।। এ এইচ এম সায়েদুজ্জামান।।
রাজধানীর দনিয়ার ব্রাইট স্কুল অ্যান্ড কলেজের দশম শ্রেণির ছাত্রী সাবিকুন নাহারের মৃত্যুর ঘটনাটি শুধু একটি পরিবারের শোক নয়; এটি আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা, স্কুল পরিচালনা কমিটি ও তথাকথিত “চেয়ারম্যান সংস্কৃতি”র নগ্ন প্রতিচ্ছবি। একজন কিশোরী কেন পরীক্ষার হল থেকে অপমানিত হয়ে বাড়ি ফিরে আত্মহননের পথ বেছে নেয়—এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের তাকাতে হবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভেতরে গড়ে ওঠা ভয়, অপমান ও ক্ষমতার অপব্যবহারের সংস্কৃতির দিকে।
আজ দেশের বহু বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পরিচালনা কমিটি মানেই যেন এক ধরনের ক্ষুদ্র সাম্রাজ্য। সেখানে শিক্ষার চেয়ে প্রভাব, মানবিকতার চেয়ে কর্তৃত্ব, নীতির চেয়ে ব্যক্তিস্বার্থ বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্কুলে পড়তে আসা কোমলমতি শিক্ষার্থীরা অনেক সময় শিক্ষকদের চেয়ে বেশি আতঙ্কে থাকে কমিটির সভাপতি, চেয়ারম্যান কিংবা প্রভাবশালী সদস্যদের কারণে। প্রশ্ন হচ্ছে—যে কমিটি শিক্ষার পরিবেশ রক্ষা করার কথা, তারা যদি শিক্ষার্থীদের জন্য ভয় ও মানসিক নির্যাতনের কারণ হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে এমন কমিটির প্রয়োজন কী?
সাবিকুন নাহারের ঘটনায় অভিযোগ উঠেছে, স্কুলের চেয়ারম্যান পরীক্ষার কক্ষ থেকে তাকে ডেকে নিয়ে গালিগালাজ করেন। অভিযোগ সত্য হলে এটি নিছক শাসন নয়, এটি ক্ষমতার নির্মম প্রদর্শন। একজন কিশোরী মেয়ের আত্মসম্মান কতটা ভঙ্গুর হতে পারে, তা বুঝতে বিশেষজ্ঞ হওয়ার প্রয়োজন নেই। কৈশোর এমন একটি সময়, যখন একটি অপমান, একটি কটু কথা, একটি হুমকিই একজন শিক্ষার্থীর মানসিক জগৎকে তছনছ করে দিতে পারে। সেখানে যদি একজন প্রতিষ্ঠানের সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষ প্রকাশ্যে অপমান করেন, তাহলে সেই আঘাত কত গভীর হতে পারে তা সহজেই অনুমেয়।
আমরা প্রায়ই শুনি—“শিক্ষার্থীদের শাসন না করলে মানুষ হবে না।” কিন্তু শাসন আর অপমান এক জিনিস নয়। শিক্ষার উদ্দেশ্য চরিত্র গঠন, আত্মবিশ্বাস তৈরি ও মানবিকতা শেখানো। কাউকে হেয় করা, গালিগালাজ করা কিংবা টিসির ভয় দেখানো শিক্ষা নয়; এটি মানসিক নির্যাতন। অথচ দেশের অসংখ্য স্কুলে এই নির্যাতনকে “শৃঙ্খলা রক্ষা” নামে বৈধতা দেওয়া হয়।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, অনেক বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিচালনা কমিটিতে শিক্ষাবিদদের চেয়ে ব্যবসায়ী, স্থানীয় প্রভাবশালী কিংবা রাজনৈতিক পরিচয়ে প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তিদের আধিপত্য বেশি। তাদের বড় অংশের শিক্ষামনোবিজ্ঞান, শিশু অধিকার কিংবা শিক্ষাব্যবস্থার মৌলিক দর্শন সম্পর্কে ন্যূনতম ধারণাও নেই। তারা স্কুলকে অনেক সময় ব্যক্তিগত প্রভাব বিস্তারের ক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহার করেন। কেউ শিক্ষক নিয়োগে বাণিজ্য করেন, কেউ ভর্তি বাণিজ্যে জড়ান, কেউ আবার শিক্ষকদের ওপর কর্তৃত্ব ফলিয়ে নিজের ক্ষমতা জাহির করেন।
এই সংস্কৃতি নতুন নয়। দেশে বহু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কমিটির সদস্যদের বিরুদ্ধে শিক্ষকদের অপমান, নারী শিক্ষার্থীদের হয়রানি, আর্থিক অনিয়ম, নিয়োগ বাণিজ্য ও রাজনৈতিক প্রভাব খাটানোর অভিযোগ দীর্ঘদিনের। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বিচার হয় না। কারণ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে অনেক সময় স্থানীয় রাজনৈতিক ক্ষমতার বলয়ের অংশ হিসেবে ব্যবহার করা হয়। ফলে শিক্ষকরা মুখ খুলতে ভয় পান, শিক্ষার্থীরা প্রতিবাদ করতে পারে না, আর অভিভাবকরা সন্তানের ভবিষ্যতের কথা ভেবে চুপ থাকেন।
সাবিকুন নাহারের সহপাঠীদের বক্তব্যে আরেকটি ভয়াবহ দিক উঠে এসেছে—চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে মেয়েদের উত্ত্যক্ত করার অভিযোগ। এসব অভিযোগ সত্য-মিথ্যা তদন্তে প্রমাণিত হবে, কিন্তু একটি বিষয় স্পষ্ট: শিক্ষার্থীদের মধ্যে তার বিরুদ্ধে দীর্ঘদিনের ক্ষোভ ছিল। আর যখন কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীরা একজন চেয়ারম্যানের নাম ধরে স্লোগান দেয়, তখন বুঝতে হবে সমস্যাটি ব্যক্তিগত নয়, প্রাতিষ্ঠানিক।
দুঃখজনক হলো, আমাদের দেশে শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য এখনো গুরুত্ব পায় না। একটি কিশোরী আত্মহত্যা করলে আমরা বলি—“অভিমান করেছে”, “মানসিকভাবে দুর্বল ছিল”, “পারিবারিক সমস্যা ছিল।” কিন্তু আমরা খুব কমই দেখি, সেই মানসিক চাপের উৎস কোথায়। শিক্ষার্থীরা এখন ভয়ঙ্কর প্রতিযোগিতা, ফলাফলের চাপ, সামাজিক প্রত্যাশা এবং প্রতিষ্ঠানের কঠোর আচরণের মধ্যে বড় হচ্ছে। সেখানে একজন শিক্ষক বা চেয়ারম্যানের একটি অপমানজনক আচরণও অনেক সময় শেষ ধাক্কা হয়ে দাঁড়ায়।
আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, ঘটনার পর ময়নাতদন্ত হয়নি। পরিবার “ঝামেলা” এড়াতে চেয়েছে—এটিও আমাদের বিচারহীনতার বাস্তবতা। মানুষ বিশ্বাস হারিয়েছে। তারা মনে করে, ক্ষমতাবানদের বিরুদ্ধে বিচার চেয়ে লাভ নেই। তাই অনেক পরিবার নীরবে কান্না চেপে যায়। কিন্তু এই নীরবতাই অপরাধীদের আরও বেপরোয়া করে তোলে।
একজন শিক্ষার্থী স্কুলে যাবে জ্ঞান অর্জনের জন্য, না কি অপমানিত হওয়ার ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে? একজন চেয়ারম্যানের কাজ কি শিক্ষার্থীদের তদারকি করা, না কি তাদের ভয় দেখানো? বাস্তবতা হলো, দেশের বহু স্কুলে কমিটি নিজেদের “মালিক” ভাবতে শুরু করেছে। অথচ স্কুল কোনো ব্যক্তির সম্পত্তি নয়; এটি একটি সামাজিক প্রতিষ্ঠান।
এখন সময় এসেছে স্কুল পরিচালনা কমিটির কাঠামো নতুনভাবে ভাবার।
প্রথমত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কমিটিতে শিক্ষাবিদ, মনোবিজ্ঞানী, অভিভাবক প্রতিনিধি ও সুনামধন্য সামাজিক ব্যক্তিদের অগ্রাধিকার দিতে হবে। শুধুমাত্র রাজনৈতিক পরিচয় বা আর্থিক সক্ষমতার ভিত্তিতে কাউকে কমিটিতে বসানো বন্ধ করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, শিক্ষার্থীদের সঙ্গে অসদাচরণ, মানসিক নির্যাতন বা ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ তদন্তে স্বাধীন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। অভিযোগ উঠলেই যেন নিরপেক্ষ তদন্ত হয় এবং অভিযুক্ত ব্যক্তি তদন্ত চলাকালে দায়িত্ব থেকে সাময়িক অব্যাহতি পান।
তৃতীয়ত, প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা ব্যবস্থা চালু করা জরুরি। কাউন্সেলিং সেল, অভিযোগ বাক্স, নিরাপদ অভিযোগ ব্যবস্থা—এসব এখন সময়ের দাবি।
চতুর্থত, শিক্ষকদেরও স্বাধীনতা ও মর্যাদা নিশ্চিত করতে হবে। অনেক সময় কমিটির প্রভাবের কারণে শিক্ষকরা অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে পারেন না। ফলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে একটি অস্বাস্থ্যকর ক্ষমতার ভারসাম্য তৈরি হয়।
সবচেয়ে বড় কথা, আমাদের বুঝতে হবে—শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ব্যবসা বা ক্ষমতার ক্ষেত্র নয়। এটি মানুষ গড়ার জায়গা। সেখানে একজন শিক্ষার্থী যদি অপমান সহ্য করতে না পেরে জীবন শেষ করে দেয়, তাহলে শুধু একটি পরিবার নয়, পুরো সমাজ ব্যর্থ হয়।
সাবিকুন নাহারের মৃত্যু আমাদের সামনে আয়না ধরে দাঁড়িয়েছে। আমরা কি এই আয়নায় নিজেদের দেখতে প্রস্তুত? নাকি কয়েকদিন সামাজিক মাধ্যমে শোক প্রকাশ করে আবার সব ভুলে যাব?
যদি সত্যিই আমরা শিক্ষার্থীদের নিরাপদ ভবিষ্যৎ চাই, তাহলে “চেয়ারম্যানতন্ত্র” ও “কমিটি দৌরাত্ম্য” বন্ধ করতে হবে। স্কুল পরিচালনা কমিটি থাকবে—কিন্তু তা হতে হবে জবাবদিহিমূলক, মানবিক ও শিক্ষাবান্ধব। অন্যথায় এমন আরও অনেক সাবিকুন নাহার হারিয়ে যাবে, আর আমরা কেবল শোকসভা আর প্রতিবাদ মিছিল দেখেই যাব।
একটি সভ্য সমাজে কোনো শিক্ষার্থী স্কুলের অপমান সহ্য করতে না পেরে আত্মহত্যা করবে—এটি কখনো স্বাভাবিক হতে পারে না। তাই আজ প্রশ্ন তুলতেই হয়—যে কমিটি শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা দিতে পারে না, মানবিক আচরণ করতে জানে না, বরং ভয় ও অপমানের সংস্কৃতি তৈরি করে, সেই লুটেপুটে খাওয়া কমিটির আসলে কী দরকার?
লেখক: শিক্ষক ও গবেষক।।
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল

