এইমাত্র পাওয়া

পহেলা বৈশাখ করোনায় আক্রান্ত

 পহেলা বৈশাখ! বাংলা নববর্ষ!! বাংলা নববর্ষের শুভেচ্ছা আজ ক্ষত-বিক্ষত!!! সারাবিশ্ব আজ করোনা ভাইরাসের থাবায় থমকে দাড়িয়েছে। জীবন-মৃত্যুর মাঝে দাড়িয়ে সারা পৃথিবীর মানুষ প্রতিএমুহূর্তে মৃত্যুর প্রহর গুণছে। সারা পৃথিবী আজ লাশের স্যাঁতস্যাঁতে গন্ধে ভরেগেছে। হাসপাতালগুলোতে করোনা রোগীর সংখ্যা বাড়ছে, কর্মহীন মানুষের সংখ্যা বাড়ছে, অনাহারী মানুষের সংখ্যা বাড়ছে, মৃত্যর মিছিলের সংখ্যা বাড়ছে, জিনিসপত্রের দাম বাড়ছে, মুনাফাখোর ও মজুদদারের সংখ্যা বাড়ছে, কালোবাজারি ও সুদখোরের সংখা বাড়ছে এবং আরো কত অনৈতিকতা বাড়ছে তার কোন ইয়াত্তা আছে? তারপরও মানুষের আজ খাদ্যর সঙ্কট হতনা যদি মানুষরূপী অমানুষগুলো মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দেয়া চাল চুরির মহোৎসব না করতো।

মানুষ না খেয়ে আছে, পশু-পাখির খাবার নাই, পাখিগুলো না খেতে পেরে কিচিরমিচির করছে, কুকুরগুলো খাবার না পেয়ে ঘেউ ঘেউ করছে। শ্রমিকের কাজ নাই, পকেটে টাকা নাই, ওষুধ কেনার সামর্থ্য নাই। ওষুধ কেনার সার্থ নাই তাই সর্দিকাশি, ঠাণ্ডায় কুপোকাত হচ্ছে, আর তাই দেখে মানুষ গ্রাম ছেড়ে পালাচ্ছে। স্ত্রী পালাচ্ছে, স্বামী পালাচ্ছে, সন্তান পালাচ্ছে, গ্রামের মানুষ পালাচ্ছে ; শুধু গর্ভধারিণী মা মাথার কাছে বসে অঝোরে কাঁদছে। সবাই যখন করোনার ভয়ে পালাচ্ছে, মা তখন মহান আল্লাহর দরাবরে দু’হাত তুলে মুনাজাত করছে- “হে আল্লাহ্ তুমি আমাকে নিয়ে যাও বিনিময়ে আমার সন্তানকে সুস্থ করে দাও”।

জীবনে অনেক মহামারি দেখেছি, বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দা দেখেছি, বন্যা দেখেছি, টর্নেডো দেখেছি, ম্যালেরিয়া দেখেছি, ডেঙ্গু দেখেছি, কলেরা দেখেছি, টাইফয়েড দেখেছি, ক্যান্সার দেখেছি, পক্স দেখেছি কিন্তু রোগ দেখে কাউকে পালাতে দেখিনি। রোগকে ভয় পেতে দেখেছি কিন্তু রোগী রেখে পালাতে দেখিনি। যে মানুষটি বিদেশে থেকে খেয়ে না খেয়ে, অমানুষিক কষ্ট সহ্য করে পরিবার-পরিজনের সুখের জন্য অর্থ দিয়েছে, বিত্তবৈভবসহ কি না দিয়েছে; সে মানুষটির শুভাগমণে প্রিয়জনের দরজা বন্ধ করতে দেখেছি, কিংবা আসার আগেই বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে যেতে দেখলাম।

স্কুল বন্ধ, কলেজ বন্ধ, বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ, পরীক্ষা বন্ধ এমনকি বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীদরে বেতনের একাংশ বন্ধ। শিক্ষকদের আর্থিক বৈষম্য থাকলেও সরকারি নীতিমালা মেনে বৈধভাবে অতিরিক্ত আয়ের পথ আজ রুদ্ধ। সমাজের মধ্যবিত্ত অনেকের মত শিক্ষক-কর্মচারীরাও মানুষের কাছে হাত পাততে পারে না, লাইনে দাড়িয়ে সাহায্য নিতে পারে না। এহেন পরিস্থিতে বাংলা নববর্ষের শুভেচ্ছা না জানাতে পেরে আমিও আজ ভারাক্রান্ত। কেবলই মনে হচ্ছে- এর শেষ কোথায়? আরো কোন কঠিন পরিস্থিতির মোকাবেলা করতে হবে নাতো! যদি করোনা ভাইরাসের প্রতিষেধক আবিস্কারে বিলম্ব হয়! মৃ্ত্যুর মিছিল যদি আরো বড় হয়! চিকিৎসা সেবা দিতে দিতে ডাক্তারগুলোও যদি শেষ হয়ে যায়!

এপর্যন্ত যতজন আক্রান্ত হয়েছে, তার শতকরা প্রায় ৫ জন মৃত্যুবরণ করেছে এবং প্রায় ৫ জন সুস্থ্য হয়েছে। ডাক্তাররাও আক্রান্ত হচ্ছে; মৃত্যুবরণ করছে। এখনও পর্যন্ত যতটুকু ভাল কাজ হয়েছে তা ডাক্তারদের জন্যই হয়েছে। তারপরও এক শ্রেণির মানুষ ডাক্তারদের বিষেদাগার করে ডাক্তারদের মনে বিষবাস্প ঢেলে প্রকারান্তরে জনগণ থেকে ডাক্তারদের বিচ্ছিন্ন করার অপচেষ্টা চালাচ্ছে। কারণ যারা বিষেদাগার করছে তাদের হয়তো এদেশের ডাক্তারদের চিকিৎসা সেবা নিতে হয় না। ভুলে গেলে চলবে না সমাজের সকল মানুষ একরকম নয় না। ডাক্তার হলেও তাঁরা মানুষ।

প্রকৃতিগতভাবেই সাহসী, দূর্বল চিত্তের, শান্ত, বদমেজাজি, পরোপকরী, নিজের জীবন বাজী রাখার মানসিকতাসম্পন্ন ইত্যাদি বিভিন্ন প্রকৃতির হয়ে থাকে। একবার ভেবে দেখুন আমরা যে ডাক্তার, শিক্ষক, বিসিএস ক্যাডারসহ অনেক পেশার পেশাজীবীদের সমালোচনা করছি; দু’চারটি ব্যতিক্রম ছাড়া তাঁরা কিন্তু ক্লাসের সবচয়ে মেধাবী ও নম্র-ভদ্র ছিল। দু’-চার জনের জন্য যে কোন পেশার সবাইকে ঢালাওভাবে দোষারোপ করা কি সমীচিন?

এর জন্য সাময়িক বাহবা পাওয়া গেলেও পরিণাম ভাল হয়? কথায় কথায় বিদেশ থেকে ডাক্তার ও শিক্ষক আনার হুমকি কিসের অালামত বহন করে? বরং এখনও সময় আছে ডাক্তার ও শিক্ষকদের পেছনে বিনিয়োগ বাড়িয়ে যোগ্য করে গড়ে তুলতে হবে। কারণ অতীতের মহামারী ও বর্তমান করোনা ভাইরাসের বিপর্যয়ই শেষ নয়, ভবিষ্যতের মহামারীর জন্যও আমাদের তৈরি হতে হবে। সুযোগ্য ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, ব্যারিস্টার, রাজনীতিবিদ ইত্যাদি তৈরি করতে হলেও আগে দরকার সুযোগ্য শিক্ষক। তা না হলে চাল চোরসহ অযোগ্যদের সংখ্যা দিন দিন বাড়তেই থাকবে।।

লেখক- অধ্যক্ষ মোঃ বজলুর রহমান মিয়া
সভাপতি
বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতি (বিটিএ)


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.