আল আমিন হোসেন মৃধা, ঢাকা: মিনিস্ট্রি অডিটের নামে এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের এক মাসের এমপিও’র অংশ পুরোটাই আদায় করার অভিযোগ নতুন নয় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধদিপ্তরের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে। এসব রুখতে দপ্তরটিতে দুদকের হানা, গোয়েন্দা নজরদারি, শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে সতর্কতা জারি এমন সব উদ্যোগ নিলেও কার্যত আগেও যা এখনও তা এমন বাস্তবতা। পতিত হাসিনা সরকার পতন হয়েছে। জনতার মত কর্মরত শিক্ষক-কর্মচারীদেরও আশা ছিল নয়া বন্দোবস্তের। তবে অনেক ক্ষেত্রে নয়া বন্দোবস্তের আশা জাগালেও সেই পুরোনো রীতিতেই চলছে পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তর। পাঁচ আগস্টের পর শিক্ষা সেক্টরের প্রথম পদায়ন মেলে এই দপ্তরটির পরিচালক পদে। পদায়ন পান বিসিএস সাধারণ শিক্ষার ১৪ ব্যাচের কর্মকর্তা ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক কাজী আবু কাইয়ুম শিশির। দায়িত্ব পেয়েই যেন পেয়ে যান আলাদিনের চেরাগ। কোটি কোটি টাকা মিনিস্ট্রি অডিটের নামে দপ্তরটি থেকে ঘুস আদায় করেন তিনি, ব্যাপক হারে করেন ‘ট্যুর প্রোগ্রাম বিক্রি’। ব্যাপক সমালোচনার মুখে মাত্র তিন মাসের মাথায় তাকে বদলি করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। তার বিরুদ্ধে ডিআইএ থেকে ঘুস বাণিজ্যের বিষয়ে তদন্ত করছে দুদক। এরপর বিসিএস ১৪ ব্যাচের কর্মকর্তা হিসাববিজ্ঞানের অধ্যাপক সাইফুল ইসলাম পদায়ন পান দপ্তরটিতে। সম্প্রতি তিনি অবসরে গেছেন। তবে অবসরে গেলেও দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কর্মরত ৬৭৮ জন জাল সনদধারী শিক্ষককে পুনর্বহালের বন্দোবস্ত করার চেষ্টা করেছেন তিনি। আদায় করেছেন কয়েক কোটি টাকা। ডিআইএর নিয়োগ পরীক্ষা থেকেও কামিয়েছেন কোটি টাকার কম নয়। তবে সেই নিয়োগ স্থগিত করে তদন্ত করেছে খোদ শিক্ষা মন্ত্রণালয়। এছাড়াও পরিদর্শন ও নিরীক্ষার নামে ট্যুর বিক্রি করে লাখ লাখ টাকা আদায় করেছেন এই অধ্যাপক। দপ্তরটির শিক্ষা পরিদর্শক ও অডিট কর্মকর্তাদের করা নিরীক্ষা ও পরিদর্শন প্রতিবেদনে আপত্তিগুলোকে নিজে হাতে কেটে দিয়ে প্রতিবেদন দাখিল করতে কর্মকর্তাদের বাধ্য করেছেন। আর্থিক অনিয়ম ও জালিয়াতি করে নিয়োগ পাওয়া শিক্ষকদের বাঁচাতে তাদের থেকে মোটা অংকের অর্থ নিয়ে কোন আপত্তি দিতে দেননি। পাঁচ আগস্টের আগে মিনিস্ট্রি অডিটে আতঙ্ক ছিল সরেজমিনে মিনিস্ট্রি অডিট করা কর্মকর্তারা। তবে নয়া বন্দোবস্তে অনেকটা পাল্টিয়েছে ডিআইএ’র গতিধারায় এখন আতঙ্ক খোদ পরিচালক, উপ-পরিচালকরা।
ডিআইএ’র দুই সাবেক পরিচালক অধ্যাপক শিশির এবং অধ্যাপক সাইফুলের পর দপ্তরটির আরেক আতঙ্কের নাম উপ-পরিচালক মো: ওয়াজকুরনী। যিনি বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারের ইতিহাস বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক। আওয়ামী আমলে আওয়ামী নেতাদের সুবিধা নিয়ে টানা সাত বছর জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডে কর্মরত থেকে নিজেকে আওয়ামী আমলের বঞ্চিত কর্মকর্তার কাতারে দেখিয়ে বাগিয়েছেন পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক পদ। তার আগেও তিনি টানা পাঁচ বছর ছিলেন সরকারি তিতুমীর কলেজে। বড় পদ মানেই মোটা টাকা। সাবেক পরিচালক অধ্যাপক সাইফুল ইসলামের যোগ্য উত্তসূরি তিনি। কিভাবে ফাইল আটকে অর্থ কামানো যায় তা সাইফুল ইসলামের থেকে রপ্ত করেছেন আওয়ামী আমলের প্রায় পুরো সময় ঢাকায় কর্মজীবন কাটানো এই কর্মকর্তা। বিভিন্ন স্কুল কলেজের মিনিস্ট্রি অডিট বা তদন্ত করে শিক্ষা পরিদর্শক- অডিট কর্মকর্তারা প্রতিবেদন জমা দিলেও সেই প্রতিবেদন ফাইল বন্দি করে অর্থ না পেলে তা ছাড়েন না তিনি। কিছু ফাইল পড়ে আছে দশ মাস, কিছু ফাইল আট মাস এমন অসংখ্য ফাইল আটকে রেখেছেন এই পাঁচ আগস্টের পরে ভোল পাল্টানো এই কর্মকর্তা।
শিক্ষাবার্তা’র অনুসন্ধানে জানা গেছে, আওয়ামী আমলের শেষ দিকে রাজধানীর মতিঝিলের টিএন্ডটি কলেজের অধ্যক্ষ নিয়োগ হয় পুরো জালিয়াতি করে। বিষয়টি নিয়ে “কোনো নিয়মই মানা হয়নি টি এন্ড টি কলেজের অধ্যক্ষ নিয়োগে তবুও এমপিওভুক্তি” শিরোনামে সে সময় শিক্ষাবার্তা’য় সংবাদ প্রকাশিত হয়। এই নিয়োগ জালিয়াতির অভিযোগে কলেজটির শিক্ষক-কর্মচারীদের করা অভিযোগের ভিত্তিতে গত ১৯ নভেম্বর ২০২৪ খ্রিষ্টাব্দ তারিখে তদন্ত ও সাধারণ পরিদর্শন করে ডিআইএ। তবে তদন্তের প্রায় দশ মাস অতিবাহিত হলেও সেই তদন্ত প্রতিবেদন নিজের কাছে কুক্ষিগত করে রেখেছেন ঢাকা বিভাগের দায়িত্বে থাকা ডিডি মো: ওয়াজকুরনী। তদন্তের এই ফাইল থেকে টাকা না পাওয়ায় বছর হতে গেলেও ফাইল তার দপ্তর থেকে ছেড়ে দেওয়ার কোন ভ্রূক্ষেপ নেই তার।
রাজধানীর ফার্মগেটের ইন্দিরা রোডে অবস্থিত তেজগাঁও কলেজ। কলেজটিতে গত বছরের অক্টোবর মাসের ৩০ তারিখ নিরীক্ষা ও পরিদর্শন করে ডিআইএ। এই পরিদর্শনে দপ্তরটির দুইজন উপ-পরিচালক, একজন সহকারি পরিদর্শক ও দুইজন অডিট কর্মকর্তা নিরীক্ষা ও পরিদর্শন করে প্রতিবেদন জমা দেন। আর এক মাস পার হলেই প্রতিষ্ঠানটির পরিদর্শন করার এক বছর পূর্ণ হবে। অথচ আজও সেই প্রতিবেদন নিজের কাছেই কুক্ষিগত করে রেখেছেন ওয়াজকুরনী। অর্থ না পেলে তার কাছ থেকে পরিচালকের দপ্তরে যাবে না এই ফাইল।
রাজধানীর মোহাম্মদপুর মহিলা কলেজের অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে নারী কেলেংকারী, আর্থিক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে ডিআইএ থেকে তদন্ত করা হয় গত মার্চ মাসের মাঝামাঝিতে। তবে তদন্ত হয়েছে প্রতিবেদন সাবমিট হয়েছে কিন্তু সেই প্রতিবেদন আটকে রেখেছেন ওয়াজকুরনী। উদ্দেশ্য ঐ একটাই অর্থ। একইভাবে রাজধানীর মিরপুর গার্লস আইডিয়াল ল্যাবরেটরি ইনস্টিটিউট, মিরপুর কলেজ, কেরানীগঞ্জের জিনজিরা পীর মোহাম্মদ পাইলট স্কুল এন্ড কলেজ, রাজধানীর মালেকাবানু আদর্শ বিদ্যানিকেতন সহ একাধিক প্রতিষ্ঠানের প্রতিবেদনকে ফাইলবন্দি করে নিজের কাছে রেখেছেন তিনি। শুধু এসব প্রতিষ্ঠান থেকে অর্থ না পেয়ে তদন্ত ফাইল আটকিয়েই রাখেননি বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারের এই কর্মকর্তা রাজধানীর মিরপুরের একটি বালিকা বিদ্যালয় থেকে প্রায় ২০ লাখ টাকা নিয়েও সেই প্রতিবেদনের ফাইল আটকে রাখার অভিযোগ তার বিরুদ্ধে। শুধু এগুলো নয় সম্প্রতি টাঙ্গাইলের একটি ফাইল থেকেও অর্থ আদায় করেছেন তিনি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা শিক্ষাবার্তা’কে বলেন, আমরা তদন্ত করে কিংবা সাধারণ পরিদর্শন ও নিরীক্ষা করে যথা সময়ে প্রতিবেদন সাবমিট করলেও এসব প্রতিবেদনের অনুকূলে অর্থ না পাওয়ায় তিনি এগুলো নিজের কাছে ফাইল বন্দি করে রেখেছেন। যেহেতু তিনি উপ-পরিচালক এখানে আমাদের কিছু বলার নেই। এসব প্রতিষ্ঠানের অভিযোগকারী কিংবা সাধারণ শিক্ষকরা নিয়মিত আমাদেরকে ফোন করেন প্রতিবেদন কবে চূড়ান্ত হবে তা জানতে। প্রতিবারের মতই আমাদের জবাব ফাইল ছেড়েছি উপরে আছে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয় বলছে, পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তর কর্তৃক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পরিদর্শন ও নিরীক্ষা কার্যক্রম সম্পাদনের দীর্ঘ সময় পরে প্রতিবেদন প্রেরণ করার কারণে সুপারিশসমূহ বাস্তবায়ন বিঘ্নিত হচ্ছে। প্রতিবেদন প্রেরণে দীর্ঘসূত্রিতার জন্য অনেক ক্ষেত্রে প্রতিবেদনের আর্থিক অনিয়ম সংশ্লিষ্ট সুপারিশসমূহ বাস্তবায়নও বিলম্ব হচ্ছে। ফলে বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রশাসনিক ও আর্থিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না। পরিদর্শন ও নিরীক্ষা কার্যক্রমের কার্যকারিতা প্রতিষ্ঠার জন্য যথাসময়ে মন্ত্রণালয়ে প্রতিবেদন প্রেরণ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। সে লক্ষে পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের পরিদর্শন ও নিরীক্ষা প্রতিবেদন প্রেরণে দীর্ঘসূত্রিতা হ্রাসের লক্ষ্যে গত ১৭ এপ্রিল ২০২৫ একগুচ্ছ নির্দেশনা প্রদান করে বিজ্ঞপ্তি জারি করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা শাখা। নির্দেশনায় বলা হয়, “পরিদর্শন ও নিরীক্ষা কার্যক্রম শেষে পরবর্তী ১৫ (পনের) কর্ম দিবসের মধ্যে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা/দলের সদস্যদের পরিদর্শন ও নিরীক্ষা প্রতিবেদন পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরে জমা দিতে হবে। প্রতিবেদন জমা হওয়ার পরে নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে এ বিভাগে এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরে প্রেরণ করতে হবে। পরিদর্শন ও নিরীক্ষা সংশ্লিষ্ট কোন কর্মকর্তা/কর্মচারীর নিকট প্রতিবেদন পাওনা/বকেয়া থাকলে উক্ত প্রতিবেদন জমা না দেয়া পর্যন্ত তাকে পরবর্তী পরিদর্শন ও নিরীক্ষা কাজে অন্তর্ভুক্ত করা যাবেনা”।
পরিদর্শন প্রতিবেদনের বিষয় নিষ্পত্তিকরণের সময়সীমাতে বলা আছে, প্রতিবেদনের বিষয় নিষ্পত্তিকরণে শাখার দায়িত্বরত কর্মকর্তার সময় সর্বোচ্চ দুই দিন। অথচ ঢাকা বিভাগের দায়িত্বে থাকা উপ-পরিচালক মো: ওয়াজকুরনী কোনো প্রতিবেদন ১০ মাস, কোনোটা ৯ মাস করে একাধিক প্রতিবেদন নিজের কাছে কুক্ষিগত করে রেখেছেন যা মন্ত্রণালয়ের আইনকে বৃদ্ধাঙ্গলী দেখানো বলছেন সংশ্লিষ্টরা।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে উপ-পরিচালক মো: ওয়াজকুরনীর মুঠোফোনে কল করেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এ বিষয়ে পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের পরিচালক (রুটিন দায়িত্বে) অধ্যাপক খন্দকার মাহফুজুল আলম শিক্ষাবার্তা’কে বলেন, ফাইল দ্রুত ফরওয়ার্ড করার বিষয়ে আমিও তাকে বেশ কয়েকবার তাগাদা দিয়েছে। বিভিন্ন কোয়ারি (চাহিদা পত্র) আছে তাই তিনি দেড়িতে দিচ্ছেন বলে আমাকে জানিয়েছেন। তবে আর্থিকভাবে লাভবান হবার জন্য ফাইল আটকে রেখেছেন এ জাতীয় কোন তথ্য আমার কাছে নেই। কেউ আমাকে মৌখিক কিংবা লিখিতভাবে জানায় নাই। লিখিত অভিযোগ পেলে অবশ্যই তা আমলে নিয়ে উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সাথে আলাপ করে তদন্তের আলোকে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
জানতে চাইলে বিসিএস জেনারেল এডুকেশন অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক ড. মাসুন রানা শিক্ষাবার্তা’কে বলেন, আওয়ামী আমলে শিক্ষার বিভিন্ন দপ্তরে যারা কর্মরত থেকে নানা অনিয়মে জড়িত ছিল পাঁচ আগস্টের পরে আমরা দেখেছি তারা নিজেদেরকে আওয়ামী বঞ্চিত কর্মকর্তা সাজিয়ে পদায়ন নিয়ে সেই আওয়ামী আমলের মতই একই কায়দায় নানা অনিয়মে জড়িত রয়েছে। এ বিষয়ে আমরা নিন্দা জানায়। যারা আওয়ামী লীগের আমলে সর্বোচ্চ সুবিধা নিয়ে অনিয়ম করেছেন তাদের বিরুদ্ধে মন্ত্রণালয়ের নজরদারি বাড়াতে আহ্বান জানাই এবং একই সাথে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ারও দাবি জানাই।
শিক্ষাবার্তা ডটকম/এএইচএম
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
