এইমাত্র পাওয়া

‘খালেদা জিয়া’কে পুঁজি করে চাঁদাবাজি করা শিশির হতে চান এনসিটিবির চেয়ারম্যান

আল আমিন হোসেন মৃধা, ঢাকা: শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তা হয়েও আওয়ামী ছত্রছায়ায় খাদ্য অধিদপ্তরের ১ নম্বর ঠিকাদার হয়ে ধুমিয়ে ব্যবসা করা মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের মনিটরিং এন্ড ইভালুয়েশন উইংয়ের পরিচালক অধ্যাপক কাজী কাইয়ুম শিশির পাঁচ আগস্টের পর গিরিগিটির মত রঙ বদলিয়ে জাতীয়তাবাদি দলের একজন আওয়ামী আমলের বঞ্চিত কর্মকর্তা সেজে জুলাই অভ্যূত্থানের মাসেই অর্থ্যাৎ আগস্টেই পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের পরিচালক পদ বাগিয়ে নেন। ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা পালানোর সপ্তাহ খানেক পরেই নিজেকে বিএনপির লোক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে সাবেক একাধিকবারের সফল প্রধানমন্ত্রী বিএনপি’র চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার অনুমতি না নিয়ে (তার পরিবারের কারো অনুমতি নেওয়া হয়নি) “Khaleda Zia: A Biography of Democracy” নামক গ্রন্থটি রচনা করে গ্রন্থটির এক লাখ কপি ছাপানোর ব্যয় এবং মোড়ক উম্মোচন অনুষ্ঠানের খরচের কথা উল্লেখ করে চিঠি দিয়ে বিভিন্ন ব্যক্তি, কর্মকর্তা ও ব্যবসায়ীর কাছ থেকে চাঁদা উত্তোলন করা অধ্যাপক কাজী কাইয়ুম শিশির এবার জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের শূন্য থাকা চেয়ারম্যান পদ পেতে জোর তদবির চালাচ্ছেন, ব্যাগ ভর্তি টাকা নিয়ে ঘুরছেন বিভিন্ন অসাধু কর্মকর্তার দরবারে। বই লিখে চাঁদাবাজি করা এই অধ্যাপক দায়িত্ব নিতে চান পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের। 

“Khaleda Zia: A Biography of Democracy” গ্রন্থটি লিখে চাঁদাবাজি, শিশিরের বিরুদ্ধে রমনা থানায় চাঁদাবাজির মামলা

জীবিত ব্যক্তির আত্মজীবনী লেখার জন্য অব্যশই সেই ব্যক্তির অনুমতি নেওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে, তিনি যদি অসুস্থ থাকেন বা কথা বলার মত শারীরিক পরিস্থিতি না থাকে তাহলে অবশ্যই তার পরিবারের সদস্যদের অনুমতি নিতে হবে। ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে পালালে ৬ আগস্ট মুক্তি পান বেগম খালেদা জিয়া। সেসময় তিনি শারীরিকভাবে এতটাই অসুস্থ ছিলেন দলের দুই একজন সিনিয়র নেতা এবং পরিবার ছাড়া কারও সাথে সাক্ষাৎ করেননি। তার আগে তিনি ৮ই ফেব্রুয়ারি ২০১৮ সাল থেকে আওয়ামী সরকারের রোশানলে পরে কারাবরণ করেন। আগস্টের ২য় সপ্তাহে “Khaleda Zia: A Biography of Democracy” গ্রন্থটি লেখেন অধ্যাপক কাজী কাইয়ুম শিশির। খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক দপ্তর এবং দুই জন জ্যেষ্ঠ নেতা নিশ্চিত করেছেন এই আত্মজীবনী লেখার কোনো অনুমতি নেওয়া হয়নি। না চেয়ারপার্সনের অনুমতি, না তার পরিবারের কোনো সদস্যের অনুমতি। এটা সুস্পষ্ট প্রতারণা ও ব্লাকমেইলিং করার শামিল।

২৩ আগস্ট ২০২৪ খ্রিস্টাব্দে ঢাকার অফিসার্স ক্লাবে Biography of Democracy” গ্রন্থটির মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানের জন্য এবং বইটির রঙিন এক  লাখ কপি বই মুদ্রণে এক কোটি টাকা খরচ হবে জানিয়ে বিভিন্ন কর্মকর্তা ও ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানের মালিকদের অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাক নামে চিঠি দেন অধ্যাপক কাইয়ুম শিশির। চিঠিটে উল্লেখ করা হয়,  “অফিসার্স ক্লার ঢাকায় প্রফেসর কাজী মো. আবু কাইয়ুম (শিশির) রচিত Khaleda Zia: A Blography of Democracy গ্রন্থটির আনুষ্ঠানিক মোড়ক উন্মোচন ও গ্রন্থের উপর আলোচনা অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এ রঙিন বইটি এক লক্ষ কপি ছাপানো হবে এবং অনুষ্ঠানটি সফল করার জন্য যে অর্থের প্রয়োজন তা আমাদের কাছে নেই। আপনার প্রতিষ্ঠান থেকে কর্পোরেট সোস্যাল রেসপন্সিবিলিটি ফাণ্ড থেকে বা অন্য কোন উৎস থেকে আমাদেরকে অনুদান/স্পন্সর করলে বাধিত হবো। বি: দ্রঃ চেক/পে-অর্ডার ছাড়া নগদে অর্থ গ্রহণযোগ্য নয়।”

এমনই একটি চিঠি পান রাজধানীর রমনা থানাধীন সিদ্ধেশ্বরীর বাসিন্দা ব্যবসায়ী মোঃ জুবায়েদ আহেম্মদ দীপ। পরবর্তীতে মোঃ জুবায়েদ আহেম্মদ দীপ বিষয়টি জানার জন্য প্রফেসর আব্দুর রাজ্জাক এর উল্লেখিত মোবাইলে নাম্বারে ফোন দিলে তিনি সরাসরি দেখা করতে চান। ২০/০৮/২০২৪ইং তারিখ রাজধানীর সেগুনবাগিচা ভোজ রেষ্টুরেন্টে ১নং আসামির সাথে দেখা করলে প্রফেসর আব্দুর রাজ্জাক তাকে জানান, শিক্ষকদের নেতা প্রফেসর কাজী মোঃ আবু কাইয়ুম (শিশির) রচিত খালেদা জিয়ার জীবনির উপর “Khaleda Zia, A Biography of Democracy” নামক গ্রন্থটির মোড়ক উন্মোচন করবেন আগামী ২৩/০৮/২০২৪ইং তারিখ অফিসার্স ক্লাব ঢাকায়, উক্ত অনুষ্ঠানে কয়েক শত অতিথি থাকবেন তাই অনুষ্ঠানে আমাদের এক কোটি টাকার উপরে বাজেট, উক্ত অনুষ্ঠানটি সম্পন্ন করার জন্য আমাদেরকে আপনি পাঁচ লক্ষ টাকা নগদ দিবেন। অন্যথায় আপনার ব্যবসা-বানিজ্য বন্ধ করে দেয়া হবে। তখন আমি জানতে চাইলাম আপনারা আমার কাছে যে চিঠি পাঠিয়েছেন সেখানে বললেন চেক অথবা পে-অর্ডার ছাড়া নগদ অর্থ গ্রহনযোগ্য নয়। সেখানে আপনি কেন নগদ টাকা চাচ্ছেন, উত্তরে প্রফেসর আব্দুর রাজ্জাক দীপকে জানান প্রফেসর কাজী মোঃ আবু কাইয়ুম (শিশির) আপনার কাছে নগদ টাকা চাওয়ার জন্য বলেছে, তাই আমি চেয়েছি এবং আগামী দুই এক দিনের মধ্যে উক্ত পাঁচ  লক্ষ টাকা পরিশোধ করবেন। আরো বলেন যে, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পাঁচ লক্ষ  টাকা পরিশোধ না করলে আপনাকে পিটিয়ে হাড্ডি-গুড্ডি ভেঙ্গে প্রাণে মেরে ফেলবো। আর এই অনুষ্ঠান সহ টাকা চাওয়ার বিষয়ে কারো সাথে কোনভাবে আলাপ-আলোচনা করলে আপনার ব্যবসা-বানিজ্য সব বন্ধ করে দিয়ে ঢাকা ছাড়ার ব্যবস্থা করব। এমন হুমকির পর মোঃ জুবায়েদ আহেম্মদ দীপ প্রফেসর আব্দুর রাজ্জাককে ১ নম্বর আসামী এবং প্রফেসর কাজী আবু কাইয়ুম শিশিরকে ২ নম্বর আসামী করে চাঁদাবাজীর মামলা করে রাজধানীর রমনা থানায়। মামলা নং ০২ তাং ০৯/১০/২০২৪ ইং ধারা ৪২০/৩৮৫/৫০৬(২) বাংলাদেশ দন্ডবিধি। 

২৩ আগস্ট অধ্যাপক কাইয়ুম শিশির বিভিন্ন কর্মকর্তা ও ব্যবসায়ীদের (যাদের চাঁদা চেয়ে চিঠি দিয়েছিলেন) মোবাইলে ক্ষুদে বার্তা পাঠান। খুদে বার্তাতে তিনি উল্লেখ করেন, “সম্মানিত সদস্য, Khaleda Zia: A Biography of Democracy ক্লাবে বইটির মোড়ক উন্মোচনের অনুমতি নিয়ে ৫০০০ লোকের রান্নাসহ সকল আয়োজন শেষ হলেও স্বঘোষিত সাধারণ সম্পাদক ২ টার সময় অনুষ্ঠান বাতিল করায় ৭০ লাখ টাকা লস হয়। ৩০ সেপ্টেম্বর প্রেসক্লাবে এ বিষয়ে সংবাদ সম্মেলন। আপনি আমন্ত্রিত। কাজী কাইয়ুম শিশির নির্বাহী সদস্য (২০০৫-০৭,২০০৭-০৯)।” 

এনসিটিবির চেয়ারম্যান পদে পদায়ন পেতে দৌড়ঝাঁপ

বেগম খালেদা জিয়ার অনুমতিহীন জীবনী লিখে বইটিকে অস্ত্র বানিয়ে চাঁদাবাজি করে বেড়ানো অধ্যাপক শিশির এবার দায়িত্ব নিতে চান জাতীয় পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের। এনসিটিবির চেয়ারম্যান অধ্যাপক এ কে এম রিয়াজুল হাসানের মেয়াদ শেষ হয় চলতি বছরের গত ২৫ মার্চ। এরপর থেকে পদটি শূন্য। চেয়ারম্যানের অতিরিক্ত দায়িত্ব সামলাচ্ছেন অধ্যাপক রবিউল কবীর চৌধুরী।  এই পদের চেয়ারে বসতি প্রতি নিয়ত মন্ত্রণালয়ে দৌড়াচ্ছেন অধ্যাপক কাজী কাইয়ুম শিশির। যে করেই হোক এই পদে তাকে আসতেই হবে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানান, সম্প্রতি মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি থাকাকালীন মাউশির অতিরিক্ত দায়িত্বের মহাপরিচালক পদে পদায়ন নিতে আবেদনসহ মন্ত্রণালয়ের দৌড়ঝাঁপ করেন অধ্যাপক শিশির। নিয়ম অনুযায়ী, মাউশির মহাপরিচালক অনুপস্থিত থাকলে মাউশির পরিচালক (প্রশাসন) মহাপরিচালকের অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করবেন। তবে সচিব মহোদয় এবং উপদেষ্টা মহোদয় সেই আবেদন রিজেক্ট (বাতিল) করে দেন। এখন আবার তিনি ঘুরছেন এনসিটিবির চেয়ারম্যান হবার জন্য। 

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, ব্যাগ ভর্তি টাকা নিয়ে সে দপ্তরে দপ্তরে ঘুরাঘুরি করেন। যেখানে প্রভাব বিস্তারে কাজ না হয় সেখানে টাকা দেন কাজ হতেই হবে। এবারও এনসিটিবির চেয়ারম্যান পদ পেতে তিনি একই পন্থা অবলম্বন করছেন। তার এই কাজে সরাসরি সহযোগীতা করছেন শিক্ষা উপদেষ্টার দপ্তরের এক কর্মকর্তা। তবে শিক্ষা উপদেষ্টা জানেনও না ঐ কর্মকর্তা তার নাম ভাঙ্গিয়ে কি’না করছেন। 

এক শিশিরই নয়টি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মালিক

শুধু শিক্ষা ক্যাডার নয় সরকারের গ্যাজেটেড কিংবা নন গ্যাজেটেড কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারী কোনো ব্যবসার সাথে জড়িত থাকতে পারেন না। তবে বিশেষ বিবেচনায় সরকারের অনুমতি নিয়ে সামান্য ব্যবসার (কনসালটেন্সি ফার্ম জাতীয়) সাথে জড়িত থাকার সুযোগ থাকলেও সেই সংখ্যা নগণ্য।   কিন্তু মাউশির পরিচালক অধ্যাপক কাজী আবু কাইয়ুম শিশির একাধারে নয়টি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার। নিজের নামে স্ত্রী ও সন্তানের নামে এসব ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান। ১. K.M. A. KAYUM (KAZI MD. ABU KAYUM) ২.  BADRUN NAHAR ৩. SHISHIR DAIRY FARM ৪. SHISHIR ENTERPRISE, ৫. SHISHIR FISHERIES ৬. SHISHIR RICE MILLS ৭. SHISHIR POULTRY ৮. NIBIR FLOUR Mills ও 9. M/S NEEPA SEMI AUTO RICE MILLS.. এর মধ্যে রাজধানীর লালবাগের আজিমপুর কলোনিতে একটি, বারিধারায় একটি, মিরপুর সাড়ে ১১তে একটি এবং বাকি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান জামালপুর জেলার ঠিকানায় অবস্থিত। অধ্যাপক কাজী কাইয়ুম শিশিরের  জ্ঞাত আয় বহির্ভূত সম্পদের অনুসন্ধানে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের ‘সেন্ট্রাল ইনটেলিজেন্স সেল’ (সিআইসি) শাখা ইতিমধ্যে তদন্ত শুরু করেছে যা চলমান রয়েছে। 

অধ্যাপক শিশিরের দাবি, ১৯৯৯ সালে শেখ হাসিনার সরকারের আমলে বিসিএস কর্মকর্তা হিসেবে তিনিই প্রথম হাসিনা সরকারের অনুমোদন নিয়ে ব্যবসা করেন। 

আওয়ামী লীগ সরকারের বিগত ১৬ বছর আওয়ামী ফ্যাসিস্টদের ছত্রছায়ায় তিনি খাদ্য অদিপ্তরের প্রথম শ্রেণীর ঠিকাদার হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন এবং বাংলাদেশ পুলিশ ও ইডেন কলেজসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে অধ্যাপক শিশিরের “শিশির রাইস মিলস” নামক  ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে খাবার চাল সাপ্লাই দিতেন।

১৯৭৯ সালের সরকারি কর্মচারী আচরণ বিধিমালা অনুযায়ী এই অনুমোদন নেওয়া বাধ্যতামূলক। আচরণ বিধিমালার ১৭ (১) নম্বর ধারায় বলা আছে, ‘এই আইনের অন্য বিধান অনুসারে, কোনও সরকারি কর্মচারী সরকারের পূর্ব অনুমোদন ছাড়া কোনও ব্যবসায় জড়াতে পারবেন না। অথবা দায়িত্বের বাইরে অন্য কোনও কাজ কিংবা চাকরি নিতে পারবেন না।’ আবার বিধিমালার ১৭ (৩) নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, ‘সরকারের পূর্ব অনুমোদন ছাড়া একজন সরকারি কর্মচারী তার এখতিয়ারভুক্ত এলাকায় নিজের পরিবারের কোনও সদস্যকে কোনও ধরনের ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে যুক্ত করার বিষয়ে অনুমতি দিতে পারবেন না।

বিভিন্ন সময় বিভিন্ন গণমাধ্যমে দেওয়া বক্তব্যে অধ্যাপক কাজী কাইয়ুম শিশির দাবি করেছেন, তিনি সরকারের অনুমতি নিয়ে ব্যবসা করছেন। অথচ খোদ জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন তার সিংহভাগ ব্যবসাতেই সরকারের অনুমতি নেই। 

কর্মজীবনের সিংহভাগ সময় কলেজে পদায়ন থাকলেও কখনও কলেজমুখী হননি তিনি, নেননি কোন ক্লাস

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি সাহিত্যে পড়াশোনা করা অধ্যাপক শিশির কর্মজীবনে ঢাকাসহ বিভিন্ন সরকারি কলেজে পদায়ন থাকলেও দুই মাস অন্তর অন্তর একদিন তিনি কলেজে উপস্থিত হয়েছেন। তবে কখনও নেননি ক্লাস। ডিআইএর পরিচালক পদে পদায়নের আগে প্রায় দেড় বছর কুড়িগ্রাম সরকারি কলেজে কর্মরত ছিলেন। এই দের বছরে একটি ক্লাসও নেননি তিনি। ডিআইএর পরিচালক পদ থেকে মাউশির ডিরেক্টর পদে আসার মাঝের কয়েক মাস পদায়ন ছিলনে ময়মনসিংহের মুমিনুন্নিসা সরকারি মহিলা কলেজে। তবে কলেজটির মাটিতে শুধু যোগদান ছাড়া তা পা পরেনি। সব মিলিয়ে পাঁচ থেকে সাত দিন তিনি কলেজটিতে উপস্থিত ছিলেন। দীর্ঘদিন রাজধানীর ইডেন কলেজে পদায়ন থাকলেও কখনও তিনি ক্লাস নেননি। তার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান থেকে ইডেনে খাদ্য সরবারহ করা হয়েছে। সে ই খাবার সরবরাহের কাজে তিন মাঝে মাঝে ইডেন কলেজ উঁকি দিতেন।

শিশিরের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা এবং শিক্ষা সচিব কর্তৃক গুরুদণ্ড প্রদানের সিদ্ধান্ত আজও কার্যকর হয়নি 

পটুয়াখালী সরকারি কলেজে কর্মকালীন ৩১ ডিসেম্বর ২০২২ থেকে ৩১ মার্চ ২০২৩ ইং তারিখ পর্যন্ত ৯০ (নব্বই) দিন অননুমোদিতভাবে কর্মস্থলে অনুপস্থিত ছিলেন কলেজটির ইংরেজি বিভাগে কর্মরত অধ্যাপক শিশির। টানা ৯০ দিন কলেজে অনুপস্থিত থাকায় পটুয়াখালী সরকারি মহিলা কলেজের অধ্যক্ষ শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে অভিযোগ করেন। তদপ্রেক্ষিতে সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮ এর ৩(খ) ও ৩(গ) অনুযায়ী “অসদাচরণ” ও “পলায়ন” এর অভিযোগে বিভাগীয় মামলা দায়ের করা হয়। এই প্রেক্ষিতে অধ্যাপক শিশিরকে কারণ দর্শানোর নোটিশ প্রদান করা হলে শোকজের জবাব সন্তোষজনক না হওয়ায় সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮ এর বিধি ৭(২)(ঘ) অনুযায়ী তদন্তের জন্য তদন্তকারী কর্মকর্তা নিয়োগ করা হয় এবং তদন্তকারী কর্মকর্তা কর্তৃক দাখিলকৃত তদন্ত প্রতিবেদনে শিশিরের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ প্রমাণিত হয়। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগ নথিপত্র পর্যালোচনায় এবং তদন্ত প্রতিবেদনের প্রদত্ত মতামতের আলোকে আপনার বিরুদ্ধে সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮ এর ৩(খ) ও ৩(গ) অনুযায়ী “অসদাচরণ” ও”পলায়ন” এর অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় উক্ত অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করে শিশিরের বিরুদ্ধে গুরুদণ্ড প্রদানের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।

শেখ হাসিনা দেশত্যাগের ঠিক এক মাস আগে অর্থ্যাৎ ৩০ জুন ২০২৪ খ্রিষ্টাব্দে শিক্ষা সচিব সোলেমান খান স্বাক্ষরিত চিঠিতে বলা হয়, “কাজী মো: আবু কাইয়ুম (১০৩৫৭), অধ্যাপক (ইংরেজি), কুড়িগ্রাম সরকারি কলেজ, কুড়িগ্রাম-কে সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮ এর ৩(খ) ও ৩(গ) অনুযায়ী “অসদাচরণ” ও “পলায়ন: এর অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় আপনার বিরুদ্ধে গুরুদন্ড আরোপের সিদ্ধান্ত গৃহীত হওয়ায় একই বিধিমালার ৭(৯) বিধি অনুযায়ী কেন আপনাকে চাকরি হতে বরখাস্ত বা বিধিতে বর্ণিত অন্য কোনো গুরুদন্ড প্রদান করাহবে না তার জবাব এ নোটিশ প্রাপ্তির ০৭ (সাত) কার্যদিবসের মধ্যে প্রেরণ করার জন্য নির্দেশ দেওয়া হলো।” সে সময়ে আওয়ামী লীগের বেশ কিছু কেন্দ্রীয় নেতার সাথে ব্যবসায়িক সুসম্পর্ক থাকায় তিনি এই শোকজ ধামাচাপা দেন। এর ঠিক এক মাস পর শেখ হাসিনা দেশ ত্যাগ করলে মন্ত্রণালয় থেকে তিনি তার ফাইলই গায়েব করে দেন।

অসদাচরণের কারণে ঢাকা অফিসার্স ক্লাবের সদস্যপদ থেকে শিশিরকে বরখাস্ত

ঢাকা অফিসার্স ক্লাবের সাধারণ সম্পাদকের সঙ্গে অশালীন আচরণ এবং প্রশাসন ক্যাডারের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণের কারণে ঢাকা অফিসার্স ক্লাবের সদস্যপদ থেকে অধ্যাপক কাজী মো. আবু কাইয়ুম শিশিরকে গত ১৩ অক্টোবর ২০২৪ খ্রিষ্টাব্দে তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। ঢাকা অফিসার্স ক্লাবের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ক্লাবের গঠনতন্ত্রের ১৯ (৪) (ক) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী কাইয়ুম শিশিরের বিরুদ্ধে এডহক কমিটিকে হুমকি, সদস্যদের সঙ্গে অশালীন আচরণ এবং ক্লাবের সাধারণ সম্পাদকের নামে মিথ্যা কুৎসা রটনা করে ফেসবুকসহ ব্যক্তিগত ঠিকানায় পাঠানো এবং ক্লাবের পাওনা পরিশেষে ব্যর্থতার কারণে গত ১৩ সেপ্টেম্বর আপনাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়। একই সঙ্গে আপনার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ তদন্ত করার জন্য একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। আপনি কারণ দর্শানোর জবাব দেন নাই। তদন্ত কমিটি আপনার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হয়েছে বলে প্রতিবেদন পেশ করেছে। যা ক্লাবের গঠনতন্ত্রের ১২। (৪) (খ) এবং ১৯। (১) (ক) (খ) (গ) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী শাস্তিযোগ্য অপরাধ। বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়েছে, বর্ণিত অবস্থায় এডহক কমিটির ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৪ তারিখে অনুষ্ঠিত সভায় ক্লাবের গঠনতন্ত্রের ১৯। (৪) (খ) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী উল্লিখিত কার্যকলাপের কারণে আপনাকে ক্লাবের সদস্যপদ থেকে সাময়িকভাবে বরখাস্তের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত হয়েছে। এমতাবস্থায় আপনাকে ক্লাবের সদস্যপদ থেকে সাময়িক বরখাস্ত করা হলো।

জামালপুরের সামান্য বেতনের স্কুল শিক্ষক বাবার ছেলে আবু কাইয়ুমের অঢেল সম্পদ, দুদকের তদন্ত চলমান 

অধ্যাপক কাজী কাইয়ুম শিশির জামালপুরে সামান্য বেতনের একজন স্কুল শিক্ষক থাকলেও শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তা হয়ে কিভাগে কোটি কোটি টাকার সম্পদের মালিক বনে গেছেন সে বিষয়ে অনুসন্ধান করছে দুর্নীতি দমন কমিশন দুদক।  শিশিরের বিরুদ্ধে করা জনৈক এক ব্যক্তির করা আবেদনের প্রমাণিত বিশ্লেষণ করে প্রাথমিক সত্যতা পেয়ে তদন্তের সিদ্ধান্ত নেয় দুদক। যা চলমান আছে। দুদক সূত্রে জানা গেছে, ফ্যাসিস্ট হাসিনা পালানোর পর পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের পরিচালক পদে পদায়ন বাগিয়ে এই দপ্তরের অবৈধ আয় দিয়ে তিনি ঢাকার গুলশান-২ এর রোড নং-২৭ এ বিলাসবহুল একটি ফ্ল্যাট, উত্তরার কনকর্ড গ্রীন প্লাজায় অবস্থিত ফ্ল্যাটসহ একাধিক স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের মালিক বনে গেছে। প্রফেসর মো: আবু কাইয়ুম এর নামে বেনামে অসংখ্য প্লট ও জমি রয়েছে। তা মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল পূর্বাচল ২১ নং সেক্টরে স্ত্রীর নামে ৬ কাঠা প্লট। ঢাকার উত্তরখানে ৯ কাঠা জমি। স্ত্রীর নামে ১০ লক্ষ টাকার সঞ্চয়পত্র ও বড় ছেলের নামে প্রিমিয়ার ব্যাংক লিঃ এ ২০ লক্ষ টাকা ডিপোজিট, গাজীপুরে যৌথ মালিকানাধীন একটি রিসেটি, একটি প্রিমিও প্রাইভেট কার, একটি মাইক্রোবাস ও মিতসুবিশি জীপ গাড়ি। 

এক একাউন্টের প্রায় দুই কোটি টাকা লেনদেন শিশিরে

অধ্যাপক কাজী কাইয়ুমের নামে অগ্রণি ব্যাংকের এক একাউন্টেই প্রায় দুই কোটি টাকার লেনদেনের তথ্য পেয়েছে শিক্ষাবার্তা। এছাড়াও তার ও তার পরিবারের সদস্যের অন্যান্য একাধিক একাউন্টি শত শত কোটি টাকা লেনদেন হয়েছে বলে একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র নিশ্চিত করেছে। ঐ সূত্র জানায়, যদি বাংলাদেশ ব্যাংকের আর্থিক গোয়েন্দা শাখা দিয়ে তার ব্যাংক একাউন্ট ফ্রিজ করা হয় সব গুলো ব্যাংক একাউন্টের লেনদেন দেখলেই বোঝা যাবে তিনি এত টাকার মালিক কিভাবে হলেন।

মামলাবাজ শিশির

গত ১৪ জুলাই ২০২৫ খ্রিস্টাব্দে “শিক্ষা ক্যাডারের আবু কাইয়ুম শিশিরই যেন শিক্ষা উপদেষ্টা, মাউশি ডিজি তার ‘অধীনস্থ’!” শিরোনামে শিক্ষাবার্তা’য় সংবাদ প্রকাশের পর ঐদিন রাতেই বিভিন্ন মাধ্যম দিয়ে শিক্ষাবার্তা’র প্রতিবেদক এবং অফিস ম্যানেজ করার চেষ্টা করেন। তবে শিক্ষাবার্তা’ বরাবরের মতই কোনো অনিয়মের সাথে আপোষ না করায় পরের দিন অধ্যাপক কাজী কাইয়ুম শিশির পত্রিকাটির প্রতিবেদক, সম্পাদক ও প্রকাশের নামে মামলা করার হুমকি দিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পোস্ট করেন। শিক্ষাবার্তা’ কর্তৃপক্ষ শিশিরের এহেন হুমকিকে পাত্তা না দিয়ে গত ২০ জুলাই ২০২৫ খ্রিষ্টাব্দে “আরও বেপরোয়া মাউশির পরিচালক অধ্যাপক কাজী মো. আবু কাইয়ুম শিশির” শিরোনামে সংবাদ প্রকাশের পর ২৭ জুলাই ২০২৫ খ্রিষ্টাব্দে তিনি প্রতিবেদক এবং পত্রিকাটির সম্পাদক ও প্রকাশকের নাম উল্লেখসহ ১০০ কোটি টাকার মানহানী মামলা করে। মামলা নম্বর বিজ্ঞ সি. এম. এম (এ. সি. এম. এম-৩) আদালত।  সূত্রঃ সি.আর আর মামলা নং-৫৯২/২০২৫ (ধানমন্ডি থানা) ধারাঃ ৫০০/৫০১/১০৯ পেনাল কোড। এর আগে দুর্নীতির দায়ে গত ২৪ নভেম্বর ২০২৪ খ্রিষ্টাব্দে পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের পরিচালক (পদায়ন পাওয়ার তিন মাসের মাথায়) পদ থেকে প্রত্যাহার করে একটি সরকারি কলেজে পদায়ন দিলে তিনি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিরুদ্ধে মহামান্য হাইকোর্টে রিট পিটিশন মামলা দায়ের করে বদলির আদেশ স্টে করান। পরবর্তী পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের পরিচালকের চেয়ার দখল করলে ডিআইএর পক্ষ থেকে শাহবাগ থানায় সাধারণ ডায়েরী করা হয়। অধ্যাপক আবু কাইয়ুম শিশিরের পরিবারের সদস্যরা অর্থ্যাৎ তার দুই সন্তান এবং স্ত্রী বদরুন নাহার নিপা বসবাস করেন লন্ডনে। বদরুন নাহার নিপা রাজধানীর মোহম্মদপুরে অবস্থিত ঢাকা স্টেট কলেজের ইংরেজি বিষয়ের সহকারী অধ্যাপক। তিনি কলেজটিতে লন্ডনে বসবাস করলেও ইএফটিতে (ইলেকট্রনিক ফান্ড ট্রান্সফার) তার বেতন-ভাতা উত্তোলন করছেন শিশির। আওয়ামী লীগের আমলে দীর্ঘদিন কলেজটিতে অনুপস্থিত থাকায় বদরুন নাহারকে বরখাস্ত করে ঢাকা স্টেট কলেজ প্রশাসন। বরখাস্তের বিরুদ্ধে স্ত্রীকে দিয়ে অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে মামলা করান শিশির। এছাড়াও ২০২১ সালের ৭ ডিসেম্বর ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান দ্য বিল্ডার্স ইঞ্জিনিয়ার্স অ্যাসোসিয়েটস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ফজলুল করিম চৌধুরী ওরফে স্বপন চৌধুরীসহ দুজনের বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা দায়ের করে অধ্যাপক কাজী কাইয়ুম শিশির। ২০২২ সালে বনানী থানায় এক ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে মামলা করেন তিনি।

শিক্ষাবার্তা ডটকম/এএইচএম/২০/০৮/২০২৫


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.