মনিপুর উচ্চ বিদ্যালয়ে এসএসসির ফল বিপর্যয়: তদন্তের দাবি

রাজধানীর খ্যাতনামা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান মনিপুর উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজে এবার এসএসসি পরীক্ষার ফলে বিপর্যয় ঘটেছে বলে মনে করছেন শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা। গত মাসে প্রকাশিত ফলে দেখা যায়, নজিরবিহীনভাবে এ প্রতিষ্ঠানটির ৩২৬ পরীক্ষার্থী ফেল করেছে। এ ছাড়া জিপিএ ৫ কমে গেছে উল্লেখযোগ্য হারে। ৩ হাজার ৮৮০ পরীক্ষার্থীর মধ্যে ১ হাজার ২৪৮ জন জিপিএ ৫ পেয়েছে। গত বছর জিপিএ ৫ পেয়েছিল এর দ্বিগুণ পরীক্ষার্থী।

এ ফলে প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরাও ক্ষুব্ধ। ইতোমধ্যে তারা দু’বার বিদ্যালয় ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ করেছেন। এর পেছনে ‘ষড়যন্ত্র’ আছে বলে মনে করছেন স্থানীয় সংসদ সদস্য শিল্প প্রতিমন্ত্রী কামাল আহমেদ মজুমদার। তিনি এ ঘটনার তদন্ত চেয়ে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যানকে আধা সরকারি পত্র (ডিও লেটার) দিয়েছেন।

অভিভাবকরা বলছেন, অতীতে মিরপুরের এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি বারবার দেশসেরা হয়েছে। প্রতি বছরই পাসের হার ছিল প্রায় শতভাগ। এবার হঠাৎ করে ৯ শতাংশ শিক্ষার্থী ফেল করায় অভিভাবকরা বিস্মিত ও ক্ষুব্ধ।

তাদের অভিযোগ, মনিপুর স্কুলের শিক্ষার্থীদের এসএসসি পরীক্ষার কেন্দ্র ছিল মিরপুর গার্লস আইডিয়াল ল্যাবরেটরি ইনস্টিটিউটে। ওই প্রতিষ্ঠানের কেন্দ্র সচিব ও কক্ষ পরিদর্শকের বিমাতাসুলভ আচরণের কারণেই ফল বিপর্যয় ঘটেছে। পরীক্ষা কক্ষে পরীক্ষার্থীদের সঙ্গে প্রতিদিনই দুর্ব্যবহার, ধমক দেওয়া, খাতা আটকে রাখা, ইচ্ছাকৃতভাবে প্রশ্নপত্র বিলম্বে বিতরণ ও অতিরিক্ত কাগজ (লুজ শিট) দিতে দেরি করা হতো। ব্যবহারিক পরীক্ষায়ও এ প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা মনিপুর স্কুলের শিক্ষার্থীদের ইচ্ছাকৃতভাবে কম নম্বর দেওয়ায় বহু শিক্ষার্থী জিপিএ ৫ পায়নি।

ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক তপন কুমার সরকারকে গত ৬ আগস্ট দেওয়া চিঠিতে শিল্প প্রতিমন্ত্রী কামাল মজুমদার লিখেছেন, তিনি ঐতিহ্যবাহী মণিপুর উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। মনিপুর উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজের ফলাফল বরাবরই সন্তোষজনক এবং এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষায় শতভাগ শিক্ষার্থী কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ হওয়ায় শুধু ঢাকা শিক্ষা বোর্ডই নয়, দেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেছে। ২০২২ সালেও এ প্রতিষ্ঠান থেকে ২ হাজার ৪৭৮ শিক্ষার্থী জিপিএ ৫ পেয়েছিল এবং গড় পাসের হার ছিল ৯৯.৯১ শতাংশ।

প্রতিমন্ত্রী তাঁর চিঠিতে লিখেছেন, এ প্রতিষ্ঠানটিকে বিতর্কিত করতে একটি মহল সর্বদা সচেষ্ট রয়েছে। বর্তমান ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের গাফিলতির কারণে মিরপুর গার্লস আইডিয়াল ল্যাবরেটরি ইনস্টিটিউট কেন্দ্রের দায়িত্বরত শিক্ষকরা মণিপুর স্কুল ও কলেজের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে অশোভন আচরণ এবং ভয়ভীতি সৃষ্টির মাধ্যমে মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি করে পরীক্ষায় বিঘ্ন ঘটায়। ফলে ২০২৩ সালের এসএসসি পরীক্ষায় মনিপুর স্কুল ও কলেজের ৩২৬ শিক্ষার্থীই অকৃতকার্য হয়। প্রতিষ্ঠানটির প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে কখনোই এ ধরনের ফল বিপর্যয় হয়নি। পরীক্ষা কেন্দ্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত শিক্ষকদের রোষানলে পড়ায় ও ব্যবহারিক পরীক্ষায় কম নম্বর পাওয়ায় গড় পাসের হার ৯১.৬ শতাংশ। অনেক মেধাবী শিক্ষার্থী জিপিএ ৫ পাওয়া থেকে বঞ্চিত হয়েছে। প্রতিমন্ত্রী এ বিষয়ে তদন্ত সাপেক্ষে শিক্ষার্থীদের উত্তরপত্র বিশেষভাবে পুনর্মূল্যায়নসহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে বিশেষভাবে অনুরোধ জানান।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক তপন কুমার বলেন, শিগগির এ বিষয়ে তদন্ত কমিটি গঠন করে দেওয়া হবে।

মনিপুর উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক জাকির হোসেন  বলেন, পরীক্ষা শুরুর দিন থেকেই মিরপুর গার্লস ল্যাবরেটরি আইডিয়াল স্কুলের শিক্ষকরা আমাদের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে রূঢ় ব্যবহার করতে থাকেন। সামান্য অজুহাতে আধা ঘণ্টা খাতা আটকে রাখেন। ওই প্রতিষ্ঠানের প্রধান শিক্ষকসহ সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের বিষয়টি জানানোর পরও কোনো প্রতিকার মেলেনি। বিষয়টি নিয়ে তিনি ঢাকা শিক্ষা বোর্ডে চিঠি দিয়েছিলেন।

ওয়াকিল আহমেদ নামে এক অভিভাবক জানান, যোগ্য হলেও তাঁর সন্তানকে ব্যবহারিক পরীক্ষায় পূর্ণ নম্বর দেওয়া হয়নি। এমন বহু পরীক্ষার্থীর সঙ্গে অমানবিক আচরণ করা হয়েছে। তারা সবাই এখন পরীক্ষার ফল পুনর্নিরীক্ষণ করতে আবেদন করেছেন। রাইসা আবেদীন রিচি নামের এক অভিভাবক বলেন, তাঁর মেয়েকে ‘বেয়াদব’ বলা হয়েছে, ধমক দেওয়া হয়েছে। এতে তাঁর দুই পত্রের পরীক্ষা খারাপ হয়েছে। জাহিন রহমান নামের এক পরীক্ষার্থী জানায়, তার লিখিত পরীক্ষার খাতা অকারণে ২০ মিনিট আটকে রাখা হয়। এতে সে ভীত হয়ে পড়ে। পরীক্ষায় এর প্রভাব পড়েছে।

ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক আবুল বাসার বলেন, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, অভিভাবক, পরীক্ষার্থীদের অভিযোগ আমরা পেয়েছি। নিরপেক্ষ তদন্ত করে দেখা হবে কেন ফল এমন হলো। কারও ইচ্ছাকৃত ত্রুটি বা গাফিলতি থাকলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

তিনি বলেন, ভবিষ্যতে মনিপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের পরীক্ষার কেন্দ্র যাতে মিরপুর গার্লস আইডিয়াল ল্যাবরেটরি ইনস্টিটিউটে না পড়ে, সে চেষ্টা করা হবে। সূত্রঃ সমকাল

শিক্ষাবার্তা ডট কম/এএইচএম/১৫/০৮/২০২৩  

দেশ বিদেশের শিক্ষা, পড়ালেখা, ক্যারিয়ার সম্পর্কিত সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম, ছবি, ভিডিও প্রতিবেদন সবার আগে দেখতে চোখ রাখুন শিক্ষাবার্তায়


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.