এইমাত্র পাওয়া

শিক্ষা কী কেবলই বিসিএসমুখী!

শিক্ষার উদ্দেশ্য বহু বছর আগে থেকেই চাকরীমুখী হয়ে গেছে। আমরা খুব ধীরে ধীরে আমাদের কয়েক প্রজন্মকে এটা শিখাতে সক্ষম হয়েছি যে শিক্ষা কেবলই চাকরি-বাকরি পাওয়ার উদ্দেশ্যেই করা হয়। বাবা-মা, শিক্ষক, প্রতিবেশী সবাই এটাই বলে, শেখায়। ছেলেবেলায় শিশুকে পড়ালেখা শেখাতে বলা হয়, লেখাপড়া করে যে গাড়ি ঘোড়া চড়ে সে! অর্থাৎ পড়ালেখা না করলে গাড়ি-ঘোড়ায় চড়া যায় না! এর অর্থ হলো পড়ালেখা করে বড় চাকরি পেয়ে গাড়িতে চড়া বা এরকম কিছু। সন্তানের কাছে মা-বাবা পড়ালেখা শেষে একটা ভালো চাকরিই আশা করে। তা যদি মোটা অর্থের বিনিময়েও হয় তাতেও সমস্যা নেই। চাকরি তো হবে! শিক্ষা মানুষের মধ্যেকার অন্তর্নিহিত শক্তি জাগ্রত করার কাজ করলে বাস্তবিক ক্ষেত্রে এর প্রয়োগ সঠিকভাবে হচ্ছে না।

শিক্ষা তার উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে সফল হচ্ছে না। প্রয়োগের উদ্দেশ্য এবং ধরণেই এমনটা হচ্ছে বলাই যায়। ভারতের রাষ্ট্রপতি ও বিখ্যাত পরমাণু বিজ্ঞানী এ.পি.জে আবদুল কালাম শিক্ষা নিয়ে খুবই চমৎকার একটি মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেছিলেন, যতদিন শিক্ষার উদ্দেশ্য শুধু চাকরি পাওয়া হবে, ততদিন সমাজে শুধু চাকররা জন্মাবে, মালিক নয়”। যে কথার বাস্তবিক প্রমাণ আমরা আজকের সমাজে প্রতিফলিত হচ্ছে । দুঃখের বিষয় হচ্ছে  আমাদের আজকের শিক্ষার উদ্দেশ্য কেবল চাকরি পাওয়া। একটা সার্টিফিকেট আর চাকরি তারপর জীবনে আর কোন দুঃশ্চিন্তা থাকে না। আমাদেও দেশে চলে আসা শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে বহুবার ঘষামাজা করা হয়েছে। কখনো কোন বিষয় বাতিল করা হয়েছে আবার প্রয়োজনের খাতিওে কোন বিষয় বাদ দেয়া হয়েছে। ভারতীয় উপমহাদেশে শিক্ষা ব্যবস্থা প্রসারে ভূমিকা রেখেছিল ব্রিটিশরা। মূলত ব্রিটিশদের তৈরি করা শিক্ষা ব্যবস্থাতেই কিছুটা পরিবর্তন করে আজও আমাদের দেশে চলছে। ব্রিটিশ ভারতে আধুনিক একটি শিক্ষা ব্যবস্থা প্রণয়নের দায়িত্ব পেয়েছিলেন লর্ড মেকলে সাহেব। লর্ড মেকলে সাহেবের এ উপমহাদেশে শিক্ষা ব্যবস্থা প্রণয়ন নিয়ে একটি চিন্তা চেতনা ছিল এরকম- ” তিনি ১৮৩৫ সালের ২ ফ্রেবুয়ারি ব্রিটিশ সংসদে তার বক্তব্যে বলেছিলেন, আমি ভারতের আনাচে কানাচে ঘুরেও একজন ভিক্ষুক কিংবা একজন চোরের দেখা পাইনি।

এদেশে এতটা ধনসম্পদ, এদেশের মানুষের মধ্যে নৈতিক চরিত্রের এতটা উ”চস্তর দেখেছি যে, এদেশবাসীর শিক্ষা,তাদের ধর্ম বিশ্বাস ,সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে পুরোপুরি ভেঙে দিতে না পারলে আমরা কোনদিনই দেশটাকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারবো না।” এই ভাষণে তিনি প্রস্তাব করেছিলেন,’আমরা এসব ঐতিহ্যগত শিক্ষাব্যবস্থা আর সংস্কৃতিকে এমনভাবে বদলে দেব যেন তারা যা কিছু বিদেশী, যা কিছু ইংলিশ,সে সব কিছুকেই তাদের নিজেদের চেয়ে উৎকৃষ্ট ভাবতে শিখবে। ফলে নিজেদের সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য হারিয়ে তারা, ঠিক আমরা যেমনটা চাইবো,তেমনই একটি আত্ম বিস্মৃত পদানত জাতিতে পরিণত হবে।” ইংরেজ সাহেবদের সেই  ইচ্ছার প্রতিফলন আজও আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় দেখতে পাই। আমাদের পোশাকে, আমাদের চালচলনে আমরা সর্বদাই সেই সাহেবদের অনুসরণ করার করি। আমাদের শিক্ষা এখন ভালো চাকরি দিতে পারে, ভালো মানুষ তৈরি করাটা শিক্ষার কোনো উদ্দেশ্য নয়। সকলেই সেটাই চাইছে। চাকরি চাইছে। অথচ চাকরির বাজার চাকরি প্রার্থীর তুলনায় অনেক কম। আবার মেধাবী ছাত্রছাত্রীদের একটি বড় অংশই চাইছে বিসিএস ক্যাডার হতে। বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া ছাত্রছাত্রীদের প্রত্যেকেই আজ বিসিএস পাস করে ক্যাডার হতে চায়। হতে না চাওয়ারও কোনো কারণ নেই। কারণ একবার যদি বিসিএসটা হয়ে যায় তাহলে এই বাজারে জীবনটা নিশ্চিন্ত। সবকিছুই তার হাতের মুঠোয়। এজন্যই দিনরাত বই মুখস্ত’ করার কাজ করছে সকলে। এখন কথা হলো যারা ক্যাডার বা নন ক্যাডার চাকরি পাচ্ছে না তারা অন্য চাকরি খুঁজছে। কিন্তু  বিসিএসটাই প্রধান। এখানে আবার ইদানিং প্রশাসনে যাওয়ার ব্যাপক ঢল দেখা যাচ্ছে।

অর্থাৎ সবার উপরে প্রশাসন ক্যাডারে চয়েস দিচ্ছে  চাকরি প্রার্থীরা। কিন্তু শিক্ষা এভাবে বিসিএসমুখী হওয়ার ভালো এবং মন্দ দিকটাও আমাদের ভাবা দরকার। চূড়ান্ত মেধাবীরা অর্থাৎ যারা বিসিএস উত্তীর্ণ হচ্ছে তারাই দেশের চূড়ান্ত মেধাবী এমনটা স্বীকৃত তারা যদি সকলেই বিসিএস শেষে কর্মকর্তার পদে বসেন তাহলে আরও ক্ষেত্র যেখানে সত্যিই প্রচুর মেধাবী মানুষের দরকার সেই ক্ষেত্রগুলো ক্ষতিগ্রস্থ’ হচ্ছে আমরা তো বিসিএসমুখী শিক্ষা চাইনি। আমাদের দেশকে এগিয়ে নিতে যত না দরকার একজন কর্মকর্তা তার চেয়েও বেশি দরকার একজন গবেষক, একজন চিকিৎসক, একজন বিজ্ঞানী বা এমন একজন যিনি দেশের অর্থনীতিকে বদলে দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন। সেই ইচছাশক্তি তৈরি করা ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে একান্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সেটা হচ্ছে না। তাদের প্রথম থেকেই স্বপ্ন দেখানো হয় ভালো ছাত্র বা ছাত্রী হলে কিভাবে লেখাপড়া করলে বিসিএস পাস করা যায়! কিন্তু‘ তাদের সেই স্বপ্ন দেখানো হয় না যে কিভাবে একজন মানুষ হাজার হাজার মানুষকে চাকরি দিতে পারে, বিশ্বব্যাপী বাংলাদেশের পণ্যকে ছড়িয়ে দিতে পারে অথবা সৃষ্টিশীল কোনো কাজ যা দেশকে সম্মান এনে দিতে সক্ষম হয়। চীন বা ভারতের বড় বড় প্রযুক্তি কোম্পানি, মার্কেটপ্লেস আজ ইউরোপ-আমেরিকাকে টেক্কা দিচ্ছে। একজন মানুষ পুরো দেশটাকেই বদলে দিয়েছে। পাশের দেশ চাঁদে অভিযান পরিচালনায় সফল হয়েছে।

জ্ঞান-বিজ্ঞানে এগিয়ে চলেছে সমানতালে। আমাদের কতজন ছাত্রছাত্রী বিজ্ঞান নিয়ে লেখাপড়া করে গবেষণায় ব্রতী হয়েছে তা ভাবার বিষয়। যদি গবেষণার জন্য বাইরের দেশে চলে যায় তাহলে কেউ কেউ আবার সেখানেই থেকে যান। আপনি একশজন উচ্চ শিক্ষিত মেধাবী যুবক যুবতীর কাছে জানতে চান যে তারা কি করতে চায়? তাদের অধিকাংশেরই উত্তর হবে বিসিএস করতে চায়। এটাই স্বাভাবিক। বহু বছর ধরে তাদের মা বাবা, শিক্ষক, সমাজ মনন ও মগজে এই কথাটাই ঢুকিয়ে দিয়েছে। একদিনে সেটা বের করা সম্ভব না। মাত্র কিছুদিন আগে করোনা অতিমারী আমাদের একটা শিক্ষা দিয়ে গেছে। এই যে করোনার প্রতিষেধক তার জন্য আমরা কিন্তু প্রাণপ্রণে নির্ভর করেছি বিজ্ঞানীর উপর। কবে একজন এর কার্যকর টিকা বের করতে পারবেন তার অপেক্ষা করেছি। একজন মানুষ পুরো পৃথিবীকে স্বপ্ন দেখাতে পারে। কিন্তু আমরাই সেই স্বপ্ন দেখাতে ব্যর্থ হয়েছি। আমরা তার মেধাকে কুক্ষিগত করে একটি দিকে নিয়ে গেছি। এখন আর এখান থেকে মুক্তি নেই। চাকরি করতে হবে, চাকরি করতে হবে নইলে পড়ালেখা বৃথা, এই মন্ত্রই জপেছি দিন-রাত। আজও চাকরি না পেলে একজন বেকার এদেশে সমাজে অবহেলিত। ব্যবসা করলে, কৃষক হলে, অথবা খামার করে সফল হলেও চাকরি না করার খোঁটা শুনতে হয়। প্রতদিন সকালে সুটেড বুটেড হয়ে অফিসের গাড়ি চলে এসি রুমে চাকরি করারই স্বপ্ন। বাকিটা দুঃস্বপ্ন।

এরপর চাকরির বাজারে এসেও নানা কারসাজি হয়। এখানেও প্রশ্ন ফাঁসের গোলমাল আছে, আছে টাকা এবং লোকবল খাটিয়ে পরীক্ষার হলেই ম্যানেজ করার কারসাজি। সুতরাং চাকরি পেলেই যে সেই প্রকৃত মেধাবী সেটাও প্রশ্নাতীতভাবে বলা যাচ্ছে না। সব সেক্টরে কমবেশি একই অবস্থা বিরাজ করছে। বাঁকা পথে সার্টিফিকেট অর্জন করে যারা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মাথা উঁচু করে চলাফেরা করছে। তাদের মনের মধ্যে কি কখনো এই পাপের জন্য একটুও অনুশোচনা হয় না। আয়নায় নিজেকে দেখে কি একটু লজ্জাও হয় না। এভাবে দেশের বিভিন্ন সেক্টরে মেধাবীদের সাথে মেধাবীহীনরা প্রবেশ করেছে। আর তাই ভালোর সাথে খারাপ মিশে দেশটার বারোটা বাজাচ্ছে। সক্রেটিস এরিষ্টোল প্লেটোর হাত ধরে যে শুদ্ধ শিক্ষার ইতিহাস বয়ে চলেছে তার বিপরীত ব্যবহারের ফল যে আমাদের এমন বেহাল দশা করে ছাড়বে তা কে জানতো। যে শিক্ষা মানুষের ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে না তার কোন প্রয়োজন নেই। আজকাল যেন সেই মূল লক্ষ কেবল সার্টিফিকেট।

বিজ্ঞান বিভাগে পড়ালেখা করলেও আবিষ্কারক হওয়ার কথা কিন্তু তেমন একটা কেউ বলে না। কারণ প্রথম প্রথম ওতে শুধুই ধৈর্য্য লাগে পয়সা আসে না। কিন্তু অবাক বিষয় হলো মাঝে মাঝে পত্রিকায় দেশের আনাচে কানাচে যেসব আশা প্রদানকারী নতুন কিছু আবিষ্কারের খবর চোখে পড়ে তার বেশিরভাগই তেমন উচ্চ শিক্ষিত নয়। বরং দীর্ঘদিন ঐ বিষয়টি নিয়ে কাজ করতে করতে একান্তই ই”ছা থেকে সে আবিষ্কারটি করে ফেলে। এখানে বিজ্ঞান তার কাছে নেশা বা ভালবাসা। আমাদের এই প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। আমরা কেবল বিসিএসমুখী শিক্ষা বা চাকরিমুখী শিক্ষা চাই না। শিক্ষা তার প্রকৃত কাজটি করে প্রকৃত চেতনার উন্মেষ ঘটাক- এটাই প্রার্থনা।

লেখক-
অলোক আচার্য
প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.