শিক্ষাক্ষেত্রে গবেষণার বিকল্প নেই

মো. মঈনুদ্দিন চৌধুরীঃ শিক্ষা মানবজীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ, যা জাতির মেরুদণ্ড হিসাবে বিবেচিত। অন্যদিকে কোনো সুনির্দিষ্ট বিষয়ের ওপর প্রাসঙ্গিক তথ্যের বিজ্ঞানসম্মত ও পদ্ধতিগত অনুসন্ধানই হলো গবেষণা। এ বিবেচনায় আমরা বলতে পারি, জাতির মেরুদণ্ড হিসাবে বিবেচিত শিক্ষাসংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয়ের বিজ্ঞানসম্মত ও পদ্ধতিগত অনুসন্ধানই হলো শিক্ষা গবেষণা। শিক্ষার মাধ্যমে মানুষের বিদ্যাবুদ্ধির উন্নয়ন ঘটে এবং এর মাধ্যমে সে সত্য, সুন্দর ও শিষ্টতার অনুরাগী হয়ে উঠতে পারে। কিন্তু সেই শিক্ষা যদি সুশিক্ষা না হয়, সেক্ষেত্রে দেশ বা জাতি তার ঈপ্সিত লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হয়। সুশিক্ষা বলতে সেই শিক্ষাকে বোঝায়, যার মাধ্যমে মানুষ বাস্তব ক্ষেত্রে এর ইতিবাচক দিকগুলোর প্রয়োগ ঘটাতে পারে। উন্নত দেশগুলো গবেষণা করে বিভিন্ন সমস্যা সম্পর্কে অবগত হয়। এরপর তারা এসব গবেষণার ফলাফলের ওপর ভিত্তি করে বিভিন্ন নীতি নির্ধারণ করে থাকে। কিন্তু বাংলাদেশের বিভিন্ন সংগঠনের ওপর গবেষণা পরিচালিত হলেও শিক্ষাক্ষেত্রে গবেষণার সংখ্যা আশাব্যঞ্জক নয়।

মুষ্টিমেয় কিছু প্রতিবেদন দৃষ্টিগোচর হলেও তাতে শিক্ষক বা শিক্ষাবিদদের অংশগ্রহণ নেই বললেই চলে। ফলে বিভিন্ন সময়ে প্রণীত নীতিমালাগুলোয় দেশের সংবিধানে বর্ণিত এবং আইএলও ও ইউনেস্কো বর্ণিত শিক্ষকদের অধিকার ও মর্যাদার সঠিক প্রতিফলন ঘটেনি; বরং এর পরিবর্তে ঔপনিবেশিক আমলের বৈষম্যমূলক ও পরস্পরবিরোধী নীতি, ‘ডিভাইড অ্যান্ড রুল পলিসি’, শিক্ষকবিরোধী নীতিমালা, শিক্ষকদের সুবিধাবিরোধী নীতিমালা, জাতীয় শিক্ষানীতি এবং জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রণীত নীতির সঙ্গে জনবলকাঠামো ও এমপিও নীতিমালার সাংঘর্ষিকতা বিদ্যমান থাকা, সাম্যের নীতির অভাব, দ্বৈত অধীনতার উপস্থিতি, এমপিওভুক্ত বেসরকারি কলেজে কর্মরত গবেষক শিক্ষকদের সরকারিভাবে সঠিক মূল্যায়ন না থাকা ইত্যাদি কারণে দেশের শিক্ষা খাত উন্নত বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগিয়ে যেতে পারছে না। তাছাড়া প্রতিটি সরকারের আমলেই শিক্ষার অঘোষিত রাজনীতিকরণের কারণে শিক্ষক সংগঠনগুলোর মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি হয়। এ পরিপ্রেক্ষিতে শিক্ষাক্ষেত্রে বিদ্যমান সমস্যাগুলো ক্রমেই প্রকট আকার ধারণ করছে।

আগে থেকে যদি নিরপেক্ষভাবে বিদ্যমান সমস্যাগুলোর ওপর গবেষণা পরিচালনা করা হতো, তাহলে বর্তমানে অনেক জটিল সমস্যার সমাধান হয়ে যেত। এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, আমাদের দেশে শিক্ষিত ব্যক্তির অভাব নেই; কিন্তু অপ্রিয় হলেও সত্য, আমাদের অনেকের মধ্যেই সুশিক্ষার অভাব আছে। আর এই সুশিক্ষার বাস্তবায়ন ঘটানোর জন্য শিক্ষাক্ষেত্রে গবেষণার প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। সঠিকভাবে প্রয়োগ করা জ্ঞানকে আমরা প্রজ্ঞা নামে অভিহিত করে থাকি, আর এই প্রজ্ঞা অর্জনের জন্যই গবেষণা পরিচালনা করা হয়। ড. জন ক্লার্কের মতে, ‘গবেষণা অজানার সঙ্গে পরিচিতিকে একীভূত করে। গবেষণা হয়ে ওঠে উন্নতি ও সমৃদ্ধির পথ।

পূর্ববর্তী গবেষণার মাধ্যমে সংগৃহীত বিদ্যমান জ্ঞান নতুন জ্ঞান অর্জনের ভিত্তি হিসাবে কাজ করে।’ তাই আমি মনে করি, বাংলাদেশের প্রাথমিক (প্রাক-প্রাথমিকসহ) থেকে শুরু করে মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা ক্ষেত্রে শিক্ষার্থী, শিক্ষক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, শিক্ষা প্রশাসন/আমলা, শিক্ষাসংক্রান্ত নীতিমালা এবং অন্য যেসব সমস্যা বিদ্যমান রয়েছে সেসবের সমাধানের জন্য গবেষণার কোনো বিকল্প নেই। আর এই গবেষণাকর্ম পরিচালিত হতে হবে শিক্ষার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দ্বারা। মোটকথা, শিক্ষার্থী, শিক্ষক, শিক্ষার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের চাহিদা নিরূপণ করে তদনুযায়ী বৈষম্যহীন, যুগোপযোগী নীতিমালা প্রণয়ন জরুরি।

লেখকঃ গবেষক; সহকারী অধ্যাপক, ব্যবস্থাপনা বিভাগ, শংকুচাইল ডিগ্রি কলেজ, বুড়িচং, কুমিল্লা

শিক্ষাবার্তা ডট কম/এএইচএম/১৫/০৮/২০২৩ 

দেশ বিদেশের শিক্ষা, পড়ালেখা, ক্যারিয়ার সম্পর্কিত সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম, ছবি, ভিডিও প্রতিবেদন সবার আগে দেখতে চোখ রাখুন শিক্ষাবার্তায়


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.