বর্তমান সময়ে সারা বিশ্বেই আতঙ্কের নাম হচ্ছে করোনা ভাইরাস। মানব দেহে অসুস্থতার কারণ হতে পারে এমন ভাইরাসগুলোর মধ্যে বিশাল একটি পরিবার এই করোনা ভাইরাস। অতি সম্প্রতি আবিস্কৃত হওয়া করোনা ভাইরাস দ্বারা সংক্রামক রোগ এর নাম COVID-19।
বাংলাদেশেও এই ভাইরাসে আক্রান্ত রোগী সনাক্ত হয়েছে। এর ফলে বাংলাদেশসহ সারা পৃথিবীতে অর্থনৈতিক সমস্যা দেখা দেবার সম্ভাবনা রয়েছে। যেহেতু এই সমস্যাটি বিশ্বব্যাপী তাই বৈদেশিক সাহয্যের আশাও করা যাবে না।
কাজে এই অর্থনৈতিক সমস্যা মোকাবেলায় নিজেই নিজেদের খাবারের সংস্থান করতে হবে। বাংলাদেশে দিন দিন চাষাবাদি জমির পরিমাণ কমে গেলেও শস্য উৎপাদনে সাফল্য দেখিয়েছ। দিন দিন কৃষির উন্নয়ন হচ্ছে।
পয়লা বৈশাল ১৪২৭ উপলক্ষ্যে জাতির উদ্দ্যেশে ভাষণ দেন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ।
এই ভাষণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা করোনা ভাইরাস মোকাবেলায় আমাদের করণীয় যাবতীয় আলোকপাত করেন। তিনি বাংলাদের কৃষির উৎপাদন বাড়ানো কথা বলেন। কোন জমি যাতে অনাবাদি না থাকে সেদিকে লক্ষ্য রাখতে বলেন।
বাংলাদেশ কৃষি প্রধান দেশ।
এদেশের অর্থনীতির সিংহভাগ দখল করে আছে কৃষি। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো অনুযায়ী এদেশে শতকরা ৭৫ ভাগ লোক গ্রামে বাস করে। বাংলাদেশের গ্রাম এলাকায় ৫৯.৮৪% লোকের এবং শহর এলাকায় ১০.৮১% লোকের কৃষিখামার রয়েছে। মোট দেশজ উৎপাদন তথা জিডিপিতে কৃষিখাতের অবদান ১৯.১% এবং কৃষিখাতের মাধ্যমে ৪৮.১% মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে।
২০১৮ সালের বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সমীক্ষার তথ্যমতে, এটি মোট শ্রমশক্তির ৪০.৬ ভাগ যোগান দিয়ে থাকে এবং দেশের জিডিপিতে এর অবদান ১৪.১০ শতাংশ। দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে যেমন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দারিদ্র দূরীকরণ, মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং খাদ্য নিরাপত্তায় এই খাতের ভূমিকা অনস্বীকার্য।
করোনা ভাইরাসে কারণে বাংলাদেশ আজ স্তবিত। ঘোষিত ও অঘোষিত লক ডাউন সারা বাংলাদেশ। করোনা ভাইরাস ছোয়াছে রোগ তাই রোগের চেয়ে আতংক বেশি। মসজিদগুলোতে জামাতে নামায পড়ার শর্ত দিয়েছে। লোকের সমাগম, মিলাদ মাহফিল, স্কুল কলেজ, অফিস ইত্যাদি আপাতত বন্ধ ঘোষণা করছে সরকার।
বাংলাদেশের এই ভয়াবহ অবস্থা এক সময় থাকবে না। কিন্তু খাদ্যে অভাব পড়তে পারে যদি এখনই কৃষির উপর বিশেষ নজর না দেয়। খাদ্য নিরাপত্তায় হবে বাংলাদেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ বিশ্বব্যাপী কৃষি উৎপাদন কমে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে। এই চ্যালঞ্জে মোকাবেলায় মাননীয় প্রধানমন্ত্রী কৃষি খাতে প্রণোদনার ঘোষণা দিয়েছেন।
করোনা ভাইরাসের মোকাবেলার সাথে সাথে কৃষি মন্ত্রণালয় কৃষির সাথে সংশ্লিষ্ঠ প্রতিষ্ঠান নিয়ে কৃষির সাথে সংশ্লিষ্ট অন্যান্য মন্ত্রনালয়ের সাথে সমন্বয় করে কৃষির আরো উন্নয়ন করা এবং বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের কাজের পরিধি কৃষিপণ্যের উন্নয়ন থেকে শুরু করে কৃষি, কৃষি প্রকৌশল ও কৃষি অর্থনীতির ওপর গবেষণাসহ কৃষিভিত্তিক শিল্পের উন্নয়ন পর্যন্ত বিস্তৃত। কৃষির সাথে সংশ্লিষ্ঠ প্রতিষ্ঠানসমুহ হলোঃ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (বিএআরসি),বাংলাদেশ ধান গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইন্সটিটিউট (বিনা), বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন, তুলা উন্নয়ন বোর্ড, বীজ প্রত্যয়ন সংস্থা, মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন কেন্দ্রে, কৃষি বাজারজাতকরণ বিভাগ, বাংলাদেশ ফলিত পুষ্টিবিদ্যা ও মানবসম্পদ উন্নয়ন বোর্ড, বাংলাদেশ কৃষি ইনিস্টটিউটসমুহ, বাংলাদেশ কৃষি কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয়সমূহ ।
বাংলাদেশের আবাদি জমির অনাবাদির অবস্থা কয়েকটি পত্রিকার প্রতিবেদন রিপোর্ট নিম্নে দেয়া হলোঃ
গত ২৫ শে জুন ২০১৯ তারিখে ‘দৈনিক প্রথম আলো’ র প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, “পাট ও আউশ ধান আবাদের ভরা মৌসুমেও যশোর ও কুষ্টিয়া অঞ্চলের ছয় জেলার ২ লাখ ১৫ হাজার ৩৬ হেক্টর চাষযোগ্য জমি অনাবাদি অবস্থায় পড়ে থাকছে। যা মোট চাষযোগ্য জমির প্রায় এক-তৃতীয়াংশ” ।
০৬ মার্চ ২০১৭ তারিখে মতলব দক্ষিণ (চাঁদপুর) প্রথম আলোর প্রতিনিধির প্রতিবেদন রিপোর্টে জানা যায়, “চাঁদপুরের মতলব উত্তর উপজেলায় মেঘনা-ধনাগোদা সেচ প্রকল্পের ৬ হাজার ৬০০ হেক্টর জমিতে কৃষিকাজ করা যাচ্ছে না। সেচের আওতায় না আসায় ২৮ বছরের বেশি সময় ধরে জমিগুলো অনাবাদি পড়ে আছে”।
৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ তারিখে ইনকিলাব এর রিপোর্ট জানা যায়, “ঝিনাইগাতীতে সেচ সুবিধার অভাবে উপজেলার ৭টি ইউনিয়নের মধ্যে ৫ ইউনিয়নে ফি-বছর পতিত থাকছে কমপক্ষে তিন হাজার হেক্টর জমি। ফলে উপজেলায় কমপক্ষে ১২ হাজার মেট্রিক টন খাদ্য উৎপাদন কম হচ্ছে ফি-বছর।
জানা যায়, স্থানীয় কৃষি বিভাগ এবং বিএডিসির পক্ষ থেকে অনাবাদি এ সব জমি সেচ সুবিধার আওতায় আনার জন্য বারবার সংশ্লিষ্ট কতৃপক্ষকে জানানোর পরও সংশ্লিষ্ট উর্ধ্বতন কতৃপক্ষ এ ব্যাপারে কোন ব্যবস্থা গ্রহণ না করায় উপজেলাবাসী প্রতি বছর বাড়তি ১২ হাজার মেট্রিক টন খাদ্য উৎপাদন থেকে বঞ্চিত হচ্ছে”।
বাংলাদশের চট্রগ্রাম, পার্বত্য চট্রগ্রাম, সিলেট, ময়মনসিং এলাকা, পঞ্চগড়,দিনাজপুর প্রভৃতি অঞ্চলে কৃষি বনায়ন বৃদ্ধি করে কৃষির উৎপাদন এবং বনের চাহিদাও পুরণ করা সম্ভব।
করোনা ভাইরাসের চিকিৎসা ও প্রতিরোধের সাথে সাথে এবার প্রস্তুত হতে হবে কৃষির উৎপাদন বৃদ্ধি। এক্ষেত্রে কৃষক থেকে সচিব পর্যন্ত সবাই একযোগে কাজে নেমে পড়তে হবে। কোথায় অনাবাদি জমি রাখা যাবে না। অনাবাদি জমির মালিককে শাস্তি বা জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে। এক্ষেত্রে উপজেলা কৃষিকর্মকর্তাকে নির্বাহী ক্ষমতা দিলে ভাল হয়। এদেশে এক সময় ইংরেজদের প্রয়োজনে জোর করে নীল চাষ করিয়েছে। এবার নিজেদের প্রয়োজনে খাদ্য নিরাপত্তার জন্যে নিজেদের জমি চাষ করতে হবে।
নভেম্বর ২০১০ এ ৩৯তম জাতীয় সমবায় দিবস উপলক্ষে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে আয়োজিত আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন,
“এক ইঞ্চি জমিও অনাবাদি রাখা যাবে না”।
দেশের ক্রান্তিকালে একই কথা আবার ২০২০ সালে এপ্রিল মাসে বলতে হয়েছে। তবে এবার কৃষি ক্ষেত্রে প্রণোদনা দিয়ে গুরত্বের সহিত বলেছেন। এবার প্রধানমন্ত্রীর এই কথা অক্ষরে অক্ষরে মানতে হবে অন্যথায় অস্ত্রবিহীন এই জীবনযুদ্ধে আমরা পরাজিত হব।
লেখক- মোহাম্মদ শাহজামান শুভ
সহকারি শিক্ষক (কৃষি শিক্ষা)
বাতাকান্দি সরকার সাহেব আলি আবুল হোসেন মেমোরিয়াল উচ্চ বিদ্যালয়
তিতাস, কুমিল্লা
ইমেইলঃmshazaman@yahoo.com
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
