এইমাত্র পাওয়া

ঢিমেতালে চলছে পাঠ্যবই ছাপা

নিউজ ডেস্ক।।

পাঠ্যপুস্তক উৎসব না করার ঘোষণায় ঢিমেতালে চলছে ২০২১ শিক্ষাবর্ষের পাঠ্যবই ছাপানোর কার্যক্রম। বই ছাপানোর কাগজ সংকটে বন্ধ রয়েছে অনেক ছাপাখানা। জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) দাবি করছে কাগজের এ সংকট কৃত্রিম। যথাসময়ে পাঠ্যবই সরবরাহ না করলে জরিমানা গুনতে হবে কার্যাদেশপ্রাপ্ত ছাপাখানা মালিকদের। অন্যদিকে ছাপাখানা মালিকরা জানিয়েছেন, এনসিটিবি কর্তৃক নির্ধারিত কাগজ পাওয়া যাচ্ছে না।

জানা গেছে, পাঠ্যবই ছাপানোর টেন্ডারে প্রাক্কলিত দরের চেয়ে ৩৭ থেকে ৪৭ শতাংশ কমমূল্যে দরদাতাদের কার্যাদেশ দিয়েছে এনসিটিবি। অস্বাভাবিক কমমূল্যে পাঠ্যবই ছাপানোর কার্যাদেশ নিয়ে এখন বিপাকে পড়েছেন ছাপাখানা মালিকরা। রাজধানীর দক্ষিণ মাতুয়াইল মুসলিম নগর, কলেজ রোড এলাকার বড় ছাপাখানা আনন্দ প্রিন্টার্স লিমিডেটে গত ৮ নভেম্বর সরেজমিন দেখা যায় বই ছাপানোর যন্ত্র বন্ধ রেখে কর্মচারীরা অলস সময় পার করছেন।

একই এলাকায় আরেকটি বড় ছাপাখানা ব্রাইট প্রিন্টিং প্রেস লিমিডেট। এখানেও পুরো কারখানা কাগজশূন্য। পূর্বে ছাপানো কিছু বইয়ের বাঁধাইয়ের কাজ করছেন কর্মীরা। কলেজ রোডে আরেকটি বড় ছাপাখানা ফাহিম প্রিন্টিং অ্যান্ড পাবলিকেশন্স। এই কারখানায় বই ছাপানোর পাঁচটি ইউনিট রয়েছে। সবকটি বন্ধ। কর্মীরা জানান, ১২ থেকে ১৬ ঘণ্টা একটি ইউনিট চালু করলে দৈনিক ১৫ থেকে ২০ টন কাগজ প্রয়োজন। কিন্তু

সপ্তাহে তারা ১০ থেকে ১৫ টন কাগজ পেয়ে থাকেন পেপার মিল থেকে। এভাবে প্রায় ৩০-৪০টি ছাপাখানায় নিয়মিত বই উৎপাদন হচ্ছে না গত ৪ থেকে ৫ সপ্তাহ ধরে। ব্রাইট প্রিন্টিং প্রেস লিমিটেডের স্বত্বাধিকারী এসএম মহসিন আমাদের সময়কে জানান, এনসিটিবির টেন্ডারে দরপত্র দাখিলের সময় তারা পেপার মিলের দেওয়া একটি সম্ভাব্য দরে কাগজের মূল্য নির্ধারণ করে থাকেন। এখন পেপার মিলগুলো ওই দরে কাগজ সরবরাহ করছে না। আমরা বিভিন্ন পেপার মিলের সঙ্গে যোগাযোগ করছি। অন্য একটি পেপার মিল থেকে সামান্য কিছু কাগজ পাচ্ছি। তবে সেটি আমাদের জন্য পর্যাপ্ত নয়।

এ বিষয়ে ফাহিম প্রিন্টিং অ্যান্ড পাবলিকেশন্সের স্বত্বাধিকারী শামসুল ইসলাম বাহার জানান, এনসিটিবি নির্ধারিত মানের কাগজের দাম এখন আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে। আমরা চুক্তিমূল্যে কাগজ পাচ্ছি না। একটি পেপার মিল থেকে এখন অনেকগুলো ছাপাখানা কাগজ নিচ্ছে। কিন্তু তাদের উৎপাদন সক্ষমতা আমাদের প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। ফলে চাহিদা অনুযায়ী কাগজ কোনো ছাপাখানা পায় না। পেপার মিল কর্তৃপক্ষ রুটিন করে কিছু কিছু করে কাগজ সব ছাপাখানাকে দিচ্ছে। এতে কোনো ছাপাখানাই চাহিদার সব কাগজ একদিনে পাচ্ছে না।

এ বিষয়ে এনসিটিবির চেয়ারম্যান অধ্যাপক নারায়ণচন্দ্র সাহা আমাদের সময়কে বলেন, এক টাকার জিনিস যদি ৭০ পয়সায় দাবি করেন, এটি তো পাওয়া যাবে না। ছাপাখানা মালিকরা অস্বাভাবিক কমমূল্যে পাঠ্যবই ছাপানোর কাজ নিয়েছেন কিনা জানতে চাইলে চেয়ারম্যান জানান, দরপত্রে প্রাক্কলিত দরের চেয়ে ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ কমমূল্যে কাজ পেয়েছে।

অস্বাভাবিক কমমূল্যে দরপত্র দাখিল করলে পিপিআর অনুযায়ী দরপত্র আহ্বানকারী ব্যাখ্যা চাইতে পারেন- আপনারা এটি করেছেন কিনা জানতে চাইলে নারায়ণচন্দ্র সাহা বলেন, এটি আমরা সরকারের ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটিতে পাঠিয়েছিলাম। তারাই অনুমোদন দিয়েছে। এখন কাগজের কৃত্রিম সংকট তৈরি করেছেন ছাপাখানা মালিকরা। এটি এনসিটিবি দেখবে না, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পাঠ্যবই সরবরাহ না করলে জরিমানা গুনতে হবে।

২০২১ সালে প্রাক-প্রাথমিক থেকে নবম শ্রেণি পর্যন্ত প্রায় ৩৫ কোটি পাঠ্যবই ছাপানোর কার্যক্রম শুরু করেছে এনসিটিবি। এসব বই নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ছাপানো, বাঁধাই, জেলা-উপজেলায় পৌঁছানো নিয়ে আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। কাগজ সংকট, পা-ুলিপি না দেওয়া, সক্ষমতার অতিরিক্ত বইয়ের কাজ এক প্রতিষ্ঠানকে দেওয়ায় এমন আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। একই সঙ্গে অস্বাভাবিক কমমূল্যে কার্যাদেশ দেওয়ায় মানসম্মত কাগজে বই ছাপানো নিয়েও সন্দেহ রয়েছে।

গত ৯ নভেম্বর পর্যন্ত বইয়ের সরবরাহের তথ্য জানতে চাইলে এনসিটিবির বিতরণ নিয়ন্ত্রক জিয়াউল হক বলেন, এ মুহূর্তে সুনির্দিষ্ট তথ্য হিসাব করা হয়নি। তবে প্রায় দেড় কোটি বই তৈরি আছে যেগুলো জেলা-উপজেলায় পাঠানো যাবে। নিয়মিত বই বিভিন্ন জেলা-উপজেলায় সরবরাহ হচ্ছে।

কাগজ সংকটে নির্ধারিত সময়ে বই সরবরাহ নিয়ে আশঙ্কা আছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ছাপাখানা মালিকরা আমাদের বিষয়টি জানিয়েছেন। তারা কাগজ পাচ্ছেন না। অনেক পেপার মিল বন্ধ হয়ে গেছে। এখনো আশা করছি, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে বই সরবরাহ করতে পারব। এ ছাড়া ১ জানুয়ারি সব বই শিক্ষার্থীর হাতে দিতে হবে- এমন বাধ্যবাধকতা এখন নেই। এ বছর করোনা ভাইরাস সংক্রমণের কারণে পাঠ্যপুস্তক উৎসব হচ্ছে না। ৩০ ডিসেম্বরের মধ্যে শতভাগ না হলেও বেশিরভাগ বই পৌঁছে যাবে জেলা-উপজেলায়।

ছাপখানাগুলোয় কাগজ সংকট প্রসঙ্গে মুদ্রণশিল্প মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ মুদ্রণশিল্প সমিতির উপদেষ্টা তোফায়েল আহমেদ আমাদের সময়কে বলেন, প্রাক্কলিত দরের চেয়ে অস্বাভাবিক কমমূল্যের দরদাতাদের পাঠ্যবই ছাপাতে দিয়েছে এনসিটিবি। ফলে এই সমস্যার উদ্ভব হয়েছে। এই সময়ের মধ্যে যে পরিমাণ বই ছাপা শেষ হতো, সেটি হয়নি। আদৌ নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পাঠ্যবইয়ের কাজ শেষ হবে কিনা সেটি নিয়ে আশঙ্কা রয়েছে।

এনসিটিবি বিতরণ নিয়ন্ত্রণ অনুবিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালে ষষ্ঠ-নবম শ্রেণির ব্রেইল বইসহ (৯ হাজার ৫০৪) মোট ২৪ কোটি ৪১ লাখ ২২ হাজার ৩৪৯টি পাঠ্যবই ছাপানো হবে। দাখিলের ৩ কোটি ৮১ লাখ ৭২ হাজার ৬১৫টি, এবতেদায়ির ২ কোটি ৪১ লাখ ৫৯ হাজার ৬০টি এবং মাধ্যমিকের ১৭ কোটি ৬২ লাখ ৬৭ হাজার ৯১টি। এ ছাড়া প্রাইমারির প্রায় ১০ কোটি পাঠ্যবইও রয়েছে।

বর্তমান সরকারের গত ১০ বছরে ৩৩১ কোটি ৩৮ লাখ ৩ হাজার ৬১৬ কপি বই বিনামূল্যে বিতরণ করা হয়েছে। আর ২০২১ সালে ছাপানো হবে প্রায় ৩৫ কোটি বই। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড প্রতিবছর সরকারের বিশাল এ কর্মযজ্ঞ বাস্তবায়ন করছে, যা সারাবিশ্বে সুনাম বয়ে এনেছে।সুত্র  যুগান্তর

শিক্ষাবার্তা/এসজেড


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.