শিক্ষাবার্তা ডেস্ক, ঢাকাঃ স্বপ্ন ছিল পররাষ্ট্র ক্যাডার হওয়া। সেই লক্ষ্যে ২০১৯ সালে বিসিএসের প্রস্তুতি শুরু করেন। স্বপ্নের পূর্ণতায় অবিশ্রান্ত ছুটে চলা। আর প্রথমবার বিসিএসে অংশ নিয়েই করেন বাজিমাত। স্বপ্নের পররাষ্ট্র ক্যাডারে সারাদেশে প্রথম হলেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) ইলেক্ট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ২০১৪-১৫ সেশনের শিক্ষার্থী মোহাম্মদ সাজ্জাদ হোসাইন।
৪১তম বিসিএসে পররাষ্ট্র ক্যাডারে প্রথম চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক এই শিক্ষার্থীর পছন্দ ও স্বপ্ন ছিল পররাষ্ট্র ক্যাডার। কিন্তু সত্যি সত্যি তা পেয়ে যাবেন কল্পনাতেও ভাবেননি। নিজের চেষ্টা আর পরিবারের অকুণ্ঠ সমর্থনে সম্ভব হয়েছে উল্লেখ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দীর্ঘ লেখা পোস্ট করেন তিনি। এরইমধ্যে হাজার হাজার পাঠক সেই লেখা পড়েছেন। অনেকেই প্রশংসা করছেন।
তার লেখা কথাগুলো পাঠকের উদ্দেশ্যে তুলে ধরা হলো।
সাজ্জাদ লিখেছেন, আমার পড়ালেখার হাতেখড়ি মায়ের হাতেই। কোনো ধরনের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যাওয়ার আগেই আমি বর্ণমালা, ছড়া, বিভিন্ন সুরা ও দোয়া এসব শিখে ফেলি। তখন আমার মায়ের যুদ্ধের কেবল শুরু। তারপর সময়ের পরিক্রমায় আমি গ্রাম ছেড়ে শহরে এসে থিতু হই। প্রতিবার আমাকে শহরের বাসে তুলে বাসের হেলপারকে হাতে পায়ে ধরে আমার মায়ের সে কি কান্না! তার আদরের সন্তানকে যেন ঠিক জায়গায় সে নামিয়ে দেয়।
বাস ছেড়ে যাওয়া অবধি মা দাঁড়িয়ে থাকতেন, আর দুইহাতে চোখের পানি মুছতেন। সেই ত্যাগের মধ্যে নিশ্চয়ই দোয়া ছিল, স্বপ্ন ছিল– ছেলে একদিন বড় হবে, মানুষের মতো মানুষ হবে।
হ্যাঁ, এটাই আমার কাছে মায়ের একমাত্র চাওয়া ছিল, যেন আমি ভালো মানুষ হই। হিংসা নয়, বিনয়ই আমার ভাষা হয় যেন। সবসময় বলতেন, ‘অনেক টাকা-পয়সার দরকার নেই, সঠিক পথে থেকে সহজ সুন্দর জীবন যাপন করতে পারলেই হবে।’ আজ আল্লাহ আমাকে মায়ের সেই আদেশ পালনে আরেক ধাপ এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ দিলেন।
অনেক কথা মনে পড়ছে আজ। অনেকের কথা মনে পড়ছে আজ। ছোটবেলার এহসান স্যার, শাহজাহান স্যার, রাসেল স্যার, লিটন স্যার, নার্গিস ম্যাডাম, শেলী ম্যাডাম, সুইটি ম্যাডাম ও মাদরাসার বড় হুজুরের কথা খুব মনে পড়ছে। কলেজিয়েটের আবসার স্যার, বোরহান স্যার ও সুশান্ত স্যারের কথা মনে আসছে, যারা বিভিন্ন সময়ে আমাকে কম বেতনে প্রাইভেট পড়াতে হাসিমুখে রাজি হয়েছিলেন। স্কুলের মসজিদের মুয়াজ্জিনের কথা মনে পড়ছে, যিনি আমার অভিভাবকের মতো ছিলেন। হোস্টেলের তাজু ভাইয়ের কথা মনে পড়ছে, যিনি সকাল-দুপুর রাতে আমাকে রান্না করে খাইয়েছেন। এই মানুষগুলো আমাকে বিভিন্নভাবে তৈরি করেছেন আজকের আমির জন্য।
মনে পড়ছে আমার শ্রদ্ধেয় খালেক ভাইয়া, প্রিয় আঙ্কেল আর ছোট আব্বুর কথা– যারা আমাকে শহরে আনা-নেয়া করেছেন অনেক বছর। হোস্টেলের সময়, স্কুলের বড় মাঠ, আপনভোলা মেস– মনে পড়ছে সবকিছুর কথা। জীবনে চলার পথে এই মানুষ ও ঘটনাগুলো থেকে যে শিক্ষা লাভ করেছি, যে অভিজ্ঞতাপ্রাপ্ত হয়েছি তা আমাকে আরো শাণিত করেছে।
আজ আমার বলতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা নেই আমার আজকের এই অর্জন আমার পরিবারের জন্যই সম্ভব হয়েছে। আমার বাবাকে অল্প বয়সে হারালেও আমি জানি বাবার দোয়া সবসময় আমার মাথার উপর ছায়া হয়ে ছিল। আমার এমন কোনো অভাব নেই যা আমার ভাই দূর করেননি, না চাইতেই সব পেয়েছি আমি তার কাছে। মা ছিলেন বলে আমার কখনো দোয়ার কমতি হয়নি। মমতাময়ী মা সারাক্ষণ আমার জন্য জায়নামাজে কান্না করে গেছেন। পেয়েছি বোনের অপরিসীম স্নেহ-আদর। ভাবীর কাছে পেয়েছি ছোট ভাইয়ের মতো ব্যবহার। স্ত্রীর কাছে পেয়েছি অকৃত্রিম ভালোবাসা ও সাহস। আমি পরীক্ষা দিতে গেলে এই মানুষগুলো রোজা রাখতেন। নামাজে বসে সেজদায় আল্লাহর কাছে আমার সুস্থতা ভিক্ষা করতেন। বিয়ের পর পাওয়া দ্বিতীয় পরিবারে আমার গুরুজনেরাও সবসময় আমার জন্যে আল্লাহর দরবারে ফরিয়াদ জানিয়েছেন। আজ আমি ব্যর্থ হলে এই মানুষগুলোর দুঃখ হতো। মহান সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ তা চাননি।
দোয়া মানুষের ভাগ্য পরিবর্তন করতে পারে। আর এই দোয়ার কোনো কমতি আমার ছিল না। আমি যখন যেখানে গিয়েছি, থেকেছি, সেখান থেকেই দোয়ার ভাণ্ডার নিয়ে এসেছি। জেনেশুনে কোনদিন কাউকে কষ্ট দিতে চাইনি, চেষ্টা করেছি বড় ভাই, ছোট ভাই, বন্ধু, মেসের খালা ও রিকশাওয়ালা সবার সঙ্গে সুন্দর ব্যবহার করতে। বিনিময়ে আমার পাওনা হলো কাড়ি কাড়ি দোয়া। আজ এই দোয়াই আমাকে পৌঁছে দিলো আমার স্বপ্নের দ্বারপ্রান্তে।
আমার জীবনের গল্প আল্লাহ অশেষ রহমতের সঙ্গে লিখেছেন। নাহলে এভাবে সব মিলে যাবে কেন! আগস্টেই আমার বিয়ে, আগস্টেই আমার প্রথম চাকরি পাওয়া, আর আজ আগস্টেই আমার বিসিএস স্বপ্ন পূরণ। তাও আবার জীবনের প্রথম বিসিএসে বসেই পররাষ্ট্র ক্যাডারে প্রথম হওয়ার মতো অকল্পনীয় ফলাফল। আল্লাহর রহমত আর মানুষের দোয়া আমাকে শূন্য থেকে শিখরে নিয়ে আসল। এর জন্যে শুকরিয়া জানানোর ভাষা আমার জানা নেই।
আজ আমার অর্জনের মাধ্যমে জয়ী হলেন আমার মা, আমার ভাই। জীবনের বেশিরভাগ সময় কোনো সাধ আহ্লাদ পূরণ করতে না পারা আমার মায়ের জন্যে এটাই আমার সর্বোচ্চ উপহার। ‘ভাইকে এতো পড়িয়ে লাভ নেই’– মানুষের মুখে এমন কথা শুনেও কানে না তোলা বড় ভাইটার জন্য আমার পক্ষ থেকে এই উপহার। আজকের এই অর্জনের মাধ্যমে তাদের কষ্ট, ত্যাগ স্বীকারকেই মূলত আমি স্বীকৃতি দিলাম। আমার পরিবারকে সম্মানিত করতে পেরে, আমার বাবার নাম উজ্জ্বল করতে পেরে আজ আমি ধন্য।
এবার সময় দেশের জন্যে কিছু করার। মহান আল্লাহর দরবারে সেই তৌফিক এবং শক্তি আমাকে দেয়ার আর্জি রাখলাম।
শিক্ষাবার্তা ডট কম/এএইচএম/০৫/০৮/২০২৩
দেশ বিদেশের শিক্ষা, পড়ালেখা, ক্যারিয়ার সম্পর্কিত সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম, ছবি, ভিডিও প্রতিবেদন সবার আগে দেখতে চোখ রাখুন শিক্ষাবার্তায়
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল

