক সহযোগিতা ও তত্ত্বাবধানে শ্রীমঙ্গল উপজেলায় এই রিডিং রাইটিং হাসপাতাল চালু করা সম্ভব হয়েছে। এ জাতীয় একটি হাসপাতাল খুলতে খরচ তেমন না। ডিজিটালভাবে করলে ৭/৮ হাজার টাকার মধ্যে হয়ে যায়। আর কাগজ দিয়ে করলে ১৫ টাকার মধ্যে হবে। এ ব্যাপারে শ্রীমঙ্গল উপজেলা ভারপ্রাপ্ত শিক্ষা কর্মকর্তা জ্যোতিষ রঞ্জন দাশ জানান, শ্রীমঙ্গল উপজেলা নির্বাহী অফিসারের আন্তরিক সহযোগিতায় উপজেলাজুড়ে চমৎকার এই কার্যক্রমটি চালু করা হয়েছে। উপজেলা নির্বাহী অফিসারের পাশাপাশি তাদের সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম ভূঁইয়া এ বিষয়ে অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন। তিনি স্কুলে স্কুলে গিয়ে শিক্ষকদের এ বিষয়ে প্রথমে প্রশিক্ষণ দেন এবং হাসপাতাল খোলার কার্যক্রম গ্রহণ করেন। এই কার্যক্রমের আরো একটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো- তৃতীয় শ্রেণি থেকে ৫ম শ্রেণি পর্যন্ত বাংলা ও ইরেজিতে যত বানান রয়েছে বিশেষ করে যুক্তবর্ণের সবগুলো শব্দ দিয়ে তিনটি ডিকসনারি তৈরি করা হয়েছে। যা এই রিডিং রাইটিং রুমে পড়ানো হয়। তিনি জানান, এই কোর্সটি শেষ করতে দুই থেকে আড়াই মাস ভর্তি থাকতে হয় রিডিং অ্যান্ড রাইটিং হাসপাতালে। তবে কেউ কেউ ১৫ দিনেও রিডিং আয়ত্তে নিয়ে আসে।
এ ব্যাপারে শ্রীমঙ্গল প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক কল্যাণ দেব জানান, এই উদ্যোগটি চমৎকার। যাতে সরাসরি আমাদের বিদ্যালয়ের উপকার হচ্ছে। বিশেষ করে দুর্বল শিক্ষার্থীদের পড়ানোর জন্য আলাদা করে শিক্ষক পাওয়া যাবে না। এক্ষেত্রে ভালো ছাত্ররাই ডাক্তার ও নার্সের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে দুর্বল শিক্ষার্থীদের এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। এ কার্যক্রমে খুশি অভিভাবকরাও। শ্রীমঙ্গল সিংহব্রীজ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি নুরুল ইসলাম খান বলেন, এর ফলে আমাদের সন্তানদের অনেক উপকার হচ্ছে।
শ্রীমঙ্গল উপজেলা নির্বাহী অফিসারের ব্যতিক্রমী এই শিক্ষা কার্যক্রমের সংবাদ উপজেলা ছাড়িয়ে চলে যায় জেলায়।
মৌলভীবাজার জেলা প্রশাসক ড. উর্মি বিনতে সালাম বিষয়টি প্রত্যক্ষ করেন এবং এটি পুরো জেলায় ছড়িয়ে দিতে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি), মৌলভীবাজার বর্নালী পালের নেতৃত্বে একটি টিম পাঠান শ্রীমঙ্গলে।
বুধবার এডিসি বর্নালী পাল শ্রীমঙ্গলের বেশ কয়েকটি বিদ্যালয়ে এই রিডিং অ্যান্ড রাইটিং হাসপাতাল পরিদর্শন করে বলেন, পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের এগিয়ে নিতে এই কার্যক্রম খুবই প্রশংসনীয়। জেলা প্রশাসক মহোদয়ের নির্দেশে তিনি এই কার্যক্রম দেখতে এসেছেন এবং এটি সারা জেলায় ছড়িয়ে দিতে জেলা প্রশাসকের কাছে সুপারিশ করবেন বলেও জানান তিনি।
শিক্ষাবার্তা ডট কম/এএইচএম/০৫/১০/২০২৩
দেশ বিদেশের শিক্ষা, পড়ালেখা, ক্যারিয়ার সম্পর্কিত সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম, ছবি, ভিডিও প্রতিবেদন সবার আগে দেখতে চোখ রাখুন শিক্ষাবার্তায়
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
